শান্তা মারিয়া
প্রতিবছর জন্মদিনে আমার একটা কথা মনে হবেই। প্রতিবারই মনে হয় ‘কেমন হতো যদি আমি না জন্মাতাম?’ কিছুটা অক্সিজেন বেঁচে যেত নিঃসন্দেহে। বেঁচে যেত আমার ব্যবহৃত কাগজ বাবদ কিছু গাছ। কিছু কনজিউমার গুডস, স্কুলে ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন। আমার জন্য বাবা মা ,আত্মীয় , বন্ধুদের ভালোবাসাটাও বেঁচে যেত।
মনে হয় এত বছর বেঁচে নাও থাকতে পারতাম।
আমার জন্ম ১৯৭০ সালের ২৪ এপ্রিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ হওয়া অসংখ্য মানুষের মধ্যে আমিও তো সামিল হতে পারতাম। কত শিশু সে সময় ঘাতকের হাতে প্রাণ দিয়েছে। আমি এবং আমার পরিবার তো বেঁচে গেছি।
এই যে অর্ধশত বছরের বেশি সময় ধরে ক্রিজে টিকে আছি এর মধ্যে কতবার তো মৃত্যু কাছাকাছি এসেছে। দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, অসুখ বিসুখ। সৃষ্টিকর্তার কৃপায় আমি তো বেঁচে আছি।
করোনা মহামারীতেও তো চলে যেতে হতে পারতো। আমার পরিচিত, বন্ধু, আত্মীয় কত প্রিয় মানুষ তো চলে গেলেন।
এই বেঁচে থাকার সময়টায় কত রকম অভিজ্ঞতা অর্জন হয়েছে।
সাধারণ-অসাধারণ কত মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। বন্ধু ও শত্রু দুটোই লাভ করেছি। বন্ধুবেশী শত্রুও। এখানে জানিয়ে রাখি অসংখ্যবার ঠকেও আজও আমি মানুষের উপর বিশ্বাস হারাইনি। মানবতার উপরে আজও্ আস্থা রয়েছে। এখনও মনে করি, বিশ্বে খারাপ মানুষের চেয়ে ভালো মানুষের সংখ্যাই বেশি।
ভালো স্মৃতিগুলোকে আমি সব সময় আগলে রাখি। খারাপ আচরণ, খারাপ স্মৃতি ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করি। কোন কোন দুঃখও অবশ্য পরম সম্পদ। সেগুলো যত্নে লুকিয়ে রাখি ডি ড্রাইভে। সেগুলোই আমার কবিতার খনিজ আকরিক।
আমি বাবা মায়ের দ্বিতীয় সন্তান। প্রথম সন্তান আমার ভাই আহমদ ইয়ুসুফ আব্বাস উদয়। আমি তার চেয়ে আট বছরের ছোট। আমার জন্ম হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভোর সাড়ে চারটায়। ফজরের আজান পড়ছে তখন। এর মধ্যেই বাবা আমার জন্মের ঘোষণা হিসেবে আজান দিলেন। আশপাশে থাকা কয়েকজন বললো, ‘সে কি শুনলাম তো মেয়ে হয়েছে। ছেলের জন্ম হলেই শুধু আজান দিতে হয়, এটা জানেন না?’ বাবা এককথায় তাদের বললেন, ‘আমার কাছে দুই সন্তানই সমান’।
মেয়ের জন্ম হওয়ায় বাবা ও মা অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন। আমার ভাই একটু মন খারাপ করেছিল। কারণ তার ইচ্ছা ছিল ছোটভাই হলে তাকে বক্সিং শেখানোর। তার ধারণা ছিল আমাকে হাসপাতাল থেকে কিনে আনা হয়েছে। বারে বারে মাকে অভিযোগ জানাতো, ‘ছোটবাচ্চাই আনা হলো যদি, তাহলে একটু বড়সর ছেলে বাচ্চা আনলে ভালো হতো, মারপিট করা যেত। এত নরম পুতুলের মতো বোন দিয়ে কী হবে?’ তবে কিছুদিনের মধ্যে তার এই মনখারাপ কেটে গিয়েছিল। বিশেষ করে যখন ভাইয়ার পছন্দে আমার ডাকনাম রাখা হলো ভ্যালিয়া। এটা হলো তার তন্ময় হয়ে সোভিয়েত গল্পের বই পড়ার ফলাফল। মা-বাবাও প্রথম নারী নভোচারী ভ্যালেনটিনা তেরেসকোভার এই ডাকনামটি পছন্দ করলেন। বাবা সারাজীবনই আমাকে ভ্যালেনটিনা বা ভ্যালেন, কিংবা মামণি, মম এইসব নামে ডাকতেন।
এরপর শুরু হলো আসল নামকরণের পালা। বাবা নাম রাখলেন ‘ঊর্মিমালা ঢেউয়ের মালা ঊষা নদীর কূলে’। মা বললেন, এত বড় নাম রাখা যাবে না। রাখলেন চন্দ্রাবতী। মা বললেন, পুরানো আমলের বাংলা সিনেমার নায়িকা মনে হচ্ছে। এরপর বাবা জিদ ধরলেন কুন্দনন্দিনী শান্তা মারিয়া নামটা রাখতেই হবে।মা বললেন, শান্তা মারিয়া তো কলম্বাসের জাহাজ। বাবা ব্যাখ্যা করলেন, কুন্দনন্দিনী হলো বঙ্কিমের বিষবৃক্ষের নায়িকা। এই নামে বাঙালি ঐতিহ্য রক্ষা হবে। মারিয়া কিবতি ছিলেন হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর একজন বিবি। তাহলে মুসলিম ঐতিহ্য রইল।
দুটি মিলিয়ে শান্তা মারিয়া হলো আন্তর্জাতিক । শান্তা শব্দটি আর্যধারার। আর মারিয়া হলো সেমেটিক ধারার। উচ্চারণও সহজ। শান্তা মারিয়া নামটি বিশ্বের যে কোন দেশের মানুষ উচ্চারণ করতে পারবে। কোন ধর্মের তাও কিছু বোঝা যাবে না।
মা মন্তব্য করলেন, সারা বিশ্বের মানুষের আমার মেয়ের নাম ধরে ডাকাডাকির দরকারটাই বা কি? কিন্তু বাবা তখন আমার ভবিষ্যত নিয়ে অতি উচ্চাশা পোষণ করায় মায়ের আপত্তি ধোপে টিকলো না। কুন্দনন্দিনী শান্তা মারিয়া বহু বছর বহাল রইলো। আকিকাও হলো ওই নামেই। আকিকার সময় দুটি ছাগল আনা হলো জবাই দিতে। আজও পর্যন্ত ছাগলদুটির জন্য আমার অপরাধবোধ হয়। আমার জন্মের কারণে দুটি প্রাণীকে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে কেন?
কুন্দনন্দিনী অংশটি অবশ্য বাদ পড়েছিল কয়েক বছর পরে। বাংলা উপন্যাসের সিরিয়াস পাঠক মা সেটি বাদ দিয়েছিলেন একটা কুসংস্কার থেকে। বিষবৃক্ষে কুন্দনন্দিনীকে বিষ খেয়ে মরতে হয়েছিল, সেটা মা কখনও ভুলতে পারেননি।
আমার মা কবিতার ভক্ত। তাঁর নিত্যসঙ্গী ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সঞ্চয়িতা’ আর কাজী নজরুল ইসলামের ‘সঞ্চিতা’। তিনি কবিতা আবৃত্তি করতেন। মাতৃগর্ভ থেকেই তাই আমি কবিতা শুনছি। জন্মের পর আমাকে ঘুম পাড়াতেন কবিতা বলে বলে। একেই বোধহয় বলে ব্রেইন ওয়াশ।
আমি কথা বলতে শিখেছিলাম খুব দ্রুত। দুই আড়াই বছর বয়স থেকে আধো আধো স্বরে বলতাম ‘সোনার তরী’, ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’। বিটিভিতে ওই বয়সেই ক্যামেরার সামনে কবিতা বলতাম।
না বুঝেই কবিতার শব্দগুলো নিজের মনে উচ্চারণ করতে করতেই শুরু হলো কবিতা লেখা। ঠিক লেখা নয়, মুখে মুখে বলা। মা বাবা খেয়াল করে দেখলেন আমি কবিতার মতো কিছু কিছু নিজস্ব কথা বলছি। তাদের কাছে সেগুলো খুব বিস্ময়কর বলে মনে হলো। তখন বছর তিনেক বয়স। প্রথম কবিতাটি হলো,
‘ধরণীতলে মাথাটি থুয়ে
জাগায়ে তুমি দিয়েছ প্রাণ,
আমি ভালোবাসি
সবচেয়ে গান’।
বোঝাই যায়, রবীন্দ্র-কবিতা থেকেই শব্দগুলো তুলে নেয়া।
সেই শুরু হলো কবিতার সঙ্গে সপ্তপদী।বর্ণ পরিচয়ের পর ছোট ছোট কবিতা লিখতাম। স্কুলে যাওয়ার পর এই লেখার বাতিক আরও বাড়লো। সহপাঠীদের নিয়ে কবিতা লেখা, স্কুল ম্যাগাজিনে দেয়া।
১৯৭৯ সালে নয় বছর বয়সে আমার লেখা ছোট ছোট কবিতাগুলো একসঙ্গে করে বাবা প্রকাশ করলেন বই। নামটা আমারই দেয়া ‘মাধ্যাকর্ষণ’। প্রচ্ছদ এবং অলংকরণও আমারই করা ছিল। সে সময় ‘খেলাঘর’, ‘সাতভাই চম্পা’, ‘কচিকাঁচার আসর’ এবং বিভিন্ন ম্যাগাজিনে কবিতা প্রকাশ হতো।
আমার শিশুবেলা কেটেছে বইয়ের সঙ্গে। স্কুলে ভালো ছাত্রী হিসেবে শিক্ষক ও বন্ধুদের স্নেহ ও প্রীতি পেয়েছি। টিভিতে অনুষ্ঠান করতাম, ঢাকা লিটল থিয়েটারের সদস্য হিসেবে মঞ্চে নাটক করতাম, কবিতা প্রকাশ হতো, ক্লাসে প্রথম হতাম। তবে খেলাধুলায় ভালো ছিলাম না। ‘পড়ুয়া টাইপ’ মেয়ে।
বাবা, মা প্রচুর বই কিনে দিতেন। উপহার পেয়েছি অনেক বই। সেসময় জন্মদিন বা যে কোন উপলক্ষে বই উপহারের রেওয়াজ ছিল। সোভিয়েত লেখকদের বই ছিল নিত্যসঙ্গী। উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার রায়, সত্যজিৎ রায়, লীলা মজুমদার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, শওকত ওসমান, সাজেদুল করিম, মোহাম্মদ নাসির আলী, মুনতাসির মামুন এমন আরও অনেক লেখক আমার বইয়ের আলমারিতে জ্বল জ্বল করতেন। চাঁদের পাহাড়ের শঙ্কর, প্রেফেসর শঙ্কু, ফেলুদা, কিরীটি রায় এবং অবশ্যই শার্লক হোমস ছিলেন প্রিয় নায়ক। অনেক কমিকস বই ছিল।
রেডিও শুনতাম। সাদাকালো ও পরে রঙিন টিভিতে দেখতাম, ‘স্টার ট্রেক’, ‘হাওয়াই ফাইভ ও’ ‘সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান’ ‘নাইট রাইডার’। রমনা পার্কে বেড়াতে যেতাম। আমাদের ছোট্ট ‘বেবি অস্টিন’গাড়িতে চড়ে ঘুরতে যেতাম প্রায়ই। তবে বাবা শুধু বেড়াতে নিয়েই যেতেন না। পড়াতেনও। স্কুলের বই নয়। স্কুলের পড়া পড়াতেন মা। বাবার কাছে শুনে শুনে কার্ল মার্কস, লেনিন, স্ট্যালিন, মাও সে তুং নামগুলো মুখস্ত হয়ে গেল ছোটবেলাতেই।
ছয়-সাত বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের পর আমার আরেকজন বন্ধু হন। ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন। সোকোলিনিতে নববর্ষ, স্ফুলিঙ্গ থেকে অগ্নিশিখা, লেনিনের গল্প, রুশ ইতিহাসের কথাকাহিনী এমনি আরও অনেক বই ছিল।সেসব বইতে লেনিনের ছবি, লেনিনের গল্প আর বাবার মুখে লেনিনের জীবনের কথা শুনে শুনে তাকে ভীষণ আপন মনে হতো। লেনিনকে নিয়ে কবিতাও লিখেছিলাম। লেনিন ও রবীন্দ্রনাথ আমার আজীবনের বন্ধু হয়ে এখনও রয়ে গেছেন।
তখন থেকেই সাম্যবাদ, ইতিহাস আর মিথোলজির ভুবনে আনাগোনা শুরু হলো বাবার হাত ধরে। পড়ালেন গীতা, বাইবেল, কোরান, ত্রিপিটক, কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো। রামায়ণ মহাভারত, ইলিয়াড অডিসির গল্পগুলো জানলাম, পরে পড়লাম বই থেকে, রীতিমতো পড়া মুখস্ত করার স্টাইলে, প্রশ্ন-উত্তর ধরে। পৃথিবীর ইতিহাস প্রাচীন যুগ আর মধ্যযুগ পড়া হলো। রাহুল সাংকৃত্যায়নের মানব সমাজ আরেকটু বড় হয়ে পড়তে হলো বাধ্যতামূলকভাবে। ছোটবেলা, বড়বেলা এমনকি বুড়োবেলাতেও বাবা আমাকে পড়িয়েছেন অসংখ্য বই। পাশ্চাত্য চিত্রশিল্পের ইতিহাস, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দর্শন থেকে শুরু করে ক্ল্যাসিক সাহিত্য। বাবার কাছে এসব পড়া ছিল আনন্দদায়ক। কারণ তিনি কাউকে কোনদিন কড়া কথা বলতেন না। আমি খুব আগ্রহ নিয়েই এসব বই পড়তাম। শিশুবেলাটা নতুন নতুন জানার আগ্রহে রঙিন হয়ে উঠেছিল।
বাবা আমাকে ও ভাইয়াকে নামাজ পড়তে শিখালেন। বাবার পাশে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তাম। আবার তার হাত ধরেই যেতাম চকের ঈদের মেলায়, বনগ্রাম লেনে দুর্গাপূজার প্রতিমা দেখতে। আমাকে নিয়ে যেতেন নিমতলীর পুরানো জাদুঘরে এবং পরে শাহবাগের জাদুঘরে। পাল আমল, সেন আমল, মোগল পাঠানের ইতিহাস তাই বই পড়ে মুখস্ত করতে হয়নি।
একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরিতে আমি বাবার সঙ্গে যেতাম।
ছোটবেলায় জন্মদিন মানেই ছিল বিশাল আনন্দের দিন। এপ্রিলমাস এলেই দিনগোনা শুরু করতাম।জন্মদিন মানেই বেলুন ও রঙিন কাগজ দিয়ে ঘর সাজানো। খানবাহাদুর সাহেবের মেয়ে বলে আমার মায়ের মধ্যে কিছুটা সাহেবিয়ানা ছিল।
তিনি আমাদের জন্মদিনে পায়েস রাঁধতেন না। বরং বার্থডে কেক ছিল অবধারিত।
সত্তর ও আশির দশকে ঢাকায় কেকের দোকান বলতে ছিল অলিম্পিয়া, ক্যাপিটাল, লাইট, ইউসুফ বেকারি ।এছাড়া মহল্লায় অবশ্য কনফেকশনারি ছিল তবে সেখান থেকে জন্মদিনের কেক কখনও আনা হতো না। আমাদের আলুবাজারের বাড়ির কাছাকাছি নবাবপুরে ছিল আরজু হোটেল আর ঢাকা হোটেল। এই হোটেলগুলোর কেকও বেশ ভালো ছিল।তবে সাধারণতই বায়তুল মোকাররমের অলিম্পিয়া থেকে কেক আনা হতো।পূর্বাণী থেকেও কেক আনা হয়েছে বেশ ক’বার। পরে ডিসেন্ট থেকে বাবা সবসময় কেক নিয়ে আসতেন। জন্মদিনে পোলাও কোর্মা রাঁধার রেওয়াজ ছিল না।জন্মদিনে হতো ‘টিপার্টি’। আমার ধারণা এটা ইংরেজ আমলের রীতির অবশেষ।
জন্মদিনে উপহার পেতাম বই, খেলনা, প্রাইজবন্ড। আমার সংগ্রহের অনেক সোভিয়েত বই জন্মদিনে পাওয়া।মাঝেমধ্যে নতুন ড্রেসও পেতাম।নুলিয়াছড়ির সোনারপাহাড়, এন্ডারসনের গল্প, দেশবিদেশের রূপকথা জন্মদিনে পাওয়া অনেক পছন্দের বই।আরও অনেক বই পেয়েছি সত্যজিৎরায়ের, সুকুমার রায়ের।কলমও ভালো উপহার হিসেবে গন্য।বাবা-মায়ের তরফ থেকে নতুন ড্রেস পেতেই হবে।
ক্লাস সিক্সে উঠে বাবার কাছ থেকে ঘড়ি উপহার পেয়েছিলাম। ইউনিভারসিটিতে পড়ার সময় বন্ধুবান্ধব নিয়ে নীরবহোটেল, টিএসসি, সিলভানা বা অন্য কোথাও খেতে যেতাম।‘কথপোকথন’বা অন্য কবিতার বই উপহার পেয়েছি বেশি।
মৈত্রেয়ী দেবী ন হন্যতে এবং মির্চা এলিয়াডের লা নুই বেঙ্গলীও উপহার পেয়েছিলাম। তবে বইদুটি আমার সংগ্রহে ছিল এর আগে থেকেই।
১৯৮৮ সালে এইচএসসি পাশ করার পর ভর্তি হলাম বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজে। বরিশালে সপ্তাহখানেক থাকার পর মা বাবা নিয়ে আসলেন।
আমার মায়ের উদ্বেগজনিত সমস্যা ছিল। ঢাকার বাইরে রেখে তাই পড়াতে চাননি। এখন ভাবি যদি ডাক্তারিটা পড়া হতো তাহলে মানুষের সেবায় সত্যিকারভাবে কিছু করতে পারতাম।
তবে ভাগ্যিস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেয়া ছিল এবং সুযোগও পেয়েছিলাম। ফলে ‘ইয়ার লস’ হয়নি। লোক প্রশাসন বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স করেছি।
সোভিয়েত নারী পত্রিকায় লেখা প্রকাশ হয়েছে আশির দশকে।
নব্বই দশকে লিটল ম্যাগাজিনে কিছু কিছু লেখা প্রকাশ হতো। ১৯৯৬ সালে বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পে যোগ দিই। এই তরুণ লেখক প্রকল্পে যোগ দেয়ার ফলেই লেখালেখির ভূত মাথায় স্থায়ীভাবে চেপে বসে।
বিসিএস, ব্যাংক সবকিছুর চেয়ে মনে হলো পত্রিকায় চাকরি নিলে নিজের লেখা প্রকাশ করা সবচেয়ে সহজ হবে। তখন আমি এমফিল করার পাশাপাশি লাইসিয়াম ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে চাকরি করছিলাম। পত্রিকায় টুকটাক লিখতাম। পত্রিকার পাতায় নিজের নাম ঘন ঘন দেখার কি যে ইচ্ছা। ১৯৯৭ সালে যোগ দিলাম মুক্তকণ্ঠ পত্রিকায়। ব্যস সেই থেকে সাংবাদিকতা নামক চক্রবূহ্যে প্রবেশ। পত্রিকার পাতায় নিজের নাম দেখার খায়েশ পূর্ণ হয়েছে বটে, কিন্তু যে লেখাগুলো লিখেছি সেগুলো বেশিরভাগই ফিচার। ১৯৯৮ সালে জনকণ্ঠে যোগ দেয়ার পর রনিতা রায়ান, প্রিয়া ত্রিবেদী নামেও বিভিন্ন পাতায় ফিচার লিখতাম।
ফিচার, কলাম, উপসম্পাদকীয় কোনো কিছুর ভিড়েই অবশ্য কবিতার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়নি। গল্প লিখেছি। গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে। লিখেছি ভ্রমণগদ্য, নাটক, প্রবন্ধ,স্মৃতিগদ্য। কিন্তু সেই শৈশব থেকে কবিতাই আমার প্রিয় সঙ্গী। এখনও কুনমিং শহরের উপকণ্ঠে আমার অ্যাপার্টমেন্টের ব্যালকনিতে বসে আমি কবিতা পড়ি। চোখের সামনে সবুজ পাহাড়, লেক রঙিন হয়ে ওঠে বিকেলের আলোয়, সূর্যাস্তের বিভায়।
আমার নিজস্ব জগতে আমি ছিলাম এবং আছি একান্ত একা। কিন্তু এই একাকীত্ব এতই অভ্যাস হয়ে গেছে অথবা আমার মনের গঠনটাই এমন যে একা থাকতে আমার খারাপ কখনও লাগেনি। এখনও লাগে না। আমার এমন কোন বন্ধু সারাজীবনে হয়নি যার সঙ্গে আমার সুখ-দুঃখের সমস্ত কথা ভাগ করে নিতে পারি। আমার দুই তিনজন খুব ভালো বন্ধু অবশ্যই আছেন। যারা আমাকে অনেক ভালোবাসেন। কিন্তু তাদের কাছেও আমি কেন যেন একেবারে সমস্ত কথা কখনও উজার করে বলতে পারি না।
শৈশব থেকে কিশোরবেলা, তারপর তারুণ্য। এখন মধ্যবয়স। আমার নিজস্ব জগত ক্রমশ আরও প্রসারিত হয়েছে। ইতিহাস আর মিথোলজির পাঠ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রিয় শখ। শৈশব কৈশোরে ছোটদের বিশ্বকোষ খুব পড়তাম। কত কিছু জানা হতো। সেটা নেশা হয়ে দাঁড়ালো ক্রমে ক্রমে। নতুন কিছু জানতে, নতুন বই পড়তে বিশেষ করে ইতিহাসের বই পড়তে যে কি ভালো লাগে।
অনেক মানুষের ভিড়েও আমি একা থাকতে পারি। বন্ধু, বান্ধব অনেক হয়েছে। ভালোবাসাও। সংসার, সন্তান। সবকিছুই। তবু আমার নিজস্ব জগতটা কিন্তু আমারই আছে।
এখন চীনে একা থাকি। এখানে বন্ধু বান্ধব তো হয়েছে অবশ্যই। তবুও এমন অনেক দিন যায় যেদিন কারও সঙ্গে একটি বাক্যও বিনিময় হয়নি। অনেকেই প্রশ্ন করেন একা থাকতে খারাপ লাগে না? আমি হাসি। সত্যিই কি খারাপ লাগে? নিঃসঙ্গ লাগে? মোটেই না। আমার নিজস্ব একটি পৃথিবী আছে। সেখানে আজও আমার অনেক সঙ্গী। তারা কেউ কেউ প্রিয় উপন্যাসের চরিত্র, কেউ প্রিয় লেখক। আর এখন তো নেট থেকে অসংখ্য বই ডাউনলোড করা যায়। ইউ টিউবে ক্ল্যাসিক ছবিগুলো দেখা যায়। ভ্যান গঘ, গঁগার পেইন্টিংগুলো দেখে নেয়া যায়। বিশ্বের যে কোন বিষয়ে জানতে চাইলেই ধারণা পাওয়া যায়। নতুন কোন বই যখন ডাউনলোড করি মনে হয় সোনার খনির খোঁজ পেয়েছি।
আমি কখনও একা হই না।
আমার কাছে জন্মদিন মানে এখনও আনন্দ। তবে এটা ঠিক জন্মদিনটা দুঃখেরও। এখন তো আর বাবা নেই। মা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত। এখন কেউ কেক আনার চিন্তা করে না। এক মাস আগে থেকে কেউ পরিকল্পনা করে না। কেউ নতুন ড্রেস কেনার কথা বলে না। এখন আর আমার জন্মদিন কারও কাছে সেলিব্রেট করার মতো কোন ঘটনা নয়।
কি করা যাবে। আমিই আমাকে উপহার দিই। আমার জন্মদিন আমি নিজেই সেলিব্রেট করি। নিজেই নিজের প্রতি ভালোবাসা জানাই। যত যাই হোক, বেঁচে থাকাটা তো আনন্দের। বেঁচে থাকটাই তো পরম পাওয়া।
মন খারাপ বা একটু বিষন্ন হলে আমি প্রিয় কোন বই নিয়ে বসে যাই। ব্যস, মন খারাপের কথা আর মনেই থাকে না। আর যত অভিমান জমে থাকে সেটা জায়নামাজে দাঁড়িয়ে মুছে ফেলার চেষ্টা করি। এখন পর্যন্ত কোন মানুষের নামে আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে নালিশ জানাইনি বরং বলেছি ‘আল্লাহ তাকে সুমতি দাও।’ তবে আমার চোখের জল যদি অভিযোগ হয়ে থাকে সেখানে তো কোন হাত নেই।
ভালোমন্দ সব মিলিয়ে এই জীবন, এই মানবজন্ম আমার বড় প্রিয়। বেঁচে থাকতে চাই আরও অনেক বছর।কত কি পড়ার আছে, দেখার আছে, লেখার আছে।
প্রতিটি জন্মদিনেই ভাবি, আগামি বছর এই দিনে আমি থাকবো তো?? যদি বেঁচে থাকি তবে ভালোবাসা সকলের জন্য। আর যদি না থাকি, তাহলেও জানিয়ে যাই, আমি আমার আশপাশের সকল মানুষকেই বড় বেশি ভালোবাসি। আমার জীবনে চেনাজানা পরিমণ্ডলে এমন কেউ নেই, যার অমঙ্গল কামনা করেছি কখনও। আমি যদি নিজের অজান্তেও কাউকে আঘাত দিয়ে থাকি তাহলে ক্ষমা চাওয়ার এই তো সময়। ক্ষমা করো আর মনে রেখো আমাকে, এক জীবনে এর চেয়ে বেশি চাওয়া, বেশি প্রাপ্তি আর কি হতে পারে?








অনেক কিছু জানলাম। জীবন সুখময় হোক।শুভ জন্মদিন।
কবির আত্মজীবনী পড়ে খুবই ভালো লেগেছে। ভালো থাকবেন সবসময়।