সালমান রাইয়ান
গণঅভ্যুত্থানের সময় যদি শেখ হাসিনা গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হতেন, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়ত? এ প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর দেওয়া অসম্ভব। তবে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কৌশল এবং ইতিহাসের অভিজ্ঞতার আলোকে একটি সম্ভাব্য বিশ্লেষণ করা যায়।
আওয়ামী লীগের রাজনীতির একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক আইকন নির্মাণ বা ‘কাল্ট অব পারসোনালিটি’। দলটি শেখ মুজিবুর রহমানকে শুধু প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে নয়, বাংলাদেশের অস্তিত্বের সমার্থক এবং জাতির পিতা হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে। এই প্রক্রিয়া স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না; বরং শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে তোলা হয়েছে।
রাষ্ট্রক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে অনেক দলই এ ধরনের প্রতীক নির্মাণের কৌশল গ্রহণ করে। কিন্তু বাস্তবে কোনো দলের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নির্ভর করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দুর্নীতি দমন, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, দক্ষ প্রশাসন ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির উপর। বাংলাদেশে এসব ক্ষেত্রে সব রাজনৈতিক দলেরই কম-বেশি সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে শেখ পরিবারকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বৈধতা নির্মাণে বিশেষ জোর দিয়েছে। সরকারি শিক্ষানীতি, পাঠ্যপুস্তক, রাষ্ট্রীয় মিডিয়া এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সড়ক ও প্রতিষ্ঠানের নামকরণও শেখ পরিবারের সদস্যদের নামে করা হয়েছে। এভাবে আওয়ামী লীগকে বঙ্গবন্ধুর সমার্থক এবং বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের সমার্থক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা লক্ষণীয়।
এই কৌশলের ফলে দলের সমালোচনাকে প্রায়ই জাতীয় চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা হিসেবে চিত্রিত করা সম্ভব হয়েছে।
যদি গণঅভ্যুত্থানের সময় শেখ হাসিনা নিহত হতেন, তাহলে আওয়ামী লীগ সম্ভবত তাঁকেও একটি আত্মত্যাগী গণতান্ত্রিক নেতা হিসেবে উপস্থাপন করে শোক ও সহানুভূতির আবেগকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করত। দলটি তাঁকে বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকারী ও উন্নয়নের রূপকার হিসেবে ব্র্যান্ডিং করে আসছিল। পদ্মা সেতু, মেট্রো রেলসহ কিছু বড় অবকাঠামো প্রকল্প জনজীবনে সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের শ্বেতপত্রসহ বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসব প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া শেখ হাসিনা সরকারের আমলে রাজনৈতিক আশ্রয়পুষ্ট ‘এস আলম গ্রুপ’-এর মতো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান চারটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এতে ব্যাংকগুলোর নেট অ্যাসেট ভ্যালু (NAV) ঋণাত্মক হয়ে শেয়ারের মূল্য শূন্যে নেমে আসে, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যাপক ক্ষতির কারণ হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয় (OHCHR)-এর প্রতিবেদন অনুসারে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ১,৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ১২-১৩ শতাংশ শিশু। হাজার হাজার মানুষ আহত ও পঙ্গু হয়েছে এবং আহতদের চিকিৎসায় বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার মৃত্যু হলে সাময়িকভাবে শহীদত্বের আখ্যান তৈরি হলেও, বৃহত্তর জনগোষ্ঠী সম্ভবত এটিকে দমনমূলক শাসনের পরিণতি হিসেবেই দেখত। ফলে তিনি ইতিহাসে অমর নেত্রী হওয়ার পরিবর্তে বিতর্কিত ও সতর্কতামূলক উদাহরণ হয়ে থাকতেন।
ইতিহাসের শিক্ষা হলো, জোর করে ব্যক্তিপূজা ও আইকন নির্মাণ করে কোনো রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না। দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের জন্য প্রয়োজন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছতা ও জনগণের প্রতি জবাবদিহিতা।







