আবু জাফর সিকদার
[শেষ পর্ব ]
আমরা যখন ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠলাম, আমরাও ছোটদের জায়গা ছেড়ে দিয়ে বড়দের ধারায় লীন হতে থাকলাম। তখনও মসজিদে ঈদ জমায়েত শেষে যে অভূতপূর্ব আনন্দ, হাসি কান্নার মিলন ঘটতো তা অব্যাহত ছিলো। আমাদের পরের প্রজন্ম থেকে এই উৎসব কেমন যেন ধীরে ধীরে দৃশ্যত ফিকে হয়ে আসতে লাগলো! বদলে যেতে লাগলো ঈদ আনন্দের সব কিছু। বায়তুল ইজ্জত ও পটিয়ায় সিনেমা হল হলো, ছেলেরা সব গ্রামের ঘরে ঘরে দৌড়াদৌড়ি বাদ দিয়ে পঙ্গপালের মতো ছুটতো সিনেমা দেখার নেশায়।
সামাজিক বিবর্তন এবং পরিবর্তনগুলো ঘটতে শুরু করেছে বিগত দু’তিন দশক ধরে। গ্রামের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর সন্তানেরা শহরমুখি হতে শুরু করলো। উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনে তারা শহরে গিয়ে আর গ্রামে ফেরার ফুরসত পেলো না, চাকুরী, সংসার ব্যবসা, বাণিজ্য, বিদেশ গমন কোনো না কোনো কর্মযজ্ঞে তারা যুক্ত হয়ে পড়লো। তাদের দেখাদেখি অন্যরাও জীবিকার তাগিদে শহরের দিকে ছুটতে লাগলো! আলগা হয়ে গেলো শাশ্বত গ্রামীণ মা ও মাটির প্রতি পিছুটান। আমাদের সন্তানসন্ততিরা বড় হতে থাকলো শহরেই। ওরা গ্রামের অলিগলি চিনে না, গ্রাম ওদের টানে না! ঈদে চাঁদে ওরা আগ্রহ ভরে যেতে চায় না কিংবা মা বাবার পীড়াপীড়িতে হয়তোবা গ্রামে যায়। গ্রাম তাদের কাছে এক নতুন প্রতিবেশ। অচেনা পরিবেশ, অচেনা আত্মীয় পরিজন, সমবয়সি সহপাঠিরাও যেন তেল জলের মতো! অপরিচিত মানুষজনের ভেতরে তারা খুবই অস্বস্তিতে ভুগতে থাকে। এক দুদিন ঘুরতে না ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে উঠে! ঘুরার চেয়ে বরং ট্যাব, অ্যাপল, এন্ড্রয়েড মোবাইলে ফেসবুক, ইউটিউব, গেইম, টিকটক ভিডিও ইত্যাদির প্রতি তাদের অদম্য আকর্ষণ। এসব মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাদের ঘরবন্দী করে রাখে। চাকুরীওয়ালা মা বাবাদের ছুটি শেষ হয়ে আসে, আবার পরিচিত পরিবেশে ফিরতে হয়, হাঁফছেড়ে যেন বাঁচে আজকের প্রজন্ম!
এছাড়া অধুনা ঈদের বেড়ানিতে উচ্চবিত্তের দেখাদেখিতেও উঠতি মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যেও একটি নতুন অনুষঙ্গ যুক্ত হয়ে গেছে। ঈদের সময় তারা গ্রামমুখি আর হতে চান না! তারা ঈদ কাটান পারিবারিকভাবে কিংবা বন্ধুমহল মিলে বিভিন্ন পর্যটন স্পটে। কেউ ছুটেন কক্সবাজার সৈকতে, কেউ বা সেন্টমার্টিন, আবার কেউ বা যান সিলেট, কুয়াকাটা, রাঙামাটি, বান্দরবন, খাগড়াছড়ি। নানা জায়গায় তখন উপচে পড়া ভিড়। যাদের টাকা পয়সার তারল্য একটু বেশি তারা এই বিনোদনেও সন্তুষ্ট থাকছেন না, তারা ঈদের আনন্দ খুঁজতে ছুটছেন মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই, মুম্বাই, মালদ্বীপ, আমেরিকা, কানাডা কিংবা অন্য কোন দেশে, যার যেখানে সামর্থ্যে কুলায় ছুটছেন ঈদ আনন্দ কুড়াতে। ঈদ এখন তাদের স্রেফ আত্মকেন্দ্রিক অবকাশযাপনের একটি সুযোগ মাত্র। বিনোদনের নামে পয়সার বিনিময়ে সুখ ও আনন্দ কেনার ব্যর্থ প্রয়াস। ঈদ এখন তাদের কাছে প্রতিবেশিদের সাথে শেয়ারিং এর বিষয় নয়, ঈদ এখন তাদের কাছে পারস্পরিক হৃদ্যতা-আন্তরিকতা, ত্যাগের মহিমায় আনন্দ লাভের মাধ্যমও নয়, নয় ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করার কোন উসিলা। ঈদ এখন এসব উঠতি ধনিক,বণিক ও শিক্ষিত আমলাশ্রেণির কাছে গরীব দুস্থদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের কিছু কষ্ট লাঘব করে আনন্দ ভাগাভাগি করার ব্যাপারও নয়। সবচেয়ে ভয়াবহ যে বিষয়টি লক্ষণীয়, তাদের নতুন প্রজন্ম রীতিমতো সমাজবিচ্ছিন্ন কিছু নব্য মানব প্রজাতির মতো বেড়ে উঠছে। তাদের কাছে ঈদ মানে লেটেস্ট ফ্যাশন সংগ্রহের প্রতিযোগিতা, শপিং এ কেনাকাটা, দিল্লি-দুবাই-সিঙ্গাপুর চষে বেড়ানো। তারপর বিনোদনের নামে যা যা তারা করছে সেসব না হয় এখানে নাই বা উল্লেখ করলাম। তাদের কাছে সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম বিনোদন হলো সাইবার ক্যাফে গিয়ে নানাজাতের গেইম কিংবা অশ্লীলতায় বুঁদ হয়ে থাকা। আবার এক শ্রেণির কিশোর, যুবক ঝুঁকে পড়ছে সাইবার ক্রামের চোরাগলিতে! না চাইতে পেয়ে যাওয়ার বিপরীতে না পাওয়ার চরম হতাশা থেকে আর একটি ক্ষুদ্র শ্রেণি তৈরি হচ্ছে তারা ঝুঁকছে
চরম ধর্মীয় উগ্রবাদের দিকে। এভাবে এক সমাজ আজ বহুধা ভঙ্গুর অপভ্রংশে রূপান্তর ঘটে চলছে।
ঈদের প্রকৃত শিক্ষা, চেতনা থেকে দূরে সরে গিয়ে ঈদের নির্মল আনন্দ যেমন উবে গেছে তেমনি সেখানে মূল্যবোধ ও শাশ্বত সংস্কৃতির ভিত্তিমূলও ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে। ঈদ নিয়ে আমাদের উত্তর প্রজন্মের যখন এই বেহাল দশা, তখন আমাদের বুড়ো প্রজন্মের ঈদ ভাবনায়ও ঘটে গেছে বিস্তর রূপান্তর। বলা যায়, এই বুড়ো প্রজন্মের বদৌলতেই উত্তর প্রজন্ম ঈদের ঐতিহ্যগত জৌলুশ, আভিজাত্য ও স্বকীয়তা ভুলে স্রেফ আত্মকেন্দ্রিক আনন্দ বিনোদনে সুখ খুঁজে ফিরছে।
বুড়ো প্রজন্মের আরও কিছু অপরিণামদর্শী আচার আচরণও বেশ অবাক করা বিষয়, এমনকি এবিষয়ে বোধ হয় গবেষণা করা গেলে ভালোই তো। পাকিস্তান আমলি এবং বাংলাদেশ উত্তর (৫০-৯০ দশক) সময়কালের প্রজন্মের সাথে বেনিয়া সমকালের প্রজন্ম তথা আমাদের দাদাদাদি নানা নানিদের আচরণগত ও স্বভাব-চরিত্রগত যে ব্যবধান ঘটে গেছে তা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে বেশি নেতিবাচক দিকেই মোড় নিয়েছে। অথচ যে কোনো বিবেচনায় এর উল্টোটাই হওয়া প্রত্যাশিত ছিলো। এই যে চরিত্র ও স্বভাবে নেতিবাচক প্রভাব প্রকট হয়েছে , ক্ষেত্র বিশেষে উৎকট ও কদর্য হয়ে উঠেছে তা-ই তো একবিংশের প্রজন্মকে ফ্রাংকেস্টাইনি দানবের মতো গ্রাস করতে বসেছে। এই যে ব্যক্তিক পর্যায়ের ইতিবাচকতার চেয়ে নেতিবাচকতা চর্চার প্রভাব, তা পুরো সামাজিক ও সামষ্টিক জীবনাচারে সংক্রমিত হয়ে গেছে। সেখানে ঈদ পার্বণ কিংবা অন্যান্য সামাজিক উৎসবগুলো বাদ যায় কি করে?
এ নিয়ে এখানে বিস্তারিত আলোকপাতের অবকাশ নেই, তবে একটু ব্যাখ্যা না দিলে বোধ হয় অস্পষ্টতা থেকে যাবে।
আমাদের দাদাদাদি, নানা নানিদের সময়কাল পেরিয়ে বাপ-চাচা, মামা,খালাদের সময়। তারপর আমরা। তারপর আমাদের সন্তানসন্ততির হাত ধরে নাতি নাতনিরাও প্রবেশ করছে মহাকালের কক্ষপথে! এই পাঁচটি মাত্র প্রজন্মের বাইরে আমাদের দৃষ্টিপথ খুবই ক্ষীণ। হাজার বছরের বাঙালি বলে আমরা গর্ব করি! হিউয়েন সাং, ইবনে বতুতার আর চর্যাপদের কিছু দলিল দস্তাবেজ ঘেঁটেঘুটে হয়তো আরও কিছু দূর পেছনে যাওয়া যেতে পারে। পেছনের সেসব গৌরবগাঁথা আর সমৃদ্ধ সামাজিক অবস্থার পর্যালোচনা ও বিচার বিশ্লেষণে না গিয়েও আমরা কেবল আমাদের পাঁচ প্রজন্মের সমকালটিকে সূচক ধরে পর্যালোচনা করলেই সার্বিক চিত্রটি ফুটে উঠে। আমাদের প্রজন্মটা সেতুবন্ধন। আমাদের আগের দুই প্রজন্ম এবং শেষ দুই প্রজন্ম মিলে প্রায় শতাব্দীকালের পরিক্রমায় সামাজিক অবক্ষয়ে কার দায় কতটুকু সে হিসাব না কষলেও ভাঙ্গনটা যে বৃটিশ কলোনিয়াল যুগোত্তর সময় কাল থেকে শুরু হয়ে গিয়েছিলো তা বলতে দ্বিধা নেই। আমরা দু-দুটো স্বাধীনতা আস্বাদন করেও যেন পরাধীনের মতোই বেড়ে উঠেছি! আমাদের আত্ম-সামাজিক যে পরিবর্তনগুলো বিভিন্ন বাঁক বদলের সময় ঘটে গেছে তার সুফল আমার ঘরে তুলতে পারিনি, এটাই চরম সত্য। তারই জের ধরে অবক্ষয় প্রকট হয়েছে, ঐক্যের পরিবর্তে অনৈক্য, ভ্রাতৃত্ববোধের পরিবর্তে চরম বিভেদ, বিভাজন। সংহতির পরিবর্তে পারস্পরিক শত্রুতা এতটাই ব্যাপক রূপ পরিগ্রহ করেছে যে সেখানে ঈদ, পুজো-পার্বণ, উৎসব, মেলা ইত্যাদি আমরা এখন আর সম্মিলিতভাবে উদযাপন করতে পারি না! ভাই, ভাইয়ের মুখ দেখে না। চাচা ভাতিজা কথা হয় না। ভাই বোনের খবর রাখে না, বোন ভাইয়ের। প্রিয় সন্তানেরা পুরোনো ধ্যানধারণার (ব্যাকডেটেড) বলে কিংবা ভরণপোষণে ভাগাভাগির অজুহাত তুলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিচ্ছে জন্মদাতা বাবা আর জন্মদাত্রী মা জননীকে।
এক প্রতিবেশি যাতায়াতের পথ বন্ধ করে দেয় অন্য প্রতিবেশির! এ-ই হলো একটি একক ও অতিক্ষুদ্র পারিবারিক পরিমণ্ডলের প্রাত্যহিক খণ্ডচিত্র। প্রতিহিংসা ও জিঘাংসা এখানে থামলেও তবুও কিছুটা সান্ত্বনা খোঁজা যেতো। কিন্তু বাড়তে বাড়তে পুরো রাষ্ট্র কাঠামোকেই এই মহাপ্লাবন গ্রাস করে নিয়েছে! ঐক্য, সংহতি, পারস্পরিক ভালোবাসা, সহমর্মিতা, ক্ষমার পরিবর্তে আমরা কম বেশি সবাই মিলে এমন এক সমাজ বিনির্মাণ করে ফেলেছি, এখানে ঈদের সেই সার্বজনীন রূপ খুঁজতে যাওয়া বাতুলতা ছাড়া আর কী!
তাই, ঈদ যে সওগাত নিয়ে আসতো তা ফিরে পেতে হলে আমাদের সমাজকে পুনঃনির্মাণ ছাড়া আদৌ সম্ভব নয়।
ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে বিনোদন – এটাই শেষ কথা নয়। ইসলামের সংস্কৃতিতে এই দুই দুটি ঈদের সাথেই আধ্যাত্মিকতার তাৎপর্যপূর্ণ সংযোগ আছে। দুটি বিশেষ ধর্মীয় তাৎপর্য, ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশ ও উপলক্ষকে ঘিরে এই ঈদ আনন্দ উৎসবের অনুমোদন দেয় ইসলাম। তাই বিনোদনের নামে কোন রকম লাগামহীন কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি নেই এখানে। ঈদের কেবল আনুষ্ঠানিক সর্বস্বতা কাম্য নয়। আনন্দ-বিনোদনের পাশাপাশি এর যে সামাজিক গুরুত্ব ও তাৎপর্য সেটা অনুধাবন ও চর্চা সমভাবে জরুরী। ঈদের ধর্মীয় তাৎপর্যের মূল কথা হলো আল্লাহভীতি অর্জন ও ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে সবাই মিলেমিশে, ভাগাভাগি করে আনন্দ উদযাপন করা। দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনা শেষে আল্লাহর পক্ষ থেকে ঈদুল ফিতর হলো এক অনন্য উপহার! একই ভাবে ঈদুল আযহা এক অনন্য ত্যাগের দৃষ্টান্তকে স্মরণীয় ও বংশপরম্পরায় তা পালনের সুযোগ করে দিয়ে ইসলাম যে শিক্ষা সমাজে ছড়িয়ে দিতে চায়, তা এক কথায় অতুলনীয়। হাজার হাজার বছর আগের কেবল দুটি মানুষ- হযরত ইব্রাহিম আ. ও হযরত ইসমাইল আ. এর অগাধ বিশ্বাস ও আল্লাহভীতি কতটা শর্তহীন ও নজিরবিহীন ছিলো এবং তা সমগ্র মানবজাতির জন্য কতটা অনুকরণীয় ও অনুশীলনযোগ্য দৃষ্টান্ত এটা যেমন প্রতিভাত হয়েছে, ঠিক একইভাবে এই ঐতিহাসিক ঘটনা মানব জাতিকে সাম্য-ভ্রাতৃত্ব-ঐক্য-ত্যাগ-ঐশী জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় আলোকিত করার ধর্মীয় লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সফল করা মিশনকে কেয়ামত পর্যন্ত জারি রাখার সুব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, একটি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের অনুষ্ঠানকে একটি আনন্দঘন উদযাপনের ভেতর দিয়ে সুসম্পন্ন করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। ঈদের মোড়কে খাওয়া দাওয়া,আপ্যায়ন, আনন্দের ভেতরও আল্লাহ আখেরাতমুখি কল্যাণ ও মুক্তির উছিলা বানিয়ে দিয়েছেন। এর চেয়ে চমৎকার আয়োজন ও বিধান আর কী হতে পারে! আল্লাহ আমাদের যথাযথ শিক্ষা গ্রহন করে ঈদ আনন্দ উদযাপনের তৌফিক দান করুন।
।সমাপ্ত।