আমিনুল ইসলাম
ভারতীয় উপমহাদেশ যখন বৃটিশদের হাতে পরাধীন তখন এক পর্যায়ে ছোটগল্প রচনা প্রবেশ করে বাংলা সাহিত্যে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাজে প্রথম ও শ্রেষ্ঠ গল্প রচয়িতা। ঢাকা-মুর্শিদাবাদ উপেক্ষিত থাকতে থাকতে অন্যপাশে আধুনিক রূপ ও মনন নিয়ে গড়ে ওঠে শহর কলকাতা। সেই ১৮৫৭ সালের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বা সিপাহি যুদ্ধের পর রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হলেও ইউরোপীয় আধুনিক ধাঁচের সাহিত্যচর্চার কেন্দ্র হিসেবে কলকাতা রয়ে যায়। ইংরেজ প্রবর্তিত আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে গড়ে ওঠে হিন্দু এলিট শ্রেণি। তারা সরকারি চাকরি, ব্যবসা, ওকালতি, রাজনীতি, জমিদারি ইত্যাদি পেশায় নিয়োজিত থাকে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সাহিত্যচর্চায় অংশগ্রহণ করে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়- মাইকেল মধুসূদন দত্ত, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বিহারীলাল রায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ লেখকগণ খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেন। মুসলমানদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী, মীর মশাররফ হোসেন প্রমুখ লেখকগণ জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি অর্জন করতে সমর্থ হন। কিছুদিন পর পঞ্চপাণ্ডব খ্যাত কবিগণ বিপুল প্রতিষ্ঠার অধিকারী হন। তখন বাংলা ভূগোল ছিল মূলত গ্রামবাংলা। শহর বলতে কলকাতা। অকৃষি পেশা, আধুনিক উচ্চশিক্ষা, সাহিত্যচর্চা, সংগীতচর্চা, মদ্যপান, ক্লাবজীবন প্রভৃতি সবকিছুর কেন্দ্র ছিল কলকাতা শহর। তখন ঢাকায় ছিলেন মূলত কয়েকটি নবাব পরিবার। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের ফলস্বরূপ ঢাকায় গড়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এটি ছিল ঢাকার হারানো গৌরব ফিরিয়ে পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তথাপি ইউরোপীয় ধাঁচের নগরজীবন বলতে যা বোঝায় তা ছিল মূলত কলকাতা শহরে। বৃটিশ শা্সনের অবসানে ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে ক্রমে ক্রমে ঢাকায় গড়ে ওঠে নগর জীবন ও নগর সংস্কৃতি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-জীবনানন্দ দাশ কেউই শহরজীবনকে গভীরভাবে ভালোবাসতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথের “নষ্টনীড়”, “কাবুলিওয়ালা”, “ক্ষুধিত পাষাণ” প্রভৃতি গল্পে এবং “বধূ”, “সভ্যতার প্রতি” প্রভৃতি কবিতায় নগরজীবনের ছবি আছে। সেসব ছবি নগরজীবনের নেতিবাচক চরিত্রের উদ্ভাসনে সোচ্চার। “সভ্যতার প্রতি” শীর্ষক কবিতায় তিনি বলেছেন: “ দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর, / লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর / হে নবসভ্যতা !” জীবনানন্দ দাশ তাঁর “রাত্রি” নামক কবিতায় কলকাতার নগরজীবনকে নেতিবাচকতার রঙে রাঙিয়ে চিত্রিত করে বলেছেন: “ নগরীর মহৎ রাত্রিকে তার মনে হয় / লিবিয়ার জঙ্গলের মতো।/ তবুও জন্তুগুলো আনুপূর্ব— অতিবৈতনিক, / বস্তুত কাপড় পরে লজ্জাবশত ।” সেই ১৯৪৭ সালের পর গড়ে ওঠা ঢাকার নগরজীবন সবচেয়ে বেশি চিত্রিত হয়েছে শামসুর রাহমানের কবিতায়। কথাসাহিত্যে নগরজীবনের ছবি ফুটে উঠেছে বিভিন্ন কথাসাহিত্যিকের উপন্যাস ও ছোটগল্পে। আলাউদ্দিন আল আজাদের “তেইশ নম্বর তৈলচিত্র” তার উজ্জ্বল উদাহরণ। অনেকটা এমন প্রেক্ষাপটে এবং সময়কালে ঢাকার সাহিত্য আকাশে কথাসাহিত্যিক ফরিদা হোসেনের আবির্ভাব। তিনি ১৯৪৫ সালেল ১৯ জানুয়ারি পিতার কর্মস্থল কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস চট্টগ্রামের মীরেরশ্বরাই। ঢাকার সাহিত্য আকাশ একারণেই বললাম যে তাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা, যাপন, ভ্রমণ নানা ভূগোলে হলেও তাঁর সাহিত্যচর্চার উঠোন মূলত ঢাকা। ফরিদা হোসেন একটি উচ্চশিক্ষিত ও প্রচলিত অর্থে খান্দানি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শ্রমিক নেতা এবং আইএলও এর পরিচালক। ফরিদা হোসেন ইডেন কলেজ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। তাঁর বিয়ে হয় একটি উচ্চশিক্ষিত ধনাঢ্য পরিবারে। পিতামাতা এবং শশুর-শাশুড়ি উভয়ের পরিবারই সমাজের উপরতলায় অবস্থানকারী এবং নিবিড়ভাবে সাহিত্য-সংস্কৃতির অনুরাগী। ফরিদা হোসেন শিক্ষাজীবনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের পাশাপাশি সাহিত্য-সংগীত চর্চা করেন। ছাত্রজীবনেই তিনি রেডিওতে সংবাদপাঠ ও উপস্থাপনার সুযোগ লাভ করেন। তিনি ছোটগল্প উপন্যাস নাটক রচনার সমান্তরালে গান রচনা, গানে সুরারোপ, রেডিও টেলিভিশনে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা, সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা, পেন ইন্টারন্যাশনাল এর বাংলাদেশীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশে-বিদেশে সাহিত্য সভায় অংশগ্রহণ, সাহিত্যপত্রিকা সম্পাদনা করে এসেছেন। উপন্যাস, ছোটগল্প, শিশুসাহিত্য, নাটক ইত্যাদি মিলিয়ে তাঁর গ্রন্থসংখ্যা ৪০ এর অধিক। তার মধ্যে গল্পগ্রন্থ ৮টি। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ হচ্ছে: অজন্তা, ঘুম, শিকড়, হিমালয়ের দেশে, মুখোশ, সহযাত্রী, শ্রেষ্ঠ গল্পসমগ্র, হিলভিউ, আরাধনা, জীবন তো একটাই, শাড়ি, নীল প্রজাপতি, মায়াদ্বীপে অভিযান, আনন্দ ফুলঝুরি প্রভৃতি।
ফরিদা হোসেনের জীবনের একটি অংশ কেটেছে কলকাতায়। অধিকন্তু তিনি পৃথিবী নানা দেশ ভ্রমণ করেছেন এবং নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দর্শন করেছেন। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় বিবেচনাতেই তাঁর জীবনাভিজ্ঞতা নগরকেন্দ্রিক। তিনি নগরজীবনক তার বাইরের চাকচিক্যময় রূপে এবং অন্দরমহলের দিক থেকে তার উজ্জ্বলতায় ও অন্ধকারের স্বভাবে নিবিড়ভাবে অবলোকন, পর্যবেক্ষণ ও উপলব্ধি করেছেন। আবহমান গ্রামবাংলার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জীবন যাপনের সুযোগ হয়নি তাঁর । ফলে তাঁর প্রায় সবখানি দৃষ্টি, মনোযোগ, উপলব্ধি, কল্পনা, ভালোবাসা, হতাশা, আবেগ, নিরাসক্তি শহরজীবনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। তিনি একজন বহিরাগত হিসেবে শহরজীবনকে দেখেননি। তিনি জন্মের পর থেকেই নিরবচ্ছিন্নভাবে শহরবাসী হওয়ায় শহরকে তার স্বরূপে দেখেছেন রাগে ও বিরাগে, অনুভবে ও কল্পনায়, ভাবনায় ও ভালোবাসায়। তিনি একজন উদ্যমী ও অক্লান্ত বইপড়ুয়া মানুষ। বাংলা ভাষার বিখ্যাত লেখকদের রচনাবলি তাঁর পড়া। একইসঙ্গে তিনি গ্রহণ করেছেন বিশ্বসাহিত্যের পাঠ। সংগীত তাঁর ভালোবাসা ও চর্চার অন্যতম ক্ষেত্র। মন্ত্রণালয়, ক্লাব, তারকা হোটেল, রাজনীতির কেন্দ্রীয় উঠোন, রেডিও টেলিভিশন এসবই তাঁর যাপিত জীবনের নিবিড় আওতায় এসেছে এবং থেকেছে। এই বহুমাত্রিক অনন্য জীবন অভিজ্ঞতা ও যাপন অভিজ্ঞান তাঁর সৃষ্টিশীল সাহসী মনকে নগরজীবনের অন্তরঙ্গ ও সত্যনিষ্ঠ ছবি আঁকায় প্ররোচন ও প্রেরণা দান করেছে। একই অভিজ্ঞতা তাঁকে জুগিয়েছে সেই ছবি আঁকার মন, ক্যানভাস, রং ও তুলি।
ফরিদা হোসেন সাতচল্লিশের ভারত-পাকিস্তান স্বাধীনতা, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং তৎপরবর্তীকালের গুরুত্বপূর্ণ যাবতীয় ঘটনা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞানের অধিকারী। তাঁর ছোটগল্পে বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ছবি এসেছে প্রবলভাবে। কিন্তু তিনি গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে সেসব গল্প না লিখে সেসবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অলক্ষিত ও অনালোকিত দিকগুলোকে যুগপৎভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর “একুশের দিনরাত্রি” শীর্ষক ছোটগল্পে কবিতা নামীয় একজন কিশোরীর ভাষা আন্দোলনে তাঁর মামার শহিদ হওয়ার বেদনা থেকে লেখক হয়ে ওঠার ছবি তুলে ধরা হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে ভাষা আন্দোলন নিয়ে কবিতা-উপন্যাস- ছোটগল্প-নাটক-গানের ছড়াছড়ি। কিন্তু ভাষা আন্দোলন কীভাবে নারীদেরও লেখক হতে প্রেরণা ও শক্তি জুগিয়েছিল এবং ভাষা আন্দোলন কীভাবে বাংলা সাহিত্যকে সম্প্রসারিত হতে ও সমৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হয়েছিল বিশেষত শিক্ষিত নারীদের সাহিত্যিক হয়ে উঠতে প্রভাবিত করেছিল, ফরিদা হোসেনের “একুশের দিনরাত্রি” তারই উজ্জ্বলতম প্রমাণ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশে যত সাহিত্যকর্ম হয়েছে, তার তুলনা বোধহয় বিশ্বসাহিত্যে নেই। কিন্তু এসকল কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, গান একচক্ষু বিশিষ্ট প্রাণীর অবলোকন ও উপস্থাপনের মতো। যে কোনো যুদ্ধে একাধিক পক্ষ থাকে এবং তার অন্যায় শিকার হয় উভয়পক্ষের নির্দোষ নিরুপায় শিশু-নারী-বৃদ্ধগণ। “প্রেমে এবং ভালোবাসায় অন্যায় বলে কিছু নেই”-এই জংলী নীতি আগ্রাসী ও প্রতিরোধী, বিজয়ী ও বিজিত উভয় পক্ষকে অন্ধভাবে হিংস্র করে তোলে। যুদ্ধশেষে একতরফা বয়ানে ইতিহাস লেখেন বিজয়ী পক্ষ যা অর্ধসত্যে অর্ধ মিথ্যায় ও অর্ধ প্রকাশে অর্ধ গোপনকরণে আকীর্ণ এবং ফলে অনির্ভরযোগ্য বয়ান হয়ে ওঠে। এখানেই মহৎ সাহিত্যের সোনালি ভূমিকা রাখার ক্ষেত্র ও ফাঁক থাকে। এটা অপ্রিয় ও দুঃখজনক হলেও সত্য যে বাংলাদেশের সাহিত্যিকগণ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ব্যতিক্রমী মহৎ সাহিত্য রচনায় মনোযোগী হননি বললেই চলে। দুয়েকটি দৃষ্টান্ত আছে উপন্যাসে- ছোটগল্পে- সিনেমায় কিন্তু সেসবকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণের মননশীলতা দেখা যায়নি বললেই চলে।এই একচক্ষু বিশিষ্ট সাহিত্য- সংস্কৃতির উঠোনে বসে মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্টতায় ফরিদা হোসেন রচনা করেছেন “শুভাশীষ”, “চরিত্র বদল”, “শিকড়”, প্রভৃতি ছোটগল্প । এসব ছোটগল্পে একদিকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের বিদেশ ছেড়ে স্বদেশের মাটিতে ফিরে আসার দুর্বার টানের ছবি ফুটে উঠেছে তেমনি অন্যদিকে একাত্তর সালে পাকহানাদার বাহিনীর হাতে লাঞ্ছিত প্রেমিকা-স্ত্রীকে যুদ্ধের পর ফিরে এসে প্রেমিক স্বামীর গ্রহণ না করার হীনম্মন্যতা এবং আরেকটি গল্পে যুদ্ধফেরত স্বামীর হাতে লুণ্ঠন করা সোনাদানা দেখে তাকে প্রশ্ন করার মাধ্যমে সেসব পরাজিত বিহারীদের সোনাদানা বলে জানতে পারার পর উচ্চশিক্ষিত প্রেমিকা স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে পরিত্যাগের চিত্র ফুটে উঠেছে। এসব ছবিতে মুক্তিযুদ্ধ একটা উপলক্ষ । গল্পকার কোথাও না বললেও বুঝতে পারা যায় যে মুক্তিযুদ্ধ দেশকে হানাদার মুক্ত করলেও নারীর ওপর পুরুষের প্রভুত্ব করার মানসিকতা, সম্পদলিপ্সা, সতী-অসতী ধারণা, ইচ্ছার বিরুদ্ধে ও প্রতিরোধে অক্ষম নারীর পুরুষের দ্বারা ধর্ষিত হওয়ার পর পুরুষ আত্মীয়-স্বজন ও প্রেমিক-স্বামী পুরুষ কর্তৃক তাকে গ্রহণ না করার মানসিকতা ইত্যাদির অবসান হয়নি। “শুভাশীষ” গল্পটির সারসংক্ষেপ হচ্ছে: হাসিব এবং রিফাত দুজনই ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের তুখোড় ছাত্রনেতা ছিলেন। দুজনই ছিলেন বায়ান্নর ভাষা সংগ্রামের সময় তুখোড় বক্তা, কর্মী ও নেতা । তারা একসময় প্রেমসূত্রে বিবাহবন্ধনে জড়ায়। তাদের শীলা নামে একটি ফুটফুটে মেয়ে সন্তান হয়। অতঃপর কিছুদিন পর মুক্তিযুদ্ধ এলে হাসিব মুক্তিযুদ্ধে যান আর রিফাত ছোট শীলাকে নিয়ে বাড়িতে অবস্থান করেন। একরাতে রিফাত ধর্ষিত হয় হানাদার বাহিনীর লোকজনের দ্বারা। যুদ্ধশেষে হাসিব এসে এসব ঘটনা শোনেন। অতঃপর কোনো কথা না বলে প্রিয়তমা স্ত্রী রিফাত এবং নিজের ঔরসজাত শিশুকন্যা শীলাকে পরিত্যাগ করেন । তার মনে হয় যে– তার স্ত্রী অন্যদের দ্বারার ধর্ষিত হয়েছিল অতএব সে আর সতী নারী নেই, সে এখন অপবিত্র। এ হচ্ছে যুগপুরাতন পুরুষতন্ত্র সবকালেই যার বলী হতে হয়েছে নারীকে। গল্পটি বলতে চেয়েছে: মুক্তিযুদ্ধ দেশের ভূগোলকে মুক্ত করলেও দেশের অর্ধেক নাগরিক যে নারী, পুরুষতন্ত্রের হাত থেকে তার মুক্তিলাভ ঘটেনি। অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বলতে হয় যুদ্ধজয়ী পুরুষও যুগ যুগ ধরে পুষে রাখা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার অচলায়তন থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারেননি। তারা হাজার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, বিশ্বযুদ্ধ, পারমাণবিক যুদ্ধ, প্রযুক্তি নির্ভর যুদ্ধ করেও উদ্ধত আস্ফালনের আড়ালে নিজেদের রচা পুরুষতান্ত্রিকতার হীন খোঁয়াড় বন্দি রয়ে গেছে। গল্পকার ফরিদা হোসেন চমৎকারভাবে বিষয়টিকে ফুটিয়ে তুলেছেন কয়েকটি শানিত বাক্যের কষাঘাতে।
“নার্সিং হোম থেকে বেরিয়ে কয়েকবছর একটা মাতৃসদনে ছিল রিফাত।
তারপর থেকেই পুরোপুরিভাবে একটা অনাথ আশ্রমে। এবং এই অনাথ আশ্রমের কোলাহলের মধ্যেই নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে ভার্সিটির চৌকশ সংগ্রামী মেয়ে রিফাত। আর দিনরাত এইসব শিশুদের মাঝে খুঁজেছে শীলাকে।
একটি দেশকে অপবিত্রতা থেকে বাঁচাবে বলে যুদ্ধ করেছে যে দেশের তরুণরা, তাদেরই একজন একটি জীবনকে ঘরে ঠাঁই দিতে পারলো না। ছিঃ ঘৃণা ধরে গেছে রিফাতের হাসিবের মতো মেরুদণ্ডহীন পুরুষদের উপরে।
এত গালভরা স্লোগান—দেশপ্রেমের বুলি—মায়ের পবিত্রতা রক্ষার জন্য জীবন মরণপণ?
সেই মায়েরই একজন রিফাত।
একটিবার সাহস করে জিজ্ঞেস পর্যন্ত করতে পারলো না “কেমন আছো?”
ফরিদা হোসেনের “শুভাশীষ” এবং “চরিত্র বদল” গল্পদুটি ব্যতিক্রমী উজ্জ্বলতায় সুন্দর ও অভিনব। গল্পদুটিতে সৃষ্ট দুটি পুরুষ চরিত্র হাসান এবং হাসিব। দুজনই যুদ্ধজয়ী মুক্তিযোদ্ধা।কিন্তু দুজনই ন্যাযনীতি, মহৎ মানসিকতা ও মানবিকতার পরীক্ষায় পরাজিত। তারা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, যুদ্ধ করেছিলেন সময়ের চাপে ও বয়সের উত্তেজনায়, যুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু মানুষের মতো মানুষের নির্লোভ মন ও নারীকে শর্তহীনভাবে ভালোবাসার মহত্ব অর্জন করতে পারেননি। তারা পুরুষতান্ত্রিক পৃথিবীর গড়পড়তা পুরুষ রয়ে গেছেন। হাসান একটি অদ্ভুত চরিত্র যে যুদ্ধের কোনো সময়ই প্রিয়তমা স্ত্রীর কথা বিস্মৃত হননি এবং যুদ্ধশেষে স্ত্রীর কাছেই ফিরে এসেছেন কিন্তু পরাজিত পক্ষের মালামাল গ্রহণ করার লোভ সংবরণ করতে পারেননি। তার প্রেমে খাদ নেই কিন্তু বৈষয়িক নীতিতে ভেজাল আছে।
বিপরীতে “চরিত্র বদল” গল্পের নায়িকা নিমা এবং “শুভাশীষ” গল্পের নায়িকা রিফাত উভয়ই অন্য মানুষ। তারা দুজনই স্বামী-পুরুষের নিচুমনা অর্থলোভ ও গতানুগতিক পুরুষতান্ত্রিক হীনতাকে বৃদ্ধাঙ্গুল প্রদর্শন করত স্বনির্ভর পায়ে আত্মসম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার প্রত্যয়দীপ্ততায় উজ্জ্বল।
ফরিদা হোসেন তাঁর কিছু কিছু ছোটগল্পে সংগীত জগতের অন্দরমহলের অন্তরঙ্গ ছবি উপস্থাপন করেছেন যা কথাসাহিত্যের পাঠকের কাছে নতুন স্বাদ ও পাঠাভিজ্ঞতার আধার হয়ে আছে। তিনি সুদক্ষ শিল্পীর হাতে সেই ছবি এঁকেছেন যা একইসঙ্গে বিশ্বাসযোগ্যতায় ও শৈল্পিকতায় উত্তীর্ণ। সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনের অনেক মানুষেরই সেলিব্রেটি ভাবমূর্তি গড়ে ওঠে। সেটি তারা নিজেরাও উপভোগ করেন এবং তাদের অনেক ভক্ত অনুসারী বা ফ্যান তৈরি হয়। সংগীত জগতে এ ধরনের সম্পর্ক হয় গুরু শিষ্যের। গুরু শিষ্যের মধ্যে রোমান্টিক প্রেমের অথবা শারীরিক মিলনের সম্পর্ক হওয়া অনুচিত বলে প্রচলিত বিশ্বাস ও অলিখিত নিয়ম রয়েছে। কিন্তু অনেক সময় রক্তমাংসের মানুষ প্রচলিত নিয়ম বা প্রথার বৃত্তে সীমায়িত থাকতে পারেন না। সীমায়িত থাকতে গেলে মারাত্মক অন্তর্দ্বন্দ্ব হৃদয়ের রক্তক্ষরণ ঘটায়। ফরিদা হোসেন তাঁর “অব্যক্ত প্রেম” এবং “পরাজয়” নামক গল্পদুটিতে সংগীত গুরু এবং শিষ্য তরুণীদের মধ্যকার “অসম ও অনুচিত প্রেম” এবং উভয়পক্ষের হৃদয়মনে ক্ষতবিক্ষত হওয়ার অনুপমসুন্দর চিত্র এঁকেছেন। গল্পে কোনো আতিশয্য বা অবাস্তব উল্লফন, শুচিবায়ুগ্রস্ততা কিংবা রগরগে রিরংসা স্থান পায়নি। কিন্তু নরনারীর মনো-দৈহিক চাহিদা তথা আকুল প্রেমাকাঙ্ক্ষার জীবন্ত শাব্দিক ছবি যথাযথ প্রাণবন্ততায় অঙ্কিত হয়েছে। যৌনবাসনা এবং সুরুচি সোনার বাঁধনে এক অদ্ভুত ধরনের মেলবন্ধন রচনা করেছে। গল্পকার হিসেবে তাঁর অনন্য কৃতিত্ব এই যে তিনি গল্পদুটিতে আগাগোড়া সম্মোহন রচনা করেছেন যা পাঠককে টেনে নিয়ে যায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। গল্পগুলো গল্প বলেছে তবে তার ভাষা আধুনিক কবিতার যেখানে প্রকাশ ও আড়াল, ইশারা ও অন্ধকার, আবেগ ও উত্তেজনা, ঘটনা ও কল্পনা একই অঙ্গে সোনায় সোহাগার সৌকর্যে অঙ্গীভূত হয়েছে। “পরাজয়” নামের গল্পটি থেকে একটা অংশ তুলে দিচ্ছি যা পাঠে সহজেই বোধগম্য হতে পারে গল্পের প্লট বা ধরন অনুসারে আখ্যান নির্মাণ এবং চিত্রকল্পময় ভাষা ব্যবহারের ফরিদা হোসেনের দক্ষতার স্তর।
“সাঈফ খান সাধনালব্ধ ঐশ্বর্যের সবটুকুই তো উজাড় করে দান করেছিলেন রুমানা নামের মেয়েটিকে। চট্টগ্রাম বানিয়া টিলার একটি সাধারণ ঘরে বসে তিনি রচেছেন মায়াবী সুরের ইন্দ্রজাল।
আর সেই সুরের হলাহল আকণ্ঠ পান করে নেশায় বুঁদ হয়ে গিয়েছিল এক কুমারী হৃদয়। কতদিন কত অসতর্ক মুহূর্তে তরঙ্গায়িত সুরের সাথে সাথে উত্তাল ঢেউ জেগেছে সাঈফ খানের সমাহিত বুকে । চোখে জ্বলেছে দীপকের আগুন। আবার সে আগুন ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে গিয়েছে মালহারের আলাপে। বাহারের রাগে কত বা হৃদয়ের অব্যক্ত ব্যাকুলতা প্রকাশ করেছেন তিনি। অক্লান্ত কেঁদেছেন বেহাগের সুরে।
কিন্তু সেই কান্নায়, অশ্রু, সেই অনুভূতি দহনের জ্বালা, কোনোদিনও বুঝতে পারেনি রুমা। বিভোর নেশায় বুঁদ হয়ে ছিল রাগ জগতের নীলাভ মায়ায়।”
গল্পটির নামকরণ গভীরভাবে কাব্যময়। গল্পের নায়ক ওস্তাদ প্রৌঢ় সাঈফ খান, গল্পের নায়িকা গায়নশিল্পী তরুণী রুমানা উভয়ের মধ্যকার শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, সাঈফ খানের প্রেমকামনা, বিভিন্ন মঞ্চে গান গেয়ে ঝড় তোলা রুমানার অডিশনের মাঝপথে সহসা থেমে যাওয়া ফলে ব্যর্থ হওয়া, রুমানার শিল্পী করে তোলার জন্য ওস্তাদ সাঈফ খানের অক্লান্ত পরিশ্রম— এতগুলো দিকের কোনটির পরাজয় ঘটেছে, গল্পে তা বলা হয়নি। কোনো ইঙ্গিতও দেওয়া হয়নি। গল্পকার কোনো পক্ষ নেননি। সংগীতের শিক্ষক-ছাত্রী সম্পর্ক একদিকে, অন্যদিকে ছাত্রীকে ঘিরে শিক্ষকের একতরফা অব্যক্ত প্রেম– পাঠক কোন পক্ষ নেবেন? প্রেম তো বয়স, ধর্ম, জাত, বর্ণ, পেশা, সম্বন্ধ কোনোকিছুরই ব্যবধান শিকার করে না। গল্পকার অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে শুধু অবস্থা ও ঘটনার ছবি এঁকেছেন, কোনো পক্ষ নেননি, — কোনো সিদ্ধান্তসূচক উপসংহার রচনা করেননি। এটি গল্পরচয়িতা ফরিদা হোসেনের শৈল্পিক দক্ষতা ও আধুনিক মানসিকতার উজ্জ্বল প্রমাণক। গল্পের নায়ক প্রৌঢ় ওস্তাদ সাঈফ খান একটি অনন্য চরিত্র। সংগীত সাধক ও সংগীত শিক্ষক হিসেবে ব্যাপকভাবে সফল, দৃঢ় গভীর ব্যক্তিত্ব, চারিত্রিক শক্তিমত্তায় সচ্ছল আবার একইসঙ্গে মানবিক কামনাবাসনায় একজন রক্তমাংসের মানুষ। পেশাগত মর্যাদা, বয়স আর হৃদয়গত প্রেমের ঢেউ এসবের টানাপোড়েনে ক্ষতবিক্ষত কিন্তু ঢলে পড়া নয়, ভেঙে পড়া নয়। নয় সাময়িক ব্যর্থতার কাছে নতি স্বীকার কিংবা হতাশায় মদের কাছে আত্মসমর্পণ।
ফরিদা হোসেন শহরের উচ্চবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের অন্দরমহলের নিবিড় কথাকার। শহর মানেই খারাপ, শহরের মানুষ মানেই আত্মকেন্দ্রিক, শহরের মানুষ মানেই হৃদয়হীন, শহরের মানুষ মানেই বৈষয়িকতার দাস –এসব প্রচলিত ও সস্তা জনপ্রিয় ধারণার স্রোতে ভেসে যাননি তিনি। আবার তিনি শহরকে সকল গৌরবের দাগশূন্য পীঠস্থান- এমনটাও প্রচার করেননি। কোনো পূর্বধারণা নিয়ে তিনি শহরজীবনকে দেখেননি। তিনি শহরকে দেখেছেন নিরপেক্ষ ও নির্মোহ দৃষ্টিতে। যেখানে যা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে তিনি তা গল্পের জমিনে ঠাঁই দিয়েছেন কোনো ব্যক্তিগত মতামত ব্যতিরেকে। তাঁর শহর সবখানি পূর্ণিমার জোছনায় ধৌতধবল স্বপ্নস্বর্গ নয় আবার তার সবখানি কৃষ্ণপক্ষের নিকষ কালো আঁধারে আচ্ছাদিত দৈত্যপুরীও নয়। বাস্তবে শহর হচ্ছে আ্ধুনিক শিক্ষা, চিকিৎসা, রাজনীতি, সাহিত্য, সংগীত, প্রকাশনা শিল্প প্রভৃতির উঠোন। শহরে আয়ের উৎস বেশি ও বহুবিধ তেমনি বেশি জীবন নির্বাহের ব্যয়। শহরের মানুষের জীবনে গতি বেশি এবং স্বস্তি কম। শহরে We Feelings খুবই দুর্বল এবং I Feelings এর প্রবল রাজত্ব। অর্থাৎ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের প্রভাব অনেক বেশি। নর-নারীর খোলামেলা মেলামেশা এবং অন্তরঙ্গ সম্পর্ক কোনো লুকোচুরি আচরণের অন্তর্ভুক্ত নয়। ফরিদা হোসেন দৃষ্টি থেকে অপ্রয়োজনীয় কাব্যিক রোমান্টিকতার কাজল মুছে ফেলে দিয়ে স্বাভাবিক চোখে শহরকে দেখেছেন তার আসল রূপে–ভালোতে-মন্দতে এবং ভালো-মন্দের মিশ্রণে। তাঁর “মানুষ”, “শাড়ি”, “আমাকে নিয়ে”, “হিমালয়ের দেশে”, “অনুশোচনা”, “নির্বাসন”, “বন্ধন”, “একটা শীতল মৃত্যু”, “মুখোশ” প্রভৃতি গল্পে নগরজীনের অন্দরমহল চিত্রিত হয়েছে তার আলো ও অন্ধকার নিয়ে। এসকল গল্পে শহরের উচ্চবিত্ত পুরুষের ভোগবাদী জীবন, জীবনসঙ্গিনীর প্রতি উপেক্ষা ও অবহেলা, দাম্পত্যজীবনের ফাঁক ও ফাঁকি, উচ্চশিক্ষিত তরুণীদের আত্মপ্রতিষ্ঠার ও আত্মমর্যাদার সংগ্রাম, কিছু সেলিব্রিটি নারীর পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও নিজ পারিবারিক আঙিনায় নারীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন, প্রতিষ্ঠিত মানুষদের কারো কারো দ্বিচারী আচরণ ইত্যাদি নির্মোহ ভাষায় ও ভঙ্গিতে এবং সংযমী ভাষায় ফুটে উঠেছে। “মুখোশ” গল্পটি শহরের একজন বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক কর্তৃক অত্যন্ত মেধাবী ও তেজস্বী ছাত্রীকে ভালোবেসে বিয়ে করা, পরিবারে হিংসুটে নিজবোনের কুপরামর্শে প্রেমিকা স্ত্রীর ওপর সীমাহীন মানসিক জুলুম চালানো, অনিবার্য বিচ্ছেদ এবং অত্যাচারী সেই নারীর একটি নারী বিষয়ক আয়োজনে অন্যতম বক্তার আসন গ্রহণ, অত্যাচারিত নারীর সাংবাদিক হয়ে ওঠা এবং সেই আয়োজনে উক্ত নারীর নারীর স্বাধীনতা ও মুক্তি বিষয়ক বক্তব্য প্রদান কালে চিৎকার করে বাধা দান এবং তার স্বরূপ উন্মোচন ইত্যাদি ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্য ও আকর্ষণ অক্ষুণ্ণ রেখে তুলে ধরা হয়েছে । নারীবাদী সংগঠনগুলোর অনেক নারীনেত্রীর মাঝেই সর্ষের মধ্যে ভূত থাকার মতো নারীবিরোধী পুরুষতান্ত্রিক ভূমিকা নারীজাতির সামগ্রিক মুক্তি আন্দোলন দুর্বল হয়ে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ। পণ্ডিত হুমায়ুন আজাদ তাঁর একটি লেখায় বলেছেন পুরুষের চেয়েও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার নারীরা নারীজাতির জন্য বেশি ক্ষতিকর। ফরিদা হোসেন নিবিড় পর্যবেক্ষণের দৃষ্টি ও সৎসাহস নিয়ে বিষয়টিকে ছোটগল্পে রূপ দিয়েছেন। শিল্পের সকল শর্ত মেনেও এই “মুখোশ” গল্পটি জীবনের জন্য শিল্প হয়ে উঠেছে। উপস্থাপনার নাটকীয় ভঙ্গি গল্পটিকে বাড়তি উপভোগ্যতা দান করেছে। আবার “হিমালয়ের দেশে” শীর্ষক গল্পে আরিফ নামক একজন মেধাবী ধনীর দুলাল লেখকের মহৎ মনের প্রেমিক-স্বামী হয়ে ওঠার ছবি শহরজীবনের আলোমাখা দিককে উদ্ভাসিত করেছে। শহরের ধনী দম্পতির দাম্পত্য জীবনের ফাঁক ও ফাঁকি, গোপন টানাপোড়েন, সন্তানের মা-রূপী নারীর বঞ্চনাভোগ, পিতামাতার অসচ্ছল সম্পর্কের কুপ্রভাব এবং এক পর্যায়ে একজন উচ্চশিক্ষিত কন্যার সাহসী ও যথাযথ ভূমিকায় পিতামাতার দাম্পত্য জীবনে সচ্ছল সুস্থতা ফিরে আসা ইত্যাদি বিষয়কে নিপুণ শৈল্পিকতায় গল্পে রূপান্তর করেছেন ফরিদা হোসেন। চমৎকার এই গল্পটির নাম “বন্ধন”। গল্পটিতে উচ্চবিত্ত পরিবারের পুরুষ কর্তার স্বভাব ও মনস্তত্ত্ব নিপুণভাবে চিত্রায়িত হয়েছে। গল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র বন্ধন। গল্পের একস্থানে গল্পকার বলেছেন:
“ছোটবেলা থেকেই দার্জিলিংয়ে বোর্ডিং স্কুল কলেজে পড়াশোনা করেছে বন্ধন। আর বুদ্ধি হবার পর থেকেই দেখছে একটু একটু করে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন মা। কিন্তু সেজন্য বাবাকে কখনো চিন্তিত বা দুঃখিত হতে দেখেনি বন্ধন। বাবা তারেক হায়দার উচ্চবিত্ত সমাজের একজন ব্যস্ত ব্যক্তিত্ব।
সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের কাজে তাঁকে ব্যস্ত থাকতে হয়। ব্যবসার খাতিরে বিভিন্ন ধরনের পুরুষ মহিলার সাথে মেলামেশা করতে হয় তাঁকে। সময় কোথায় অন্দরমহলের কোন কোণায় দুঃখ এবং ভালোবাসার ধূপ জ্বলতে জ্বলতে কখন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে তা জানার….?
ব্যবসা, জীবন এবং যৌবন সবই তারেক হায়দারের অনুগত দাস। এসবের যেমন খুশি ব্যবহার তাঁর নখদর্পণে।
অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে পরদিন মায়ের মুখোমুখি দাঁড়ালো বন্ধন। বলল–কেন তুমি এভাবে নিজেকে শাস্তি দিলে মা? কেন?”
গল্পটির নামকরণের মতো ব্যঞ্জনাঋদ্ধ তার উপসংহার যেখানে বন্ধন আর তার হবু স্বামী ইমরান রচনা করেছেন শুভবাদী চেতনায় উজ্জ্বল একটি আগামী। আধুনিকতা মানেই যে জীবনে নেতিবাচকতার জয় নয় এবং সাহিত্যে শুভবাদিতা মানেই যে অতীতের রোমান্টিকতা নয়, ফরিদা হোসেন তাঁর অনেক গল্পেই তা নান্দনিক সাফল্যে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং “বন্ধন” গল্পটিতে তা শিখরস্পর্শী হয়ে উঠেছে। এই গল্পে বন্ধন একজন অসাধারণ তেজস্বী উচ্চশিক্ষিত ও বুদ্ধিমতী নারী চরিত্র। তাঁর পিতা একজন ভোগবাদী সম্পদশালী পুরুষ আর মা একজন উচ্চশিক্ষিত সংস্কৃতিমনা সর্বংসহা নারী। বন্ধন এর হবু স্বামী ইমরান একজন ধৈর্যশীল গভীর অথচ মধুর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ব্যবসায়ী যুবক।
ফরিদা হোসেন তাঁর ছোটগল্পের ক্যানভাসে শহরবাসী মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতা৷, অবিশ্বস্ততা, পরকীয়া স্বভাব, যৌন ভোগবাদিতা, দ্বিচারিতা প্রভৃতির ছবি এঁকেছেন এবং সেসব মানুষ মূলত উচ্চবিত্ত পুরুষ মানুষ। কিন্তু তিনি কখনোই একচক্ষু হরিণ হয়ে ওঠেননি। তিনি নারীর প্রতি পুরুষের অন্যায় আচরণের ছবি তুলে ধরেছেন কিন্তু কোনোভাবেই এবং কখনোই পুরুষবিদ্বেষী হননি। তাঁর অনেক গল্পেই সুন্দর মনের সুন্দর আচরণের পুরুষের উপস্থিতি ঘটেছে। আবার তিনি এক নারীর প্রতি আরেক নারীর অন্যায় আচরণকে শানিত ভাষায় উপস্থাপনে দ্বিধাগ্রস্ত হননি। “মুখোশ” নামক গল্পে একজন নারীর পারিবারিক চৌহদ্দিতে অন্য একজন গুণবতী স্মার্ট নারীর বিরুদ্ধে তাঁর ননদের হিংস্র কুটিলতায় নিয়োজিত হওয়ার কথা তুলে ধরেছেন তেমনি “নির্বাসন” শীর্ষক গল্পে কামরান নামক পুরুষের মা এবং তার প্রেমিকা স্থানীয় দুজন নারীর পরকীয়া প্রেম ও চরম স্বার্থপর চরিত্রের ছবি এঁকেছেন।
ফরিদা হোসেন নিবিড়ভাবে মানুষের সম্পর্ক বিষয়ে সচেতন মানুষ। তিনি শহরের মানুষের দাম্পত্য, বন্ধুত্ব, পেশাগত, সাংস্কৃতিক চেতনাগত সম্পর্কগুলো সূক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করে সেই অভিজ্ঞান তাঁর গল্পের চরিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি ব্যক্তিজীবনে ও পারিবারিক জীবনে শহরের উঁচু তলার মানুষ হলেও নিজস্ব শ্রেণির মানুষকে নিয়ে তাঁর কোনো পক্ষপাত নেই। তিনি ঘটনা অথবা অর্জিত অভিজ্ঞানকে শিল্পের রূপ ও রং মিশিয়ে গল্পে উপস্থাপন করেছেন কিন্তু সেখানে কোনো ব্যক্তিগত বিদ্বেষ কিংবা পক্ষপাত প্রবেশ করতে পারেনি। তিনি মনেপ্রাণে প্রেমনিষ্ঠ মানুষ। তিনি সকল ক্ষেত্রেই নরনারীর প্রেমকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি শুভবাদী ভাবনার অগ্রসর মানুষ। প্রেম মানে দায়দায়িত্বহীন অবাধ যৌনাচার নয়, প্রেম মানে ক্ষণিকের শারীরিক ভোগমাত্র নয়, প্রেম হচ্ছে পারস্পরিক বিশ্বস্ততা, শ্রদ্ধা, দায়িত্ববানতা ও সুখে-দুঃখে নির্ভরযোগ্যতার সুরভিত সম্পর্ক এমন ছবি তাঁর গল্পে ফুটে উঠেছে। তবে তিনি প্রেম কাকে বলে অথবা কার নাম অপ্রেম এসব নিয়ে গল্পে কোনো ফতোয়া দেওয়ার চেষ্টা করেননি। নরনারীর এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীর ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও পছন্দ পদদলিত করে তাদের ওপর পারিবারিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া এবং গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ না করে লাফ দিয়ে কারও সঙ্গে জীবনের রাস্তায় নেমে পড়া, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব কাজ মানুষের জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনে। ফরিদা হোসেনের প্রেমপ্রধান বহু গল্পে এধরনের চিত্র নান্দনিক সৌকর্যে উদ্ভাসিত হয়ে আছে। আবার দুজনার প্রেমের বিয়েও অনেক সময় সুখী ও স্থায়ী বন্ধন রচনায় ব্যর্থ হয়। কারণ আবেগ, অনুরাগ, বিরাগ, সম্পত্তির লোভ, রিরংসা, মেজাজের বৈচিত্র্য ইত্যাদি নিয়ে মানুষ অনেক সময় একটা আনপ্রেডিক্টেবল প্রাণী। তার জন্য প্রেম-অপ্রেম কোনটাই পদার্থবিজ্ঞানের প্রমাণিত সূত্রের মতো কাজ করে না। মানুষের মনের নদী কখন যে কোন কূল ভাঙে আর কোন কূল গড়ে, তার কোথায় চর জাগে আর কোথায় রচিত হয় গহীন গাঙ, কখন আসে শীতের শীর্ণতা আর কখন আকস্মিক ঘূর্ণিঝড় এসে এলেমেলো করে দেয় তার জলস্রোতের ব্যাকরণ, আজ অবধি কোনো মনোবিজ্ঞানী অথবা চিকিৎসাবজ্ঞানী খুঁজে পাননি এসবের কোনো সিদ্ধান্তসূত্র। ফরিদা হোসেনের সৃষ্টিকর্মে শুভবাদী মানসিকতার হালকা ঘ্রাণ পাওয়া সম্ভব হলেও সেখানে মানবমনের পূর্বাভাসহীন বিচিত্রগামিতাই প্রাধান্য পেয়েছে। নরনারীর অন্তরঙ্গ সম্পর্ককে কোনো নির্দিষ্ট ধাঁচে ফেলে তার জয় বা পরাজয় দেখানোর মন নেই তাঁর কোনো গল্পের শরীরে। তাঁর “ঘূর্ণিঝড়” নামক প্রেমের গল্পে দুজন অবিবাহিত যুবক-যুবতির গভীর প্রেম ভেঙে গেছে পারিবারিক সিদ্ধান্তের ঝড়ে; আবার “বন্ধন” গল্পের নায়ক-নায়িকার সম্ভাবনাময় প্রেম জোয়ার নিয়ে এসেছে নায়িকার পিতামাতার তলে তলে স্রোতশূন্য হয়ে ওঠা দাম্পত্য সম্পর্কের পুরোনো নদীতে। আরেকটি প্রেমের গল্প “হিমালয়ের দেশে” যেখানে দুর্ঘটনায় আপনজনদের সবাইকে চিরতরে হারিয়ে দিশেহারা অসহায় গুণী তরুণী দীপার পাশে বিশ্বস্ত প্রেমিক ও আজীবন জীবনসঙ্গী হতে বাড়িয়েছেন ঢাকার বিখ্যাত লেখক ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান- আরিফ। তিনি নায়িকার দুলাভাইয়ের বন্ধু এবং বিদেশ ভ্রমণকালে নায়িকার সাথে পরিচিত হন। এই গল্পে একসঙ্গে দুটি প্রচলিত ধারণা ভেঙে গেছে। এক– ধনাঢ্য পরিবারের ছেলে মানেই ভোগবাদী যাদের কাছে প্রেম মানেই নারীর শরীর নিয়ে খেলা করা এবং একসময় পুরোনো কাগজের মতো ছুড়ে ফেলা; দুই– পুরুষ কবি-কথাসাহিত্যিকমাত্রই হচ্ছেন নারীর শরীর লোভী এবং বহুগামী। অথচ এধরনের কোনো পূরনির্ধারিত লক্ষ্য নিয়ে গল্পগুলো রচিত হয়নি। অধিকন্তু ঘটনার বাস্তবঘেঁষা রং, সৃষ্ট চরিত্রসমূহের বিশ্বাসযোগ্য অনন্যতা, উপস্থাপনার শৈল্পিক ঢং, বর্ণনার শরীরে সঞ্চারিত প্রাণ ও সম্মোহন এবং ইঙ্গিতময় সমাপ্তি এইসবকিছুর সংশ্লেষধর্মী সমাবেশ গুল্পগুলোকে শিল্পোত্তীর্ণ মহিমায় সমৃদ্ধ করেছে। “হিমালয়ের দেশে” আরিফ নামীয় লেখক চরিত্রটি সত্যিসত্যি একজন গুণী লেখকের ব্যক্তিত্বে, গাম্ভীর্যে ও আকর্ষণে উজ্জ্বল। অনুরূপভাবে নায়িকা দীপা আধুনিক স্মার্ট ও চটপটে উচ্চশিক্ষিত যুবতিদের যথোপযুক্ত প্রতিনিধি।
ফরিদা হোসেন প্রেমময় চোখে এবং প্রেমের চোখে জীবন ও পৃথিবীকে দেখতে চেয়েছেন, দেখেছেন। প্রকৃত প্রেম মানুষের জীবনকে ভরে তোলে মহত্বে ও গৌরবে। সেই জীবনেই ইহোলোকে স্বর্গসুখের ঘ্রাণ মেলে। প্রেমিকের দৃষ্টিতে একজন রোগাক্রান্ত প্রেমিকাও সবচেয়ে সুন্দর মানুষ এবং প্রেমিকার চোখে একজন সাধারণ জীবনের প্রেমিক পুরুষও অনন্যসাধারণ। প্রেম জীবনে বাড়তি উপভোগ্যতা যোগ করে যাকে বলা যেতে পারে ভ্যালু অ্যাডিশন (Value addition)। ফরিদা হোসেনের অধিকাংশ গল্পে প্রেম ভ্যালু সংযোজন করতে চেয়েছে নরনারীর জীবনে। যেখানেই প্রেমের ঘাটতি সেখানেই কলহ, দ্বন্দ্ব, ব্যর্থতা ও অসার্থকতা। তাঁর “ভালোবাসার আলো”, “একটি শীতল মৃত্যু”, “বাসর”, “বন্ধন”, “শেষ ভোর”, “আমাকে নিয়ে” প্রভৃতি গল্পে প্রেমের উপস্থিতি-অনুপস্থিতি জীবনকে সার্থকতায় ভরে তুলতে পারা না পারার ক্ষেত্রে নিয়ামক ফ্যাক্টর হয়ে থেকেছে। কোথাও সম্পর্কবদ্ধ দুজন নরনারীর মধ্যে একজনের অবিশ্বস্ততা এবং কোথাও একজনের প্রেমের সাধনে ফুল তুলতে ভুল করা শোচনীয় ব্যর্থতা ও হৃদয়িক যন্ত্রণা ডেকে এনেছে। গল্প রচয়িতা ফরিদা হোসেনের অনন্য কৃতিত্ব হচ্ছে তিনি শহরের সকল স্তরের মানুষের জীবনে প্রেমের উপস্থিতি এবং তার ঝড়ীয় প্রভাব লক্ষ করেছেন। পত্রিকার হকার একতরফা প্রেমে পড়েছেন তার পত্রিকার গ্রাহক স্মার্ট তরুণীর; ড্রাইভারের প্রেমে পড়েছেন ধনী পিতামাতার ভার্সিটি পড়ুয়া তেজস্বী কন্যার, ছোট বইয়ের দোকানের মালিক যুবক একতরফাভাবে ভালোবেসেছেন তার দোকানে বই কিনতে অভ্যস্ত উচ্চশিক্ষিত যুবতিকে, ট্রেনের যাত্রী যুবক প্রেমে পড়েছেন যাত্রী যুবতির। সব প্রেম ফলে ওঠেনি সাফল্যে; কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যর্থতা জয়ী হয়েছে; কিছু ক্ষেত্রে প্রেমে রচনা করেছে সাফল্যের সোনালি ভোর যদিও তা সারাদিনের রোদেলা আকাশের নিশ্চয়তা নয়।এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, “সহযাত্রী” নামক গল্পটি ফরিদা হোসেনের একটি অসাধারণ সুন্দর সৃষ্টি। ট্রেন যাত্রা থেকে বিয়ের অনুষ্ঠান এবং সেখানে জমে ওঠা প্রেমের ফলে ওঠা দুজন নরনারীর পরস্পরের অনুরক্ত জীবন যাত্রায়। ট্রেনের সহযাত্রী স্টেশনে নেমে সেখান থেকে খুঁজে নিয়েছে এবং খুঁজে পেয়েছে যৌথ জীবনের প্রেমের ট্রেন যা পৌঁছে যেতে চায় সুখের সংসার নামক শাশ্বত স্টেশনে। গল্পের নায়িকা মিলা এবং নায়ক জাভেদ দুটি চরিত্রই সুচিন্তিত ও সুনির্মিত। গল্পটির অন্যতম ঐশ্বর্য হচ্ছে ট্রেন ভ্রমণের মতো টুকিটাকি ঘটনার ঘনঘটা এবং গল্পের ভাষার জাদুময় গতিশীলতা। ট্রেন ভ্রমণ এবং বিয়েবাড়ির অনুষ্ঠান উভয় দৃশ্যাবলি আঁকার ক্ষেত্রে কথাকার নিশ্ছিদ্র নিপুণতার ছাপ রেখেছেন যা গল্পটিকে যুগপৎ সম্মোহনে ও বিশ্বাসযোগ্যতায় ভরে তুলেছে। প্রেমময় গল্পটির ভাষায় আবেগ আছে কিন্তু আবেগের আতিশয্য নেই। গল্পটি শুরু হয়েছে ট্রেনের কামরায় ওঠার দৃশ্য দিয়ে এবং শেষ হয়েছে দুটি নরনারীর যৌথজীবনের পথের শুরুতে পা বাড়ানো বর্ণনায়। সার্থকতায় ভরে উঠেছে গল্পের নামকরণও।
ফরিদা হোসেনের গল্পের প্লট নির্বাচন এবং গল্প উপস্থাপন দু-ই তাঁর জন্মগত মেধা ও পরিশ্রমী ভাবনার চিহ্ন বহন করে। তিনি অনেক সময় সমাজবিজ্ঞানীর মন এবং পাখি শিকারির দৃষ্টি নিয়ে সমাজকে দেখেছেন। অথবা বলা যায় তিনি গল্পের অভিনব ধরনের প্লট খুঁজতে নগরজীবনে অনালোকিত বা কম আলোকিত আনাচে-কানাচে সৃষ্টিশীলতার টর্চের আলো ফেলেছেন। প্রচলিত ধারণার বিপরীতে তিনি গাড়িচালক কিংবা কাজের মেয়ের মাঝে সন্ধান পেয়েছেন মহৎ মানুষের। আবার শিক্ষকতার মতো যুগনন্দিত পেশার মানুষের মধ্যে দেখেছেন ছাত্রীকে ঘিরে রচনা করা হীন লাম্পট্য। কোনো পেশাই নিজে থেকে ব্যতিক্রমহীনভাবে মহান বা অমহান নয়, বরং তা নির্ভর করে পেশাকে ধারণকারী মানুষের নৈতিকতার স্তর এবং অন্যদের উদারভাবে ভালোবাসতে পারা না পারার সামর্থ্যের ওপর। ফরিদা হোসেন জীবনদার্শনিকের মেধায় ও প্রজ্ঞায় বিষয়টিকে তুলে ধরেছেন নানা রঙের ঘটনা এনে গল্পে। তাঁর “একজন কাজলির কথা”, “একজন দুখাই এর গল্প”, “শাড়ি”, “মানুষ” প্রভৃতি গল্প যুগপৎ জীবনের নানা অনালোকিত অলিগলি এবং গল্প রচনার প্রাতিস্বিক শৈলীকে ধারণ করেছে নান্দনিক উপভোগ্যতার ঐশ্বর্যে। “একজন কাজলির কথা” গল্পটিতে পিতার অসংবেদনশীল নির্মম আচরণ, স্কুল শিক্ষকের লাম্পট্য, বাড়ির ধনী মালিকের চরিত্রহীনতা ও লাম্পট্য এবং তাদের বিপরীতে কাজলি নামক কিশোরীর প্রতি তার দাদির গভীর ভালোবাসা এবং একজন কাজের মহিলার মাতৃসম দরদি মন উপস্থাপিত হয়েছে। গল্পটি শহুরে সমাজের একটি অংশের বিবেকহীন লোভ ও ভোগলিপ্সার শৈল্পিক দলিল। “মানুষ” গল্পটি গল্পকারের একটি অনুপম সৃষ্টি। এই গল্পে ইয়ার খান নামক গৌরবর্ণের ছয় ফুট লম্বা একজন গরিব ড্রাইভারের সুঠাম দেহসৌষ্ঠব, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, মহৎ মন, সংযমে সমৃদ্ধ চরিত্র এবং অনিবার্যভাবে গাড়ির মালিক ধনীর দুলালী সোমার গোপনে আকৃষ্ট হওয়ার চিত্র রোমান্টিকতার শারীরিক ছোঁয়ামাখা আলো-আঁধারির ভাষায় উপস্থাপন করা হয়েছে। মীমাংসাহীন উপসংহার গল্পটিকে অনিঃশেষতার ঐশ্বর্য দান করেছে।
বাংলা গল্পভুবনে সম্ভবত একটা নতুন মাত্রা সংযোজন ফরিদা হোসেনের “শাড়ি” নামীয় ছোটগল্পটি। রাজধানীর একটি শাড়ির দোকানের অবিবাহিত তরুণ সেলসম্যান রাজু একতরফাভাবে প্রেমে পড়েন মিলি নামক অবিবাহিত একজন স্মার্ট সুন্দরী যুবতির। মিলি তা বুঝতে পারেন না। কারণ সেটা তার অনুমানও অনুমোদন করে না কিংবা কল্পনাও সে পথে যায় না। মিলি প্রায়শ সেই দোকান থেকে শাড়ি কিনেন আর রাজু বাড়তি উৎসাহে সুন্দর সুন্দর শাড়ি প্রদর্শন করে আনন্দ পান। বছর দুয়েক পর মিলির বিয়ে হয়ে যায়। অতঃপর অল্প কয়েক বছর যেতে না যেতেই অসুখে মারা যান মিলির স্বামী। তিনি সাদা থান পরে আসেন সেই দোকানে। রাজু বুঝতে পারে মিলির স্বামী মারা গেছেন। রাজু তাকে সাদা থান না দিয়ে অন্য দোকানে যেতে বলেন। মিলি চলে যান। অবাক হউন রাজুর চোখের দিকে তাকিয়ে। রাজুর মনে বেজে ওঠে ঝাঁঝর কাঁসর। লেখক খোলসা করে কিছু বলেননি। তবে এই বাজনা হয়তো রাজুর মনে মিলিকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়ার সুখকল্পনার প্রতীক হিসেবে বাজিয়ে দিয়েছেন গল্পকার ফরিদা হোসেন। ঘটনাবিন্যাস, উপস্থাপনার নাটকীয়তা, শাড়ির দোকানে কেনাবেচার দৃশ্য, মিলি ও সেলসম্যান রাজুর মিথস্ক্রিয়া এবং সর্বোপরি কাব্যিক ইঙ্গিতময় উপসংহার এইসবকিছু মিলেমিশে গল্পটিকে উপভোগ্যতায় ও সৃষ্টিশীল শৈল্পিকতায় উত্তীর্ণ করেছে।
ফরিদা হোসেনের গল্পপাঠের সময় ভালোভাবেই বোঝা যায়, সেসব বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের জীবন ও সংস্কৃতির উপকরণ নিয়ে রচিত। তাঁর গল্পের চরিত্রগুলোর অনেকেই উদার ধার্মিক এবং একইসঙ্গে আবহমান বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। ধর্ম ও স্থানীয় সংস্কৃতির মাঝে কোনো বিরোধ নেই তাঁর গল্পে। উপস্থাপিত মানুষগুলোর কেউ কেউ গ্রন্থ রচনা করেন, গান করেন, অভিনয় করেন, আবৃত্তি করেন আবার নামাজের সময় হলে নামাজ আদায় করেন। তাঁর গল্পের চরিত্রগুলো দোষেগুণে মাটির মানুষ কিন্তু কেউই চরমপন্থার অনুসারী নন। ব্যক্তিগত জীবনে শহরের উঁচুতলার মানুষ হিসেবে ফরিদা হোসেনের একই শ্রেণির মানুষ সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ও আগ্রহ দু-ই বেশি। কিন্তু তাঁর লেখক দৃষ্টি সেখানেই সীমায়িত হয়ে থাকেনি।তিনি শহরের এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে শহরের বাইরের মানুষের জীবনচিত্র ধারণ করেছেন তাঁর গল্পে। তাঁর “একজন দুখাই এর গল্প “তেমনি একটি সাহিত্যকর্ম। তিনি কিছু ব্যতিক্রমধর্মী জীবনকে গল্পে উপস্থাপন করেছেন। যক্ষারোগে আক্রান্ত স্যানিটোরিয়ামবাসী মানুষদের সুখ-দুঃখকে বিষয় করে রচেছেন হৃদয়ে আলোড়ন জাগাানিয়া “অবগাহন” নামক গল্প; তেমনি একজন প্রায় অপ্রকৃতিস্থ মানুষের সঙ্গে একটি গরিব অসহায় যুবতিকে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে বিয়ে দেওয়া এবং তাদের ব্যর্থ বাসর রাত যাপন নিয়ে লিখেছেন মন খারাপ করে দেওয়ার গল্প “বাসর” যেখানে লুনা নামক তরুণীটি মানবিক কারণে সেই অপ্রকৃতিস্থ মানুষটিকে নিয়েই সংসার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন । তাঁর আরেকটি অদ্ভুতসুন্দর গল্প হচ্ছে“ ঘুম”। তাঁর গল্পের আরেকটি দিক হচ্ছে তিনি দেশে এবং ভিনদেশে স্থায়ীভাবে অথবা সাময়িক ভিত্তিতে বসবাসকারী মানুষদের নিয়ে গল্প রচেছেন। তাঁর গল্পের ভূগোল কখনো ঢাকা, কখনো লন্ডন, কখনো কলকাতা, কখনো নেপাল, কখনো-বা অন্য কোনো দেশের কোনো শহর। সেকারণে তাঁর গল্পে দেশের মাটির সোঁদাগন্ধের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ভূগোলের ঘ্রাণ পাওয়া যায়। এটি পাঠকদের বাড়তি পাওয়া। ফরিদা হোসেনের গল্পের প্রায় সকল চরিত্র শহরবাসী অথবা শহরে অবস্থানকারী মানুষ। স্বভাবতই ঘটনার ভূগোলও শহর অথবা শহর সংশ্লিষ্ট কোনো দূরবর্তী স্থান কিংবা ভ্রমণ কেন্দ্র। এই শহুরে মন নিয়ে তিনি পুরোপুরি প্রকৃতিপ্রেমিক। তাঁর গল্পে প্রকৃতির দানে সচ্ছল গ্রাম আসেনি কিন্তু সকল প্রকার আবাসন ও গগনচুম্বী অট্টালিকা উপর দিয়ে চলে এসেছে শ্রাবণের ঝরঝর বৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়ের ছিটা, সমুদ্র সৈকতের প্রাণদায়ী হাওয়া, বোশের খরতাপের ঝাঁঝ এবং গায়ক পাখির কণ্ঠের তুলনা। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বর্ষার দৃশ্য এসে তুলনা, প্রতিতুলনা অথবা আবহসংগীতের ব্যঞ্জনা রচেছে তাঁর গল্পে। মাঝে মাঝে মনে হয় ফরিদা হোসেন বাংলার বর্ষা দ্বারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো প্রভাবিত ও প্ররোচিত হয়েছেন। আসলে ঢাকার মতো জনবহুল শহরে মূলত বর্ষা এবং গ্রীষ্ম এই দুটি ঋতুর উপস্থিতি প্রবলভাবে জানান দিতে পারে। ফরিদা হোসেনের শহরকেন্দ্রিক ছোটগল্পে প্রকৃতির জুতসই উপস্থিতি অথবা ব্যবহার তাঁর কথাসাহিত্যকে নাগরিক কংক্রিটময়তায় কিংবা নীরস ঘটনাসর্বস্বতায় পর্যবসিত হতে দেয়নি। বরং সেসব হয়ে উঠেছে প্রাণবন্ত সৃষ্টি যা যুগপৎ সাহিত্যপ্রেমী নগরবাসী ও গ্রামীণ মানুষের উপভোগ্যতায় উত্তীর্ণ। তিনি মূলত গল্পের কোনো পর্যায়ে কোনো চরিত্রের মানসিক প্রতিক্রিয়া অথবা ঘটনার মানসিক অভিঘাতের ধরন সম্পর্কে ইঙ্গিত দিতে প্রকৃতির অনুষঙ্গ ব্যবহার করেছেন তবে তা লেখকের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সফল সহায়তা দিয়েও পাঠকভেদে উপভোগ্য বাড়তি ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছে।
ফরিদা হোসেন দৃষ্ট ও সৃষ্ট নগরমানসিকতা স্বয়ংক্রিয় সাবলীলতার ফসল। তিনি কোনো বিশেষ ব্যক্তি কিংবা কোনো বিশেষ পেশার মানুষ অথবা বিশেষ ঘরনার লোকজনকে মহিমান্বিত অথবা মসিলিপ্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে কোনো চরিত্র সৃষ্টি করেননি। তাঁর গল্পে লেখকের কোনো পূর্বসংস্কার (Prejudices/ Stereotypes) দেখা যায় না। ঘটনাপ্রবাহের অ্যাক্টর, পার্শ্বচরিত্র, ভিক্টিম অথবা সাক্ষী হিসেবে গড়ে উঠেছে চরিত্রগুলো। তাদের ব্যক্তিত্ব ও ঘটনা সংশ্লিষ্টতায় মানসিক প্রতিক্রিয়া থেকে চরিত্রগুলোর মনস্তত্ত্ব চিহ্নিত ও তার খসড়া রূপরেখা অঙ্কন করা সম্ভব। তিনি ব্যক্তির অন্তর্দ্বন্দ্ব ও অন্তর্দহনের নিবিড় ছবি এঁকেছেন যা চরিত্রসমূহের ব্যক্তিত্বের ধরন, নৈতিক অবস্থান ও মানসিক ডেভেলপমেন্টকে চিনিয়ে দিতে সহায়তা করে। “পরাজয়” গল্পের ওস্তাদ সাইফ খান একটা অদ্ভুত সুন্দর চরিত্র। গভীরভাবে সংস্কৃতিমনা, শিষ্যদের সাফল্যে উত্তীর্ণ করতে শতভাগ নিবেদিতপ্রাণ, সংযমী অথচ রুমানা নামীয় তুখোড় তরুণী শিষ্যের প্রতি মানসিকভাবে সম্মোহিত। তিনি মনকে আটকাতে না পারলেও নিজেকে আটকিয়েছেন সংযমের বেড়ায়। তিনি মহৎ সৃষ্টিশীল শক্তি ও সংবেদনশীল হদয়ের দোলাচলে ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন। সাইফ খানকে মহৎ বা অমহৎ চরিত্র – কোনোটাই বলা নিরাপদ নয়। কিন্তু “চরিত্র বদল” গল্পের নায়িকা নিমা একটি ব্যতিক্রমধর্মী মহৎ চরিত্র, একথা জোর দিয়েই বলা সম্ভব। আবার “একজন কাজলির কথা” গল্পের বহুমুখী অন্যায়ের শিকার মাতৃহীনা কিশোরী কাজলির জন্মদাতা পিতা রকিব উদ্দিন একটি বিদঘুটে চরিত্র যাকে এক অর্থে একজন অধম মানুষ বলেও চিহ্নিত করা যায়। তিনি পিতা হিসেবে ক্ষমাহীন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু বারবার নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার কাজলি এক অসাধারণ শক্তিমান কিশোরী যে নিজে মরে তার ধর্ষণকারী গৃহমালিককে যমালয়ে পাঠিয়ে ছেড়েছেন। “শুভাশীষ” গল্পের নায়ক হাসিব একটি অদ্ভুত চরিত্র। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তুখোড় মানবতাবাদী ছাত্রনেতা। প্রেমিক। প্রেম করে বিয়ে করেন আরেক মানবতাবাদী সংস্কৃতিমিনা তুখোড় ছাত্রীনেত্রী রিফাতকে। মুক্তিযুদ্ধ শেষ করে স্বাধীন দেশে প্রত্যাবর্তন। কিন্তু ফিরে এসে নিজের ঔরসজাত কন্যাসহ প্রিয়তম স্ত্রী রিফাতকে গ্রহণে ব্যর্থতার পরিচয় দেন। স্ত্রী যুদ্ধের সময় একবার ধর্ষিত হয়েছিলেন এটা তো স্ত্রীর কোনো অপরাধ বা অযোগ্যতা নয়। সংগ্রামে যুদ্ধে প্রেমে পিতৃত্ব অর্জনে সোনালি সাফল্যের অধিকারী উজ্জ্বলতম নায়ক পারিবারিক উঠোনে খলনায়ক হয়ে উঠেছেন। অনেক মানুষের জীবনে একাধিক বার বিয়ে হয়। তাহলে ইচ্ছার বিরুদ্ধে একবার ধর্ষণের শিকার হওয়া নিজের সন্তানের মা- প্রেম করে বিয়ে করা সংগ্রামী স্ত্রীকে এবং কন্যাকে গ্রহণে বাধা কোথায়? নেলসন ম্যান্ডেলা ২৭ বছর রবিন দ্বীপে নির্বাসিত ছিলেন। তাঁর দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে দল ও সংগ্রামের নেতত্ব দেন তাঁরই সংগ্রামী স্ত্রী উইনি ম্যান্ডেলা। অথচ বিজয়ের পর জেল থেকে মুক্ত হয়ে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তিনি সেই উইনি ম্যান্ডেলাকে পরিত্যাগ করে আরেক নারীকে বিয়ে করে ফার্স্ট লেডি বানান। এটা ম্যান্ডেলার ক্ষমাহীন ব্যর্থতা ও হীনম্মন্যতা যা তাঁর অন্যান্য অর্জনকে ম্লান করে দেয়। বিশ্ববিখ্যাত সেতার বাদক পণ্ডিত রবিশঙ্করের জীবনেও এমন ক্ষমাহীন ব্যর্থতা ব্য আছে। এটা একসঙ্গে পুরুষতান্ত্রিক পশ্চাৎপদতা, অন্যদিকে ব্যক্তিত্বের দূর্বলতা এবং কখনো কখনো চারিত্রিক শৈথিল্যের প্রমাণক। হাসিব চরিত্রটি পুরুষজাতির জন্য লজ্জাজনক দৃষ্টান্ত এবং যুগপুরাতন হীন মানসিকতা পরিবর্তন করার তাগিদ। ফরিদা হোসেনের “মুখোশ” গল্পটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন তুখোড় তরুণ অধ্যাপক রিয়াজ যে অত্যন্ত সফল শিক্ষকতায় ও প্রেমে কিন্তু সংসারজীবনে বোনের কুটিলতা ধরতে এবং নিজের মেধাবী স্মার্ট সুন্দরী ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন স্ত্রীর মর্যাদা দিতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। অধ্যাপক রিয়াজ চরিত্রটির মধ্যে সমাজের উঁচুতলার অনেক প্রতিষ্ঠিত পুরুষই নিজের ছবি দেখতে পাবেন। গল্পের সাবরিনা নামক নারী চরিত্রটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মেধা, ব্যক্তিত্ব, হার না মানা সংগ্রাম ও তেজস্বিতার এক অনুপম উদাহরণ। ফরিদা হোসেন সৃষ্ট চরিত্রগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এসবের বাস্তবঘেঁষা বিশ্বাসযোগ্য রূপ। চরিত্রগুলো আরোপিত নয়; তারা নয় লেখকের কষ্টকল্পনার উদ্ভট ফসল। সাধারণ বেশে অসাধারণ এমন চরিত্র নির্মাণে তিনি ঈর্ষণীয় সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন।
গল্পরচনার ক্ষেত্রে ফরিদা হোসেনের একটা সীমাবদ্ধতা চোখে পড়ে। তিনি তাঁর প্রায় সব গল্পেই কথোপকথন ব্যবহার করে লিখেছেন। অন্যদিকে তাঁর প্রায় সকল চরিত্র শহুরে উচ্চশিক্ষিত। ফলে কথোপকথনে একধরনের সমরূপিতা ঘটতে চেয়েছে। এতে করে একধরনের পুনরাবৃত্তি দোষ অথবা প্রকরণবৈচিত্র্যের অভাব কখনো কখনো পীড়া দিতে চায়। তিনি কিছু গল্প শুধু লেখকের জবানে গদ্যধর্মী ভাষায় রচনা করলে শৈলীবিচিত্রার ক্ষেত্রে বাড়তি সমৃদ্ধি নিশ্চিত হতো। হয়তো-বা অধিকাংশ গল্পের প্লট প্যত্যক্ষ অভিজ্ঞান থেকে নেয়া বলে এমনটি ঘটেছে। আরেকটি কারণ হতে পারে, গ্রামীণ পটভূমি নিয়ে রচিত গল্পের অনুপস্থিতি। কথোপকথন গল্পগুলিকে সিনেমাটিক উপভোগ্যতা দান করেছে, অন্যদিকে গল্পে জটিলতা ও ঘোরপ্যাচ পছন্দ করেন এমন পাঠকদের জন্য ভালো লাগার অবকাশ কমে গেছে। তবে একথাও সত্য যে, ব্যবহৃত কথোপকথন গল্পগুলোর চরিত্রসমূহের মনস্তত্ত্ব নির্মাণে ও বুঝতে অনেকবেশি সহায়ক হয়েছে।
ফরিদা হোসেনের গল্পপাঠের সময় ভালোভাবেই বোঝা যায়, সেসব বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের জীবন ও সংস্কৃতির উপকরণ নিয়ে রচিত। তাঁর গল্পের চরিত্রগুলো মূলত বাংলাদেশি মুসলমান; তাদের অনেকেই উদার ধার্মিক এবং একইসঙ্গে আবহমান বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। ধর্ম ও স্থানীয় সংস্কৃতির মাঝে কোনো বিরোধ নেই তাঁর গল্পে। তাদের কেউ কেউ গ্রন্থ রচনা করে, গান করে, অভিনয় করে, আবৃত্তি করে আবার নামাজের সময় হলে নামাজ আদায় করে। শুক্রবারে মসজিদে যায়, ঈদগাহে যায় ঈদ উৎসবের দিন। এসকল শহরবাসী মানুষদের কারো বাপদাদা ১৯৪৭ এর আগে কর্মসূত্রে কলকাতায় থাকতেন; কারো কারো বাপদাদা উচ্চশিক্ষিত আইনজীবী, চাকরিজীবী কিংবা জোতদার গোছের মানুষ ছিলেন। কেউ কেউ উচ্চশিক্ষা লাভ করে প্রথম প্রজন্মের নগরবাসী, কেউ রোগের চিকিৎসা নিতে এসে হাসপাতালবাসী; আবার কেউ জীবিকা উপার্জনের জন্য গ্রাম থেকে শহরে এসেছেন চাকরি ছাড়াও ছোটখাটো নানা পেশায়– তাদের কেউ কারো গৃহে কাজের লোক, কেউ শিক্ষার্থী, কেউ পত্রিকার হকার, কেউ দোকানের সেলসম্যান, কেউ গাড়িচালক কেউবা হোটেলবয়। স্বভাবতই সবার পক্ষে শহরের উচ্চবিত্ত জীবনের স্বাদ গ্রহণ সম্ভব হয় না তবে শহরের সংস্কৃতির সঙ্গে কমবেশি পরিচিতি ও অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। তারা এটা বোঝেন যে শহরই হচ্ছে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও আধুনিক জীবনের সুযোগ-সুবিধার কেন্দ্র। তাদের সবারই নাগরিক জীবনবোধের সঙ্গে কমবেশি যোগ আছে কিন্তু সবাই সেই সুযোগ সুবিধার অংশীদার নন। বৃটিশ আমলে পূর্ববঙ্গ পরে পূর্ব পাকিস্তান এবং অতঃপর বাংলাদেশ নামক ভূগোলে একটি কৃষিপ্রধান গ্রামীণ সংস্কৃতি নিয়ে অগ্রসর হতে হতে স্থানে স্থানে জোরদার উঠেছে নগর সংস্কৃতি। আবাসনের, পেশার নগরায়ন, অভ্যাসের নগরায়ন, ভাবনার নগরায়ন এবং এভাবে সংস্কৃতির নগরায়ন— এই ধারাবাহিক বিবর্তনের বর্ণনা রচনার কাজটি সমাজবিজ্ঞানীর। তবে ফরিদা হোসেনের কথাসাহিত্যে এই বিবর্তনের নানা সময়ের খণ্ড খণ্ড ছবি ফুটে উঠেছে। তিনি সচেতন পরিকল্পনায় এটি করেননি। তিনি বিবর্তনের ধারায় বেড়ে ওঠা একজন সংবেদনশীল মানুষ এবং অনুসন্ধিৎসু কথাসাহিত্যিক বলে অনেকটা স্বয়ংক্রিয় স্বাভাবিকতায় তাঁর সেই অভিজ্ঞান ছাপ ফেলেছে তাঁর গল্পের সময়, ভূগোল, চরিত্র, ঘটনা ও ভাবনার গায়ে। তাঁর গল্পের ভূগোলে বাংলাদেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহরের পাশাপাশি এসেছে কলকাতা-লন্ডনসহ আরও অনেক বিদেশি শহর। তবে তাঁর ভাবনার কেন্দ্র হয়ে থেকেছে রাজধানী ঢাকা এবং বাকি শহরগুলো ছুয়ে আছে ব্যাস, ব্যাসার্ধ এবং সোনালি পরিধি। পরিধি থেকে উঠে এসে কেন্দ্রে মিশেছে নানাবিধ সৌরভ এবং কেন্দ্র থেকে বিচ্ছুরিত আলো পৌঁছে গেছে পরিধির ভূগোলে।
ফরিদা হোসেনের গল্প পাঠে স্পষ্টতায় বোঝা যায় আবহমান গ্রামীণ সংস্কৃতির ভিত্তি নিয়ে দিনদিন তার উপরে একটু একটু করে গড়ে উঠেছে নগরসংস্কৃতির বহুস্তরিক সৌধ। অনেক দেশের শহরায়নের ক্ষেত্রেই এমনটা সত্য। ক্যামেরা হাতে কালের মোড়ে বসে থেকে সেই ক্রম-অগ্রসরমান বিনির্মাণের ভিডিও রেকর্ড করেনি কেউ। সেটা মানবীয় সাধ্যের বাইরের বিষয়। ফরিদা হোসেন স্বীয় সৃষ্টিশীলতার ক্যামেরা নিয়ে মাঝে মাঝে তুলেছেন শাহরিক বিবর্তনের কিছু স্টীল ছবি। অতঃপর সেগুলোকে সামনে নিয়ে এঁকেছেন নতুন ছবি। সেই সৌধের বহিঃসৌন্দর্য নয়, বাস্তবের তুলি ও কল্পনার রং দিয়ে তার অন্দরমহলের চিত্র এঁকেছেন তিনি যোগ করে নিজের শিল্পীমনের ভাবনা ও ভালোবাসা। ফরিদা হোসেনের ছোটগল্পগুলো সাহিত্যরস পিপাসুদের জন্য অনন্য পানীয়ের আধার, সমাজবিজ্ঞানীগণ পেতে পারেন তাদের গবেষণার জন্য আবশ্যকীয় নানাবিধ উপাদান ও উপকরণ।
–০–
আমিনুল ইসলাম
কবি ও প্রাবন্ধিক








কথাসাহিত্যিক ফরিদা হোসেন এর গল্পজগতকে ঘিরে লেখা এই প্রবন্ধটি সত্যিই মনোযোগ দিয়ে পড়ার মতো। লেখক আমিনুল ইসলাম শুধু গল্পের আলোচনা করেননি, বরং নগরজীবনের ভেতরের সম্পর্ক, সংকট, প্রেম, একাকিত্ব আর মানুষের মনস্তত্ত্বকে খুব সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। বিশেষ করে ফরিদা হোসেনের গল্পে নারীর অবস্থান ও শহুরে জীবনের অন্দরমহল নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণগুলো বেশ গভীর ও ভাবনার খোরাক জোগায়। প্রবন্ধটি কিছুটা দীর্ঘ হলেও এর পাঠগভীরতা ও আন্তরিকতা সহজেই পাঠককে ধরে