প্রচ্ছদপ্রবন্ধসাজ্জাদ বিপ্লবের কবিতা : আশ্চর্য পবিত্রতা ও সুন্নাহের পরিক্রমায় স্নিগ্ধ

লিখেছেন : তৈমুর খান

সাজ্জাদ বিপ্লবের কবিতা : আশ্চর্য পবিত্রতা ও সুন্নাহের পরিক্রমায় স্নিগ্ধ

তৈমুর খান

বাংলা করিতাকে আবার নতুন করে কিভাবে উপস্থাপন করা যায়, কিভাবে লিখলে সব ধরনের পাঠকই কবিতাকে নিজের করে নিতে পারবে, মূলত কবিতায় কী থাকে—এসব নিয়ে যিনি ভেবেছেন, কখনো নিজেই লিখেছেন, কখনো অন্যকে দিয়ে লিখিয়েছেন—সেই কবি ও সম্পাদক সাজ্জাদ বিপ্লব। একদিকে সৃষ্টিশীল ভাবুক ও দার্শনিক,অন্যদিকে কবি ও গদ্যকার, সম্পাদক ও প্রকাশক । ২৩ এপ্রিল তাঁর জন্মদিন। আমাদের অঢেল শুভকামনা ও ভালোবাসা তাঁর জন্য।
কবিতার সহজবোধ্য চাবি খুঁজতে গিয়ে তিনি যে বিখ্যাত বইটি লিখেছেন তা প্রথমেই স্মরণ করি— ‘আমার হাঁসগুলি কবিতা পাড়ে’। এই কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতায় সকালের স্নিগ্ধ আলোকরশ্মি ছড়িয়ে পড়েছে। শরৎকালীন মনোরম প্রতিভাসে জেগে উঠেছে অসীম মুগ্ধতা। অন্যান্য গ্রন্থগুলিতেও কবির নিজস্বতা স্পষ্ট। মূলত ‘তুমি ছাড়া আমার কোনো বসন্ত নেই’, ‘আমি কারো শত্রু নই’, ‘সেই ছেলে আমি’ পড়তে পড়তে কাব্যজগতের এক নতুন দিগন্ত খুলে যায়। খুব অল্পদিনেই তিনি আমাদের মন জয় করে নিয়েছেন। এক ঝলক দেখে নিই তাঁর কবিতা ভাবনার বিষয়-আশয়।
সাজ্জাদ বিপ্লব এক সহজ জীবনবাদী চেতনায় সর্বদা চালিত হয়েছেন। সমস্ত সৃষ্টির মধ্যেই তিনি আত্মসত্তার জাগরণ টের পেয়েছেন। তাই তাঁর কবিতা ও ছড়াগুলিতে এক মরমি জীবনচারণার উচ্ছল আনুগত্য স্পর্শ করা যায়। এই আনুগত্য পরম স্রষ্টার প্রতি, যিনি তাঁকে সৃষ্টি করেছেন, যিনি জগৎও সৃষ্টি করেছেন। তাই জগৎও সাজ্জাদ-সত্তার সঙ্গে একীভূত চেতনার রূপান্তর। সুতরাং তিনি কখনো নিজেকে আলাদা ভাবতে পারেন না। যা সকলের, যা জগতের, যা অনন্তের, যা চিরন্তনের তা তাঁরও। তাই তিনি মানুষকে ছেড়ে, পৃথিবীকে ছেড়ে কখনো নিজের দূরত্ব বজায় রাখতে চান না। বরং আরো কাছাকাছি সকলের সঙ্গে এই জীবনের সুখ-লাবণ্য, দুঃখ ও অনুতাপ ভোগ করেন। একটি কবিতায় বলেছেন:
“তুমি, মানেই আমি। আমরা। এক থেকে একাধিক। লক্ষাধিক। অসংখ্য।
সৃষ্টির আদি কথাও তুমি ও আমি।”
(সিক কল)
সুতরাং ‘তুমি’ ‘আমি’ ব্যক্তিবাচক সর্বনামে ভিন্ন ব্যক্তি নির্দেশ করাকে তিনি অমূলক মনে করেন। বরং সমূহ সৃষ্টি সত্তার মধ্যে বহুমুখী জীবন প্রত্যয়ের বিচিত্র রূপকেই তিনি অনুধাবন করেন। এখানেই তাঁর পরম প্রজ্ঞার প্রতি গভীর আনুগত্যের প্রকাশ লক্ষ করা যায়। এখানেই তিনি ক্ষুদ্র মানবজন্মকে বৃহত্তর মানবিক করে তুলতে পারেন। তাই তিনি নিজের বিনাশকেও বিনাশ বলে মনে করেন না। কেননা তিনি শুধু ব্যক্তি নন, তিনি অনন্ত। অনন্তের কখনো মৃত্যু নেই। ধ্বংস নেই।
পৃথিবী কখনো অনন্ত সুখের আধার নয়। চিরসৌন্দর্যের আশ্রয়ভূমিও নয়। নানা অসামঞ্জস্য, অন্তরায়, ও অসৌজন্যতায় ভরা এই সংসার। তাই এখানে সবকিছুই মানিয়ে নিতে হয়। নঞর্থক চেতনায় সবকিছু থেকে পলায়নও সম্ভব নয়। সাজ্জাদ বিপ্লব এটা খুব ভালো করেই বোঝেন। তাই সব অসামঞ্জস্যকে চোখের সামনে থেকে সরাতে পারেন না। জীবনকে সুস্থ, সৌম্য ও সৌন্দর্যের আকরও করে তুলতে পারেন না। যা আছেন, যেভাবে থাকেন তাকেই মহিয়ান করে তুলতে পারেন সাজ্জাদ। তাই পৃথিবীকে ভালোবেসে, মানুষ ও মাটিকে ভালোবেসে এক মহিমাময় জীবনের স্বপ্ন বুনে চলেন। তখনই লেখেন এরকম পজেটিভ কবিতা:
“কোথায় যেতে পারি, আমি? তোমাকে ছাড়া?
সুন্দরী এই পৃথিবী, গ্রহ-নক্ষত্র, ফুল-ফল,
সবুজ অরণ্যানী, হলুদ আগুন আমায়
যেতে দেয় না কোথাও
আমি যেখানেই যাই বা যেতে চাই
দেখো, বারবার ফিরে আসি মাটির কাছে,
তোমার কাছে, আমার স্বপ্নের কাছে, জীবনের কাছে”
কবিতাটির নাম ‘জলসাঘর’। হ্যাঁ, এই জগৎ-প্রপঞ্চ কবির কাছে জলসাঘরই বটে। তা না হলে জীবন এই সংসারের টান অনুভব করতে পারত না। কবি তো মানুষ। তাঁর মধ্যেও এই টান প্রবলভাবে দেখা দিয়েছে। শক্তি চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন: “যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো?” সাজ্জাদ সেখানে বললেন গিয়েও ফিরে আসি— “কোথায় যেতে পারি আমি?”
সত্যিই তো এই পৃথিবী ছাড়া আর কোথাও যাওয়ার নেই। শুধু মানুষ আর মানুষ। এই মানবিক ভুবনে থেকে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রবল। রবীন্দ্রনাথ সেই কারণেই লিখেছিলেন:
“মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাহি।”
এই বাঁচা তো শুধু দিনপাত করা নয়, জীবনকে উৎসর্গ করা সমস্ত সৃষ্টির মাধ্যমে। এই সৃষ্টির ধারা থেকেই সাজ্জাদ রচনা করেছেন তাঁর কাব্য কুসুম।
সৃষ্টির মধ্যে যেমন প্রেম আছে, তেমনি আছে নীরবতা। নীরবতাকেই ঈশ্বরের প্রতিচ্ছায়া হিসেবে দেখেছেন বহু সাহিত্যিক।আমেরিকান বিখ্যাত গায়ক পল সাইমন বলেছেন: “আপনি একজন লেখক হতে চান, জানেন না কিভাবে বা কখন? একটি শান্ত জায়গা খুঁজুন, একটি নম্র কলম ব্যবহার করুন।”
এই নীরবতার কাছেই দায়বদ্ধ থাকেন সাজ্জাদ বিপ্লবও। কেননা সৃষ্টির সমূহ উৎস যেমন প্রেম, তেমনি নীরবও। এখানেই সৃষ্টিচারণার বেগ উত্থিত হয়। তাই পৃথিবী এত আবেগময় দীপ্ত ও প্রদীপ্ত। সবুজের হাতছানিতে উদ্ভাসিত। ঝরনার আন্দোলনে আন্দোলিত। পশুপক্ষীর কলকাকলিতে মুখরিত। সবই স্রষ্টার ইচ্ছা। এই স্রষ্টার কাছেই কবির বিশ্বাস জাগরিত হয় আনুগত্যের দৃঢ় প্রকাশে ও ঘোষণায়। তখন আবার কবি উচ্চারণ করেন:
“কোনো হিংসুক বা কুচক্রান্তকারী, দেশ বিক্রেতা আমাদের পথ আগলে রাখতে পারবে না
আমাদের স্বাধীনতা বেচতে পারবে না, আমাদের কিনতে পারবে না
আমরা স্ফিংক্স এর মতো জন্ম নিবো বার-বার
আমরা দাঁড়িয়ে যাবো খাড়া আলিফের মতো সোজা হয়ে, শীর উঁচু করে
আমরা ভেদ করব শয়তানের তীব্র ফুঁৎকার
আমাদের বিশ্বাস ও কমিটমেন্ট, আকাশ ছোঁয়া…”
(সুন্দরবন ও আমরা)
এক আশ্চর্য পবিত্রতা ও সুন্নাহের পরিক্রমায় এই জীবনের নিবেদনকে কবি মূল্যবান করে তুলেছেন। তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেমন আলিফ এর মতো সোজা দাঁড়াতে পারেন, তেমনি স্ফিংক্স এর মতো জন্ম নিতে পারেন বারবার।
তবুও সৃষ্টির আদি উৎস থেকেই এক আদি ও অনন্ত যন্ত্রণাকে কবি লালন করে চলেন। কী সেই অপূর্ণতা, কিসের এত শূন্যতা, কী জন্য অবিরাম বেদনা বিদ্ধ হওয়া—কবি তা নিজেও জানেন না। পার্থিব জীবনের প্রতি আসক্তি, অন্যদিকে অপার্থিব জীবনের টান—দুই ভাবেই কবির টানাপোড়েন রচনা করেছে। তাই স্থিরতা আসেনি। একমুখী জীবনের দিকেও কবি ঝুঁকতে পারেননি। সুতরাং ধূলিময় পৃথিবীর নশ্বর শরীরে মিশে গেছে স্বর্গীয় বিভাসও। কবি নিজেই তা বলেছেন:
“এই যে, এখন আমি যেমন বেঁধে আছি
হারপুণবিদ্ধ মাছের মতো তড়পাচ্ছি
যন্ত্রণাকাতর হয়ে ঝুলে আছি, শূন্যে
না পারছি তোমাকে ছেড়ে যেতে, না তোমার মায়াকে
তোমার মায়াবী মুখমণ্ডল, নিষ্পাপ অপরূপ হাসি
(গভীর মায়াজালে)
প্রতিটি সম্পর্কের মধ্যে, জীবনযাপনের মধ্যে স্নেহপরবশ হওয়ার পরিচয় আছে। তাই শক্তির মতো তিনিও “যেতে পারি কিন্তু কেন যাবো?/সন্তানের মুখ ধরে একটি চুমু খাবো!” এই ইচ্ছা প্রকাশের অভিমুখ দর্শন করেছেন।
পৃথিবী কতটা সুন্দর ছিল, কতটা সুন্দর থাকত একথা মানুষ মাত্রই জানে। কিন্তু মানুষের সীমাহীন লোভ, অমানবিক জীবনযাপন, স্বার্থপরতা ও হিংস্রতা পৃথিবীকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে চলেছে। কবি তাে সুন্দরের পূজারী। তাই মানুষকেই এজন্য তিনি দায়ী করেছেন। ধ্বংস হলে মানুষের কারণেই হবে। কবি বলেছেন:
“পৃথিবীর প্রতিটি পাপের জন্য আমরাই দায়ী
আমাদের কারণেই সংঘটিত হচ্ছে অমানবিক পারমাণবিক যুদ্ধ, সাইবার যুদ্ধ, স্নায়ু যুদ্ধ ও মল্ল যুদ্ধ
ঘর থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে নিষ্পাপ ছেলেরা, দেশ থেকে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে সুন্দর বন”
(সময়)
প্রকৃতিকে নষ্ট করা যেমন অনাবৃষ্টির কারণ হতে পারে, তেমনি সাম্রাজ্যবাদী চেতনা যুদ্ধ নিয়ে আসে। আর তা ধ্বংসের দিকেই নিয়ে যায়। সুতরাং পৃথিবীবাসীকে তাদের পাপের ফল ভোগ করতে হয়। কবি বারবার সতর্ক করেছেন, কিন্তু কে শোনে সেই বাণী?
“দেখো, সময় বিলীন হচ্ছে কালের গর্ভে, আমাদের আমল ও কাজ-কর্ম পরিণত হচ্ছে ফলে-ফুলে, আমাদের চিন্তা পরিস্ফুটিত হচ্ছে স্বপ্নকল্পনায়-বাস্তবে
আমরা চলছি, আমাদের ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়
লক্ষ্য ভেদে…”(অপেক্ষা)
সাজ্জাদ বিপ্লব সেই কবি যাঁর কবিতায় আছে মানবিক কল্যাণের অনুসন্ধান, বিশ্বাসের আত্মজাগরণ এবং ন্যায় ও সত্যের প্রতিষ্ঠা। রোমান্টিক অবাস্তবের অনুসরণ কবি করতে চাননি। জীবনের মর্মরিত আলোড়নকে তিনি শব্দে ধারণ করেছেন। বক্তব্যকে জটিল করেননি। ভাষায় ও শব্দে সাবলীল উচ্চারণ ও স্বচ্ছ গতিময় ছন্দের নিবিড় অভিব্যক্তিতে তিনি প্রতিটি ছড়া ও কবিতা রচনা করেছেন। তাঁর ভাবনার মধ্যে দর্শন এসেছে, কিন্তু তা খুব উপযোগী এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই তাঁর সৃষ্টিতে এক ধরনের ভালোলাগা অন্তরস্পর্শী প্রজ্ঞায় প্রলোকিত হয়। অনবদ্য এক সারল্য এগুলিতে বিরাজ করে।

আরও পড়তে পারেন

1 COMMENT

  1. আলোচনাটি হৃদয়গ্রাহী।
    কবি সাজ্জাদ বিপ্লব অসাধারণ রূপকে ভাষাকে ইঙ্গিতময় করে তোলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা