১। জিন্নার প্রতি— সুকান্ত ভট্টাচার্য
যুযুধান দেশ কে আজ নির্বিরােধ!
কুচক্রান্ত ছড়ায় রাত্রিচারী
মিথ্যার মদে ভুলবে না নির্বোধ
দিনরাত্রি যে বিদ্যুৎ সঞ্চারী।
তপস্যা শেষ, ভাঙ্গো আজ মৌনতা,
দুর্গের দ্বার খােলো বিনিদ্র দ্বারী,
শত্রুরা মূঢ়; সম্ভাষে স্বাধীনতা,
আমরা জয়ের সাগরে জমাবাে পাড়ি,
আজকে এ-দেশ শুনেছে যে ব্রত কথা
সােনার খাঁচার সঙ্গে তাইতাে আড়ি।
২। হে মহান নেতা— বেগম সুফিয়া কামাল
কায়েদে আজম! হে মহান নেতা সাড়া দাও,
দাও সাড়া,
তোমারে ভোলেনি, আজিও ডাকিছে বঞ্চিত সর্বহারা
তোমারে হেরেনি, শুনেছিল শুধু তোমার কন্ঠবাণী;
জেনেছিল তারা, তুলেছে পতাকা তোমার বজ্রপাণি
অবিচল ন্যায়ে, সত্যের আলো ইসলামী ছায়াতল
বহু যুগান্ত আঁধার অন্তে আবার সমুজ্জ্বল
হয়ে এল, নীল নভ হতে হাসে অর্ধচন্দ্র-তারা
শ্যামা বসুমতী বিছায়ে আঁচল নিশীথ তন্দ্রাহারা
হেরিল দিনের দীপ্তরবির আলোক বিথারি পথ
ভরে জনতায় তব জয়গানে পুরাইয়া মনোরথ
দৃপ্ত স্বাধীন বক্ষের বলে লাখো লাখো তাজা প্রাণ-
কায়েদে আযম! তোমারে স্মরিয়া করিয়াছে কোরবান।
এনেছে আযাদী শতাব্দী শেষে, তোমার মহান দান
অঞ্জলী পাতি করেছে গ্রহণ, রাখিয়াছে সন্মান
সর্বহারার দল ।
আর যারা লোভী, ক্রুর শয়তান, তাহারা করেছে ছল।”
৩। কায়েদে আজম স্মরণে— জসীমউদ্দিন
পাকিস্তানের ভাগ্যবিধাতা, হে জাতির কান্ডারী,
কোন দূর দেশে চলে গেলে আজ মোদের একাকী ছাড়ি!
ধানের ক্ষেতেতে বাতাসে বাতাসে বাজে আজ হাহাকার,
কোটি কৃষকের ঘরে ঘরে কাঁদে শোকের অশ্রুধার।
যে রূপ তুমি দিয়া গেলে ভাই নতুন এই দেশেরে,
সে রূপ যে আজ মলিন হয়েছে তোমারে হারায়ে ফেলে।
গাঁয়ের নদীটি বয়ে চলে আজ বিষাদের সুর তুলি,
তোমারে আমরা কি করি ভুলিব, হে মহান নেতা ভুলি?
তোমার ত্যাগের স্মৃতি নিয়ে মোরা বাঁচিয়া রহিব আজ,
মাথার উপরে রহিবে তোমার রেখে যাওয়া গুরুকাজ…
৪। কায়েদে আজম — গোলাম মোস্তফা
হে কায়েদে আজম! তোমারে সালাম জানায় নিখিল জন,
তব ত্যাগ আর সাধনায় আজ মুক্ত মোদের মন।
কাটিয়েছ তুমি শৃঙ্খল-জাল, আনিলে স্বাধীনতা,
ইতিহাস মাঝে রবে অক্ষয় তোমার অমর কথা।
নব ইতিহাস রচিলে বন্ধু মুসলিম জাতির তরে,
আলোকের শিখা জ্বালাইলে আজ প্রতি মুসলিম ঘরে।
ধন্য তোমার বীরত্ব আর ধন্য তোমার বাণী,
পাকিস্তান নামে একটি মুলুক দিলে তুমি টানি।
চিরদিন তব নাম রবে লেখা আকাশের তারা সম,
শত কোটি মুসলিম হৃদয়ে তুমি প্রদীপ্ত অনুপম…
৫। জাতির জনক— বন্দে আলী মিয়া
জাতির জনক তোমারে সালাম!
পাক-ভারতের ইতিহাসে তোমার নাম লেখা রইলো।
লেখা রইলো কালের পাতায়,
লেখা রইলো ধরিত্রীর ধূসর ধূলায়।
শতাব্দীর অন্ধ কারাগারের দ্বার ঠেলে
হে জ্যোতির্ময়, পরাধীন মুসলিম জাহানে তুমি এলে।
তোমার আবির্ভাবে খসে পড়লো গোলামীর জিঞ্জির।
৬। আফতাব— ফররুখ আহমদ
চাঁদ ডুবে গেল। নিভে গেল আফতাব!
লাখো সেতারার মাঝে চাঁদ ডুবে গেল,
জামানার ঘোর জুলমাতে হায় নিভে গেল আফতাব।
সংকট-ক্ষণে নিভে গেল বুঝি তদীরে আফতাব।।
যে খররশ্মি ছড়াতে ছিলো সে মখলুকাতের তীরে,
একতার মালা গাঁথিতেছিল যে কোটি মুমিনের দীলে,
অবেলায় সেই রোশনি যে গেল নিভে;
অসময়ে হায় থেমে গেল তার হাত!
মওতের ছায়া পড়ল আমার সিপা’সালারের মুখে
নাই আলো নাই যেদিকে তাকাই আলো নাই সম্মুখে,
মরক্কো থেকে ইন্দোনেশিয়া করে ওঠে হাহাকার
নিভে গেছে আজ আফতাব, হায় হারায়ে সিপা’সালার।।
ঘুমে অচেতন সে সিপা’সালার দীর্ঘ জেহাদ-শেষে,
ফউজের ডাক যায় না কো তার কাছে;
মওতের মেঘ ঘন জুলমাতে কৃষ্ণ ছায়ার মতো
অন্ধ নিশীথে আজ তাকে ঘিরে আছে।
বাসা বেঁধে রেখে বিহঙ্গ পিতা আকাশে দিয়েছ পাড়ি,
সেনানী আমার চলে গেছে তার জয়-অভিযান শেষে।
জঙ্গী ফউজ ঐ দেখ তার জঙ্গের ময়দান-
ঐ দেখ তার নিশান উড়ছে অজানার উদ্দেশে ॥
৭। পনেরই আগস্ট — আহসান হাবীব
রাত পোহাল আজ কাঙ্ক্ষিত সেই আলোর রেখা ধরে,
বন্দী আত্মার মুক্তি এলো মুক্ত আকাশের তরে।
দ্বিজাতি তত্ত্বের কঠিন সোপানে দাঁড়ায়ে যে পুরুষ,
আনিলে কাটায়ে বহু সংগ্রাম রক্তে ভেজা ক্রুশ।
সে যে কায়েদে আজম, তাহার ডাকেই জাগিল কোটি প্রাণ,
আজাদির এই পুণ্য দিনে গাহি তাহারি জয়গান।
শত শোষণের প্রাচীর ভাঙিয়া জন্ম নিল দেশ,
পাকিস্তান নামের ভূখণ্ডে মিটিল দুঃখের শেষ।
যে পথ দেখালে মহৎ নেতা, সে পথেই চলি মোরা,
সত্যের আলোয় আলোকিত আজ নব প্রভাতের ধরা…
৮। জিন্নাহ মেহমান— সৈয়দ আলী আহসান
স্বাগত তোমারে হে মহান নেতা, পূর্বের এই তীরে,
কোটি জনতা জাগিছে আজকে তোমারে নেহারে ঘিরে।
ঢাকা নগরের আকাশে বাতাসে আজ আনন্দের বান,
ধন্য হইল নিখিল বাংলা পাইয়া তোমারে মেহমান।
সুদূর করাচি হতে আসিলে যে নব আশার বাণী লয়ে,
তোমারে সালাম জানাই মোরা বিজয়ের গান গেয়ে।
মোদের এই মাটি সুফলা ও সবুজ, প্রেমে ভরা এই ধরা,
তব শুভ পদার্পণে আজ আশার আলোয় ভরা।
গাহে গান পাখি, বহে সমীরণ তোমারি আগমনে,
পাকিস্তান সেরা একতার শক্তি জাগুক মোদের মনে…
৯। নিশান বরদার— সিকান্দার আবু জাফর
তোমার একান্ত স্বপ্ন সাধনার মূল্যে পাওয়া
আজাদীর পরম সম্মান।
এ দিনের ক্ষয় নেই তাই
এ দিনের অধিবাসী আমরা সবাই,
জাতির মহান পিতা : তোমার স্মরণে আজ
সালাম জানাই।
১০। কায়েদে আজমের প্রতি — আব্দুল কাদির
হে কায়দে আজম, তব দূরদর্শী চোখে
ফুটলো নতুন দিন মুসলিম এই লোকে।
শৃঙ্খল ভেঙে ফেলি আনলে মুক্তির বায়ু,
জাতির হৃদয়ে তুমি পাবে চির-আয়ু।
পরাধীনতার দিন অবসান হলো আজ,
মাথায় পরিলে তুমি ত্যাগেরই শিরস্তাজ।
দূর করি দিলে সব তিমির ও সংশয়,
সংগ্রাম চেতনায় আনিলে মহাজয়।
তোমারে প্রণাম জানায় কোটি কোটি জনতা,
আকাশে বাতাসে আজ তব বিজয়ের বার্তা…
১১। কায়েদে আজমের স্মরণে — শাহাদাৎ হোসেন
ঝরিল কি তবে আঁধার রাতে আশার পুঞ্জি-তারা?
শোকের সাগরে ডুবিল আজিকে পাকিস্তান-ধারা!
যে পুরুষ আনিল আযাদী-সূর্য তিমির-রজনী ফাড়ি,
সে আজ চলিল চির-অজানায় পারায়ে মৃত্যুর বাড়ি।
কান্দে কোটি প্রাণ, কান্দে আকাশ, কান্দে ধরণী মাতা,
স্বর্ণাক্ষরে লেখা রবে তব ত্যাগ ও অমর গাথা।
যে পথ দেখালে বীর কায়েদে, সে পথেই যাব চলি,
শত শৃঙ্খল ভাঙিয়া মোরা নব জীবনের কথা বলি।
মোদের হৃদয়ে জ্বেলে গেলে তুমি দেশপ্রেমেরই শিখা,
ইতিহাস মাঝে চিরদিন রবে তোমার নামটি লিখা
১২। কায়েদে আজম — বেনজীর আহমদ
তোমারে চিনেছে নিখিল পাকিস্তান, চিনেছে বঙ্গভূমি,
আঁধার রাতের মুক্তিসূর্য হইয়া দেখা দিলে তুমি।
শত শোষণের শৃ্ঙ্খল কাটি দিলে আজাদী-পয়গাম,
হে কায়েদে আজম, তোমারে জানাই অগণন সালাম।
তোমার মন্ত্রে জাগিল জাতি, ভাঙিল মনের ভয়,
সত্য ও ন্যায়ের সংগ্রামের মাঝে আনিলে মহাজয়।
একতা, ঈমান, শৃঙ্খলা দিয়া গড়িলে রাষ্ট্র নতুন,
তব ত্যাগের কথা মনে রাখিবে কোটি মুজাহিদ-মন।
নীল আকাশেতে উড়িছে পতাকা সবুজ-সফেদ রঙে,
চিরদিন তব স্মৃতি রবে জাগি এই নদী-ঘেরা বঙ্গে…
১৩। কায়েদে আজমকে— ফজল শাহাবুদ্দীন
মাঝে মাঝে দেখিয়াছি প্রভাতের আলােক রঙীন।
তবু সেই ঝড় এলাে-মেলাে সেই রাত্রির হাওয়ায়।
তুমি এলে হে নাবিক, প্রভাতের পানপাত্র হাতে
আঁধার মুখর হলাে জীবনের প্রদীপ্ত শপথে
রাত্রির বন্দর থেকে মৌসুমীর হাসিন উষায়।
১৪। ইতিহাস— আবু হেনা মােস্তফা কামাল
তােমাকে জেনেছি আকাশের চেয়ে বড়
সাগরের চেয়ে অনেক মহত্তর কেননা
ক্লান্ত চোখের পাতায় নতুন আলাের ঝড় তুমি এনে দিলে। নতুন জোয়ার ছুঁয়ে গেল বন্দর।
১৫। কায়েদে আজম — কাজী মঈনউদ্দীন
হে মহাপুরুষ, জাগালে আজকে শত কোটি ঘুমন্ত প্রাণ,
তোমারি ডাকেতে মুক্ত হইল পরাধীন আসাম-আজাদ স্থান।
দ্বিজাতি তত্ত্বের মশাল জ্বালিয়া দেখাইলে সত্যের পথ,
থামিল না কভু বাধার মুখেতে তোমার বিজয়-রথ।
পরাধীনতার শৃঙ্খল কাটি জন্ম নিলে পাকিস্তান,
ইতিহাসে তুমি রবে চিরদিন অমর মহীয়ান।
মোদের চেতনা, মোদের শক্তি, তুমি যে জাতির কান্ডারী,
তব পদচিহ্ন ধরি চলিব মোরা সংকট-নদী পারি।
তোমারি স্মরণে অবনত শির জানায় সালাম তোমায়,
চিরপ্রদীপ্ত নাম তব রবে যুগান্তরের সীমায়
১৬। স্রষ্টার প্রতি (কায়েদে আজমকে)— মযহারুল ইসলাম
সহসা আলোর পরশ লাগলে
প্রাণে প্রাণে এক চেতনা জাগে আঁধার দুয়ার খুলে গেল সম্মুখে
কে তুমি হে নব-পথ-সন্ধানী আলােকদ্রষ্টা?
১৭। স্মৃতির মিনার— সাজ্জাদ হোসাইন
আকস্মিক নেমে এলো শোকের নিবিড় আঁধার,
নিভে গেল মহাতারা পাকিস্তান-আকাশের মাঝার।
হে কাণ্ডারী, তুমি আজ বিদায় নিলে যে চিরতরে,
কান্নার রোল ওঠে কোটি মুসলিমের ঘরে ঘরে।
যে পথ দেখালে তুমি মুক্তির আলোকময় যাত্রায়,
সে স্মৃতি অমর হয়ে রবে মোদের প্রতিটি মাত্রায়।
তোমার সুদৃঢ় নীতি, একতা ও বিশ্বাসের বল,
মোদের প্রেরণা হয়ে রবে চিরদিন সমুজ্জ্বল।
কোটি প্রাণের অশ্রুতে গড়ে ওঠে স্মৃতির মিনার,
তোমার চরণে জানাই শ্রদ্ধা ও সালাম বারবার…
১৮। আজাদীর দিনে — তালিম হোসেন
শৃঙ্খল ভাঙার এই শুভ দিনে স্মরি হে তোমারে নেতা,
যাহার সাহসে ঘুচিয়া গেল গো যুগান্তরের ব্যথা।
তুমি দেখালে যে মুক্তির পথ নিবিড় আঁধার মাঝে,
তোমার মন্ত্রে জাগিল জাতি নতুন জীবন-কাজে।
পনেরই আগস্টের আলোতে আজ তোমারি নাম ফুটে,
পাকিস্তানের এই নতুন প্রভাতে শৃঙ্খল গেল টুটে।
তুমি শিখালে যে একতার পাঠ, ঈমান ও শৃঙ্খলা,
ভেঙে ফেলিলে পরাধীনতার শত প্রাচীর ও শলা।
তোমার সুদৃঢ় নেতৃত্বের বলে মুক্ত মুসলিম জাতি,
আঁধার রজনী শেষে এলো আজ নতুন আলোর ভাতি
১৯। মহাতপস্বী জিন্নাহ — আবুল হোসেন
হে মহাতপস্বী নেতা, রাজনীতির জটিল প্রাঙ্গণে
দাঁড়ালে একাকী তুমি অবিচল সংকল্পের মনে।
ঝঞ্জা ও বাধার মুখে ক্ষুরধার যুক্তি ও আশায়,
গড়িয়া তুলিলে দেশ কোটি জনতার ভালোবাসায়।
কোনো প্রলোভন কভু পারেনি নোয়াতে তব শির,
ইতিহাসের বুকে তুমি নির্ভীক অনন্য এক বীর।
অধিকার আদায়ের কণ্টকময় দীর্ঘ এই পথে,
আনিলে বিজয়-রথ জয়ী হয়ে সত্যের মতে।
তব ত্যাগে পাইলাম মুক্ত ও স্বাধীন এই ধরা,
শুভ পদার্পণে তব নতুন আশার আলোয় ভরা।
…………
কৃতজ্ঞতায় : শাহেদ আলী সম্পাদিত ‘’আমাদের সাহিত্যে ও ভাবনায় কায়েদে আজম’’।







