নাবিল নিশাত
একটা মৃতদেহকে কেউ যখন শিল্পকর্ম বলে দাবি করে, প্রথমে গা শিউরে ওঠে। তারপর মনে পড়ে যায় রংপুরের দৃশ্য, আর বুঝি এই শিউরে ওঠাটাই কবির লক্ষ্য ছিল।
কবি শায়েখ শোয়েবের এই কবিতা শান্ত মনে পড়া যায় না। এটা আসলে আবু সাঈদকে ঘিরে লেখা, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ, যার দুই হাত প্রসারিত করে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার দৃশ্য গোটা জাতির স্মৃতিতে খোদাই হয়ে গেছে।
শুরুতেই ধ্বনির খেলাটা লক্ষ্য করার মতো। “বেআব্রু বারুদ”, “বিস্ফোরিত বিদ্রোহ” – ব-ধ্বনির পরপর আঘাত, তারপর “সংশয়… সন্ত্রাসকে… সত্যের… সংশপ্তক”-এ স-ধ্বনির তালে তালে চলা। মনে হয়, এসব নিছক সাজানো শব্দ নয়।
প্রতিবার পাঠেই একধরনের ঠোকাঠুকির শব্দ তৈরি হয়, প্রায় গুলি ছোঁড়ার ছন্দ। ভাষা এখানে অস্ত্র হয়ে ওঠে, আর সেই অস্ত্রের নিশানায় থাকে একটা নির্দিষ্ট শরীর, একটা নির্দিষ্ট মৃত্যু।
“সংশপ্তক” শব্দে একটু থমকাতে হয়। শহীদুল্লা কায়সারের বিখ্যাত কথা মনে পড়ে, ‘যে যোদ্ধা প্রতিজ্ঞা করে রণক্ষেত্র থেকে ফিরবে না, হয় জিতবে নয় মরবে।”
এই একটা শব্দে কবি টেনে আনেন প্রতিরোধের একটা গোটা পরম্পরা, আর সেই পরম্পরার সবচেয়ে তাজা নাম হয়ে ওঠে আবু সাঈদ।
“সন্ত্রাসকে পদাঘাত করে সত্যের মুখোমুখি হয়”
এই লাইনে মৃত্যুভয়হীনতা যে উচ্চতায় পৌছায়, সেই উচ্চতাতেই দাঁড়িয়েছিলেন বেরোবি ক্যাম্পাসে সেই ছেলেটা। পুলিশের সামনে, বুক পেতে, দুই হাত মেলে ধরা।
খেয়াল করার মতো বিষয়, আবু সাঈদ কিন্তু পালাননি, লুকাননি নিজেকে। যে ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছিলেন, সেটা প্রায় একটা রচনার মতো, যদিও সেই মুহূর্তে সচেতন কোনো পরিকল্পনা ছিল না, ছিল শুধু গভীর সাহস। কিন্তু ফল যা দাঁড়াল, তা একটা ভাস্কর্যের মতো স্থায়ী হয়ে গেল।
দুই হাত প্রসারিত, বুক উন্মুক্ত। এই ভঙ্গি ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার পুরোনো প্রতিমার কথা মনে করায়, যেখানে আত্মত্যাগ আর মুক্তি এক হয়ে যায়। তফাৎ শুধু এই যে, এটা কোনো পুরাণকথা নয়, চোখের সামনে ঘটা, ক্যামেরায় ধরা পড়া বাস্তবতা।
এরপর দধীচির প্রসঙ্গ আসে, আর এখানেই কবি নিজের সবচেয়ে সৎ কথাটা বলেন।
“আমার বুলেটবিদ্ধ বুকের ভঙ্গুর পাঁজরের হাড় দিয়ে হয়তো তৈরি হবে না দধীচির বজ্র”
দধীচি মুনি নিজের হাড় দান করেছিলেন যাতে ইন্দ্রের বজ্র গড়া যায়, রাক্ষস বধ হয়। কণ্ঠস্বর এখানে বিনয়ী, প্রায় সংশয়ী। কিন্তু ইতিহাস পরে এই বিনয়কে মিথ্যা প্রমাণ করে দেয়। আবু সাঈদের মৃত্যু সত্যিই দধীচির মতো কাজ করল, একটা জাতিকে জাগিয়ে তুলল, পুরো অভ্যুত্থানের সূচনা করে দিল। যে ভাবছিল তার আত্মত্যাগ হয়তো ছোট, সেটাই হয়ে উঠল সবচেয়ে বড়।
এই ফাঁকটাই, বিনয়ী কণ্ঠস্বর আর মহাকাব্যিক পরিণতির মধ্যেকার এই দূরত্বটাই কবিতাকে গভীর করে তোলে। আর সঙ্গে সঙ্গেই লাইনটা ঘুরে যায় –
“আমার মুষ্টিবদ্ধ হাত হবে নতুন বিপ্লবের প্রচ্ছন্ন প্রতীক।”
নিজের সীমা মেনে নিয়েও অর্থবহ থাকার এই জেদ।
এরপর আসে তীব্র প্রশ্ন —
“শেষ হবে কি এই প্রহসনের ময়নাতদন্ত? ডোম তুমি আমার লাশকে আর কতবার করবে টুকরো টুকরো?”
ময়নাতদন্তকে প্রহসন বলার মধ্যে একধরনের ক্লান্ত ক্ষোভ আছে, যেন সত্য খোঁজার নামে শুধু শরীর কাটাছেঁড়া চলছে, আসল সত্য কখনোই সামনে আসবে না। এই লাইনে রাষ্ট্রীয় তদন্ত প্রক্রিয়ার প্রতি একটা সরাসরি অবিশ্বাস প্রকাশ পায়, যেন বলা হচ্ছে, আর কত মিথ্যা বানাবে এই লাশ ঘিরে। ডোমকে সরাসরি ডেকে কথা বলার এই ভঙ্গিতে একধরনের ভয়ংকর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
আর তারপরই ঘটে রূপান্তর —
“আমার প্রতিটি মাংসপিণ্ড মুক্তির ডমরু হয়ে বাজবে ইতিহাসের কৈলাসে।”
শিবের ডমরু, কৈলাস পাহাড়। ধ্বংস আর সৃষ্টির দেবতার জগতে নিজের ছিন্নভিন্ন দেহকে বসিয়ে দেন কবি। খণ্ডবিখণ্ড মাংস, হাড়, যন্ত্রণার চিহ্ন আর যন্ত্রণা থাকে না, হয়ে ওঠে সুরের উৎস। আবু সাঈদের রক্তমাখা শরীর এভাবেই ইতিহাসের মঞ্চে অন্তনকাল বাজতে থাকা এক সঙ্গীতে রূপান্তরিত হয়।
“রংপুরের মাটিতে কার্তুজে ক্ষতবিক্ষত আমার কলিজাই ছিল একবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম শিল্প।”
এতক্ষণ ধরে যে বিমূর্ত কণ্ঠ কথা বলছিল, এখানে সে একটা নাম, একটা মুখ পায়। রংপুর শব্দটা উচ্চারিত হতেই মনে পড়ে যায় বেরোবি ক্যাম্পাস, পুলিশের গুলি, প্রসারিত দুই হাত। এই কবিতা তাহলে বিমূর্ত বিপ্লবী ভাবনার কথা বলছিল না এতক্ষণ, একটা নির্দিষ্ট মৃত্যুরই কথা বলছিল, যে মৃত্যু জাতির ইতিহাসে একটা বাঁক তৈরি করে দিয়েছে।
আর “শ্রেষ্ঠতম শিল্প” কথাটার আসল ওজন এখানেই বোঝা যায়। মহাকাব্য লেখা হয় বছরের পর বছর ধরে, শব্দ বেছে বেছে, ছন্দ মিলিয়ে মিলিয়ে, খসড়ার পর খসড়া করে। কিন্তু আবু সাঈদের এই মৃত্যুর দৃশ্য তৈরি হলো এক মুহূর্তে, কোনো সংশোধনের সুযোগ ছাড়া। তবু তার আবেদন, তার তীব্রতা যেকোনো লিখিত মহাকাব্যকে ছাপিয়ে যায়। রক্ত দিয়ে লেখা এই পঙক্তি কালির লেখা পঙক্তির চেয়ে গভীরে বাজে, এই বিশ্বাসই কবিতার মূল স্নায়ু হয়ে দাঁড়ায়।
শিল্পের প্রচলিত সংজ্ঞা এখানে ভেঙে পড়ে। শিল্প মানে আমরা বুঝি রঙ, ক্যানভাস, শব্দ, সুর – মানুষের হাতে তৈরি কিছু একটা।
কিন্তু আবু সাঈদের মৃত্যু কোনো রচিত জিনিস নয়, একটা ঘটে যাওয়া মুহূর্ত, যাকে পরে ইতিহাস আর কবিতা মিলে অর্থ দিয়েছে। তাহলে শিল্প কি শুধু রচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি জীবনের চূড়ান্ত মুহূর্তগুলোও শিল্প হয়ে উঠতে পারে, যখন সেই মুহূর্ত মানুষের সবচেয়ে গভীর সত্যকে প্রকাশ করে দেয়? কবি প্রশ্নটা তুলে ধরেন, উত্তর না দিয়েই। এখানেই কবি হয়তো সফল, নয়তো সফল…
সবচেয়ে বেশি টানে কবিতার সততা। বীরত্বকে এখানে বাড়িয়ে দেখানো হয়নি। যন্ত্রণা আছে, ক্লান্তি আছে, তারপরও একটা জেদি বিশ্বাস আছে। “আফসোস নেই, আফসোস নেই একদম” – এই পুনরাবৃত্তি অনেকটা নিজেকে বোঝানোর মতো শোনায়, যেন জোর দিয়ে বলা হচ্ছে যাতে ভেতরের কাঁপুনিটা চাপা পড়ে যায়। এই মানবিক দুর্বলতাটুকুই কবিতাকে স্লোগান হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচায়।
পুরাণ, ইতিহাস আর হাল আমলের রাজনৈতিক বাস্তবতা মেলানোর কাজটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, কিন্তু কবি সামলে নিয়েছেন।
দধীচি হোক বা শিব-কৈলাস, কোনোটাই এখানে সাজসজ্জা নয়, বরং একটা যুক্তির অংশ, মৃত্যুকে অর্থবহ করে তোলার চেষ্টা। আর শেষমেশ আবু সাঈদের নাম না নিয়েও তার উপস্থিতি এমনভাবে ছড়িয়ে থাকে পুরো কবিতা জুড়ে যে পাঠক নিজেই সেই নাম বসিয়ে নেয় প্রতিটা পঙক্তিতে।
এভাবেই একটি ব্যক্তিগত মৃত্যু হয়ে ওঠে সমষ্টির স্মৃতি, একটি লাশ হয়ে ওঠে জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে তীব্র পঙক্তি।
একবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম শিল্প
শায়েখ শোয়েব
………………….
বেআব্রু বারুদের মতো বিস্ফোরিত বিদ্রোহ কখনো মানে না সাংবিধানিক বিধি-নিষেধ।
সব সংশয় ভুলে সন্ত্রাসকে পদাঘাত করে সত্যের মুখোমুখি হয় যে সন্তান সেই তো সংশপ্তক।
দুঃসহ দুঃশাসনকে কুর্নিশ করিনি তাই হয়েছি রাষ্ট্রদ্রোহী।
আমার বুলেটবিদ্ধ বুকের ভঙ্গুর পাঁজরের হাড় দিয়ে হয়তো তৈরি হবে না দধীচির বজ্র, কিন্তু আমার মুষ্টিবদ্ধ হাত হবে নতুন বিপ্লবের প্রচ্ছন্ন প্রতীক।
কবোষ্ণ শোণি দিয়ে শোধ করেছি দ্রোহের দাম।
আফসোস নেই, আফসোস নেই একদম।
শেষ হবে কি এই প্রহসনের ময়নাতদন্ত?
ডোম তুমি আমার লাশকে আর কতবার করবে টুকরো টুকরো?
আমার প্রতিটি মাংসপিণ্ড মুক্তির ডমরু হয়ে বাজবে ইতিহাসের কৈলাসে।
অনাগত আগামী প্রজন্ম একদিন আবিষ্কার করবে রংপুরের মাটিতে কার্তুজে ক্ষতবিক্ষত আমার কলিজাই ছিল একবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম শিল্প।







