মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত
ইতিহাসের মোড় ও ভুল ঠিকানার সাতকাহন:
ইতিহাস স্রেফ কোনো সরলরৈখিক দিনপঞ্জি না। এইটা হইল ক্ষোভ আর বেইজ্জতির জমাট বাঁধা বারুদ। আমাদের এই বদ্বীপে ১৯৪৭ এবং ১৯৭১—কোনোটাই আমাগো আসল মঞ্জিল আছিল না। পিনাকী ভট্টাচার্য তার এই অসামান্য ইতিহাসবীক্ষায় অত্যন্ত সাহসের সাথে দেখাইছেন যে, এই দুইটা এপিসোড আছিল স্রেফ একটা ভুলের থেইকা আরেকটা ভুলের চক্কর। ১৯৪৭ এ আমাগো খোয়াব দেখানো হইছিল মদিনা সনদের ইনসাফ, কিন্তু কপালে জুটল করাচির আশরাফ এলিটের জুলুম। আবার ১৯৭১ এ যখন আমরা সেই জালিমের জোয়াল ভাইঙ্গা বাইর হইলাম, তখন ভাবছিলাম এইবার বুঝি মুক্তি মিলল। কিন্তু পিনাকীর গভীর রাজনৈতিক ব্যবচ্ছেদে উইঠা আসছে এক রূঢ় সত্য—আমরা পাইলাম কী? স্রেফ একটা ‘কারেকশন’ (ভট্টাচার্য, ২০২৬)। পাকিস্তানি কেন্দ্রবাদী কাঠামোর মালিক বদল হইল মাত্র। করাচির জায়গায় ঢাকা আইল, জিন্নার গদিতে মুজিব বসল। কিন্তু আমলাতন্ত্র, পুলিশ আর পেটোয়া লাঠিয়ালদের সেই ব্রিটিশ-পাকিস্তানি তরিকা বহাল তবিয়তেই থাইকা গেল।
৭১ এর রণাঙ্গনের যে বীর, তিনি কিন্তু মরতে যান নাই; তিনি গেছিলেন বাঁচার আশায়, দেশ স্বাধীন কইরা ফিরা আসার তামান্নায় (ভট্টাচার্য, ২০২৬)। কিন্তু ২০২৪ এর জুলাই বিপ্লব পুরা ব্যাকরণটাই ওলটপালট কইরা দিল। ২০২৪ আমাগো কোনো ‘প্ল্যান বি’ না, এইটা আমাগো আসল ডেস্টিনি। এইটা ৭১ এর পোলা না, বরং ১৯৭১ এর বাপের বাপ (ভট্টাচার্য, ২০২৬)। পিনাকীর এই বয়ানে স্রেফ ক্ষমতা বদলের লড়াই নাই, এইটায় আছে ৮০০ বছরের চাপা পড়া পূর্ববঙ্গীয় আত্মপরিচয়ের মহাবিস্ফোরণ। এদেশের প্রচলিত ইতিহাসবীক্ষায় যা এক যুগান্তকারী ডিসরাপশন।
আবু সাঈদের শাহাদাত এবং সার্বভৌমত্বের নতুন ব্যাকরণ:
১৬ জুলাই, ২০২৪। রংপুরের রাজপথে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়ানো সেই ২২ বছরের তরুণ আবু সাঈদ। হাতে স্রেফ একটা লাঠি, আর সামনে খাড়ানো যমদূতের মতো শটগান উঁচানো পুলিশ। সাঈদ পিছায় নাই, বুক চিতাইয়া দুই হাত ছড়ায়া দিছিল। এই যে মরণরে ডর না পাইয়া বুক পাইতা দেওয়া, এইটা স্রেফ রাজনীতি না—এইটা হইল শাহাদাতের জ্যান্ত ব্যাকরণ। পিনাকী এইখানে একজন পাবলিক অ্যাক্টিভিস্ট বা ইনফ্লুয়েন্সারের গণ্ডি ছাড়ায়া খোদ একজন উদ্ভাবনী তাত্ত্বিক প্রস্তাবক হিশাবে হাজির হইছেন, যখন তিনি দেখাচ্ছেন: “আবু সাঈদ যখন বুকচিতায় দাঁড়াইল তার শরীর ছিল কলম, তার রক্ত ছিল কালি—সে লিখতেছিল একটা বাক্য যেটা মুছা যাবে না… তোমাদের রাষ্ট্র চূড়ান্ত না, তোমাদের গুলি চূড়ান্ত না, তার উপরে একজন আছেন…” (ভট্টাচার্য, ২০২৬)।
এই শাহাদাত শব্দটার গভীরতা আমাগো তথাকথিত সেকুলার বা বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা বুঝব কেমনে? শাহাদাত মানে একই সাথে সাক্ষ্য দেওয়া, হকের পক্ষে খাড়ানো আর নিজের জান দিয়া সেই সত্যরে মোহর মারা (ভট্টাচার্য, ২০২৬)। এইখানেই পিনাকীর বয়ানে সাঈদের লগে মহাত্মা গান্ধীর অহিংসার তফাত স্পষ্ট হয়। গান্ধীর অহিংসা আছিল স্রেফ একটা রাজনৈতিক কৌশল, ব্রিটিশরে নৈতিক শরম দেওয়া। গান্ধী জেল খাটতে চাইছেন, অনশন করছেন, কিন্তু মরতে চান নাই। আবু সাঈদ রাষ্ট্রের ভিতরের কোনো সংস্কার চান নাই; তিনি সরাসরি এই জালিম রাষ্ট্রের খোদ ‘সার্বভৌমত্বের’ ধারণাটারে চ্যালেঞ্জ করছেন (ভট্টাচার্য, ২০২৬)। আধুনিক রাষ্ট্র মানুষকে দুইটা জিনিস দিয়া গোলাম বানায়া রাখে—ভয় আর লোভ। সাঈদ যখন জান্নাতের একীন বুকে নিয়া বুক চিতাইয়া দাঁড়াইলেন, তখন আধুনিক রাষ্ট্রের খোদাগিরি খতম হইয়া গেল। এই ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র মূলত দুইটা আদিম হাতিয়ার দিয়া মানুষকে গোলাম বানায়—মৃত্যুর ভয় আর বৈষয়িক লোভ। সাঈদের ওই একটা মাত্র লহমায় রাষ্ট্রের সেই তামাম দমন-পীড়নের বন্দোবস্ত এক্কেবারে অর্থহীন ও ফালতু প্রমাণ হইয়া গেল (ভট্টাচার্য, ২০২৪)
অস্ত্রের যুক্তি বনাম আত্মত্যাগের মহাজীবন:
৭১ এর লড়াইটা আছিল অস্ত্রের বিপরীতে অস্ত্রের লড়াই। আমার বন্দুক বড় না তোমার কামান বড়, এই আছিল হিশাব। অস্ত্রের একটা নিজস্ব মর্ষকামী যুক্তি আছে—যে শক্তিশালী, সেই জিতব। আর অস্ত্র দিয়া যখন আপনি রাষ্ট্র কায়েম করবেন, তখন সেই রাষ্ট্রও শক্তির যুক্তিতেই চলবো। পিনাকীর এই কাজের বড় সার্থকতা এইখানে যে, তিনি নির্মোহভাবে দেখাইছেন—এই কারণেই ৭১ এর পর আমাগো কপালে বাকশাল, সামরিক জান্তা, আয়নাঘর আর হাসিনার ফ্যাসিবাদের মতো গজব নাজিল হইছিল। কারণ কাঠামোটা তো বদলায় নাই, স্রেফ দানবের হাত বদল হইছিল (ভট্টাচার্য, ২০২৬)।
কিন্তু ২০২৪ এ আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধ, ওয়াসিম বা সাজিদরা কোনো অস্ত্রের মাপে হিশাব কষে নাই। এইটা আছিল চরম এক অসম যুদ্ধ। জার্মান দার্শনিক মার্টিন হাইডেগারের উৎসের দর্শনের আলোকে যদি পিনাকীর এই থিসিসরে দেখি, তবে বুঝা যায়—উৎস স্রেফ অতীত না, উৎস হইল সেই জিনিস যা থেইকা কোনো কিছুর অস্তিত্ব পয়দা হয় এবং জারি থাকে (Heidegger, 1971)। ২০২৪ এর শহীদেরা আমাগো সেই আসল উৎসে ফিরায়া নিয়া গেছে। কোরআনের সেই চিরন্তন আয়াত মোতাবেক—যারা আল্লাহর রাস্তায় জান দিছে, তাদের মরা কওয়া গুনাহ। তারা মরে নাই, তারা শামিল হইয়া গেছে এই গাঙ্গেয় বদ্বীপের আট শতাব্দীর এক অমর ও রূহানী কাফেলায় (ভট্টাচার্য, ২০২৬)। পিনাকীর এই সাহসী বয়ান আমাদের ইতিহাসের আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক মাত্রাটারে এক সুতায় বাঁধছে।
আট শতাব্দীর চাপা পড়া কণ্ঠস্বর এবং ভাটির ফেডারেলিজম:
বাঙালি মুসলমান এই মাটিরই সন্তান, যার ইসলাম কোনো তলোয়ার দিয়া আসে নাই; আইছে পীর-দরবেশের হাত ধইরা, এই পলল মাটির নদীর জোয়ার-ভাটায় মিশা। এই জনপদ হাজার বছর ধইরা চারটা বুনিয়াদি চাওয়া চাইছে: জমির ওপর নিজের হক, দিল্লির খবরদারির বিরুদ্ধে দেশের অধিকার, এই ভূখণ্ডের নিজস্ব রাজনীতি এবং নাগরিক শরাফত বা মর্যাদা।
১৩৫২ সালে শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ প্রথম স্বাধীন বাঙ্গালা সালতানাত কায়েম করলেন। তখন প্রথম দিল্লির গোলামি ছুটছিল। ১৬ শতকে মোগল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঈসা খাঁ আর বারো ভূঁইয়ারা যখন খাড়াইলেন, সেইটা স্রেফ যুদ্ধ আছিল না। সেইটা আছিল নদীর জিওগ্রাফি দিয়া গড়া এক আশ্চর্য ‘ফেডারেলিজম’ বা বহু-কেন্দ্রিক ক্ষমতার জ্যামিতি, যেইখানে হিন্দু-মুসলমান কাঁধে কাঁধ মিলায়া দিল্লির বিরুদ্ধে লড়ছিল। ২০২৪-এ আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধ আর শহীদ হৃদয়ের মতো তরুণদের এই জান কোরবান দেওয়া—সেই ৪০০ বছর আগের ঈসা খাঁ আর কংশনারায়ণের অসাম্প্রদায়িক মৈত্রীরই এক মডার্ন রি-এন্যাক্টমেন্ট (ভট্টাচার্য, ২০২৪)।
লাহোর প্রস্তাবে শেরে বাংলা যে একাধিক স্বয়ংশাসিত রিপাবলিকের খোয়াব দেখছিলেন, মুজিব সেইটাই ১৯৬৬-র ৬ দফায় কপি-পেস্ট মারছিলেন। কিন্তু জিন্নাহ যেমন অখণ্ড ভারতের ভিতর থেইকা মুসলমানের সেফটি চাইছিলেন, মুজিবও পাকিস্তানের ভিতর থেইকা বাঙালির হক চাইছিলেন—কেউই প্রথমে নতুন রাষ্ট্র চান নাই, পরিস্থিতির ফেরে পইড়া মানতে বাধ্য হইছেন। পিনাকীর এই অসামান্য বিশ্লেষণ আমাদের পুরানা এবং অসঙ্গতিপূর্ণ ইতিহাসবীক্ষাকে নস্যাৎ কইরা দেয়। তিনি দেখাইছেন ৪৭ ও ৭১ এর ফাঁকগুলা কই আছিল। ৭১ আছিল বাধ্য হইয়া নেওয়া এক ‘প্ল্যান বি’। আর ‘প্ল্যান বি’ এর রাষ্ট্রে একজন ‘জাতির পিতা’ লাগে, মালিকানা জাস্টিফাই করার লাইগা। কিন্তু ২০২৪ হইল ‘প্ল্যান এ’। এর কোনো একক বাপ নাই। এর বাপের বাপ হইল এই ৮০০ বছরের লড়াকু সিলসিলা, যার পাহারাদার আবু সাঈদ আর মুগ্ধরা (ভট্টাচার্য, ২০২৬)।
দ্বীন ও দুনিয়ার কৃত্রিম বিভাজন ভঙ্গের মহাপ্রহর:
হাসিনার ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে বড় কারচুপিটা আছিল থিওলজিক্যাল। পিনাকী একজন দুর্দান্ত কমিউনিকেটর হিশাবে এই থিওলজিক্যাল চুরির মুখোশ টান দিয়া খুইলা দিছেন। তারা আমাগো মগজে ঢুকাইতে চাইছিল যে ধর্ম থাকবে মসজিদে, আর রাজপথ থাকবে সেকুলার এলিটদের দখলে। পাকিস্তান যেমন আমাগো ‘অতিরিক্ত বাঙালি’ কইয়া ছাঁটতে চাইছিল, এই ৫৩ বছর ধইরা বাংলাদেশের শাহবাগী এলিটরা আমাগো ‘অতিরিক্ত মুসলমান’ বানায়া জঙ্গি তকমা দিয়া দমন করতে চাইছে। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা আর হাজী শরীয়তুল্লাহর ফরায়েজী আন্দোলনরে পাঠ্যবই থেইকা মুইছা দিয়া আমাদের কালচারাল গোলাম বানাইতে চাইছিল।
কিন্তু ২০২৪ এর ৫ আগস্ট বিজয়ের সন্ধ্যায় শাহবাগ আর টিএসসিতে তরুণদের যে সেজদা, আর সেনানিবাসে সিপাহী-জনতার মুখে ‘নারায়ে তকবীর’ স্লোগান—সেইটা আছিল দ্বীন আর দুনিয়ার সেই কৃত্রিম সেকুলার দেয়ালটারে এক লাথিতে ভাইঙ্গা চুরমার কইরা দেওয়া। এইটা ১৯৭৫ এর ৭ নভেম্বরের সিপাহী বিপ্লবের সেই বিপ্লবী স্মৃতির পুনরুত্থান—যেইখানে সিপাহী আর প্রজা এক হইয়া দিল্লির দালালি নস্যাৎ কইরা দিছিল (ভট্টাচার্য, ২০২৬)। ইসলামে দ্বীন আর দুনিয়া যে আলাদা কোনো জুদা চিজ না, রাজপথ আর জায়নামাজ যে একই হকের ময়দান—জুলাই বিপ্লব এই বদ্বীপের মাটিতে সেই সত্যটাই আবার কড়া কইরা প্রমাণ করল (সাখাওয়াত, ২০২৬)।
এপিলগ: এই আগুন নিভবার নয়:
পিনাকী ভট্টাচার্যের এই ন্যারেশন কোনো স্রেফ সাময়িক ভিডিও কনটেন্ট না। এইটা এদেশের ইতিহাসচর্চার এক নতুন ইশতেহার। ২০২৪ এর জুলাই কোনো স্রেফ ক্যালেন্ডারের পাতা না। এইটা আমাগো ৮০০ বছরের বেইজ্জতির আর চাপা পড়া ক্ষোভের এক ঐতিহাসিক প্রতিবিধান। পিনাকীর এই নতুন ইতিহাসবীক্ষা আমাদের এক সুদূরপ্রসারী তাৎপর্যের সন্ধান দেয়। এই গণঅভ্যুত্থান আমাগো শিখাইছে কীভাবে শির উঁচা কইরা দাঁড়াইতে হয়, কীভাবে দিল্লির দাদাগিরির মুখে থুথু দিয়া ‘দিল্লী না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’ স্লোগানে আকাশ কাঁপাইতে হয়। সাঈদ-মুগ্ধদের রক্তে যে নতুন আলপনা আঁকা হইছে এই বদ্বীপে—সেইটারে মুইছা দেওয়ার ক্ষমতা কারোর নাই। এই প্রতিরোধ, এই ইনসাফের লড়াইয়ের আগুন আমরা নিভতে দিমু না—নেভানো যাইব না (ভট্টাচার্য, ২০২৬)। ইনশাআল্লাহ, এই বদ্বীপে জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই চলতেই থাকবে।







