প্রচ্ছদকবিতাজিন্দে অলির কবিতা

লিখেছেন : মাহমুদ নোমান

জিন্দে অলির কবিতা


মাহমুদ নোমান

০১.
ন জানো যে সব হরি ভেতরে ভেতরে
ঝুলিয়ে রেখেছ কোর্তা আরজে গুজর
এক্বীনে জ্বালিয়ে মোম খুঁজছে আমারে
হাট থেকে ফিরে এসে বেপর্দা আদর,
আমি শুনি কলকথা বুকেতে দুরূহ
মাছেরা আজান হাঁকে ফিরছে পাখিরা
মাটিতে গড়ায় নদী হাতড়িয়ে গৃহ
হেফজখানার শিশু আকাশের তারা;

পুরো দিন মাগে চাল হেঁটে জোড়া জোড়া
ফুলগুলো গুঁজে দেয় এ-কোন দরদী
হেফজ করে আমায় গিলে পানি পড়া
সূর্যের ভেতরে ডেকে ন পোড়ায় যদি

আমাকে আমার করে পেয়েছে যে জন
তোমাতে আমাতে সে তো প্রেমিক নোমান

০২.
অ বা’জি বাজারে গেলে গোশত কিনতে
আর তো ফিরোনি বা’জি আঁধার ঘনালে
আঙুল ধরে টানছো, আমাকেও নিতে
গোল্ডলিফের ধোঁয়ায় সন্ধ্যাটি মাড়ালে,
আমি জানি তুমি বা’জি শখের পুরুষ
হাততালি দিয়ে দুঃখে, নাচাও নর্তকী
বৈঠার তলে মাছের চিরকালে রোষ
চাঁদমারি খসে পড়ে ছটফটে পাখি…

কোথায় কী করো জানি, স্পষ্টত এখন
আড়াল হলেও বা’জি আপনেই দেখে
তাই আমি মোম জ্বালি সন্ধ্যায় যখন
নীড়ে পাখি ফিরে এসে স্নেহেতে মাখে;

অ বা’জি আগুন ধরা মোম জ্বালিয়েছি
সারাদিন আমিও তো খেলি কানামাছি…

০৩.
আমার মাজারে নৃত্য করে কত পাখি
অক্ত লাগে না কাফের অজুও লাগে না
ডেকে ডেকে খোঁজে ফিরি পিয়াসি চাতকী
কুড়িয়ে সুবাস আনি মিলনে জোছনা;
আমার মাজারে আমি মানত করেছি
আমার স্বাক্ষাত পেলে নাচা ছেড়ে দেব
কতজনারে এ নামে কত যে ডেকেছি
মেহমান আসে না’কো হৃদয় পিলাবো;

অমন বিষাদ ছেড়ে কোথায় পালাই
আমাকে বাসনা করে অনেক জেনেছি
কেউ ডুবতে চাই না বলতে না-চায়
আমার মাজার গড়ে নিজেরে গড়েছি,

ভাঙবে কেমন করে এমন মাজার
সেজদায় লুটিয়ে পড়ি আরজ গুজর…

০৪.
বদদোয়া দিচ্ছো জানি এমনও ভোরে
চুড়ি ভেঙে সারারাত মূর্তিটি গড়েছো
ফজর নামাজ শেষে ছায়া সরাচ্-ছো
ঠোঁটের কলকলান নদীজল ফুঁড়ে,
আমাকে কৈতরে মধ্যে লুকিয়েছ চুমে
কুক করু কুক কুরু তসবি গুনছি
এমন শূলনি আলো ঘেমে নেয়ে যাচ্ছি
দাদী ঘুমায়নি বুঝি নদী রেখে ওমে!

আবারও খেলা হবে হাতে হাত রেখে
পা দুলিয়ে ঘোলজলে মিছরি চুষবো
ডানা ঝাপটিয়ে খসে পদ্যটি লিখবো
এমন দরদী ছুরি রক্ত-টান এঁকে;

বদদোয়া দিচ্ছো জানি এমনও ভোরে
আমি যেন মরে থাকি শেফালির ঘরে

০৫.
ন পাইলে তোঁয়ার-এ, কেমনে চাইবো
ন ডাকিলে বিছরায়ে, কেমনে বুঝিবো
ন জানি তো ছলাকলা, কী তাবিজে বাঁন্ধি
ন কুড়ায়ে ফসলাদি, মুক্ত হস্তে নদী…
ন রতি জলা শুকালে, কী বীজ ছিটাই
ন হেসে কাছেতে এসে, মুখস্ত কাঁদায়,
ন খেলে ছেড়ে দাও গো, ফেঁডত্ পড়েছি
ন বুঝি ধরা পড়িবো, চৈত্র-তে ভেসেছি

ন ছড়ালে অন্ধকার, মুখর সন্দেহ
ন বুঝিলে মন ছলা, মরার মোচ্ছব
ন পাইবে রে দিশা, টর্চের প্রদেহ
ন ছাড়িবে আলো রেখা,এমন শরাব

ন গুজরে ন ঠাঁডারে, বাউলের নাচ
ন গাই ন শুনি গাঙে,উজনি হৈ মাছ

||||
মাহমুদ নোমান
আনোয়ারা সদর, চট্টগ্রাম
‘দেয়াঙ’ পত্রিকার সম্পাদক
০১৩১৬৭৮১০২৩ 

আরও পড়তে পারেন

1 COMMENT

  1. সনেট কাঠামোয় স্বতন্ত্র কাব্যগুণের কবিতা
    ✍️
    চৌদ্দ মাত্রার সনেট কাঠামো ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মাহমুদ নোমানের কবিতাগুলি যথেষ্টই নতুনত্বের সৃজন ক্ষমতায় উত্তরণ ঘটেছে।
    প্রতিটি কবিতাই চতুর্দশপদী বা সনেট কাঠামোর (৮+৬ বা অষ্টক ও ষটক বিন্যাস) সচেতন প্রয়োগ। অন্ত্যমিল রক্ষায় প্রচলিত নিখুঁত মিলের চেয়ে আধুনিক কবিতার মতো অপূর্ণ মিল বা স্বরবৃত্তের দোলাচুল বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। বিশেষ করে শেষ দুই চরণে একটি নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ভঙ্গি স্পষ্টত ধ্রুপদী সনেটের চরিত্র বহন করে।
    কবিতাগুলো চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বাচনভঙ্গি ও লোকজ আবহে সমৃদ্ধ। ‘অ বা’জি’, ‘ফেঁডত্ পড়েছি’, ‘তোঁয়ার-এ’, ‘ন পাইলে’—শব্দগুলো কেবল অলংকার নয়, চরিত্রের আত্মিক সংকট প্রকাশের মাধ্যম। দ্বিতীয় কবিতায় বা’জি (পিতা)-র বাজারে গিয়ে আর না ফেরা, সিগারেট (গোল্ডলিফ), নর্তকী নাচানো আর কানামাছি খেলার রূপকে বাবার প্রতি পুত্রের যে তীব্র ক্ষোভ ও তৃষ্ণা উঠে এসেছে, তা অসাধারণ বাস্তববাদী চিত্রকল্প তৈরি করে।
    তৃতীয় ও পঞ্চম কবিতায় মধ্যযুগীয় চর্যাপদ ও সুফি মরমিবাদের সরাসরি অনুরণন রয়েছে। ‘আমার মাজারে আমি মানত করেছি / আমার সাক্ষাৎ পেলে নাচা ছেড়ে দেব’—এখানে ব্যক্তিমানুষ নিজেই তীর্থক্ষেত্র বা মাজার হয়ে উঠেছে। প্রচলিত ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতাকে ছাপিয়ে (যেমন: ‘অক্ত লাগে না কাফের অজুও লাগে না’) নিজের ভেতরের পরম সত্তাকে খোঁজার যে বাউলিয়ানা, তা আধুনিক কবিতার প্রধান স্বভাব।
    কবি প্রচলিত উপমা এড়িয়ে চমকপ্রদ ও কাঁচা চিত্রকল্প তৈরি করেছেন:
    ​’মাছেরা আজান হাঁকে ফিরছে পাখিরা’
    ​’ঠোঁটের কলকলান নদীজল ফুঁড়ে’
    ​’দাদী ঘুমায়নি বুঝি নদী রেখে ওমে’
    ​’ডানা ঝাপটিয়ে খসে পদ্যটি লিখবো / এমন দরদী ছুরি রক্ত-টান এঁকে’
    ​এখানে প্রেম, শৈশব ও ক্ষোভ একই বিন্দুতে রক্তাক্ত ও কোমল হয়ে ধরা দিয়েছে।
    প্রতিটি পদ্যের ভেতরেই এক ধরনের আত্মপরিচয় খোঁজার বেদনা আছে। প্রথম কবিতায় যেমন নিজেকে খোঁজার আকুলতা শেষে কবির নিজ নামোচ্চারণে (‘তোমাতে আমাতে সে তো প্রেমিক নোমান’) ধরা পড়ে, চতুর্থ কবিতায় অভিশাপের ভেতরেও ভালোবাসার বাসনা (‘বদদোয়া দিচ্ছো জানি এমনও ভোরে / আমি যেন মরে থাকি শেফালির ঘরে’) এক চরম মানবিক বৈপরীত্যকে মূর্ত করে।
    ​আঞ্চলিক শব্দ ও লোকজ অনুষঙ্গকে কোনো রকম মেকি আধুনিকতার প্রলেপ না দিয়ে সরাসরি কবিতায় তুলে আনা এবং তাতে আধ্যাত্মিক ও মানসিক দোলাচল সঞ্চার করার কারণেই এই লেখাগুলো স্বতন্ত্র কাব্যগুণের দাবি রাখে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা