তায়েফ আহমাদ
হাজারো বর্ষণ এ জমিনকে সিক্ত করে না। এখানে জন্মায় না কোন ফলদায়ক উদ্ভিদ, নিকট অতীতে এ মাটি জন্ম দেয়নি কোন বিখ্যাত মানুষ। এমন নিষ্ফলা ভূমিতেই জন্মালেন তিনি!
সে ছিল এক অন্ধকারের যুগ। এ ভূমির সন্তানেরা তখন নিরক্ষর-যাযাবর-বন্য। হত্যা-লুটতরাজ তাদের জীবনের প্রাথমিক অনুসঙ্গ। বুকের সাহসটুকু সম্বল করে তারা সময়ের পথ পাড়ি দেয়।
তাঁর জন্মভূমিই শুধু অন্ধকারে ডুবেছিল– এমনটা নয়। এ ছিল এমন এক তমসাঘন পৃথিবী, সেখানে প্রাচ্য আর পাশ্চাত্য ছিল সুবিশাল পারস্য ও রোমান সম্রাজ্যের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত। পৃথিবীর প্রতিটি ইঞ্চিকে কুক্ষিগত করার উদগ্র বাসনায় তারা একে অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকত শ্যেণ দৃষ্টিতে। অথচ, এদের রক্তলোলুপ দৃষ্টিও চরম অবজ্ঞায় এই অনুর্বর ভূমিকে এড়িয়ে গিয়েছিল। তাদের লোভ এ জমিনের ভয়ংকরতম মরুভূমি রুব-আল-খালি আর নুফুদের বিশালতার কাছে পরাজিত ছিল। মানবতার হাহাকারে আঁধার হয়ে আসা এমনই এক ধরাতেই জন্মালেন তিনি!
দুঃখ-বেদনা তার আবাল্য সুহৃদ! জন্মের পূর্বেই পিতৃহারা এই মানুষটি শৈশবে মমতাময়ী মাকেও হারালেন। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করলেন। সমাজের অন্যায় হতে দূরে সরে থাকলেন, অবিচার দূর করবার চেষ্টা চালালেন; কিন্তু কোন মতাদর্শের প্রচারক হলেন না, নেতা হতে চাইলেন না।
অন্যদিকে, সত্যবাদিতা-ন্যায়পরায়ণতার জন্য নিজের চারপাশের সকলের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন, ভালবাসায় ধন্য হলেন। চল্লিশ বছর বয়স কাল পর্যন্ত এভাবেই কাটলো তাঁর নিস্তরঙ্গ জীবন, বলা যায় জীবনের প্রথম পর্যায়।
তারপর তাঁর জীবনের দ্বিতীয় পর্যায় এসে গেলো। তিনি নির্জনে ধ্যানস্থ হলেন। ‘মানবতার মুক্তি কিসে?’–এই প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাবার সাধনায় রত হলেন। পার্থিব জগত, লোকালয় থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রেখে দিনের পর দিন পাহাড়ের গুহায় পড়ে থাকলেন।
অবশেষে, একদিন তিনি নেমে এলেন। ফিরে এলেন একজন পরিবর্তিত মানুষ রূপে। জন্মভূমির মানুষের কাছে পেশ করতে শুরু করলেন এক কালজয়ী মতবাদ, এক অনিবার্য বিপ্লবের ইশতেহার।
কিন্তু হাজার বছরের লালিত বিশ্বাস আর মূল্যবোধের সাথে চরম বৈপরীত্য অনুধাবন করে, তারা মেতে উঠলো নির্মম বিরোধিতায়। এ নতুন আদর্শ যেন তাদের অহমের বারুদে অগ্নিসংযোগ করলো। কাল পর্যন্ত তাদের কাছে যিনি ছিলেন সত্যবাদিতা-ন্যায়পরায়ণতার উজ্জ্বল প্রতিভূ; সেই তাঁকেই আজ পেতে হলো ’মিথ্যেবাদী’,’উন্মাদ’, এমনকি ’যাদুকর’ উপাধি। তাঁর উপরে নেমে এল অত্যাচারের খড়গহস্ত। যে মুষ্টিমেয় ক’জন তাঁর আদর্শে দীক্ষা নিলো, তারাও বাদ পড়লো না। বিদ্রুপবান, শারিরীক নির্যাতন হতে শুরু করে হত্যা পর্যন্ত সবই সইতে হলো তাঁদের। সুদীর্ঘ এক যুগ সব অত্যাচার নিরবে সহ্য করে তিনি তাঁর আদর্শকে প্রচার করে চললেন। শেষ পর্যন্ত যখন দেখলেন, এই অনুর্বর জমিনে আর কোন ফসল ফলবে না, তখনই তিনি ও তাঁর সাথীরা মৃত্যুর পরোয়ানা মাথায় নিয়ে বিতাড়িত হলেন জন্মভূমি হতে। বসতি গড়লেন এক নতুন নগরীতে।
এখানেই শুরু হলো তাঁর জীবনের তৃতীয় এবং শেষ অধ্যায়। বিপ্লবের এক উর্বর ভূমির সন্ধান পেয়ে গেলেন তিনি। ছোট্ট কিন্তু সুগঠিত একটি নগর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলেন, যাকে অংকুরেই বিনষ্ট করবার হিংস্র প্রয়াসে চারিদিক হতে ছুটে এলো শত্রুতার উত্তাল তরঙ্গ। ভেতরে-বাইরে বিস্তৃত ষড়যন্ত্রের জাল তাঁর পথকে করে তুললো বিপদসংকুল।
এবার, তিনি কিন্তু আর মুখ বুঝে সইলেন না, রুখে দাঁড়ালেন। সকল বাধা-বিঘ্নকে মোকাবেলা করলেন দক্ষ হাতে। অবশেষে, যে জন্মভুমির মাটি হতে রিক্ত হস্তে তিনি বিতাড়িত হয়েছিলেন, সেখানেই প্রবেশ করলেন বিজয়ীর বেশে– দশ সহস্র একনিষ্ঠ অনুসারী নিয়ে। জীবন সায়াহ্নে তিনি ছিলেন বার লক্ষ বর্গমাইল বিস্তৃত এক সুবিশাল সম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি। প্রায় লক্ষাধিক নিবেদিতপ্রাণ অনুসারীর সামনে এক চিরস্মরণীয় বিদায়ী ভাষণ দিয়ে তিনি এই সম্রাজ্যের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলেন এবং অল্প ক’দিন পরে এ ধরাধাম ত্যাগ করলেন।
বালাগাল উলা বি-কামালিহি,
কাশাফাদ্দুজা বি-জামালিহি,
হাসুনাত জামিউ খিসালিহি,
সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহি।
পরিপূর্ণ মানুষ তিনি, উচ্চকিত সাধনায়,
আঁধার বিলিন হলো, তিনি এলেন এ ধরায়,
চরিত্রের দ্যুতিতে তিনি দুর্লভ অতি,
সালাম জানাই তাঁকে ও তাঁর পরিবারের প্রতি।
তাঁর জীবন সম্পর্কে এতটুকু জানলেই তাঁকে অনায়াসে ইতিহাসের একজন উল্লেখযোগ্য বিপ্লবী ও রাজনৈতিক নেতা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। বস্তুতঃ এই ব্যক্তিটি মানব ইতিহাসের সবচাইতে বর্ণাঢ্য ও নাটকীয় চরিত্র।
কী নেই তাঁর জীবনে! ত্যাগ-তিতীক্ষা, ধৈর্য-শৌর্য্য-বীর্য্য, মানবপ্রেম, যুদ্ধ-বিগ্রহ, আনন্দ-বেদনার সম্মিলিত এক মহাকাব্য। মানবচরিত্রের দ্বৈত সত্ত্বার এমন অপূর্ব কল্যাণমুখী সামঞ্জস্য তাঁর পূর্বে ও পরে আর কখনই দেখা যায় নি।
একদিকে, সৃষ্টিকর্তার ধ্যানে সার্বক্ষণিক নিমগ্ন তিনি এক উদাসী বাউল। অন্যদিকে, স্বীয় রাজ্যের প্রতিটি প্রজার অধিকার আদায়ে সর্বোচ্চ সতর্ক এক ন্যায়পরায়ণ সম্রাট, এমনকি রাস্তায় দেখা হলে এক শিশুর পোষা জীবটির খবর নিতেও তিনি কুন্ঠা বোধ করেন না। অত্যাচারীর বিরুদ্ধে তিনি সর্বদাই পাথরকঠিন; অথচ, অত্যাচারিতের প্রতি তিনি সদয় ও কোমল। পাহাড়-প্রমাণ স্তুপাকৃতি অর্থ-সম্পদ তাঁর দরবারে জমা হবার কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই গরীব-দুঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দেয়া হয়, আর তিনি নিজের ঘরে ফিরে আসেন শূণ্য হাতে, হয়ত সপ্তাহের পর সপ্তাহ এই চিরদুঃখী সম্রাটের ঘরের চুলোটাও জ্বলেনি। এতটাই সাহসী তিনি, কয়েক শত অনুসারী নিয়ে হাজার শত্রুর মোকাবেলায় দাঁড়িয়ে যান অটল পর্বতের দৃঢ়তায়; অথচ, এতটাই শান্তিকামী যে, অপ্রস্তুত শত্রুর কোমর ভেঙ্গে দেবার পূর্ণ সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সন্ধি প্রস্তাব পাবার সাথে সাথে তা গ্রহণ করে নেন দ্বিধাহীন চিত্তে।
যেদিন তিনি তাঁর মাতৃভূমিকে কব্জা করলেন সেদিনও তিনি শান্তি ও ক্ষমার মূর্ত প্রতীক হয়ে রইলেন। দশ সহস্র উলঙ্গ তরবারীর সামনে সেদিন সেইসব লোকগুলোই বন্দী ছিল যারা বিগত দুই দশকে তাঁকে এক মুহূর্তের জন্য ও শান্তিতে বিশ্রাম নিতে দেয় নি। অত্যাচার ও ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়ে তাঁকে জন্মভূমি ছাড়া করেছে, অনাবশ্যক যুদ্ধে জড়িয়েছে, এমনকি হত্যা পর্যন্ত করতে চেয়েছে। সেদিন হাতের মুঠোয় পেয়েও তিনি নির্দ্বিধায় তাদের ক্ষমা করে দিলেন।
এই মানুষটির জীবন দুনিয়াকে বারবার হতবাক করে দেয়। আশ্চর্য্য মানুষ তিনি! মেষের রাখাল হতে শুরু হয়েছে তার জীবন। প্রথম চারটি দশক তিনি সমাজের আর দশজন সাধারন মানুষের মতই কাটিয়েছেন। নিরক্ষর; নিজের নামটুকুও লিখতে জানেন না, লিখিত কিছুই পড়তে জানেন না। যুদ্ধবাজ সমাজের মাঝে থেকেও একটি তীর ছুঁড়ে মারেন নি। বাণিজ্য কাফেলার নেতৃত্ব দেয়া ছাড়া সমাজের আর কোথায় নেতার আসনে বসেন নি।
অথচ, হেরা পর্বতের কোন এক যাদুর কাঠির স্পর্শে তিনি হয়ে উঠলেন অসাধারণ। যেদিন হতে তিনি আদর্শ প্রচার শুরু করলেন, সেদিন হতেই তিনি অন্য মানুষ। রাষ্ট্রনায়ক, সেনাপতি, বিচারক, বাগ্মী- সবই হয়ে উঠলেন তিনি।
এমন এক অত্যাশ্চর্য্য মতবাদের তিনি প্রবক্তা– যা কিনা মানব জীবনের আধ্যাত্মিক-জাগতিক, ব্যক্তিগত-পারিবারিক, সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক এমনকি আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলের প্রতিটি বিষয়ে বিগত চৌদ্দটি শতক ধরে বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান দিয়ে আসছে। এমন এক বাণী তিনি নিয়ে এলেন যার সমতূল্য কোন কিছুই মানুষ আজ পর্যন্ত তৈরি করতে পারেনি।
শুধু কি তাই? তাঁরই যাদুকরী স্পর্শ তাঁর চারপাশের মানুষগুলোর মাঝে নিয়ে এল এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন। আগেই বলেছি, যে মাটি হতে বিগত কয়েকটি শতকে গুটিকতক নামকরা কবি ছাড়া আর একটাও বিখ্যাত মানুষের জন্ম হয় নি, সেখান হতে কাতারে কাতারে বের হয়ে এলো সমাজতত্ত্ববিদ, দার্শনিক, রাজনীতিবিদ, বিশ্ববিজয়ী সমরনায়ক, শিক্ষক, আইনজ্ঞ আর বিজ্ঞানী। এরা একই সাথে ছড়িয়ে পড়লো পৃথিবীর প্রান্তরে আর সিকি শতাব্দীর ব্যবধানে তাঁর এই মতবাদকে ছড়িয়ে দিলো এশিয়া, ইউরোপ আর আফ্রিকার কোণায় কোণায়।
হাজার বছর ধরে যে পারস্য ও রোমান সম্রাজ্য প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের নিরপরাধ মানুষগুলোর উপর শোষণের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছিল, দু’যুগ অতিক্রান্ত হবার পুর্বেই তাঁর অনুসারীদের হাতে এরা ইতিহাসের অংশ হয়ে গেল। অমিত শক্তিধর পারস্য সম্রাজ্যের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে গেল আর রোমান সম্রাজ্য ইউরোপের এক কোণায় বসে নিভু নিভু হয়ে জ্বলতে লাগলো।
ন্যায় ও সাম্যের বাণীতে দলে দলে মানুষ দীক্ষা নিতে শুরু করলো। জ্ঞানার্জন ও বিতরণে তাঁর শিষ্যরা সকল যুগের জন্য আদর্শ হয়ে রইলেন। দুই সহস্রাব্দের বেশি সময় ধরে ঘুমিয়ে থাকা গ্রীক ও রোমান বিজ্ঞান ও সমাজ-দর্শনকে এরা আধুনিকতার ছাঁচে ঢেলে জাগিয়ে তুললেন। চীন-ভারতবর্ষ যেখানেই তারা দেখতে পেয়েছেন জ্ঞানের সামান্যতম মণি-মুক্তা, সেখান হতে তাই তুলে এনেছেন নিঃসংকোচে। তাঁদের এ অক্লান্ত পরিশ্রম পাশ্চত্যে রেনেসাঁ নিয়ে এলো।
এখানেই শেষ নয়! যে মানুষটির সোনার কাঠির স্পর্শে এত পরিবর্তন, তাঁর জীবনী ও শিক্ষাকে ধরে রাখতে তাঁর অনুসারীরা যে পরিশ্রম করেছে, যে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়েছে, তার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে আর একটিও নেই। তাঁর প্রতিটি কাজ, মুখ হতে নিঃসৃত প্রতিটি বাণীকে তারা পুস্তকের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় বন্দী করে ফেলেছে। এমনকি, তাঁর সম্পর্কে অন্তত একটি কথাও বলেছে, এ ধরনের প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক ব্যক্তির জীবনী গ্রন্থও তাঁর অনুসারীরা সংকলন করে রেখে দিয়েছে। তিরোধানের পর চৌদ্দটি শতক পেরিয়ে যাওয়ার পরও তাই তিনি জীবন্ত।
পৃথিবীর অন্য সকল মহান ব্যক্তিত্বের জীবন-ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এমন গুণ-বৈশিষ্ট্যের কাছাকাছি কেউ পৌঁছে গেলেই হয়ে ওঠেন চরম একনায়ক কিংবা স্বৈরশাসক। অথচ, এ মানুষটি সারাজীবনই ছিলেন গণতন্ত্রের পতাকাবাহী। সংখ্যাগরিষ্ঠ অনুসারীগণের মতামতের সামনে স্বীয় মতামতকে বিসর্জন দেবার বহু নজীর রয়েছে তাঁর জীবনে।
আবার, এমন মানুষের তিরোধানের পর শিষ্যরা তাঁদেরকে দেবতা কিংবা অতিমানবের পর্যায়ে নিয়ে যায়। খোদার পুত্র, অবতার- কত কত বিশেষণ!
কিন্তু, এই অনন্যসাধারণ ব্যক্তিটি নিজেকে আজীবন মাটির মানুষের চাইতে বেশি কিছু ভাবেন নি, বলেনও নি। তাঁর অনুসারীরাও তাঁকে টেনে-হিঁচড়ে দেবতার আসনে বসাবার অপচেষ্টা চালায় নি, বরং তাকে সমগ্র মানবতার জন্য সর্বযুগের-সর্বকালের আদর্শরূপে চিত্রিত করেছে।
“মুহাম্মদ (ﷺ) আপনি এমন কেন
আমার উপকূল জুড়ে আপনার বেলাভূমি
তায়েফের বনে একজন রক্তাক্ত মানুষের দুর্লভ উচ্চারণ থেকে
আমার দূরত্বকে আমি বাড়াতে পারিনি কোনোদিন…”
এ মানুষটির সাথে বিশ্বমানবতার দূরত্ব বাড়ে না কোনদিন। শান্তির অন্বেষায় বারে বারে তাঁর দরবারেই আমাদের ফিরে ফিরে আসতে হয়।







