প্রচ্ছদসাম্প্রতিক১৫ আগস্ট ১৯৭৫: বিপ্লবীদের দৃষ্টিতে এক ঐতিহাসিক অনিবার্যতা

লিখেছেন : মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন

১৫ আগস্ট ১৯৭৫: বিপ্লবীদের দৃষ্টিতে এক ঐতিহাসিক অনিবার্যতা

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন একটি ঘটনা, যার মূল্যায়ন নিয়ে আজও তীব্র বিতর্ক রয়েছে। প্রচলিত বর্ণনায় এটি একটি সামরিক অভ্যুত্থান এবং শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যের হত্যাকাণ্ড। কিন্তু অন্য একটি রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় ১৫ আগস্টকে দেখা হয় তৎকালীন জনবিরোধী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়া হিসেবে। এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রবক্তাদের মতে, স্বাধীনতার পর যে রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, কয়েক বছরের মধ্যেই সেই রাষ্ট্র দুর্নীতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক দমন ও ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণে আক্রান্ত হয়ে একটি বিশেষ রাষ্ট্রের পুতুল সরকারে পরিণত হয়েছিল। তাঁদের কাছে ১৫ আগস্ট ছিল সেই সংকটেরই বিস্ফোরণ।

এই মতের মূল বক্তব্য হলো, কোনো রাজনৈতিক ঘটনা কখনোই হঠাৎ সৃষ্টি হয় না। তার আগে সমাজে অসন্তোষ জমা হয়, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জনগণ ও শাসকের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়। ১৯৭৫ সালের বাংলাদেশেও এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে এই দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থকেরা মনে করেন। ইতিহাসবিষয়ক বিভিন্ন বিবরণে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর পুনর্গঠনের ধীরগতি, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ এবং পরবর্তীতে একদলীয় রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় চরিত্র শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বিপুল জনপ্রিয়তার অধিকারী নেতা। কিন্তু এই জনপ্রিয়তা যতটা দ্রুত অর্জিত হয়েছিল, রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব সংকট তত দ্রুত সেই জনপ্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন ছিল একটি বিশাল কাজ। যোগাযোগব্যবস্থা, শিল্প, কৃষি, খাদ্য সরবরাহ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল বিপর্যয়। সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ ছিল অসংখ্য। মুজিব সরকার সংবিধান প্রণয়ন, নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠান গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করলেও সময়ের সঙ্গে জনগণের একটি অংশ সরকারের কার্যকারিতা নিয়ে হতাশ হয়ে পড়ে।

বিপ্লবীদের পক্ষে যুক্তি দিতে গেলে প্রথমেই আসে দুর্নীতির প্রশ্ন। তাঁদের দৃষ্টিতে স্বাধীনতার আদর্শ ছিল শোষণ, বৈষম্য ও অন্যায়ের অবসান; অথচ ক্ষমতাসীন দলের অধিকাংশ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ক্রমশ বাড়ছিল। সাধারণ মানুষ যখন দারিদ্র্য ও খাদ্যসংকটে ভুগছিল, তখন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিশেষ সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। এই পরিস্থিতিতে “স্বাধীনতা কার জন্য”—এই প্রশ্নও সমাজে উঠতে থাকে। খ্যাতনামা ছড়াকার আবু সালেহ লিখলেন,

“ধরা যাবে না ছোঁয়া যাবেনা

বলা যাবে না কথা

রক্ত দিয়ে পেলাম শালার এমন স্বাধীনতা!”

বিপ্লবীদের যুক্তির দ্বিতীয় বড় ভিত্তি ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে বিভিন্ন সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠীর তৎপরতা বেড়ে যায়। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কিন্তু সরকারের সমালোচকেরা মনে করতেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে রাজনৈতিক বিরোধিতাকে দমন করা হচ্ছে। রাষ্ট্রের স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি একটি বিশেষ আধাসামরিক বাহিনীর ওপর সরকারের নির্ভরতা এই সন্দেহকে আরও শক্তিশালী করে।

জাতীয় রক্ষীবাহিনী এই বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল। বাহিনীটি মূলত আইনশৃঙ্খলা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য গঠিত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে এর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। রক্ষীবাহিনীর কর্মকাণ্ড নিয়ে জনসমালোচনা তীব্র হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে সরকার এমন একটি সংশোধনী অধ্যাদেশ জারি করে, যা বাহিনীর সদস্যদের কিছু কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে পশ্চাৎমুখী আইনি সুরক্ষা প্রদান করেছিল। এই বাহিনী মূলত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মর্যাদার ওপরও পরোক্ষভাবে আঘাত হানে।

বিপ্লবীদের দৃষ্টিতে এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংকেত। তাঁদের যুক্তি ছিল, যদি কোনো নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে এবং পরবর্তীতে সেই বাহিনীর সদস্যদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের কাছে আইনের শাসনের প্রতি বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে সরকার ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর একটি অংশের মধ্যেও রক্ষীবাহিনীকে ঘিরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল বলে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত।

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক ধ্বংস, খাদ্যঘাটতি, বন্যা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং দুর্বল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ একটি গভীর মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু এবং ব্যাপক খাদ্যসংকট সরকারের প্রতি মানুষের আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তৎকালীন সরকারের সমালোচনাকারী পত্রিকাগুলো ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষকে মুজিব সরকারের জন্য একটি বড় সংকট হিসেবে উল্লেখ করেছে।

২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ সালের দৈনিক ‘গণকণ্ঠ’ পত্রিকার শিরোনামে বলা হয়:

“১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ মুজিব শাসনামলের অদক্ষতা, দুর্নীতি ও অমানবিক অবহেলার নগ্ন চিত্র তুলে ধরে। জামালপুর ও ঈশ্বরদীতে মাত্র দশ দিনে ৭১ জন মানুষ অনাহার ও অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে মৃত্যুবরণ করে। ক্ষুধার তীব্র যন্ত্রণা মানুষকে এমন অমানবিক অবস্থায় ঠেলে দিয়েছিল যে, কোথাও অসহায় স্বামী স্ত্রীকে হত্যা করেছে, কোথাও মা ক্ষুধার্ত সন্তানকে কুয়ায় ফেলে দিয়েছে শুধু তাকে না খাইয়ে রাখার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে। অনাহারী মানুষ কচু, শেকড়, অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর শিকার হয়েছে।

খাদ্যের অভাবে কেবল মানুষের জীবনই শেষ হয়নি, সমাজের নৈতিক ভিত্তিও ভেঙে পড়েছিল। নারীদের সতীত্ব নামমাত্র মূল্যে বিত্তশালীদের কাছে বিকিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, আর টাউট-দালাল শ্রেণী এই দুর্ভিক্ষেও নিজেদের আখের গুছাতে ব্যস্ত ছিল। গ্রামাঞ্চলে চরম দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে তারা নতুন নতুন শোষণের ঘাঁটি গড়ে তুলছিল।

সরকার যেখানে খাদ্য বিতরণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছিল, সেখানে দাম দিন দিন অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। ক্ষুধার্ত মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে একদল লুটেরা ও দুর্নীতিবাজ রাষ্ট্রীয় আশ্রয়ে ফুলেফেঁপে উঠছিল। ফলে দুর্ভিক্ষ শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে নয়, বরং মুজিব সরকারের ব্যর্থতা, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণেই ভয়াবহ আকার ধারণ করে।”

বিপ্লবীদের দৃষ্টিতে এখানেই সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা প্রকাশ পায়। তাঁদের বক্তব্য ছিল, যে রাষ্ট্র জনগণের স্বাধীনতা ও মর্যাদার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই রাষ্ট্র যদি মানুষকে খাদ্য ও নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক। বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, খাদ্যসংকট, কালোবাজারি ও দুর্নীতির অভিযোগ মানুষের হতাশাকে আরও তীব্র করে।

এরপর আসে রাজনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তে একদলীয় কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই ব্যবস্থা রাজনৈতিক পরিসরকে ব্যাপকভাবে সংকুচিত করেছিল এবং এর ফলে সমাজের বিভিন্ন অংশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। 

বিপ্লবীদের দৃষ্টিতে এটি ছিল চূড়ান্ত সতর্কসংকেত। তাঁদের যুক্তি ছিল, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ছিল জনগণের রাজনৈতিক অধিকার; অথচ স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছর পর যদি বহুদলীয় রাজনীতি বিলুপ্ত করে শেখ মুজিবুর রহমান একদলীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে , এর মধ্যদিয়ে স্বাধীনতার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

শুধু রাজনৈতিক দল নয়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতাও সংকুচিত হয়। ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে অধিকাংশ সংবাদপত্র বন্ধ করে মাত্র কয়েকটি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্র চালু রাখার ব্যবস্থা করা হয়। এই সিদ্ধান্ত সরকারের সমালোচকদের কাছে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ হয়ে ওঠে।

বিপ্লবীদের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখানেই: তাঁদের মতে, যখন বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির কার্যক্রম সীমিত হয়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংকুচিত হয় এবং রাষ্ট্রক্ষমতা একজন রাষ্ট্রপতির হাতে অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হয়, তখন সাংবিধানিক পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার পথ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যায়। ফলে রাষ্ট্রের ভেতরে কোনো শক্তি যদি মনে করে যে পরিস্থিতির পরিবর্তন আর স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সম্ভব নয়, তখন তারা চরম পদক্ষেপের দিকে ঝুঁকতে পারে।

সেনাবাহিনীর অসন্তোষও এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীর পুনর্গঠন, মুক্তিযোদ্ধা ও বিভিন্ন পটভূমির কর্মকর্তাদের অবস্থান, রক্ষীবাহিনীর ভূমিকা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সামরিক প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক নিয়ে নানা সমস্যা তৈরি হয়। ফলে সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশের মধ্যে সরকারের প্রতি অসন্তোষ ধীরে ধীরে জমা হয়েছিল। ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে মধ্যম পর্যায়ের সেনা কর্মকর্তাদের সরাসরি অংশগ্রহণকে সেই দীর্ঘদিনের অসন্তোষের বিস্ফোরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। একটি গবেষণায় সামরিক শাসনবিষয়ক বিবরণে বলা হয়েছে, অভ্যুত্থানকারীরা তাঁদের পদক্ষেপকে “ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা” হিসেবে যুক্তিসঙ্গত করার চেষ্টা করেছিলেন।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, বেশ কয়েকটি কারণে তৎকালীন সেনাবাহিনীর মধ্যে অস্থিরতা ও অসন্তোষ বিরাজ করছিল। বিশেষ করে, দলীয় নেতাদের চাপের মুখে সেনা সদস্যদের ব্যারাকে ফিরিয়ে আনার সরকারি সিদ্ধান্তে তরুণ সেনা কর্মকর্তাদের অনেকে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। এছাড়া, সেনাবাহিনীর একাংশ শেখ মুজিবের একদলীয় শাসনব্যবস্থাও মেনে নিতে পারছিলেন না বলে জানা যায়।

“এই সময় তরুণ মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের কিছু অংশ দারুণ ক্ষেপে ওঠে। তারা ভেতরে ভেতরে দল পাকাতে থাকে,”—নিজের বইতে লিখেছেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম. এ. হামিদ।

পদ-পদবি নিয়ে সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যেও বিরোধ দেখা দিয়েছিল। অন্যদিকে, রক্ষীবাহিনীর সুযোগ-সুবিধা ঘিরেও সেনাসদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যেই একটি গুজবকে কেন্দ্র করে সেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

“ক্যান্টনমেন্টে গুজব ছড়িয়ে পড়ল, শেখ সাহেব সেনাবাহিনীকে বিলুপ্ত করে ভারতীয় সহযোগিতায় রক্ষীবাহিনীকে গড়ে তুলছেন। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে রক্ষীবাহিনীকে সাজিয়ে দিচ্ছেন। রক্ষীবাহিনীর জন্য নতুন নতুন ব্যারাক, নতুন গাড়ি, নতুন ইউনিফর্ম সেনাবাহিনীর সন্দেহ আরও বাড়িয়ে তোলে,”—সাবেক সেনা কর্মকর্তা মি. হামিদ তাঁর ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’ গ্রন্থে লিখেছেন।

এর বাইরে, বিভিন্ন ইস্যুতে সেনাবাহিনীর তরুণ কিছু কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করার ঘটনাকে ঘিরেও অনেকের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল বলে উল্লেখ করেছেন মি. হামিদ।

তৎকালীন মার্কিন দূতাবাসের ১৬ আগস্ট ১৯৭৫ তারিখের একটি কূটনৈতিক টেলিগ্রামও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেখানে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়, অভ্যুত্থানের পর জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রতিরোধ দেখা যায়নি; বরং পরিস্থিতিকে তুলনামূলকভাবে শান্তভাবে গ্রহণ করার লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। টেলিগ্রামটি মুজিব সরকারের প্রতি মানুষের বিচ্ছিন্নতা, তাঁর জনবিরোধী নীতির প্রতি অসন্তোষ এবং ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার প্রচেষ্টাকে অভ্যুত্থানের সম্ভাব্য পটভূমির অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করেছিল। তবে এটি ছিল ঘটনাটির পরপরই করা একটি প্রাথমিক কূটনৈতিক মূল্যায়ন, চূড়ান্ত ঐতিহাসিক রায় নয়।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে ১৫ আগস্টের সমর্থকেরা বলেন, তাঁরা নিজেদেরকে কেবল ক্ষমতালোভী সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে দেখেননি; বরং রাষ্ট্রের দিক পরিবর্তনের একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবেই ঘটনাটিকে উপস্থাপন করেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, রাজনৈতিক ব্যবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দুর্নীতি, অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও রাজনৈতিক দমন দেশের ভবিষ্যৎকে গভীরভাবে বিপন্ন করছিল। তাই প্রচলিত রাজনৈতিক পদ্ধতির বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রের নেতৃত্ব পরিবর্তন করা তাঁদের কাছে “ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা” হয়ে উঠেছিল।

আর এ কারণেই কিংবদন্তি সাংবাদিক ও সাবেক মন্ত্রী মরহুম আনোয়ার জাহিদ নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত নাগরিক ফোরামের এক আলোচনা সভায় ১৫ আগস্টের প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, “রাষ্ট্রের প্রয়োজনে কখনো কখনো জীবন দেওয়া ও জীবন নেওয়া অনিবার্য হয়ে পড়ে; ১৫ আগস্ট ঠিক তেমনি একটি প্রেক্ষাপট।” সেকারণে তাঁর এই বক্তব্যের আলোকে ১৫ আগস্টকে কোনোভাবেই নিছক হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটিকে একটি সফল পূর্ণাঙ্গ বিপ্লব হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যদিও ১৫ আগস্টের বিপ্লবের পর বাংলাদেশ কোনো স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যায়নি, বরং ৩ নভেম্বর ও ৭ নভেম্বরসহ একাধিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশ আরও সামরিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে প্রবেশ করে।

সবকিছুর পরেও, “বিপ্লবীদের পক্ষে” সবচেয়ে শক্তিশালী ঐতিহাসিক যুক্তিটি হলো—১৫ আগস্টের ঘটনাকে বোঝার জন্য শুধু হত্যাকাণ্ডের দিকে তাকালে হবে না; তার আগে সৃষ্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার সংকটকেও দেখতে হবে। দুর্নীতির অভিযোগ, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ, রক্ষীবাহিনী নিয়ে বিতর্ক, রাজনৈতিক স্বাধীনতার সংকোচন, বাকশাল প্রতিষ্ঠা, সংবাদপত্রের ওপর খড়্গহস্ত এবং সেনাবাহিনীর অসন্তোষ—সবকিছু মিলিয়ে মুজিব সরকারের বিরুদ্ধে একটি গভীর রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংকট তৈরি হয়েছিল।

এই অর্থে বিপ্লবীদের পক্ষে বলা যায়, ১৫ আগস্টের পেছনে কোনো একক কারণ ছিল না; বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থার সংকট শেষ পর্যন্ত সামরিক অভ্যুত্থানের পরিবেশ তৈরি করেছিল। মুজিব সরকারের নীতিগত ব্যর্থতা ও কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা সেই পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল—এটাই এই মতের মূল বক্তব্য।

১৯৭৫-এর ঘটনাকে শেখ মুজিব সরকারের ব্যর্থতা ও কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক মোড়ের পরিণতি হিসেবে মূল্যায়ন করাই ইতিহাসকে রাজনৈতিক স্লোগানের পরিবর্তে বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে যায়।

লেখক: 

ফ্রান্স থেকে–সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা