প্রচ্ছদবই নিয়েসংবেদনশীল পাঠকের গভীর বোধকে নাড়িয়ে দেয়া কাব্যগ্রন্থ

লিখেছেন : নুসরাত সুলতানা

সংবেদনশীল পাঠকের গভীর বোধকে নাড়িয়ে দেয়া কাব্যগ্রন্থ

নুসরাত সুলতানা 

ভূমিকা : কবি মোস্তফা হক দ্বিতীয় দশকের একজন গভীর জীবনবোধের কবি। কবির সম্পর্কে আমি জানতে পারি সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই। আগ্রহী হয়ে উঠি এই কবিকে পাঠ করতে। সংগ্রহ করি “সিজোফ্রেনিয়া ” কাব্যগ্রন্থটি।

পাঠানুভূতি: কবিতা বা পদ্য হচ্ছে শব্দ প্রয়োগের ছান্দসিক কিংবা অনিবার্য ভাবার্থের বাক্য বিন্যাস — যা একজন কবির আবেগ-অনুভূতি, উপলব্ধি ও চিন্তা করার সংক্ষিপ্ত রূপ। এবং তা অত্যাবশ্যকীয়ভাবে উপমা-উৎপ্রেক্ষা-চিত্রকল্পের সাহায্যে আন্দোলিত সৃষ্টির উদাহরণ। এভাবে চাইলেই কবিতাকে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব হয়তো বা। কিন্তু প্রকৃত অর্থে কী কবিতার কোনো সংজ্ঞা হয়? কবিতা মৃত্যু, ক্ষুধা আর তীব্র কামের মতো বিমূর্ত। তাকে কেবলই উপলব্ধি করা যায়। কিংবা বলা যায় কবিতা একখণ্ড জলদগম্ভীর মেঘ যে পাঠকের মনে ও মননে ঝমঝম করে বৃষ্টি নামাতে পারে। 

পাঠক হিসেবে আমি “সিজোফ্রেনিয়া” কাব্যগ্রন্থটি যতই পড়েছি ততই জীবনের বিচিত্র এবং গভীর উপলব্ধি এবং অনুভূতির সন্ধান পেয়েছি। আসুন দেখে নিই কবির কয়েকটি কবিতার কয়েকটি পংক্তি। 

“জলের মতন মুক্তি চাই প্রাণোচ্ছল বাধাহীন 
পূর্ণতা পাক করোতলগত চির আধেক দিন
কেবলই আদর চাষ করুক বুকের জমিন
রোদের কোলে উঠুক অনাহুত এ বৃষ্টির দিন”
—- পৃষ্ঠা -১২। কবিতা – আলোর প্রার্থনা। 

কবিতা যেমন কবিতর নিজের দু:খবোধ বা বেদনাকে আশ্রয় করে বেড়ে ওঠে। তেমনি তা সার্বজনীন। শ্রেনী লিঙ্গ, বয়স ভেদ করে তা সবার হৃদয়ে ঝংকার তোলে।
কবি মোস্তফা হকের এই পক্তিগুলো তেমনি নারী-পুরুষ, যুবক-বৃদ্ধ, ধনী-গরিব সবার প্রাণে ঝংকার তোলে। কারণ মানুষ একই সাথে সম্পর্কের বা ভালোবাসার ওম চায় এবং স্বাধীন মুক্ত জীবন চায়। কিন্তু দুটির দেখা একসাথে পাওয়া যেন বাঘের দুধের সন্ধান পাওয়া। আর এই আদরের আকাঙ্খা সকল মানুষের চিরকালীন। এখানেই কবি অত্যন্ত সার্থকতার সাথে সকল মানুষের কবি হয়ে উঠেছেন।

আধুনিক কবিতাকে উপমা, উৎপ্রেক্ষা, শব্দচয়ন এবং রূপকের সম্মিলনে হয়ে উঠতে হয় বিমূর্ত। একই কবিতা একেক পাঠকের কাছে একেক রূপে ধরা দেবে। কবি মোস্তফা হকের “সিজোফ্রেনিয়া ” কাব্যগ্রন্থটিকে সেদিক থেকেও আমার বেশ সমৃদ্ধ এবং মননশীল মনে হয়েছে। কবি বিভিন্নভাবেই প্রয়োগ করেছেন তাঁর কাব্যিক অভিজ্ঞান। আসুন চোখ বুলাই কয়েকটি কবিতার কয়েকটি পঙক্তিতে।

“শূন্যের ইট দিয়ে গড়ি বাতাসের দুর্ভেদ্য দেওয়াল
শূন্যতাকে লাটায় দিয়ে উড়ায় তোমার পূর্ণ আকাশে
সুখ রাজপথ ধরে একা পথিকের মতো চলে গ্যাছে”
— আকন্ঠ দু:খ, পৃষ্ঠা -১৯।

“আলোকলতা নীলাঞ্জন নীলাঞ্জন ছায়া ফেলো কপোতাক্ষের জলে,
হাত ভরে ভিক্ষা দাও আমার প্রিয় অনিন্দ্য সুন্দর 
সূর্যের বলরেখা ভেঙে আসে আঁধারের অসতী স্রোত “
—  আলোকলতা, পৃষ্ঠা-২০।

আলো এবং দু:খ মানবজীবনের সার্বজনীন দুটি উপাখ্যান এটি যেমন ধ্রুব সত্য। তেমনি এও সত্য এই দুটিরই কোনো স্থায়ী এবং একক রূপ বা আদল নেই। একেকজনের দু:খবোধের সীমারেখা একেকরকম। আর আলোও একেকজনের কাছে আসে একেক উপাধ্যায় হিসেবে। উপরে উল্লিখিত দুটি কবিতার পংক্তি ও তাই বহুমাত্রিক এবং বহুজনের পাঠে বহু অর্থ বহনকারী।

একুশ শতকের সভ্যতার এক গভীর, পুরু অন্ধকার দিক চেতনার বিলুপ্তি, আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থান্ধতা এবং বিচ্ছিন্নতা। প্রত্যেক কবি বা লেখককেই এই হতাশাবোধে আমরা নিমজ্জিত হতে দেখি। মূলত কবি সংবেদী, ত্রিকালদর্শী বিশুদ্ধ আত্মা। তাই আফ্রিকার শিশুর চোখের জল আর এশিয়ান শিশুর চোখের জল তার কাছে একই। কবি বোঝেন এই ধরনীর প্রাণের স্বরলিপি। মোস্তফা হকের কাব্যপ্রচেষ্টাও সেই শুভবোধেই লীন হয়েছে। সুপ্রিয় পাঠক আসুন পড়ে নিই নীচের পংক্তিগুলো। 

“আমরা সবাই ঘুমিয়ে আছি একজন জাগুক
কেউ একজন জেগে উঠুক এ কাল ঘুম থেকে 
পৃথিবীর বয়স হলো ঢের, সময় বুড়ি হলো;
মানুষের থেকে আজ শামুকের সংখ্যায় বেশি “
—- কেউ একজন জাগুক, পৃষ্ঠা- ২১

মানুষের থেকে আজ শামুকের সংখ্যায় বেশি। এই পংক্তিতে কবি মনুষ্যত্বের বিপর্যয়কে একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। তেমনি দেখিয়ে দিয়েছেন সমাজ-সভ্যতার বাস্তব চিত্র।

একই চিন্তাধারা পরিপুষ্ট হতে দেখি কবির “কাল পুরুষ” এবং” সিজোফ্রেনিয়া” কবিতা দুটিতে। চলুন চোখ বুলাই কিছু পঙক্তিতে।

“ঘিরে ধরেছে দিগম্বর আঁধার, বুকের মাঝে
অধোনীল নি:শ্বাস, নিরন্দ্র কালিমায়
পোড়ে প্রেমের পিশাচ পোশাক, পান্ডুর হৃদয়ে
আলস্যমথিত সময়ে অবিনাশী এক ভ্রষ্ট সচলতা।”
—  কালপুরুষ, পৃষ্ঠা- ৬৭

“দূরে ভাসে ঐ কাদের কন্ঠ, মশাল জ্বালানো হাত?
ধীরে ধীরে আরো গভীর হয় নিকষ কালো রাত
ছুটে আসে শত মোটর সাইকেল ঘৃণা আক্রোশে
…….
অবিশ্বাসের করুণ হাসি বুকের ভেতর ফোটে”
— সিজোফ্রেনিয়া, পৃষ্ঠা-৭০।

এই কবিতা দুটিতে আমরা স্পষ্টতই দেখতে পাই- কবির মানসে জেঁকে বসেছে সাম্রাজ্যবাদীতা, বিশ্বায়ন এবং সংস্কৃতির পরাজয়ের গভীর বেদনা। কবি যেন আহত পাখির মতো ডানা ঝাপটান এই কবিতা তারই শৈল্পিক প্রকাশ।

আধুনিক কবিতার উল্লেখযোগ্য একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নানান বিষয়কে যথাবিহিত শব্দবিন্যাসে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উপস্থাপন করা। যেখানে কবির সৃজনশীল রচনা সময়ের দাবিতে, সমকালের আহবানে, মানব চেতনায় ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে। কবি মোস্তফা হকের কাব্যগ্রন্থ “সিজোফ্রেনিয়া” সেই অভিজ্ঞানেও সমৃদ্ধ। একথা একজন কবি এবং কবিতার নিবিড় পাঠক হিসেব দৃঢ়তার সাথেই বলতে পারি। চলুন খুঁজে দেখি এই কথার সুনির্দিষ্ট প্রমান।

“তোমার মুখ থেকে সাহসে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছি
কাঁদে বিধবা সূর্যের আলোহীন ধুসর শরীর, 
আঁধার জেঁকে বসেছে জোঁকের মতো রাস্তার মোড়ে।”
— তোমার মুখ, পৃষ্ঠা – ৬৪।

“কোনো এক রাতে ভোরের দিকে ঘুমের ভেতর যদি মরে যাই
আমি জানবোই না আমি মরে গেছি অথচ আর একটি
সকালে জেগে ওঠার প্রত্যাশায় ঘুমিয়ে থাকবো”
— ঘুমের ভেতর, পৃষ্ঠা- ৬২।

এমনিভাবেই “সিজোফ্রেনিয়া” আমাদের বলে যায় এই অস্থায়ী মানবজীবনে চোরাবালিতে বাসা বাঁধার কথা। বলে যায় সমাজ-সভ্যতার পরতে পরতে লেপ্টে থাকা অন্ধকারের কথা।

কবিতার শরীর এবং শব্দচয়ন : কবিতার বিনির্মানেও রয়েছে বেশ বৈচিত্র্য। বইটিতে দুই পৃষ্ঠার কবিতা যেমন আছে তেমনি পাঁচ লাইনের কবিতাও আছে। 
কবিতার শব্দচয়নে  বেশ চমৎকারিত্ব রয়েছে। চলুন দেখি কিছু উদাহরণ – বিধবা সূর্য, আততায়ী দিন, কামনার শীর্ষাকাশ ইত্যাকার দারুণ সব শব্দচয়ন গ্রন্থটিকে সুখপাঠ্য করে তুলেছে।

শেষ কথা: উপমা, উৎপ্রেক্ষা, শব্দচয়ন, ছন্দ, ভাবের গভীরতা পরও অনেক কবিতাই সুখপাঠ্য হয়ে ওঠে না। কারণ সেইসব কবিতায় প্রাণপ্রাচুর্যের অভাব থেকে যায় অনেকটাই। মোদ্দাকথা হল- কবিতা যেভাবে লেখা হোক না কেন, তার মধ্যে একটা ঝোঁক বা তরঙ্গের উপস্থিতি থাকতে হবে। যদি কোন কবিতা ধ্বনিগুলোর সমন্বয়ে অর্থনির্ভর ছন্দস্পন্দনে তরঙ্গায়িত হয় তখন তা কবিতা হয়ে উঠতে পারে। কেননা একটি যথার্থ কবিতার মাঝে কোন না কোনভাবে ছন্দময়তা থাকে। 
কবি কতটা নিমজ্জিত হয়ে লিখেছেন সেটা কবিতা পাঠেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কবিতায় রাগ, ক্ষোভ, প্রেম, ভালোবাসা, মুগ্ধতা, ঘৃণা, মানবতা, সমাজভাবনা যাই থাকুক সেটা কবিকে কতটা তাড়িয়ে বেরিয়েছে সেই বিবেচনাও কবিতার সার্থকতার আলোচনায় প্রাধান্য লাভ করে। সেসব বিবেচনায়ও বলা যায়- কবি মোস্তফা হকের কাব্যগ্রন্থ সিজোফ্রেনিয়া একটি উৎকৃষ্ট এবং মননশীল গ্রন্থ এবং তিনি একজন নিমগ্ন কবি।

কবিতা সাহিত্যের নান্দনিকতম শাখা। মোস্তফা হকের কাব্য প্রচেষ্টা অগ্রগামী পাঠককে আলোড়িত করবে সেটাই কাম্য।  সিজোফ্রেনিয়া বহুল পঠিত হবে সেটা একজন নিবিড় পাঠক হিসেব একান্ত প্রত্যাশা। 
বইটির প্রকাশক প্রসিদ্ধ প্রকাশনী এবং প্রচ্ছদ করেছেন রাজীব দত্ত।

……………………………….
লেখক : কবি ও কথাসাহিত্যিক

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা