একটি কাব্যিক দলিল : ‘পলায়নের আগে’
এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দেশে অত্যাচার, নির্যাতন, হত্যা, গুম, বিচারহীনতাসহ নানামাত্রিক ফ্যাসিস্ট কার্যকলাপ চলছিল। এ কারণে মানুষের মধ্যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বাড়তে থাকে। তারই বহিঃপ্রকাশের ফল উপমহাদেশের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ ঘটানো একনায়কের পতন। এই পতনে কান্ডারির ভূমিকা পালন করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সমাজ। তাদের সাথে যোগ দেন দেশের সাধারণ মানুষ। ফ্যাসিস্ট রেজিমের হত্যার শিকার হয় শিশু-কিশোর, নারী, ছাত্রসহ বিভিন শ্রেণি পেশার ১৫ শ’ থেকে ২ হাজারের বেশি মানুষ। এবং চোখ, মুখ, হাত-পা হারিয়ে আহত হয়েছেন প্রায় ২০ হাজার মানুষ। আমরা এই শহীদদের বিনম্র চিত্তে স্মরণ করছি।
এই গণ-অভ্যুত্থান ঘটাতে গিয়ে বাংলার সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা গণভবন অভিমুখে যাত্রা করে। ফলে স্বৈরাচার ও তার দোসররা পালাতে বাধ্য হয়।
পলায়নের আগের সময়ে লেখা বিভিন্ন কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে কবি এনামূল হক পলাশের এ কাব্যগ্রন্থ।
তিনি মূলত গণেরচেতনাকে লালন করেছেন তার লেখায়।
সময়কে ধারণ করেছেন কবিতায়। এই কবিতাগুলো ২০২২ সাল থেকে কর্তৃত্ববাদী সরকারের পলায়নপর্ব সময় পর্যন্ত লেখা হয়েছে। তিনি আসলে কবিতা লেখেননি-লিখেছেন উত্তাল প্রতিরোধের আগের সময়কে। এনামূল হক পলাশকে পাঠ করলে সময়কে পাঠ করা হয়ে যায়।
সমাজের সকল প্রকার বৈষম্যের বিপরীতে এ কাব্যগ্রন্থটি ইতিহাসের একটি কাব্যিক দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে।
–পলিয়ার ওয়াহিদ, কবি।
…………
এনামূল হক পলাশ, কবি ও চিন্তক
………….
পেশায় সরকারি কর্মচারী। ২০১৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন – “ঘর যে তৈরী করেছেন তার মধ্যে এক্সিট পয়েন্ট রেখেছেনতো?” লাইক মাত্র ৭ টা। কমেন্ট ৩ টা। ঘটনাচক্রে এক্সিট পয়েন্টটি বেদনাদায়ক ছিল। সেটা ঘটেছিল ২০২৪ সালে। ২০০৯ সাল থেকেই তিনি ফ্যাসিবিরোধী আন্দোলনে সরব ভূমিকা পালন করেছেন। লিখে গেছেন অবিরাম। রচনা করেছেন বইয়ের প বই। ২০১৮ সালের শিশু বিদ্রোহে তিনি সমর্থন যুগিয়েছেন। ফ্যাসিবাদ আমলে তিনি গণতন্ত্রের গান ও রাত্রির গান নামে দুটি গান রচনা করেন এবং ইউটিউব চ্যানেল ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এর মধ্যে ২০২৪ সালের মার্চ মাসের শেষ দিকে সংবাদ মাধ্যমে মত প্রকাশের অভিযোগে তাকে চাকুরিচ্যুত করার জন্য তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। তিনি তাতেও থেমে থাকেন নি। প্রকাশ্য ও গোপণে আন্দোলনকারীদের প্রতি সমর্থন যুগিয়েছেন। সেই সাথে বৈষম্যবিরোধী কবি ও লেখকদের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রেখে নিজ শহরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের সংগঠিত করতে মানসিক ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। আবু সাঈদের মৃত্যুর পর তিনি ১৮ জুলাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি লিখলেন,
“আমি কীভাবে ভুলে যাব ভাই হারানোর বেদনা?
আমি কীভাবে ভুলে যাব পুত্র হারানোর বেদনা?
আমি কীভাবে বয়ে বেড়াবো এই ঝাঁঝরা মানচিত্র?
তুমি বুক পেতে নিরস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিলে
গাঢ় নীল অথবা হালকা জলপাই কালারের
সসস্ত্র কুকুরগুলোর মুখোমুখি।
ইয়াবা ব্যবসায়ী কুকুরের দল মানচিত্রটি
সদম্ভে নিজেদের পকেটে ভরে
গুলি করে দিলো তোমার নিরস্ত্র বুকে।
তুমি হাঁটু গেড়ে চেটে খাওনি শুয়োরের পা,
বাংলাদেশকে ফেলে রেখে দেখাওনি পিঠ,
বেজন্মার মতো চেপে ধরোনি মায়ের টুটি,
কেননা একদিন তুমি জন্মেছিলে মাতৃগর্ভে।”
৩০ জুলাই তিনি নিজের প্রোফাইল পিকচার লাল করায় ফ্যাসিস্ট সরকারের লোকজন তাকে বিভিন্ন হুমকী দেয়। ৩৪ জুলাই থেকে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত তিনি নিজ শহরে রাজপথে অবস্থান নেন। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত লেখা কবিতাগুলো নিয়ে ঘাসফুল থেকে প্রকাশিত হয়েছে তার কবিতাগ্রন্থ “পলায়নের আগে”।
প্রকাশিত কবিতার বই- অস্তিত্বের জন্য যুদ্ধ চাই, জীবন এক মায়াবী ভ্রমণ, অন্ধ সময়ের ডানা, অন্তরাশ্রম, মেঘের সন্ন্যাস, পাপের শহরে, জল ও হিজল, তামাশা বাতাসে পৃথিবী, অখন্ড জীবনের পাঠ, লাবণ্য দাশ এন্ড কোং, সুফি কবিতা
প্রকাশিত শিশুতোষ কবিতার বই- বইয়ের পাতায় ফুলঝুরি , কলমিলতার ফুল, মগড়া নদীর বাঁকে, পাখ পাখালির ছড়া, পাখ পাখালির কবিতা
প্রকাশিত গবেষণাধর্মী বই- ভূমি ব্যবস্থাপনার সরল পাঠ
কবিকে নিয়ে স্মারক গ্রন্থ- আশ্রম পাখির মায়াপথ
অনুবাদ গ্রন্থ- ধর্ম বিশ্বাস আখ্যানের মতো সুন্দর (আল মা-আরির কবিতা), মু-আল্লাক্বা (ইমরুল কায়েসের কবিতা), লিখে রাখো আমি একজন আরব (মাহমুদ দারবিশের কবিতা), আরব ভূখন্ডের কবিতা, নদী মরে যায় পিপাসায় (মাহমুদ দারবিশের ডায়েরি), নির্বাচিত কবিতা নাজিম হিকমত, আদিবাসী নারীদের কবিতা
ইংরেজিতে ভাষান্তরিত কবিতার বই – CROSSING FORTY NIGHTS
সম্মাননা- চর্চা শুভেচ্ছা সন্মাননা- ২০১৭, মেঠোসুর গুণিজন সন্মাননা- ২০২৪, কংস থিয়েটার সম্মাননা- ২০২৪
বর্তমান অবস্থান- প্রতিষ্ঠাতা ও আচার্য
অন্তরাশ্রম, নেত্রকোণা
যোগাযোগ- mabud.enam@gmail.com
+৮৮০১৭১২৯৭১৭৯৮