খোরশেদ মুকুল
ঈদের সকাল শুরু হয় এক ধরনের নীরব আলো দিয়ে। ত্রিশ দিনের সংযম, ধৈর্য ও আত্মনিয়ন্ত্রণের পর যে প্রশান্তি মানুষের ভেতরে জন্ম নেয়, ঈদ সেই প্রশান্তিরই সামাজিক প্রকাশ। তাই ঈদ কেবল আনন্দের দিন নয়; এটি এক গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার পরিণতি। সেই কারণেই ঈদকে ঘিরে পত্রিকাগুলো যে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে, সেগুলোর প্রচ্ছদও নিছক নান্দনিকতার বিষয় হতে পারে না। একটি প্রচ্ছদ আসলে সেই অভিজ্ঞতার দৃশ্যমান ভাষা—একটি উৎসবের আত্মার প্রথম প্রকাশ।
রমজান মানুষকে কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার অনুশীলন দেয় না; এটি মানুষকে ভেতর থেকে পুনর্গঠনের এক সুযোগও এনে দেয়। দিনের পর দিন সংযম পালন করতে করতে মানুষ উপলব্ধি করে আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্তি, ধৈর্যের সৌন্দর্য এবং অন্য মানুষের দুঃখ বোঝার প্রয়োজনীয়তা। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী যাকাত ও ফিতরার মাধ্যমে সমাজের দরিদ্র মানুষের সঙ্গে সম্পদ ভাগ করে নেওয়ার যে নৈতিক দায়িত্ব, রমজান সেই বোধকে আরও গভীর করে। ফলে ঈদ যখন আসে, সেটি কেবল আনন্দের উচ্ছ্বাস নয়—এটি সংযম, সহমর্মিতা ও নৈতিক জাগরণের এক সামষ্টিক উদযাপন। সবকিছু ছাপিয়ে এটা মহান আল্লাহর এক অমোঘ বিধান। এই বহুমাত্রিক চেতনাই ঈদ সংখ্যার প্রচ্ছদের মূল প্রেরণা হওয়া উচিত।
কিন্তু এ বছরের বিভিন্ন পত্রিকার ঈদ সংখ্যার প্রচ্ছদগুলোর দিকে তাকালে একটি বৈচিত্র্যময় অথচ অসম চিত্র চোখে পড়ে। কোথাও আধ্যাত্মিকতার স্পর্শ রয়েছে, কোথাও লোকজ উৎসবের রঙিন আবহ, আবার কোথাও এমন শিল্পভাষা দেখা যায় যা ঈদের চেতনাকে স্পর্শই করতে পারে না। এই বিচিত্রতার ভেতর দিয়ে একটি প্রশ্ন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে—বাংলাদেশের মূলধারার পত্রিকাগুলো কি ধীরে ধীরে ঈদের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পরিচয়কে দৃশ্যমান শিল্পভাষা থেকে সরিয়ে দিচ্ছে?
এই প্রশ্নের ভেতরেই একটি ব্যতিক্রম হিসেবে সামনে আসে আমার দেশ–এর প্রচ্ছদ। ইসলামি স্থাপত্যের সুউচ্চ খিলান, গভীর বাদামি-লাল পটভূমি এবং সোনালি আভায় আলোকিত চাঁদের সমন্বয়ে সেখানে একটি গভীর আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি হয়েছে। এই চাঁদ নিছক অলঙ্কার নয়; এটি রমজানের সমাপ্তি ও ঈদের সূচনার প্রতীক। স্থাপত্যের খিলান যেন এক নীরব দরজার মতো, যার ভেতর দিয়ে মানুষ সংযমের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে এগিয়ে আসে। এই প্রচ্ছদ দেখলে মনে হয়, এখানে ঈদকে কেবল উৎসব হিসেবে নয়, একটি আধ্যাত্মিক মুহূর্ত হিসেবে ভাবা হয়েছে।
অন্যদিকে বেশ কয়েকটি পত্রিকার প্রচ্ছদে দেখা যায় ভিন্ন এক প্রবণতা—ঈদের ধর্মীয় পরিচয়ের পরিবর্তে বাংলার লোকজ শিল্পঐতিহ্যের আশ্রয় নেওয়া। প্রথম আলো ও সমকাল–এর প্রচ্ছদে পাখি, ফুল ও লতাপাতার লোকজ মোটিফ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে। উজ্জ্বল রঙ ও নকশার সমন্বয়ে সেখানে একটি উৎসবমুখর আবহ তৈরি হয়েছে। দেখতে ভালো লাগে, উৎসবের এক উষ্ণতা অনুভূত হয়। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে মনে একটি প্রশ্ন জাগে—এই আনন্দ কি ঈদের বিশেষ আনন্দ, নাকি যে কোনো উৎসবের সাধারণ আনন্দ? পহেলা বৈশাখ বা নবান্নের সংখ্যার প্রচ্ছদেও এই একই মোটিফ সমানভাবে মানিয়ে যেত। ফলে লোকজ সৌন্দর্যের ভেতরে ঈদের যে নিজস্ব আধ্যাত্মিক পরিচয়, সেটি অস্পষ্ট হয়ে যায়।
একই ধরনের প্রবণতা সাম্প্রতিক দেশকাল ও কালের কণ্ঠ–এর প্রচ্ছদেও লক্ষ্য করা যায়। কাটআউট শিল্পের পাখি, রঙিন নকশা এবং উৎসবের ইঙ্গিত সেখানে উপস্থিত, কিন্তু ঈদের নির্দিষ্ট কোনো চিহ্ন নেই। যেন আনন্দ আছে, কিন্তু সেই আনন্দের উৎস সম্পর্কে প্রচ্ছদ নিজে কোনো বক্তব্য দিতে চায় না। লোকজ শিল্পের সার্বজনীনতা হয়তো একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক আবহ তৈরি করে, কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় ঈদের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পরিচয়টি প্রায় অনুপস্থিত হয়ে পড়ে।
আরও কিছু প্রচ্ছদে দেখা যায় শিল্পের একেবারেই ভিন্ন ভাষা—বিমূর্ততা ও ব্যক্তিগত শিল্পচর্চার জগৎ। দেশ রূপান্তর–এর প্রচ্ছদে বিমূর্ত নারী অবয়ব, শব্দঘর–এর জ্যামিতিক প্যাটার্ন কিংবা প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকার তৈলচিত্রধর্মী পটভূমি শিল্পের দৃষ্টিতে আকর্ষণীয় হতে পারে, কিন্তু ঈদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া কঠিন। একটি বিশেষ উপলক্ষের সংখ্যার প্রচ্ছদ যদি সেই উপলক্ষের চেতনাকেই ধারণ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেখানে শিল্পের সৌন্দর্য থাকলেও অর্থের একটি শূন্যতা তৈরি হয়।
সবচেয়ে বেমানান মনে হয় বনিকবার্তা সিল্করুট–এর প্রচ্ছদটি। গাঢ় লাল পটভূমিতে একটি বিষণ্ণ নারীমুখের অভিব্যক্তি ঈদের মূল আবহের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। রমজানের দীর্ঘ সাধনার শেষে মানুষ যে প্রশান্তি ও মুক্তির অনুভূতি নিয়ে ঈদ উদযাপন করে, সেই আলোর কোনো ইঙ্গিত এই চিত্রে নেই। অন্যদিকে নয়া দিগন্ত চাঁদের প্রতীক ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে বটে, কিন্তু দুর্বল নকশা ও কৃত্রিম রঙের কারণে সেই চাঁদ ঈদের গভীর আধ্যাত্মিক বার্তা বহন করতে পারেনি। এতে যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—চাঁদ আঁকলেই ঈদের আত্মা ধরা পড়ে না। এরমধ্যে দৈনিক সংগ্রাম–এর প্রচ্ছদটি তুলনামূলকভাবে এক ধরনের প্রতীকী ভারসাম্য রক্ষা করেছে। এখানে মিনার-আকৃতির স্থাপত্যরেখা, আকাশের বুকে শোভা পাওয়া চাঁদ ও তারকার উপস্থিতি ঈদের ধর্মীয় পরিচয়কে স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়। একই সঙ্গে রঙের উচ্ছ্বাসময় বিস্তার উৎসবের প্রাণবন্ত আবহ তৈরি করেছে। চাঁদ ও মসজিদঘন স্থাপত্যরেখার উপস্থিতি অন্তত এটুকু নিশ্চিত করে যে প্রচ্ছদটি ঈদের ধর্মীয় মুহূর্তকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যায়নি; বরং উৎসবের রঙের ভেতরেই সেই চেতনাকে প্রতীকীভাবে ধারণ করার চেষ্টা করেছে।
সব মিলিয়ে এ বছরের ঈদ সংখ্যার প্রচ্ছদগুলো আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রেখে যায়। বাংলার লোকজ শিল্প অবশ্যই আমাদের ঐতিহ্যের গর্বিত অংশ, কিন্তু ঈদ সংখ্যার প্রচ্ছদে যদি ঈদের নিজস্ব ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পরিচয় অনুপস্থিত থাকে, তাহলে সেই নান্দনিকতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কারণ একটি প্রচ্ছদ কেবল একটি ছবি নয়; এটি পাঠকের সামনে একটি দরজা খুলে দেয়—যার ভেতর দিয়ে সে উৎসবের জগতে প্রবেশ করে।
ঈদের উৎসবের রঙ যতই উজ্জ্বল হোক, তার গভীরতম আলোটি আসে মানুষের ভেতর থেকে। রোজার দীর্ঘ সাধনায় যে আত্মা পরিশুদ্ধ হয়, যে হৃদয় দয়া ও সহমর্মিতায় নরম হয়ে ওঠে, সেই আত্মার আনন্দই প্রকৃত ঈদ। যে প্রচ্ছদ সেই আত্মার আলো ধারণ করতে পারে, সে-ই সত্যিকারের ঈদ সংখ্যার মুখ হয়ে ওঠে। আর যে প্রচ্ছদ কেবল রঙের উৎসবে সীমাবদ্ধ থাকে, সেখানে ঈদের অন্তর্গত চেতনাটি অধরাই থেকে যায়। ঈদ তাই কেবল আকাশে চাঁদ ওঠার ঘটনা নয়। ঈদ আসলে মানুষের ভেতরে আলো জ্বলে ওঠার মুহূর্ত। আর সেই অন্তরের আলোর প্রতিধ্বনি যদি কোনো প্রচ্ছদে ধরা পড়ে—তবেই বলা যায়, সেটিই সত্যিকারের ঈদ সংখ্যার মুখ।
…………..
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক







