| মাহমুদ নোমান |
কবিতা স্বর্গে নেয় না তবে স্বর্গীয় অনুভব মনে করি কবিতা। একবার কবিতায় পেয়ে গেলে বারবার কবিতার কাছে ফেরে; একেকজনের রুচি কিংবা জিজ্ঞাসা একেকরকম হতে পারে, তবে কবিতাকে আঁকড়ে ধরে জীবন পার করে দেওয়া কবিদের অন্যরকম লাগে। বিস্ময় জাগে, বহুদিন পরে একজন তরুণ কবি হয়ে, আরেকজন জীবনের মধ্য গগন পেরিয়ে যাওয়া কবির এই যাত্রার কবিতাগুলো পড়ে আন্দোলিত হচ্ছি! উনার সময়ে তরুণ বয়সে কেমন ছিল, বিবাহিত জীবনের কাঁথায় প্রতিটা ফোঁড়ে কেমন জোড়ন ছিল কিংবা অন্যকে নিয়ে কী ভাবছিল সবটাই শিহরিত হয়েছি; এটাও মনে করি,কবি বলতেই তরুণ নয়তো নিজেকে এতো ভাঙে কেমন করে প্রতি মুহূর্তে, এমনও তরতাজা কবি ইউসুফ মুহম্মদের কথাই বলছি। জি, একজন কবির কবিতায় জীবনের না- বলা কথা এমনকি অনুভূতি বুঝতে পারা যায়। আবার কবি তো রহস্যময়, সে রহস্য ভেদ করা অসম্ভব কিন্তু একেক পাঠক একেকভাবে বুঝবে এটাই দাবি রাখে জীবন্ত কবিতা; কবিতা যাঁর কাছে যাবে তাঁর। হ্যাঁ, জীবন্ত কবিতার কবি ইউসুফ মুহম্মদ। আধ্যাত্বিকতার মিশেলে একটা সুস্থির সুস্পষ্ট ইঙ্গিতের কবি ইউসুফ মুহম্মদ। শান্ত কিংবা শ্রান্ত হওয়ার যাত্রাপথে দাগ টেনে যায় উনার কবিতা। যেমন, তরুণ বয়সে ‘ জল প্রবাহে পদচিহ্ন’ কাব্যগ্রন্থ পাঠে বুঝেছি, উনার প্রতিবাদীর কণ্ঠস্বর; যুদ্ধ যে চলমান সেটি বলে রেখেছেন তবে উগ্রবাদী নন কিংবা ছিঁড়ে দেখার অথবা ছিঁড়ে দেখিয়ে দেওয়ার স্বরে কথা বলেন না। উনি নিবিড় পরিচর্যার মধ্যে সত্য উদ্ভাসিত করেন। আমার জন্মেরও আগে ১৯৮৮সালে ইউসুফ মুহম্মদের প্রকাশিত ‘জল প্রবাহে পদচিহ্ন’ কবিতা বইয়ের কবিতার নামগুলো পড়লে উপরোক্ত কথাগুলো মিলিয়ে নিতে পারেন। নামগুলো যেমন- আন্তর্জাতিক শান্তিবর্ষে যা লেখা হয়নি, মানুষের গল্প: ক, খ, গ, নেউলের আত্মকথন, আরো অনেক যুদ্ধ আছে, অশরীরী আত্মা, ঈশ্বরের গল্প, পা রেখে চঞ্চল জলে, তোমার বা- হাঁত ইত্যাদি… এসবে নামে বুঝা যায়,যুবক বয়সে কেমন পরিণত ছিলেন ইউসুফ মুহম্মদ। প্রশ্ন শুনবার চেষ্টা ছিলো শুধু নয় প্রশ্ন করা আবার সে প্রশ্নের সমাধাও খুঁজেছেন-
শরতের নদীতে বৃষ্টির দৃশ্য
তুমি কখনো দেখোনি
জলের শব্দের সাথে যারা জেগে ওঠে
তাদের সংগীত – প্রিয়তার
কথা জানা নেই, তাই তুমি
বালকের জন্য যাবতীয়
ঘৃণা মন থেকে মনে আর
খোলা আকাশে উড়াও;
– পা রেখে চঞ্চল জাগে; ৩৩পৃ.)
খ.
পিকাসো-র চিত্রকর্মে
আপনার আগ্রহ গভীর
সামাজিক ব্যবহার
হাতে রেখে এখানে ঘোরেন
তাঁর চিত্রকলা দেখে
চোখের অদৃশ্য ছায়াপথ
দীর্ঘ হয়-
ধূসরতা বাতাসে বেড়ায়
সুবর্ণরেখার দিকে
দৃষ্টি রাখতে রাখতে
কদাকার মাটির পুতুল
হাত
থেকে
মাটিতে গড়ায়
আপনি অথচ একা –
একা একা একা হয়ে যান….
– একা; ৩১ পৃ.)
গ.
আরো জানে কারো কারো নাড়ির খবর
কারা যেন অনর্গল কথা বলছে
বাথরুমে –
দরজা খুলে দেখি কেউ নেই
ব্রা ও অন্তর্বাস শূন্যে ঝুলে আছে।
– হ্যাংওভার; ২৪পৃ.)
আমার অগ্রজ কবিদের অর্থাৎ যাঁদের কবিতা পড়ে বড় হয়েছি,তাঁদের যুবক বয়সের কবিতা পড়তে আমার যত কৌতূহল। ঐ বয়সে দুষ্টু মিষ্টি কথাবার্তার মধ্যে আবেগের যে টান সেটি নির্ভেজাল। ঐ বয়সে অকপটে বলার যে-ই প্রতিশ্রুতি কবিতাকে দেয় অনন্য মাত্রা। কবির প্রথম কবিতার বইয়ে কিংবা প্রথম কবিতা বইয়ের পরে নিজের পথ আলাদা হয়ে যায়। এখানে ইউসুফ মুহম্মদ উনার সময়ের অন্যান্য কবিদের থেকে বেশ দূরত্বে;
০২.
১৯৮৮সালে ‘জল প্রবাহে পদচিহ্ন’ প্রকাশের পরে ইউসুফ মুহম্মদের কবিতার মধ্যে ছিল নিজেকে ভাঙা-গড়া; ইউসুফ মুহম্মদ মূলত আত্মান্বেষী কবি। একটানে বললে নির্ভেজাল আকুতিভরা প্রেমবাজ কবি। ‘জল প্রবাহে পদচিহ্ন’ প্রকাশের দেড় দশকের দীর্ঘ সময়ে নিজেকে গড়ে তুলেছেন আত্মমগ্ন স্কেচে; ২০০৩ সালে প্রকাশিত হয় ‘বিষাদের রেখেছ কী নাম ‘ কবিতার বই। এই বইয়ে ইউসুফ মুহম্মদ উনার কবিতাকে নিয়ে গেছেন অনন্য মাত্রায়। শব্দের বন্ধন আরও পোক্ত তবে খোলাসা করে চমৎকারিত্বে; কথার মধ্যে চাতুর্যে মিহি অনুভব পাঠককে আকৃষ্ট করে রিদমিক টিউনে-
আয়নার সম্মুখে দাঁড়িয়ে
আছি
প্রার্থনার ভঙ্গিতে, বিবশ
আয়না
আমারক্ষুধার শেকড়ে
প্রণাম করছে;
– আয়না; ৩৮পৃ.)
খ.
কথ না শুনেই তুমি হাসো
তোমার হাসির বিপরীতে
ওড়ে সুচতুর পাখি
– ৪০পৃ.)
এছাড়া ইউসুফ মুহম্মদের কবিতার শক্তিশালী দিক হলো উনি এখনই একটা নতুন কবিতা লিখলে সেটি মনে হবে তারুণ্যের কবিতা। অর্থাৎ নিজেকে ভাঙা-গড়ার মধ্যে রেখেছেন। আদতে কোনো কবি যদি জেনে যায় উনার সেরা কবিতা লিখে ফেলেছেন তবে উনার লেখার দম শেষ বলে জানি। ইউসুফ মুহম্মদের কবিতায় শব্দ নিয়ে টানাহেঁচড়া নেই, ফর্ম নিয়ে বাতিকও নেই তবে স্পন্দিত শব্দের স্মার্ট বুননকৌশল আছে।
০৩.
‘বিষাদের রেখেছ কী নাম’ কবিতা বইয়ের পরে প্রকাশিত হয় ‘অর্ধেক পুতুল’ কবিতার বইটি। এখানে বেশ শাণিত স্বরের কবি ইউসুফ মুহম্মদকে পাই। এই বইয়ের ‘সাকিন, নাইয়র, পর্যটন, মল্লিকা নাভির নিচে, অর্ধেক পুতুল, জনান্তিকে’ কবিতাগুলো বারবার পড়লে বারবার নতুন করে বোধ ও বিশ্বাসের সঞ্চার করে। এই কবিতাগুলো ইউসুফ মুহম্মদকে বিশিষ্টতা দেবে নিশ্চয়। এই ‘অর্ধেক পুতুল’ বইটি ইউসুফ মুহম্মদকে বাংলা সাহিত্যে মর্যাদাপূর্ণ আসন দেবে-
সামনাসামনি বসো
আমি তোমার দুচোখ পর্যটনে যাবো।
তখন সতর্ক দৃষ্টি রেখো,
না হয় তোমার খোঁপায় অকস্মাৎ
ঢুকে পড়তে পারে সমুদ্রের নুন।
– পর্যটন;৭৬পৃ.)
খ.
এই সে দরিয়া, যেখানে হৃদয়খণ্ড পালের জাহাজে
সাজিয়ে বাণিজ্যে যায় প্রেমিক আমির সওদাগর
ভেলুয়া সুন্দরী যার বিরহে কাতর।
দরিয়া কূলে একা পেয়ে ভোলা
লুঠ করে আমিরের ঘরের নহর।
এই যে সমুদ্র, এখানে পাথরে ভেসে নাকি
এই দেশে আসে মোহছেন পির
সিনানের জল তোলে খোয়াজ খিজির।
– নাইয়র; ৭৪পৃ.)
গ.
মেঘের ছায়ায় এ নগরে সন্ধ্যা এলে
আমি তোমার ভ্রু আর ভাটার চরের মতো
জেগে ওঠা স্তন- একাই পরখ করব।
– অথই লবণের খাদে;১০১পৃ.)
এই বইটির পরে প্রকাশিত ‘জানালায় ঘুম’ কবিতার বইয়ে নিজের দৌড়ের এক গন্তব্যে স্থির একজন ব্যক্তিত্ব খুঁজে পাই। কিছুটা আক্ষেপও খোঁচা মারে। কিছুটা উপলব্ধ অভিযোগে মিশেল অভিমান অথবা অভিজ্ঞতা। তবে কবিতা তো সিদ্ধান্ত পৌঁছাবার কিছু নয়। একজন ইউসুফ মুহম্মদ যেখানে ক্ষান্ত হবেন সেখান থেকে আরেকজনের দৌড়; ইউসুফ মুহম্মদের কবিতায় যেই মোহনীয় উপমার মজলিস সেখানে চিত্রিত কল্পের দর্পিত ছবি জাগতিক বাস্তবতার মধ্যে মিশে যায়; ইউসুফ মুহম্মদের কবিতা পুরোপুরি বুঝে ফেলার কৃতিত্বই দিতে চায় না, একটা মারেফতি ঘোরে টলে যেতে পারেন; অনেকে এখনকার কবিতায় যে ছন্দ খোঁজেন অর্থাৎ অন্ত্যমিলে মানে শেষের দিকে, জীবনই তো শেষ হয়ে শেষ হলো না এমন অবস্থা সেখানে কবিতায় মিল খোঁজা অনর্থক; যেসব কবি কবিতায় তথাকথিত ছন্দের ব্যতিরেকে ছন্দিত মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারেন না কিংবা পাঠক এটি খুঁজে পান না উভয়ই ব্যর্থ। কবিতা হয়ে উঠলেই কবিতা। উপরোক্ত যতসব কথা আমি লিখেছি উনার বাছাই কবিতার সংকলন ‘সাক্ষী যখন শ্রীমতি চাঁদ’ বইটির পাঠশেষে; বইয়ের নামকরণেই বুঝতে পারেন- ইউসুফ মুহম্মদ একজন মাদারজাদ কবি।







