spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
প্রচ্ছদগদ্যঈদের সেকাল, একাল, পরকাল এবং ব্যক্তিগত অনুষঙ্গ : ২য় পর্ব

লিখেছেন : আবু জাফর সিকদার

ঈদের সেকাল, একাল, পরকাল এবং ব্যক্তিগত অনুষঙ্গ : ২য় পর্ব

আবু জাফর সিকদার

[পর্ব দুই ]

ট্রেন দোহাজারী পৌঁছতে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমে এলো। ঐদিন আমাদের আর বাড়ি ফেরা হলো না। আমরা দল বেঁধে মাইগ্যাপাড়া সেই নানির বাড়িতে চলে গেলাম। নানিরা খুব সচ্ছল ছিলেন না, নিম্নমধ্যবিত্ত একটি পরিবার। কিন্তু এক আত্মীয়তার যোগসূত্র ধরে অনেকগুলো ছেলেকে যেভাবে আপন করে নিয়ে আতিথেয়তা করেছেন সেই আন্তরিকতাই ছিলো তখনকার সময়ের এক অনন্য নজির। এভাবে আমরা একেক জনের আত্মীয়তার সূত্র ধরে বহু দূরসম্পর্কের বাড়িতে বাড়িতে ঈদ উপলক্ষে বেড়াতে যেতাম। আমরা পালা করে একেক বছর একেক জনের আত্মীয়ের বাড়িতে চলে যেতাম, আশেপাশে যত আত্মীয়স্বজন থাকতো তাদের কেউ বাদ যেতো না। যাদের বাড়িতে বেড়াতে যেতাম, তারা অত্যন্ত মমতা নিয়ে আপ্যায়ন করতেন, কেউ কেউ সাধ্যমতো ঈদ সালামিও দিতেন। নিজেরা খুশি হতেন, আমাদেরও খুশি করার চেষ্টার ত্রুটি করতেন না। কিছু কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এটাই ছিলো তখনকার সময়ে বাংলার গ্রাম্য ঈদ উৎসবের প্রধান সৌন্দর্য এবং আতিথেয়তা ও ভ্রাতৃত্ববোধের চমৎকার নিদর্শন।

প্রথম আজব শহর দর্শনের যে স্মৃতি, তা খুব বেশি সুখকর না হলেও আনন্দদায়ক ছিলো নিশ্চয়ই। সেবারের ঈদের সেলামি সুকৌশলে বেহাত হয়ে ছিলো, তখন না বুঝতে পারলেও পরে তা ঠিকই বুঝেছি। এই ঘটনাটা একটু সবিস্তারে লেখার কারণ হলো তখন আসলে আমরা বন্ধু বান্ধবরা মিলে ঈদ উদযাপন করতে গিয়ে কিরকম নির্মল আনন্দ উপভোগে মাতোয়ারা হতাম, এটা তারই একটি নমুনা মাত্র।
একা একা কিংবা কেবল ভাইবোনের মধ্যে এই ঈদ আনন্দ সীমাবদ্ধ থাকতো না বরং সমবয়সি ও সহপাঠিরাই ছিলাম এই দল গঠনের মুখ্য নিয়ামক।তবে এই দলগঠন বছর বছর অভিযোজন ও বিয়োজন হয়ে যেতো। যাকে যে নিয়ে যেদিকে ছুটতে পারে সেইরকমভাবে দল পাকানো হতো। বোনরা ছুটছে এক দল বেঁধে, বয়সে ছোট ভাইয়েরা এক দলে, আবার বড় ভাইয়েরা দলে দলে বিভক্ত হয়ে ছুটছে এবাড়ি ওবাড়ি কিংবা দূরের কোন আত্মীয়ের বাড়ি। পুরানগড়, বাজালিয়া, ধর্মপুর, সদাহা, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, পটিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে আমরা ছুটে বেড়িয়েছি। ঈদের আনন্দ যেন ফুরাতে চাইতো না! মা, বাপেরা কিছুটা উদ্বিগ্ন থাকলেও বিচলিত হয়ে পড়তেন না, ভাবতেন হয়তো কোনো আত্মীয়ের বাড়িতেই নিরাপদে আছে ছেলে মেয়ে। এখনকার মতো তো তখন এত যোগাযোগ ব্যবস্থার বালাই ছিলো না। দ্রুত খবরাখবর দেয়া নেয়া সহজ ছিলো না। বিশ্বাসের উপর ভর করে ঈদের সময় ছেলেমেয়েদের ঘরের বাইরে যেতে দিতেন।

পাড়ায় পাড়ায় ঈদ বেড়ানিটাও কম আনন্দদায়ক ছিলো না। প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরেই আমরা ছুটে যেতাম, কোন শত্রুমিত্র জ্ঞানবোধ ছিলো না, আত্মীয় অনাত্মীয় ভেদ ছিলো না, ছিলো না ধনী গরীব, উঁচু নীচু ইত্যাদি হিসেব নিকেষ, দল বেঁধে ছুটছি তো ছুটছি!
মসজিদ থেকে ঈদের নামায শেষ করেই আমরা বের হয়ে পড়তাম, বড়রা কিছু কিছু বের হয়ে গেলেও অধিকাংশ খোতবা শুনতে বসে থাকতেন। মুনাজাত শেষে ময়মুরুব্বিদের কবর জেয়ারতের সময় দিতেন।
তারপর জনে জনে কোলাকুলি ও বিলাপ তুলে কান্নাকাটির এক রোল পড়ে যেতো! একজন আরেকজনের কাছে হাসিমুখে না হয় কান্নারত অবস্থায় ক্ষমা চেয়ে নিতেন। মারামারি, ঝগড়াঝাঁটি, রাগ অভিমানে সারা বছর উঠাবসা, মুখদর্শন ও কথাবলা বন্ধ থাকলেও ঈদের দিন সব ভুলে একজন আর একজনকে জড়িয়ে ধরে ছেলেমানুষের মতো বড়দের এই কান্নাকাটির দৃশ্য সত্যিই এক অনন্য সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের পরাকাষ্ঠা। ঈদ যেন ঐক্য, মিলনে এক অমিয় ও স্বর্গীয় বার্তা নিয়ে ঘরে ঘরে, মহল্লায় মহল্লায় ছড়িয়ে পড়তো।

এই ঈদ আনন্দের ঢেউ গিয়ে আছড়ে পড়তো আশে পাশের জেলে পল্লী, বড়ুয়া পাড়ায় কিংবা কামার পাড়ায়ও।
আমাদের বন্ধুরা যেমন আসতো তাদের অনেক মা বাবারাও বেড়াতে আসতেন। আমার বন্ধু ও সহপাঠি স্বপন তার ভাই অঞ্জনও আসতো। মৃদুল, দুলাল,
কাজল, রুপন, টিপু, অপু ও সন্তোষ চাচারাও নিজ নিজ বন্ধুদের সাথে ঈদ আনন্দে শরিক হতেন। অনীল দাদা, সুনীল স্যার, যতীন্দ্র, প্রিয়দর্শী দাদারাও আসতেন। কামার পাড়া থেকে ‘কাল্যুয়া মা ঝি ‘, ‘বাদল্যা মা ঝি ‘ এরা আসতো, বাপ বাপ করে ওরা আমাদের জড়িয়ে ধরে আদর করতো! তবে আমাদের পাড়ায় ওপাড়ার ছেলেদের আনাগোনা কম ছিলো, তারা বেশিরভাগ ছিলো বহির্মুখি। বাদল, কালু এরা সবাই গ্রামের বাইরে চলে গেছিলো ছোট বয়স থেকেই।

জেলে পল্লী থেকে আসতো শশীবালা, মোহনবাঁশি আরও কতো চমৎকার নাম ছিলো ওদের, সবার নাম এখন স্মরণে আসছে না। নিত্য স্যারের বোন-মাদের সাথেও আমাদের খুব ভাল সম্পর্ক ছিলো। তবে ওরা তেমন বাইরে যেতেন না। কিন্তু নিত্য স্যার আমাদের প্রাইভেট পড়াতেন, স্যারের বাড়িতে আমাদের এবং আমাদের বাড়িতে স্যারের নিয়মিত যাতায়াত ছিলো। স্যার আমাদের আশ্বিনে রেঁধে কার্তিকে খাওয়া পান্তাভাত, নারিকেল, গুড়- কলা খাওয়ার দাওয়াত দিতেন! তখন আমি সপ্তম, অষ্টম শ্রেণিতে পড়তাম।আমি, এনাম, জাকারিয়া তিনজন একসাথে স্যারের কাছে পড়তাম।

সাঙ্গু নদীর ওপার দিয়াকুল থেকে আসতেন সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি সুবল ও সোগল বৈদ্য জেঠারা। তাদের ছেলেদের মধ্যে একজন ছিলেন বাদল দা, অন্যজন হলেন কাজল দা। তারা দুজনই গ্রাম্য ডাক্তার হিসাবে সুপরিচিত হয়েছেন। তারাও আসতেন।আসতেন আমাদের প্রিয় শিক্ষক বাবু অনিল কান্তি স্যার, তার ভাই ডা. কালিপদ দাদা তো আসতেনই নিয়মিত! পশ্চিম দিয়াকুলের আর একজন প্রসিদ্ধ পল্লীডাক্তার ছিলেন তিনিও ছিলেন আমাদের অসুখবিসুখের নিত্য সহচর, তিনি হলেন ডাক্তার নগেন্দ্র বড়ুয়া (তিনি ননদ্র ডাক্তার নামে অধিক পরিচিত ছিলেন)। তার ডাক্তারি সেবা একবারের জন্য হলেও নেননি এমন লোক খুঁজে পাওয়া তখন আমাদের এবং আশেপাশের গ্রামে প্রায় দুর্লভ ছিলো। তিনি আবার আমাদের বড়ুয়া পাড়ার জামাই ছিলেন! সেই সুবাধে আমার আম্মা চাচিদের সম্পর্কে শাশুড়ি ডাকতেন। আমাদের ভাই বলেই ডাকতেন। তিনি ঘরের লোকের মতো করেই আমাদের সাথে একসাথে বসে খাওয়াদাওয়া করতেন। ঈদের সময় ঘটা করে বেড়াতেও আসতেন।

আবার মুসলিম গরীব অসহায়দের মতো দান খয়রাতের আশায় দুস্থ, হতদরিদ্র কিছু হিন্দু পরিবারের সদস্যরাও আসতেন। তারাও ধান,চাল বা নগদ সাহায্য নিতেন। আবার অনেকেই আমাদের রান্নাঘরে ঢুকে যেতেন, বসে ঈদের সেমাইও খেয়ে যেতেন। দক্ষিণপাড়ার এবং মনেয়াবাদের জেলেপাড়া কিংবা ফকিরখিল থেকেও তারা আসতেন।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

নয়ন আহমেদ on মরুভূমি
সাদ আব্দুল ওয়ালী on ৩টি কবিতা
নয়ন আহমেদ on ৩টি কবিতা
নয়ন আহমেদ on ৩টি কবিতা
সাদ আব্দুল ওয়ালী on লজ্জাবতী ও অন্যান্য কবিতা