রেজা নুর
টেনিসনের কবিতা, “টিতৌনাস” -এর অনুবাদ নিয়ে এক দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদক সাহেবের কাছে গেলে তিনি ফিরিয়ে দিলেন। মন-মরা হয়ে ঘরে এলাম। অন্ধকারের বিষন্নতার ভোরে একরেখা আলোর তীরে সচকিত হয়ে উঠলাম। মনে হলো, ইত্তেফাকে, কবি আল মুজাহিদী’র কাছে যাই না কেন?
সত্যি বলতে তখন সাহস হয়নি। এতবড় পত্রিকা, সমৃদ্ধ সাহিত্য-পাতা। তবু গেলাম। প্রথম দেখায়, এক নিবিড়চোখে দেখলেন আমাকে। বসতে বললেন। কুশলবিনিময়ের পরে, লেখাটা হাতে দিলাম। সে-সপ্তাহের সাহিত্য সাময়িকীতে ছাপা হলো। শুক্রবার সকালে গুলশান থেকে কয়েকটি কপি কিনলাম। বার বার দেখতে লাগলাম কবিতাটা। আলফ্রেড টেনিসনের নামের নিচে আমার নামও জ্বলজ্বল করছে। মনে হলো, আজ জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন।
মুজাহিদী ভাইয়ের অফিসেই পরিচয় হয়, কথাশিল্পী ফিরোজ আশরাফ ও কবি সৈয়দ সারোয়ারের সংগে। তাদের সংগে আমার আন্তরিকতা ও বন্ধুতা বাড়ে। দেশে গেলে, তিনবন্ধু এক রিকশায় চড়ি অথবা রোদ মাথায় নিয়ে ফুটপাথ ধরে হেঁটে চলি। লেখা জমা দিতে মুজাহিদী ভাইয়ের ওখানে যাই। আমার দেশের দিন শেষ হয়ে এলে, ফিরোজ ও সারোয়ার এয়ারপোর্ট পর্যন্ত বিদায় দিতে আসে।
কিন্তু দেশ হৃদয় থেকে কে নামাতে পারে? ফিরোজের গল্প, আমার আর সারোয়ারের কবিতা মাঝে মাঝে ছাপা হয়। মনে বয়ে যায় আনন্দের ধারা। একবার, মায়া অ্যানজেলোর কবিতা : “অন দ্য পালস্ অব মরনিং” ( On the Pulse of Morning : Maya Angelou) কবিতার অনুবাদ নিয়ে গেলাম। এই কবিতাটা কবি মায়া ক্লিনটনের অভিষেক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করেছিলেন। মুজাহিদী ভাই বললেন, “রেজা, পড়ো তো।”
আমি কাঁপা কণ্ঠে আবৃত্তির মতো পড়তে লাগলাম। মাঝে মাঝে থামছি আর কবি’র দিকে দেখছি। তার চোখেমুখে মুগ্ধতা। কয়েকবার স্বগত স্বরে বললেন, “ঝরঝরে অনুবাদ করেছ, ঝরঝরে অনুবাদ করেছ।” ভাললাগার প্রশান্তিতে ডুবে গেলাম যেন।
এরপরে, মৌলিক কবিতার সাথে সাথে আমার অনুবাদে তিনি ছেপেছেন, এমিলি ডিকিনসন, সিলভিয়া প্লাথ প্রমুখের কবিতা।
তখন নিউইয়র্ক ছেড়ে ম্যাসাচুসেটস্-এর রাজধানী বস্টনের কিছু দূরে ফ্যালমাউথে রয়েছি। ফোন এলো। মুজাহিদী ভাই আমেরিকা এসেছেন। দেখা করতে চান। দূরে থাকায়, তাঁর সংগে এখানে আর দেখা হতে পারেনি।
একবার বাড্ডা-শাহজাদপুরে, আমার আত্মীয়ের বাসায় দুপুরের দাওয়াত গ্রহণ করলেন। ফিরোজ আমি ও কবি শাহজাদপুর মসজিদে জুমুআ’র নামায পড়লাম। কবিকে সংগে নিয়ে আমরা বাসায় এলাম। খাবার পরিবেশনের আগে, অনেকগুলো বই উপহার দিলেন আমাকে। বেশ অনেকটা সময় আমাদের সাথে রইলেন। পরিবারের সবাইকে নিজের মতো করে হাসি-রসিকতায়, পরিবেশ আনন্দের করে তুললেন।
একবার নারিন্দা দিয়ে পুরনো ঢাকার কোনও জায়গায় কি যেন কাজে, মুজাহিদী ভাইয়ের সংগে রিকশায় ফিরোজ আর আমি যাচ্ছি । আমরা ভাড়া দেবার প্রস্তুতি নিলেও, মোটেই দিতে দিলেন না। তিনি দিলেন।
কবি আল মুজাহিদী —— শান্তি, মানবতা ও মানবের মৃত্তিকা লগ্নতার কথা বলেছেন, অপার মমতায়। “লোহার শেকল ছিঁড়ে” কবিতায় তাঁর এই উচ্চারণ :
“হিরোশিমা, এত অন্ধকার করে রেখেছিলে আমার গরাদ, কারাগার।
একটু প্রতীক্ষা কোরো । আর বার বার কেঁদো
অনুভূতি উজাড় করে দিয়ে। আমি
আবারও ফিরে আসবো তোমার উঠোনে। লোহার শিকল ছিঁড়ে ফেলে ভোরের
টোপরপরা পাখির মতন। অরণ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে।”
মানুষকে সত্যিকার মানবরূপে দেখতে চেয়েছেন, কবি।
তাঁর উপহারের উদার হাত বিস্তৃত: ——
“মানবজাতির অস্তিত্বের কোরক ফাটিয়ে
তুমি জেগে ওঠো। অমানবকে অন্তর্বর্তী কোরো না মানবজাতির।
আমি প্রত্যুষের উল্কিআঁকা হাত দু’টো
উপহার দিতে এসেছি তোমাকে।”
( প্রত্যুষের উল্কিআঁকা হাত দু’টো)
এ সময়ের মানুষের মনোচিত্র, অস্থির মনোবেদনা বা মনোবৈকল্যে দারুণ অভিমান তাঁর : ——
“এখন শিশুও শান্তি চায় না, চায়না
অমৃত। অমৃতে অরুচি হয়েছে বড়ো
তার পিতা ও মাতার-গুরুজনদের।
………………………………………
খোলা পার্ক, ছায়াহ্রদ, ময়দানে
এখন বারুদের বিকট গন্ধ
………………………………………
হাসির হররা বন্ধ করে দিয়েছি সেই কবে থেকে।
এসময়ে পৃথিবীতে
সভ্যতার দোরগোড়ায় আমার দায় নেই।
দুদন্ড হাসির।
সভ্যতার ক্রীতদাস
এইসব মানব শিশুর দুনিয়া কাঁপানো ঠাঠা হাসি নেই—
এক ভয়াবহ আণবিক অনিশ্চয়তা শুধু। “
কিন্তু সেই অভিভাবকপূর্ণ অভিমানে বেশিক্ষণ টিকে থাকেন না তিনি । বলেন : ——
“বিনাশের কাঁটাটিকে
একটি অমোঘ দূরত্বের দিকে সরিয়ে রাখাই ভালো।
…………………………….
হৃদয় নামক যন্ত্র হোক আমাদের পারিজাত-পুষ্প।
এই ধ্বংস আর ভস্মরাশি থেকে আমি জেগে উঠে আবার
নির্মাণ করবো পৃথিবীর মনোজ্ঞ উদ্যান।”
(নো পাসারান নো পাসারান)
রূপকথার ফিনিক্স পাখির মতো, হিরোশিমা-নাগাসাকির অগ্নি-ধ্বংস থেকে উড়ে-উঠে নতুন পৃথিবীর উত্তরণে কবি : ——
“হাড়গোড় দিয়ে পৃথিবীর নতুন কাঠামো তৈরী করো
তোমরা আমাকে হত্যা করে বেশ ভালোই করেছো।
আমি দিব্যি বেঁচে আছি
আমার নিষ্পাপ সিনার ওপর পুঁতে রেখেছিলে নৃশংসতা “
……………
আমার উত্তরসূরি আমাকে সমৃদ্ধ করে। সমুদ্রের
উৎকর্ষ অতিক্রম করে পৃথিবীর তাবৎ উত্তরণ।
আমার ধ্বংস আমাকে নির্মাণ করে । “
বহুদিন মুজাহিদী ভাইয়ের সান্নিধ্য-বঞ্চিত । বলা যায় এ স্বেচ্ছা-বঞ্চনা। এর দায় অন্য কিছু বা অন্য কারও না। দেশে ফেরার অনেকদিনের বিরতি, —- ফিরে, অন্যদিকের ব্যস্ততায় পেয়ে বসা, লেখার খাতাটি অনেকটা সময় সাদা পড়ে থাকা, … এইসব।
মৃদু-স্বর, সতর্ক-মধুর বাচনের মুজাহিদী ভাইয়ের অপ্রস্তুত, আপাত প্রচ্ছন্ন মুখখানা মনে পড়ে। একবার দেশে ফেরার পরেরদিনই বেশকিছু নতুন অনুবাদ নিয়ে গেলাম।
অবাক হলাম, তিনি এখন (খুব সম্ভবত) দ্বিতীয় তলায় বসেন দেখে। তাঁর অফিস তো আরও উপরে। লেখা ও কিছু উপহার (কলম, হাইলাইটার… ইত্যাদি) বাড়িয়ে দিলে সযত্নে নিলেন। লেখাটা বার বার দেখতে লাগলেন।
জানতে চাইলেন, “উপরে গিয়েছিলে?” না সূচক মাথা নাড়লাম। কারণ, মুজাহিদী ভাই আছেন কিনা জানতে চাইলে, সিঁড়ির ভদ্রলোকটা বলেছিলেন, “উনি এখন দোতলায় বসেন”।
তাঁর বসবার জায়গা বদলের বৃত্তান্ত পরে জানতে পেরেছিলাম। সাহিত্য থেকে সরিয়ে অন্যকোনও পাতার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাঁকে।
জল থেকে তুলে নেয়া মীনের মুখটা মনে পড়ে গেল ॥
—————
June 21, 2026
Holbrook, Massachusetts, USA 🇺🇸







