ড. ফজলুল হক তুহিন
কবি নিজ সমাজের যেমন বাসিন্দা, তেমনি মানসিক দিক থেকে বিশ্ব নাগরিকও। আপন সমাজচৈতন্যকে আলোড়িত করার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক ঘটনাবলীও তাকে সমানভাবে ভাবায়। সংবেদনশীল কবি মাত্রই বৈশ্বিক সমাজের চলমান স্রোতধারায় নিজেকে একাত্ম করেন। আর কবির সমগ্রতাও অর্জিত হয় ব্যক্তিসত্তা ও সমাজসত্তার সম্মিলনেই, সে-সমাজ দৈশিক ও বৈশ্বিক উভয়ই। বাংলা কাব্যে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের পর তিরিশোত্তর কবিবৃন্দ সচেতনভাবে এই আন্তর্জাতিকতা নিয়ে আসেন, তবে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে রাজনৈতিক চেতনা চল্লিশের দশকে সক্রিয় ও বিস্তৃত হয়; সমকালীন বিশ্বের সাথে মানসিক যোগযোগ গড়ে তোলেন। বিশেষভাবে বিশ্বের সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত ও জোয়ারের পটভূমিকায় সমাজতান্ত্রিক মনোভাবের অধিকারী কবিবৃন্দ এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখে, বায়ান্নোত্তর কবিরাও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক চেতনা ধারণ করে কবিতা লেখেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মহাউত্থান ঘটার ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বহু মেরুপ্রবণতা ও বহু কেন্দ্রিকতার অবসান ঘটিয়ে সূচিত হয় দ্বিমেরু প্রবণ রাজনীতিক ধারা (Bipolar Politics) (১) পূর্বে সমাজতান্ত্রিক জোট সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে এবং পশ্চিমে পুঁজিবাদী জোট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে দুটি প্রভাব-বলয় গড়ে ওঠে। ঠাণ্ডা যুদ্ধের (Cold War : ১৯৪৫-৬২) কালে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অধিকাংশ দেশ এ প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়ে। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে অর্থাৎ উপনিবেশবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহে পুঁজিবাদী অর্থনীতির স্বর্ণযুগের (১৯৫০-১৯৭৩) এই তিন মহাদেশে সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী কেন্দ্রের আধিপত্যের বিস্তার ঘটে। বিশেষভাবে প্রাচ্যে এই বিস্তারে সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাখ্যা দিয়েছেন এডওয়ার্ড সাঈদ (১৯৩৫-২০০৩)–
বিশ শতকের প্রথম দশক জুড়ে প্রাচ্যতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিলো যে, এটি কার্যকর–প্রচণ্ড ভালোভাবে কার্যকর। বক্তব্যটি সংক্ষেপ ও সরল করলে যা দাঁড়ায় তা পরিষ্কার, যাথাযথ, এবং হৃদয়ঙ্গম করা সহজ: এখানে পশ্চিমের মানুষ আছে, আর আছে প্রাচ্যবাসী, প্রথমোক্তরা আধিপত্য করবে; সেই আধিপত্যের শিকার হতে হবে অবশ্যই দ্বিতীয়োক্তদেরকে: যা সচরাচর বোঝায়, তারা তাদের ভূমি দখল করে নিতে দিবে, তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়সমূহ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে দেবে, তারা তাদের রক্ত ও সম্পদ তুলে দেবে কোনোও না কোনও পশ্চিমা শক্তির হাতে।(২)
ফলে সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর অনেকগুলোই তখন শৃঙ্খলার বন্ধনে বন্দী হবার পথে, তারই একটি প্রকাশ ছিলো মার্কিনপন্থী সামরিক অভ্যুত্থান। আবার একই সময়কালে সাম্রাজ্যবাদ ও সামরিক বা অন্য ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনবিরোধী আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ ব্যাপক ব্যাপ্তি লাভ করে। ৩২টি দেশে পরিচালিত হয় গেরিলাযুদ্ধ(৩) এবং স্বাধীনতা লাভ করে অধিকাংশ দেশ। জনগণের মধ্যে মার্কিনবিরোধী মনোভাব চাঙ্গা হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র পর্যায়েও তখন মার্কিনবিরোধী বিভিন্ন জোট গড়ে ওঠে। সমাজতান্ত্রিক জোটের পাশাপাশি গড়ে ওঠে জোট নিরপেক্ষ জোট। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান নিয়ে মিশরের জালাল আবদেল নাসের, আলজেরিয়ার হুয়ারি বুমেদিন, ইন্দোনেশিয়ার সুকার্নো, লিবিয়ার গাদ্দাফি এবং বিপ্লবী নেতা হিসেবে চীনের মাওসে তুং, ভিয়েতনামের হো চি মিন, কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রো, চে গুয়েভারা, কঙ্গোর প্যাট্রিস লুমুম্বা, তানজানিয়ার জুলিয়াস নায়ারেরে বিশ্বের সমস্ত বিপ্লবীদের কাছে শুধু নয়, সাধারণভাবে তরুণদের কাছে একেক জন চিহ্নিত হতে থাকে প্রেরণার উৎস হিসেবে। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা বিপ্লবের উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে এক নামে উচ্চারিত হয়।
আল মাহমুদ মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতার প্রশ্নে বারবার চেতনাকে জাগ্রত এবং প্রতিবাদী ভূমিকায় নিজেকে অবতীর্ণ করেন। এক্ষেত্রে নিজ জন্মভূমি ও ভিন্ন দেশের মানুষের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য বিবেচনায় আনেননি। ফলে পৃথিবীর যে প্রান্তেই মানবাধিকার লংঘন এবং স্বাধীনতা বিপন্ন হয়েছে সেখানেই কবি কবিতা নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। কেননা তিনি রুশোর মতো বিশ্বাস করেন– মানুষের প্রজন্ম জন্মগতভাবে স্বাধীন। তাদের স্বাধীনতা, তাদের নিজেদের অবিচ্ছেদ্য সত্তা। সে-সত্তাকে প্রদান করার অধিকার তাদের নিজেদের ব্যতীত অপর কারোরই হতে পারে না। অপর কারুর স্বাধীনতাকে বিনষ্ট করার অধিকার প্রাকৃতিক বিধানেরই বিরোধী।(৪) আল মাহমুদ তাই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে অঙ্গিকারবদ্ধ।
১
আল মাহমুদ ষাটের দশকের শেষার্ধে দেশে সামরিক আগ্রাসন ও শাসনের বিরুদ্ধে যেমন প্রতিবাদী; তেমনি এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদী শোষণ ও আক্রমণের বিপক্ষে সোচ্চার। ভিয়েতনাম, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, ইরাক ও কাশ্মীরে পরিচালিত সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এবং স্বাধীনতা ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং মানবাধিকারের সপক্ষে তাঁর কলম ঝলসে ওঠে। তিনি বরাবরই যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছেন। কারণ তিনি রুশোর মতো মনে করেন: যুদ্ধ মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের নয়। যুদ্ধ সংঘটিত হয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রের এমন যুদ্ধের মধ্যে জড়িত এ-পক্ষ কিংবা ও-পক্ষের সাধারণ মানুষ পরস্পরের শত্রু নয়। তাদের পরস্পরকে শত্রু বলে অভিহিত করার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। মানুষের সামাজিক নিয়মের বাইরে অনিয়মের এ-ঘটনা। রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের এমন যুদ্ধে এ-পক্ষের মানুষ বা যোদ্ধা যখন অপর পক্ষের যোদ্ধার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তখন তারা নাগরিক হিসাবে নাগরিকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে না। তারা যুদ্ধ করে সৈন্য হিসেবে। এক রাষ্ট্রের সৈন্যের বিরুদ্ধে অপর রাষ্ট্রের সৈন্যের যুদ্ধ। কোনো জাতীয় সমাজের বিরুদ্ধে অপর কোনো জাতীয় সমাজের যুদ্ধ নয়। তাই একটা রাষ্ট্রের শত্রু অপর রাষ্ট্রের মানুষ নয়। রাষ্ট্রের শত্রু রাষ্ট্র। মানুষ এবং রাষ্ট্র: দুইটি অস্তিত্ব। ভিন্ন চরিত্রের অস্তিত্ব। এবং সে-কারণে ভিন্ন চরিত্রের দুইটি অস্তিত্বের মধ্যে যথার্থ কোনো সম্পর্ক তৈরি হতে পারে না। একটা যুদ্ধের ঘোষণা যত না একটা প্রতিদ্বন্দ্বী সরকারের জন্য হুঁশিয়ারী, তার চাইতে অধিক হুঁশিয়ারী হচ্ছে সে-দেশের নাগরিকদের জন্য। প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার, সে-রাষ্ট্রের শাসক বা রাজা, ব্যক্তিগত নাগরিক তথা সকল নাগরিকের জন্য যুদ্ধের ঘোষণা একটা হুঁশিয়ারী।(৫) এই হুঁশিয়ারী একটা দেশের সাধারণ মানুষের মনে যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে তা অত্যন্ত বিপদজনক। মানুষের অস্তিত্ব বিপন্ন, স্বাধীনতা হরণ, মানবাধিকার লংঘন, সম্পদ-অবকাঠামোর ধ্বংসসহ যাবতীয় বিনাশ সম্পন্ন হয় যুদ্ধের মাধ্যমে। জীবন ও পৃথিবীর মঙ্গলচেতনায় উচ্চকিত কবি তাই সবসময় থেকেছেন প্রতিবাদী।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে কোরিয়ায় পরাজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামে তার ধ্বংস ও আগ্রাসনের সর্বশক্তি নিয়োগ করে। লক্ষ লক্ষ মার্কিন সৈন্য ভিয়েতনামে নিয়ে যাওয়া হয়, সর্বাধুনিক মানব ও পরিবেশ বিধ্বংসী অস্ত্র প্রয়োগ করা হতে থাকে। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় ভিয়েতনাম, লক্ষ লক্ষ নারীপুরুষ শিশু বৃদ্ধ নিহত হন, বিষাক্ত বোমায় পুরো দেশ যেভাবে ক্ষতবিক্ষত হয়, যেভাবে মাটি-পানি-বৃক্ষরাজি বিষাক্ত হয়, তার চিহ্ন এখনো আছে। এখনো অনেকের শরীরে, এমন কি পরের প্রজন্মের অনেক মানুষও সেই আক্রমণের ক্ষত বহন করে চলেছেন। কিন্তু সারা দুনিয়ার মানুষের মাথা উঁচু করে দিয়ে পৃথিবীর বৃহত্তম, সবচাইতে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বছরের পর বছর লড়াই করে গেছেন ভিয়েতনামের মানুষ। সেই লড়াই এতই তাপ সৃষ্টি করেছিল যে সারা দুনিয়ায় মার্কিন বিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামও অনেক বেড়ে যায়। তা বিশ্ববাসী সামগ্রিক বিপ্লবী আন্দোলনকেই সমৃদ্ধ করে। ভিয়েতনামের জনগণের প্রতিরোধের মুখে বহু মার্কিন সৈন্য নিহত হবার ফলে যুক্তরাষ্ট্রেও অভূতপূর্ব সর্বব্যাপী যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন সৃষ্টি হয়।(৬) রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভিয়েতনামে মার্কিন রাজনৈতিক ও সামরিক ক্রিয়াকলাপের উদ্দেশ্য ছিলো একটি বৃহৎ শক্তি বা পরাশক্তি হিসেবে আধিপত্য বা প্রভাব বলয় বিস্তার করা, বিশ্বে অন্যতম সেরা পুঁজিবাদী রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক বা বাণিজ্যিক স্বার্থ সংরক্ষণ বা প্রসার করা এবং এসবের কারণেই এ অঞ্চলে বিপ্লবী আশা-আকাক্সক্ষা বা সাম্যবাদ ভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেওয়া।(৭) কবি আল মাহমুদ এই সময়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্যে স্বদেশে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত; অন্যদিকে ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসনের মানবাধিকার লঙ্ঘন হওয়ায় প্রতিবাদী কণ্ঠ।
এই তো অবসর, যখন কোনো দৃশ্যই আর গ্রাহ্য নয়।
পলকহীন চোখ যেন উল্টে যাচ্ছে। যেখানে থরে থরে সাজানো আছে
ঘটনার বিদ্যুচ্চমক। না, কাউকে ধমক দিতে চাইনা।
কোনো কর্তব্য আমার জন্যে নয়। বরং হৃদয়ের ভেতর
যে ব্রহ্মাণ্ডকে বসিয়ে রেখেছি তার গোলক
দ্রুত আবর্তিত হোক।
ভিয়েতনামে বোমা পড়ছে। আমি তার প্রতিবাদ করি।
[‘উল্টানো চোখ’, সোনালি কাবিন]
কবি ভিয়েতনামে দেখেছেন মানববিরোধী ধ্বংসযজ্ঞ। মানবতা, মানুষের অধিকার, স্বাধীনতা সবকিছুকেই পরাশক্তি ভূ-লুণ্ঠিত ও বিনাশ করেছে। মানুষের অপমানে কবি নীরব থাকতে পারেননি; বিবেকবোধে উজ্জীবিত হয়ে কবি মনুষের পক্ষে কলম ধরেছেন দৃঢ়তা ও সাহসের সঙ্গে এবং আন্তর্জাতিক চেতনাজগতের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন।
২
এক দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রাম ফিলিস্তিনী ভূ-খণ্ডে এখন পর্যন্ত অব্যাহত। ফিলিস্তিনে দীর্ঘ ৪৫ বছরের ইসরাইলি দখলদারিত্ব মানব সভ্যতার জন্য চরম লজ্জাজনক বিষয়। ১৯৬৭ সালের ইহুদি আগ্রাসনের পর থেকে হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে অত্যন্ত অমানবিকভাবে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে। ইসরাইল পাখি শিকার করার মতোই টার্গেট করে করে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে বহু ফিলিস্তিনি নেতা ও সাধারণ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। কেবল ২০০৬-এ ইসরাইলি সৈন্যরা হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ছয় শত এবং ২০০৮-এ এক হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা, অসংখ্য বসতবাড়ি ও অবকাঠামো বিনাশ করেছে। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী মুসলমানদের রক্তে এখনো প্রতিনিয়ত ফিলিস্তিনের মাটি রঞ্জিত হচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীর এই তথ্য-প্রযুক্তির যুগে এসেও ফিলিস্তিনিরা তাদের ন্যায্য অধিকার, নিজেদের বসতভিটা, নিজেদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ফিরে পাচ্ছে না। জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে তথাকথিত শান্তি প্রয়াসের নামে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনসহ পশ্চিমা দেশগুলোর ফিলিস্তিনিদের ধ্বংস করার ও অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলকে শক্তিশালী করার প্রহসন আর কত দিন চালিয়ে যাবে তা আগামী ইতিহাসেই বলে দেবে।
১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বা আরব-ইসরাইল যুদ্ধ ছয় দিনের যুদ্ধ হিসেবেও পরিচিত। এই যুদ্ধ ছিল ইসরাইল এবং মিসর, জর্ডান ও সিরিয়ার মধ্যে তৃতীয় সঙ্ঘাত। ১৯৪৮ সালে প্রথম পূর্ব জেরুজালেম এবং জর্ডান নদীর পশ্চিম তীর জর্ডানের নিয়ন্ত্রণে এবং উপকূলীয় গাজা ভূখণ্ড মিসরের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ১৯৫৬ সালে ইসরাইল গাজা ভূখণ্ড ও মিসরের সিনাই উপত্যকা দখল করে নেয়। অবশ্য পরের বছর ইসরাইল সিনাই উপত্যকা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় এবং সেখানে জাতিসঙ্ঘের জরুরি বাহিনী মোতায়েন করা হয়। মিসরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুল নাসের ইসরাইলকে ধ্বংস করার লক্ষে আর বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। ১৯৬৭ সালের মে মাসে প্রেসিডেন্ট নাসের সিনাই থেকে ইসরাইলি সৈন্য প্রত্যাহারের দাবি জানান। প্রেসিডেন্ট নাসের ইহুদি রাষ্ট্রটির বিরুদ্ধে হামলা চালানোর অভিপ্রায় ঘোষণা করার পর ১৯৬৭ সালের ৫ জুন ইসরাইল মিসর, সিরিয়া ও জর্ডানের ওপর হামলা শুরু করে। ছয় দিনের প্রচণ্ড আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পর ইসরাইল জর্ডানের পশ্চিম তীর ও পশ্চিম জেরুজালেম, সিরিয়ার গোলান মালভূমি এবং মিসরের সিনাই উপদ্বীপ দখল করে নেয়। আরব জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের অদূরদর্শিতা ও যুদ্ধের ব্যাপারে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকায় ইসরাইলের কাছে আরবরা অপমানজনকভাবে পরাজয় বরণ করে। তখন আরব দেশগুলোর বিশাল সমরশক্তি থাকলেও প্রকৃতপক্ষে তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল না। ইসরাইল ১৯৭৩ সালেও সিরিয়া ও মিসরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। কিন্তু আরবরা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়াই যুদ্ধে জয়লাভ করবে বলে ধরে নেয়। অপরদিকে ইসরাইল আগে থেকেই যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখে। প্রথম দিনের যুদ্ধেই আকস্মিক বিমান হামলা চালিয়ে ইসরাইল মিসরের বিমান বাহিনীকে ধ্বংস করে দেয়। পরবর্তী পাঁচ দিন ব্রিটিশ ও আমেরিকান গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের আগাম তথ্যের ভিত্তিতে ইসরাইল যুদ্ধ পরিচালনা এবং জয়লাভ করে।
বিশ শতকের গোড়া থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ মধ্যপ্রাচ্যে আরবদের বিরুদ্ধে অনুসৃত তাদের নীতি (Policy)-র সহায়ক হিসেবে একটি ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চক্রান্ত করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তাদের এই চক্রান্ত দানা বাঁধতে শুরু করে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানীতে এবং জার্মান অধিকৃত অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে নাৎসীদের ইহুদী বিরোধী নির্মম বর্বরতা সারা দুনিয়ায় ইহুদীদের বিরুদ্ধে যে গভীর সমবেদনার আবহাওয়া সৃষ্টি করে তার সুযোগ নিয়ে ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ইত্যাদি সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠা করে ইসরাইল রাষ্ট্র। এ কাজ করতে গিয়ে তারা লক্ষ লক্ষ আরব প্যালেস্টিনিয়ানকে তাদের মাতৃভূমি থেকে জবরদস্তিমূলকভাবে উচ্ছেদ করে তাদের ভূখণ্ড দখল করে এবং সেখানে সৃষ্টি করে এমন এক রাষ্ট্র যাকে কার্যকর করার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ লক্ষ লক্ষ ইহুদী নিয়ে এসে সেখানে স্থান করতে হয় নতুন বসতি। চক্রান্তের মাধ্যমে কৃত্রিম পদ্ধতিতে রাষ্ট্র যেভাবে ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা সৃষ্টি হয়েছিল সে রকম কোনো দৃষ্টান্ত মানব জাতির সমগ্র ইতিহাসে আর নেই। সাম্রাজ্যবাদ যে কত হিংস্র হতে পারে তার এক বড় রকম দৃষ্টান্ত হলো তাদের দ্বারা ইসরাইলের মতো একটি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা।
ইসরাইলের প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই রাষ্ট্রটি মধ্যপ্রাচ্যে সাম্রাজ্যবাদের এক শক্ত খুঁটি হিসেবে এ পর্যন্ত কাজ করে আসছে। তাকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্যালেস্টাইনের আরব জনগণকে ভিটেমাটি ছাড়া করা সত্ত্বেও তাদের কোন আবাসভূমি অথবা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের বিরোধিতা ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং তাদের অন্যান্য সাঙ্গ-পাঙ্গরা প্রথম থেকেই করে আসছে। শুধু তাই নয়, এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ জাতিসঙ্ঘ কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হলেও প্রকৃতপক্ষে সামরিক সন্ত্রাস ও হামলার মাধ্যমেই ইসরাইলকে প্যালেস্টিনীয় ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠা করার পর থেকে প্যালেস্টিনীয়দের আবাসভূমি ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে কোন প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম ইসরাইলের পক্ষ থেকে তো বটেই, সেই সাথে সমগ্র সাম্রাজ্যবাদী মহল থেকে আখ্যায়িত করা হয়েছে ‘সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে।(৮) তাদের এই ঘৃণ্য প্রচারণা প্রতিদিন অব্যাহত আছে।
১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে, আশির দশকে শুরু হয়ে তিন বার ফিলিস্তিনিরা ইন্তিফাদার জন্ম দিয়েছে। নতুন ফিলিস্তিনি প্রজন্ম স্বাধীনতার জন্য আরো লড়াকু ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতের ফাতাহ আন্দোলনের সাথে সাথে ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের আপসহীন ও অপ্রতিরোধ্য মুক্তির উত্থান ঘটেছে। ১৯৯৩ সালের অসলো শান্তিচুক্তির টোপ দিয়ে ফিলিস্তিনিদের আয়ত্তে আনা যায়নি। আরাফাতের ফাতাহর পর হামাস জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমারা তা মেনে নেয়নি। এখন ফিলিস্তিনে ফাতাহ ও হামাস দুটি বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি। এই দুই শক্তি চায় ১৯৬৭ সালে অধিকৃত সব ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড সরিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, পশ্চিম তীরের সব ইহুদি বসতি অপসারণ, ইসরাইলি কারাগারে আটক এগার হাজার ফিলিস্তিনির মুক্তি এবং সব ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুর নিজ বাসভূমিতে ফিরে আসার অধিকারের স্বীকৃতি।
আল মাহমুদ ইতিহাসের এই ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রতিক্রিয়ায় ইহুদি জাতির প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশিত; সঙ্গে সঙ্গে দোসর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রতিও।
ক.
সকালে সংবাদপত্র, রাজনীতি, ক্ষুব্ধ খোঁচাখুঁচি
যা কিনা রক্তাক্ত শার্টের মতো পরে আছে আমাদের ভয়ার্ত শতক–
এসবের ঊর্ধ্বে আজ বিনাবাক্যব্যয়ে
কী করে থাকেন?
জানিনা, দেশের খবর কিছু পান কিনা,
কী ঘটবে এশিয়ায়–এ নিয়ে তর্ক করে আপনার যাওয়ার পর
পৃথিবীর সবকটি শাদা কবুতর
ইহুদি মেয়েরা রেঁধে পাঠিয়েছে মার্কিন জাহাজে।
[‘আত্মীয়ের মুখ’, সোনালি কাবিন]
খ.
অনিষ্টকর অন্ধকারে যখন পৃথিবী
আচ্ছন্ন হয়ে যায়। চারদিকে ডাইনীদের
ফুৎকারের মতো হাওয়ার ফিসফাস,
আর পাখিরা গুপ্ত সাপের আতঙ্কে
আশ্রয় ছেড়ে অন্ধকারে ঝাঁপ দেয়
ঠিক তখুনি, ইহুদিরা হেসে ওঠে।
…ইহুদিরা হাসুক,
তবু সম্পদের সুষম বণ্টন অনিবার্য।
ইহুদীরা নাচুক, তবু
ধনতন্ত্রের পতন আসন্ন। আর
মানুষ মানুষের ভাই।
[‘ইহুদিরা’, অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না]
কবি মনে করেন ইহুদিবাদ, পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ সমার্থক। ধনতন্ত্রের হাত ধরে সাম্রাজ্যবাদ আসে এবং মানবতাবিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ধনতন্ত্রের ফলেই যে সাম্রাজ্যবাদ (Imperialism)(৯) সম্প্রসারিত ও আগ্রাসী থাবা বিস্তারে সক্রিয় কবি তার যেমন ইঙ্গিত দিয়েছেন, তেমনি এর পতনও অবসম্ভাবি ও আসন্ন সেটাও বলেছেন। ফিলিস্তিন সম্পর্কে এডওয়ার্ড সাঈদের ভাষ্য হচ্ছে, ‘এ এক অদ্ভুত ধরনের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা’ (Peculiar form of historical experience)।(১০) কেননা, ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সত্য ছিলো ফিলিস্তিন বলে কিছু নেই। তাকে মুছে ফেলা হয়েছে; কিন্তু জনগণের ইচ্ছা ও সংকল্পের মাঝে ফিলিস্তিন ছিলো স্মৃতি, ধারণা এবং রাজনৈতিক ও মানবিক অভিজ্ঞতা হয়ে। যার বিনাশ অসম্ভব; সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের লড়াই এই কারণে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।(১১) সাম্রাজ্যবাদ ফিলিস্তিনের মানচিত্র মুছে ফেলতে এবং তাদেরকে জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত করতে চেয়েছে; কিন্তু অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে সংগ্রামের পথে তারা এগিয়ে চলেছে, যার নেতৃত্বে ইয়াসির আরাফাতের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। কবি তাঁর আহ্বানে উজ্জীবিত হয়েছেন।
আর বক্তৃতা করতে উঠে দাঁড়িয়েই বললো, এই পার্বত্য উপত্যকার
প্রতিটি পাহাড়চূড়া ও পবিত্র স্তম্ভগুলোর শপথ, শপথ
পবিত্র কাবা তাওয়াফকারী এখানে উপস্থিত প্রতিটি
নর-নারীর। যদি দলবদ্ধভাবে একবার, শুধু একবার। এমনকি
নিরস্ত্রভাবেও একবার। যদি
আমার দেশ প্যালেস্টাইন। শত্রু অধিকৃত একটা শহর। আপনাদের
প্রথম কেবলা। একবার যদি ভাইগণ।
আল কুদ্সের দিকে মুখ ফেরান, একবার।
হাতে হাত। এহরামের শ্বেতবস্ত্র সেলাইবিহীন। একবার। শুধু
হাঁটতে হাঁটতেও চলে যান। তবে
সামনেই জেরুসালেম, আমার প্রিয়নগরী,
বিজয়।
[‘মীনার প্রান্তরে ইয়াসির আরাফাত’, একচক্ষু হরিণ]
কবি এই মহান নেতার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। হারানো জন্মভূমি ফিরে পাবার লড়াইয়ে দীর্ঘকালব্যাপী সংগ্রামরত একটি জাতির মানসচেতনার সঙ্গে কবি অঙ্গিভূত; তাদের নেতার কণ্ঠস্বর আর কবির কবিতা একাকার হয়ে মিশে গেছে। ইয়াসির আরাফাতের উদাত্ত আহ্বান এবং বিজয়ের ব্যাপারে অকুণ্ঠ আশাবাদে কবি উজ্জীবিত। কারণ কবিও স্বদেশের মুক্তি সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন; অধিকৃত জন্মভূমি হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে মুক্ত করার প্রত্যয়ে দীপ্ত ভূমিকা রাখেন। এজন্যে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের মুক্তি-সংগ্রামের সঙ্গে কবি একাত্ম হয়ে যান।
৩
আফগানিস্তান মধ্য এশিয়ার এক রক্তাক্ত জনপদ। বহু জাতি, গোষ্ঠী, ভাষাবৈচিত্র্যের এই দেশে ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন যুদ্ধ ঘোষণা করে আগ্রাসন চালায়। দীর্ঘ ১০ বছরব্যাপী এই যুদ্ধে কমপক্ষে ১৫ হাজার সোভিয়েত সৈন্য নিহত হয়। রাশিয়ার প্রখ্যাত যুদ্ধবিদ লিও করলভ ‘সোভিয়েত স্পেশাল অপারেশন ইউনিট’কে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। এই বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডেলটা ফোর্স’ এবং ‘ব্রিটিশ এসএএস’-এর সমপর্যায়ে ছিল; কিন্তু অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট, লেসার গাইডেড মিসাইল প্রভৃতি এসব পাহাড়ি লোকদের ঘায়েল করতে পারেনি। লক্ষ লক্ষ মানুষ এতে নিহত হয়, অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়, নারী-শিশু-বৃদ্ধসহ অসংখ্য বেসামরিক লোকজন বোমাগুলির আঘাতে প্রাণ হারায়। কিন্তু ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অতীতে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যেসব দেশ আঘাত হেনেছে তারা সবাই পরাজিত হয়েছে। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট, চেঙ্গিস খান, ব্রিটিশ থেকে শুরু করে সোভিয়েত ইউনিয়নও তাদের সৈন্যবাহিনী পাঠিয়েছিল আফগানিস্তানে। এতে তাদেরকে চরম শিক্ষা পেতে হয়। সোভিয়েত নেতা গর্বাচেভ আফগানিস্তানকে ‘রক্তাক্ত ক্ষত’ আখ্যা দিয়েছিলেন। ১০০ বছরেরও বেশি আগে একজন ব্রিটিশ ভাইসরয়ও বলেছিলেন, আফগানিস্তান হচ্ছে ‘বিষাক্ত পানপাত্র’।(১২) ১৮৩০ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে ব্রিটিশ সরকার ও আফগানিস্তানের মধ্যে তিনটি বড় ধরনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ব্রিটিশরা চেয়েছিল আফগানিস্তানে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু লাভের চেয়ে ক্ষতিই হয়েছিল বেশি। চরম মূল্য দিতে হয়েছিল ব্রিটিশ শক্তিকে।
তবে লড়াকু আফগান জাতি রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রাণপণ প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তোলে। দীর্ঘ দশ বছর প্রতিরোধ লড়াইয়ে এবং ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত দখলদাররা আফগানিস্তান ত্যাগ করে। দশ বছর ব্যাপী রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধে ব্যাপকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়, সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীন জাতি হিসেবে খ্যাত আফগানদের মধ্যে স্বাধীনতার স্পৃহা জাগ্রত হতে থাকে। আল মাহমুদকে তা তীব্রভাবে প্রভাবিত করে।
মৃত্যু নেমে এসেছে একটি উপত্যকায়। একদা যাদের
উদ্দাম জীবিকা আর স্বাধীনতার দুর্দম খ্যাতি
পৃথিবীকে মৌসুমি বাতাসের মতো বেষ্টন করতো।
যাদের আজানের শব্দ হিন্দুকুশের সর্বোচ্চ পাথরটিতেও
অবলীলায় আঙুল বুলিয়েছে। আর
মেঘের মধ্যে মিলিয়ে যেতে যেতে পাখিদের বুকেও
আনন্দের শিহরণ। শোনো,
আজ ধাবমান শাদা মেঘকেও কেউ বিশ্বাস করে না।
…শওকত, হে পাঠান যুবক। বলো
আফগানিস্তান আজ কার দেশ নয়? আফগানিস্তান
সব স্বাধীন মানুষের অপহৃত মাতৃভূমি। শুধু
হত্যাকারীদেরই কোনো মানচিত্র থাকে না, নেই।
[‘হত্যাকারীর মানচিত্র’, বখতিয়ারের ঘোড়া]
আফগানদের স্বাধীনতার প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি রয়েছে তাদের বিশাল বিশাল পর্বতচূড়ার মতো। স্বাধীন পেশায় তারা অভ্যস্ত। তাদের জীবনযাত্রা ও স্বাধীনতা পৃথিবীর সমস্ত স্বাধীনচেতা মানুষের কাছে উৎসাহ ও প্রেরণার স্থল হিসেবে অভিহিত হয়েছে ইতিহাসে। আফগানিস্তানের উত্তপ্ত মরুভূমির সাথে এক ধরনের সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ে যায় সেইসব মানুষের চেতনা। এই কারণেই সেখানে যখন সোভিয়েত রাশিয়া আগ্রাসন চালিয়ে স্বাধীনতা ও মানবাধিকার চরমভাবে ভূলণ্ঠিত করে, তখন বাকি বিশ্বের মানুষের অনুভূতি নাড়া দিয়ে ওঠে। স্বাধীন মানুষ মাত্রই অনুভব করে দখলকৃত এই দেশ তাদের ‘মাতৃভূমি’। আর আধিপত্য বিস্তারে সক্রিয় হত্যাকারীদের প্রকৃত কোনো দেশ বা মানচিত্র থাকে না। তাদের হত্যাকারীদের পরিচয় শুধুমাত্র হত্যাকারীই। কবির চেতনায় এইসব ভাবনা কাজ করেছে। ফলে ‘শওকত’ নামের এক পাঠান যুবকের সঙ্গে আলিঙ্গনবদ্ধ হয়ে কবির মনে আফগানিস্তান নিয়ে নতুন চিন্তার দ্বারে উপনীত হয়েছেন। উল্লেখ্য, আগ্রাসনের প্রেক্ষিতে ১৯৮৩ সালে কবি সম্পাদনা করেন ‘আফগানিস্তান আমার ভালোবাসা’ নামের একটি গ্রন্থ।
১৯৮৯ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্ব›দ্বী অন্য পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায় এবং দুর্বল হয়ে পড়ে। একক ও অপ্রতিদ্ব›দ্বী পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র আবির্ভূত হয়। সারাবিশ্বে বিশেষভাবে মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তারে সে অপ্রতিহত হয়ে ওঠে। কিন্তু ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১-এ নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে এক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী হামলায় বিধ্বস্ত হয়েছে মার্কিন বিত্তবৈভবের প্রতীক ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার’ এবং সামরিক শক্তির প্রাণকেন্দ্র ‘পেন্টাগনে’র একাংশ। স্বভাবতই এই আকস্মিক সন্ত্রাসী হামলায় মার্কিনিরা যুগপৎ হতভম্ব, বিক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ হয়। মার্কিন প্রশাসন এই হামলাকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ বলে অভিহিত করে।(১৩) এই ঘটনার জন্যে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি ভিন্ন মতালম্বী ধনকুবের ওসামা বিন লাদেনকে অভিযুক্ত করে। যদিও সুস্পষ্ট ও অকাট্য কোনো প্রমাণ তার হাতে নেই। তবু যুক্তরাষ্ট্র ও সমগ্র পশ্চিমা মহলের কাছে ওসামা বিন লাদেন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের প্রধান নায়ক এবং সন্ত্রাস নির্মুল করার লক্ষ্যে সে-ই প্রধান লক্ষবস্তুতে পরিণত হয়। আর তার অবস্থান যেহেতু আফগানিস্তানে, সেহেতু সেখানেই মার্কিন হামলার জন্য বেছে নেয়া হয়। ২০০১-এর ০৭ অক্টোবর Operation Infinity Justice বা Operation Enduring Freedom নামে আমেরিকার নেতৃত্বে এক আন্তর্জাতিক কোয়ালিশনের মাধ্যমে সেখানে হামলা শুরু হয়।(১৪) অসংখ্য বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র আর গোলার আঘাতে প্রাণ হারায় অগণিত মানুষ, বিধ্বস্ত হয়ে যায় জনপদের পর জনপদ ও অবকাঠামো। ১৯৯৬ সালে আবির্ভূত তালেবান সরকারের পতন ঘটে এবং আমেরিকার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয় সেখানে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়াই একটি দেশে আগ্রাসনের জন্যে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও প্রতিবাদ-বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এই যুদ্ধকে পৃথিবীর বিবেকবান মানুষ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ‘আগ্রাসন’ ও সম্পদ লুণ্ঠনরূপে চিহ্নিত করেন।
বিবেকবান মানুষের মতো একজন সচেতন কবি হিসেবে সেই স্বাধীন জনপদে আর এক সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন দেখে আল মাহমুদ তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন। নয়া সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী কবিতা রচনা করেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক। আফগান ও ইরাক আক্রমণের প্রতিবাদে রচিত কবিতাবলী নিয়ে প্রকাশ পায় ‘উড়াল কাব্য’ নামে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী পূর্ণাঙ্গ একটি কাব্য। আমেরিকার জাতীয় প্রতীক ‘ঈগলে’র অপ্রতিরোধ্য অভিযান এবং ইতিহাসে তার স্থান নিয়ে কবির মনোভাব স্পষ্ট।
১.
ভাবো, ইতিহাসের গতি রুদ্ধ। মানুষের আর কোনো ইতিহাস থাকবে না। ফেরাউন
থাকবে কিন্তু মুসা থাকবেন না। পুঁজি থাকবে, সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ববিচরণশীল লুণ্ঠন
থাকবে কিন্তু না বলার মত দেশ থাকবে না। আফগানিস্তান বা ফিলিস্তিন কেউ না।
কেবল মহাকালব্যাপী ঈগল খচিত বোমারু বিমানগুলো উড়বে কিন্তু মাটি, পাহাড়
বা সাগর থাকবে না। পৃথিবী বা মানচিত্র থাকবে না। ধর্ম থাকতে চান থাকুন কিন্তু
কোনো মিনার থেকে আজান হবে না। গীর্জাগুলো তো আগেই নিলামে বিক্রি হয়ে
গেছে। এখন না ঘণ্টাধ্বনি না আজান। প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ থাকলে বোমা
হামলাও থাকবে। কারণ ইতিহাসের আর প্রয়োজন নেই। ইতিহাস থাকবে না।
২.
বুশের বোমায় তেলজল একাকার
মধ্য এশিয়া মুক্ত উদরে শোয়া;
খুলে গেছে নাভী, ঐশ্বর্যের দ্বার
আকাশে উড়ছে মৃত বিবেকের ধোঁয়া,
জ্বলছে কাবুল, লুটালো কান্দাহার।
[‘ঈগল থাকবে ইতিহাস থাকবে না’, উড়ালকাব্য]
মার্কিন নয়া সাম্রাজ্যবাদী হামলায় বর্তমান পৃথিবীতে মানবতা, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, ধর্ম-সভ্যতা-সংস্কৃতি এবং ইতিহাস পর্যন্ত বিপর্যস্ত। সেজন্যে কবি চরম হতাশা প্রকাশ করেন। অন্যদিকে একদা পুঁজির শত্রু রাশিয়া ও চীনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং জাতিসংঘের তীব্র সমালোচনায় মুখর হন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তরে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধী এই আগ্রাসী, পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী দেশ যে বিশ্বের সমস্ত শান্তি, নিরাপত্তা, প্রেম, শুভবুদ্ধি, স্বপ্ন, কল্যাণ ও সুন্দর ভবিষ্যতের জন্যে মূর্তিমান হুমকি হয়ে উঠেছে তা কবির কণ্ঠে দৃঢ়ভাবে উচ্চারিত। “কানা মামুদের উড়ালকাব্য-১, ৩”, “নির্বিবেক পৃথিবীর ওপর এ কার পতাকা”, “এক গুঞ্জরিত কবির আত্মা” ইত্যাদি কবিতাবলিতে এই মনোভাব স্বাক্ষরিত। সাম্রাজ্যবাদী এই আগ্রাসন মোকাবেলায় কবি “ফিঙে” কবিতায় ‘ফিঙে’র প্রতীককে ‘ঈগল’ প্রতীকের বিপরীতে স্থাপন করেন। পৃথিবীর আকাশে ঈগল, বাজ ও শকুনের চিরস্থায়ী রাজত্বের বিরুদ্ধে ‘একটি কালো উড়ন্ত প্রতিবাদ’ হলো ‘ফিঙে’। কবির কাছে তাই ‘ফিঙে’ হয়ে উঠেছে বিশ্বব্যাপী মার্কিন আধিপত্যবাদী জুলুম, খুন, স্বাধীনতা ও মানবাধিকার হরণের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ। উপস্থাপনা ও প্রতীকের নতুনত্বে কবিতাটি এ-ক্ষেত্রে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র বা আগ্রাসী তৎপরতার ক্ষেত্রে সোভিয়েত রাশিয়া বা সমাজতান্ত্রিক শক্তি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা পরাশক্তির মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। মানবাধিকার ও স্বাধীনতার প্রশ্নে ইতিহাসে পরাশক্তি দুটির ভূমিকা মানবতাবিরোধী এবং নির্যাতিত জাতিগুলোর পদক্ষেপ সংগ্রামমুখর ও লড়াকু।
৪
আফগানিস্তান আক্রমণের এক বছর যেতে না যেতেই ২০০২-এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে আগ্রাসন চালায়। এই বছরের ১ এপ্রিলে একটি রাতের বিভীষিকা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তার ইরাক দখলের যুদ্ধ শুরু করে। ওই একটি রাতেই মার্কিন বাহিনী এক হাজার ক্রুজ মিসাইলের আঘাতে ইরাকের রাজধানী সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করে দেয়। সেই রাতে বাগদাদে বর্ষিত হয় হিরোশিমায় নিক্ষিপ্ত আণবিক বোমার সমপরিমাণ বিস্ফোরক। প্রকৃতপক্ষে, ইরাকযুদ্ধ শুরু হয় ১৯৯১ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্র অনুগত কুয়েতের সাহায্যার্থে ইরাক ধ্বংসের মিশন হাতে নেয়। ১৯৯১ সালের ১৭ জানুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রæয়ারির মধ্যবর্তী সময়ে মার্কিন বিমান বহর ইরাকে ১ লাখ ১০ হাজার হামলা পরিচালনা করে, যার অর্থ প্রতি ৩০ সেকেন্ডে একটি করে বিমানহামলা। এই হামলাগুলোতে ৮৮ হাজার ৫০০ টন বিস্ফোরক ইরাকে বর্ষিত হয়েছিল, যা হিরোশিমায় সাড়ে সাতটি আণবিক হামলার সমান। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে মার্কিন অবরোধের ফলে ২০ লাখ ইরাকি প্রাণ হারায়, যার অন্তর্ভুক্ত ছিল ৫ লাখ শিশু। সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও ব্রিটিশ জার্নাল ‘The Lancet’’-এ পরিবেশিত খবর অনুযায়ী ২০০৩ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে ইরাকের চলমান যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে সাড়ে ছয় লাখ ইরাকি, গৃহহীন-দেশছাড়া হয়েছে ২০ লাখ ইরাকি নাগরিক। প্রায় একই সংখ্যার ইরাকী দেশের অভ্যন্তরেই উদ্বাস্তু হয়েছে। পরবর্তীকালে ৪৫ লাখ শিশু ইরাকে অপুষ্টির শিকার হয় এবং বেকারত্ব ৭০ শতাংশ এসে দাঁড়ায়।(১৫) ১০ বছর পর বুশ প্রশাসন ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের জন্য মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র তৈরির অভিযোগ এনে নগ্ন আগ্রাসন চালিয়ে প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করে সেখানে মার্কিন তাবেদর সরকার প্রতিষ্ঠা করে। এ প্রসঙ্গে বদরুদ্দীন উমরের ভাষ্য উল্লেখযোগ্য:
ইতিহাস ও মানব সভ্যতার এই আত্মঘোষিত মালিকরা ইরাকের বিরুদ্ধে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের জন্য মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র তৈরীর অভিযোগ এনে সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতের জন্য ইরাক আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করলেও এরা নিজেরা হলো বিশ্বের সব থেকে নিকৃষ্ট মানবতাবিরোধী শক্তি এবং এদের আয়ত্তে রয়েছে সব থেকে মারাত্মক ও ব্যাপকতম ধ্বংসসাধন ক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্রশস্ত্র। এই অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে আছে পারমাণবিক বোমা থেকে নিয়ে অসংখ্য রাসায়নিক ও জীবাণুযুদ্ধের সরঞ্জাম। এ সবের ব্যবহারও তারা সব সময়েই করছে। সম্প্রতি আফগানিস্তানের জনগণের বিরুদ্ধে জীবাণু অস্ত্র থেকে বিভিন্ন প্রকার মারাত্মক বোমা ব্যবহার করে হাজার হাজার নিরীহ আফগানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।(১৬)
তবে ইরাকে ব্যাপক মানব বিধ্বংসী অস্ত্র আছে– এই ইঙ্গ-মার্কিন প্রচারের বিপরীতে ইরাক তার পক্ষে জনমত সংগঠিত করতে পেরেছে। সিএনএন (CNN) বা বিবিসির (BBC) মতো গণমাধ্যমগুলোর ক্রমাগত প্রচারণা এবং আধিপত্যের বিপরীতে এই জনমত গড়ে উঠেছে। এটা সাফল্যের একটা দিক বলা যায়। আর ক্রমে পরিষ্কার হয়ে উঠছে যে, ইরাক সামরিক বিজয়ের জন্য নয়, নৈতিক বিজয়ের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত গড়ে ওঠার কারণে ইরাক এই স্বতঃস্ফূর্ত বিশ্বশক্তির গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুভব করতে পেরেছে।(১৭) যুদ্ধের আগে বিভিন্ন দেশ থেকে ইরাকি জনগণের প্রতি সংহতি জানাবার জন্য বহু মানুষ ছুটে গিয়েছেন। এই দিকগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এই পরিপ্রেক্ষিতে আল মাহমুদ বিশ্বজনমতের সঙ্গে ঐক্যমতে এসে আপন অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন। অবিবেকী ও অমানবিক এই আগ্রাসন কবিকে যুগপৎ ব্যথিত, ক্ষুব্ধ ও প্রতিবাদী করে তোলে। বৈশ্বিক জনমত ধারণ করে লেখেন:
বাগদাদের এই মরু বিছেটিকে নিয়ে এখন যত দুশ্চিন্তা।
ঘুম নেই কারো। কত টন বোমায় বিছের বংশ ধ্বংস হয়
তা সমরবিশারদরা হিসেব করে দেখছেন। বিছেটি পাছার
হুল তুলে এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে আছে। তার
সর্বাঙ্গের বিষ, মাথায় গোবর এবং কথাবার্তা
মহামতি লেনিনের মৃত্যুর আগে সর্বশেষ ভাষণের মত
কে জানে কে বেশী বিপ্লবী? বাগদাদের স্করপিয়ন
না ভøাদিমির ইলিচ?
[‘স্করপিয়ন’, উড়াল কাব্য]
সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন যেভাবে মহান বিপ্লবী এবং মানবতার মুক্তিদাতারূপে খ্যাত, বাগদাদের অধিপতি সাদ্দাম হোসেনও সেভাবে পরিচিতি পান স্বাধীনতা ও মানবতার রক্ষাকর্তা হিসেবে। তাই কবির মনে জিজ্ঞাসা জেগেছে দু’জনের মধ্যে কে বেশি বিপ্লবী। লেনিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে যেমন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর, তেমিন সাদ্দামও নয়া আধিপত্যবাদী সামরিক হামলার বিপক্ষে সাহসী প্রতীক। তবে কবি মানবতার অপমানে মর্মাহত। আবার এই আগ্রাসন প্রতিরোধের ক্ষেত্রে উৎসাহী এবং বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের সুন্দর ভবিষ্যতের ব্যাপারে আশাবাদী। কবির ভাষায়–
ধ্বংস ও রক্তপাত এবং ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র, বোমার শব্দ শয়তানের
দীর্ঘশ্বাসমাত্র কিছুতেই মানুষের বিলুপ্তি সম্ভব নয়। আর মানুষ
থাকলে শরতের মৎস্যগন্ধ্যা বাতাস কবিরাও নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে
টেনে নেবেই।
প্রজাপতি উড়বে, ফুল ফুটবে থাকবে মৌমাছির গুঞ্জন।(১৮)
কবি জীবনভর অনেক যুদ্ধ দেখেছেন; যুদ্ধের ভয়াবহতা, প্রাণহানি, ক্ষয়ক্ষতি, মানুষের হাহাকার-দীর্ঘশ্বাস কবিকে বারবার দুঃখ ভারাক্রান্ত করেছে। জীবনবাদী কবি তাই শুধু মর্মাহত হননি; সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের প্রতি তীব্র ঘৃণা উচ্চারণ করেন, প্রতিরোধের আহ্বান জানান এবং যুদ্ধমুক্ত শান্তিময় বিশ্বের জন্যে স্বপ্ন দেখেন ও সবাইকে দেখান।
এই তো পৃথিবী।
তারা কি জানে কোটি কোটি যুবক যুবতীতে কলরবমুখর
এই গ্রহের প্রতিটি অপেক্ষার স্থানে প্রাণের মিছিল নিয়ে
বসে আছে অফুরন্ত মানুষ, মারমুখী।
হে দাস প্রথার উদ্ভাবনকারীরা, পৃথিবীর সর্বশেষ
যুদ্ধের মীমাংসা আসন্ন
মানুষের ঘূর্ণাবর্তে তোমরা শৃঙ্খলিত
কোথায় পালাবে
অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতের সকল মানুষ মুখচ্ছবির
ভিতর থেকে উচ্চারিত হচ্ছে তোমাদের প্রতি ঘৃণা।
[‘আমি উচ্চারণ করি ঘৃণা’, বারদগন্ধী মানুষের দেশ]
যুদ্ধবিরোধী ও মানবতাবাদী কবি যুদ্ধবাদীদের বিরুদ্ধে সকল কালের মানুষের সঙ্গে এক সারিতে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্যে সকলের সাথে কবিও প্রস্তুত। তাদের প্রতি সম্মিলিত ঘৃণা প্রকাশ করেছেন। কেননা যুদ্ধবাদীরা মানুষ-মানবতা-পৃথিবীর শত্রু। কবি তাই তাদের অত্যসন্ন পতন দেখতে পেয়েছেন।
৫
দক্ষিণ এশিয়ার এক রক্তাক্ত মানচিত্র কাশ্মীর। এক সময় ‘ভূ-স্বর্গ’ হিসেবে এর সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধি সকলকে আকৃষ্ট করতো। কিন্তু ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতার সময় থেকেই সেখানে সংঘাত, অশান্তি আর আগ্রাসন, অন্যদিকে লড়াকু কাশ্মীরের জনসাধারণ স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার দাবিতে সংগ্রামরত। উল্লেখ্য, Indian Independence Act অনুযায়ী ভারত স্বাধীন হলেও কাশ্মীরের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত হয় যে, কাশ্মীরের জনগণ ভোটের মাধ্যমে ঠিক করবে তারা হিন্দুস্থান না পাকিস্তান ডোনিনিয়নে যোগদান করবে। কিন্তু কাশ্মীরের মাহরাজা ভারত স্বাধীনতা বিলের শর্ত লঙ্ঘন করে হিন্দুস্থান ডোমিননিয়নে যোগদান করেন।(১৯) মহারাজার ডোগরা সৈন্যরা ও জম্মু প্রদেশের শিখরা সেখানকার মুসলমান আধিবাসীদের অকথ্য অত্যাচারে বিতাড়িত করে। হাজার হাজার মুসলিম নর-নারী তাদের হাতে নিহত ও অপহৃত হয়। এই নিদারুণ সংবাদে সীমান্তের স্বাধীন পাঠানরা ক্ষিপ্ত হয়ে কাশ্মীর আক্রমণ করে। হিন্দুস্থান সরকার মহারাজার সাহায্যার্থে স্থল ও বিমান পথে কাশ্মীরে প্রচুর সৈন্য প্রেরণ করে। অনেক খÐযুদ্ধে ভারতীয় ও কাশ্মীরী সৈন্যদের পরাভূত করে পাঠানরা গিলজাই মুযাফফরবাদ, পুঞ্চ প্রভৃতি স্থান অধিকার করে রাজধানী শ্রীনগরের নিকটবর্তী হয়। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের ফলে যুদ্ধবিরতি সীমারেখা নির্ধারিত হয়ে যুদ্ধ স্থগিত হয়। এই সংঘাতের ভার জাতিসংঘ গ্রহণ করে। অন্যদিকে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ট জুনাগড়ের নওয়াব পাকিস্তানে যোগদান করায় হিন্দুস্থান সরকার সৈন্য প্রেরণ করে জুনাগড় রাজ্য অধিকার করে। নওয়াব পরিবারবর্গসহ করাচীতে আশ্রয় নেয়। সেই থেকে ভারত ও পাকিস্তানের অধীনে চলে যায় কাশ্মীর; কাক্সিক্ষত স্বাধীনতালাভে ব্যর্থ হয় কাশ্মীরবাসী। তবে স্বাধীনচেনা জনগণ স্বাধিকার ও স্বাধীনতার জন্যে আন্দোলন ও সংগ্রামের পথ বেছে নেয়। স্বভাবতই অসংখ্য প্রাণহানি, ধ্বংস, রক্তপাত ও জুলুম-অত্যাচার নেমে আসে তাদের উপর। এইসব নির্যাতন বরণ করে নিয়েই অর্ধশতাব্দী ধরে তারা লড়াইরত। মধ্যএশিয়া ও লাতিন আমেরিকার স্বাধীনতা ও স্বাধিকারের প্রশ্নে কবি যেভাবে একাত্মতা প্রকাশ করেন, কাশ্মীরের ক্ষেত্রেও সেভাবে উচ্চকিত হয়েছেন।
তবুও কি অদম্য মানুষের স্বাধীনতার গান।
স্বাধীনতা, শব্দটি পারতপক্ষে এখন আর উচ্চার্য নয়।
স্বাধীনতা, এক উপত্যকাবাসীর ফিনকি দেওয়া রক্তের চিৎকার। লেকের ভেতর
প্রতিটি নৌকোয় এখন গুঞ্জরিত হচ্ছে কাশ্মীর। মনে হয় প্রতিটি বিষণ্ণ মুখই
উদ্গীরণ করতে পারে বুলেট।
প্রতিটি যুবতীর বক্ষসুষমায় লুকিয়ে আছে বিস্ফোরক।
প্রতিটি কিশোরীর ইজ্জতের ওপর এখন রোপিত আছে স্বাধীনতার পতাকা।
অত্যাচারীর প্রতিটি রোমকূপ এখন আজাদীর রক্তে সিক্ত। স্বাধীনতা এখন
হাত বাড়িয়ে দেওয়া ইতিহাস কিংবা
ইতিহাস এখন অপেক্ষামান কাশ্মীর।
[‘উপমহাদেশ, কাশ্মীর ’৯৩’, আমি, দূরগামী]
কবি সব সময় মানুষের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছেন। প্রতিটি স্বাধীনতাকামী জনপদের জন্যে কলম ধরেছেন– তাদের নায্য অধিকার, স্বাধীনতা, মুক্তিসংগ্রামে সাহস, নৈতিক মনোবল জোগান দিয়েছেন। সেটা ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে সকল মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামেই কবি উদ্দীপ্ত থেকেছেন। এশিয়ার অন্যান্য জনপদবাসীর মতো দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীনতা আন্দোলনরত মুক্তিকামী কাশ্মীরের মানুষের সঙ্গে কবি একাত্ম হয়েছেন এবং তাদের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাকে মহিমান্বিত করেছেন। কাশ্মীরের দুঃসাহসী তরুণ-তরুণীদের লড়াকু জীবনসংগ্রামের চিত্রকল্প তিনি নির্মাণ এবং ইতিহাসের সঙ্গে তাদের স্বাধীনতার সম্পর্ককে অঙ্গাঙ্গি ও অপরিহার্যরূপে প্রকাশ করেন।
কবি এইভাবে দক্ষিণ এশিয়া, পূর্ব এশিয়া এবং মধ্য এশিয়ার মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতার প্রশ্নে প্রতিবাদী হয়েছেন। ইতিহাসের দ্বা›িদ্বক গতিধারায় সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়ে কবি তাকে অনিবার্য করে তুলেছেন। এক্ষেত্রে বিচিত্র ও বলিষ্ঠ প্রতীক-চিত্রকল্প-উপমার সাহায্যে কবি পাঠককেও উজ্জীবিত করেন।
তথ্য-নির্দেশ:
১. নির্মল কান্তি ঘোষ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক (দ্বি-সং.; কলকাতা: ছায়া প্রকাশনী, ১৯৮৬), পৃ. ৩১৬।
২. এডওয়ার্ড ডব্লিউ. সাঈদ, ফয়েজ আলম (অনূ.), অরিয়েন্টালিজম (দ্বি-প্র.; ঢাকা: র্যামন পাবলিশার্স, ২০০৭), পৃ. ৭০।
৩. (ক) Eric Hobsbawn, Age of Extremes ১৯১৪-১৯৯১ (London, Abacus, ১৯৯৪), পৃ. ৪৩৭.
(খ) আনু মুহাম্মদ, “৬০ দশক: রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানুষ”, নিসর্গ, ষাটের দশক সংখ্যা, পৃ. ২৯।
৪. জাঁ জ্যাক রুশো, সরদার ফজলুল করিম (অনূ), সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট (তৃ-মু.; ঢাকা: মওলা ব্রাদার্স, ২০০৮), পৃ. ২৮-২৯।
৫. জাঁ জ্যাক রুশো, সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট, পৃ. ৩০-৩১।
৬. আনু মুহাম্মদ, “৬০ দশক: রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানুষ”, নিসর্গ, পৃ. ৯।
৭. আবুল কালাম, “আমেরিকা ও ইন্দোচীন রাজনীতি: একটি রণনৈতিক দর্পণ”, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা (ডিসেম্বর, ১৯৮৩), পৃ. ৪৪।
৮. বদরুদ্দীন উমর, প্যালেস্টাইন, আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ (ঢাকা: জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, ২০০৪), পৃ. ৫৩-৫৪।
৯. লেলিন ‘সাম্রাজ্যবাদ’কে পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়’ হিসেবে অভিহিত করেন। অর্থনীতিতে পুঁজিবাদ বিকাশের একটি পর্যায়ে, তার সর্বোচ্চ রূপ ‘সাম্রাজ্যবাদ’ হিসেবে চিহ্নিত; এবং তাকে বলা হয় আধুনিক সাম্রাজ্যবাদ। এক চেটিয়া পুঁজিবাদের লক্ষণ আলোচনা করতে গিয়ে লেনিন কয়েকটি প্রধান লক্ষণ উল্লেখ করেছেন: ক) উৎপাদন এবং পুঁজির পুঞ্জিভবন এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে যেখানে তা একচেটিয়া রূপ ধারণ করে এবং এই একচেটিয়া অবস্থাই তখন অর্থনীতিতে নির্ধারক ভূমিকা পালন করে, খ) ব্যাংক-পুঁজি এবং শিল্প-পুঁজি একীভূত হয়ে সৃষ্টি করে ফিন্যান্স পুঁজি এবং দেখা দেয় মুষ্টিমেয়র একচেটিয়া প্রাধান্য, গ) পণ্য রফতানির বদলে পুঁজি রফতানি অনেক বেশি গুরুত্ব লাভ করে।; ঘ) আন্তর্জাতিকভাবে পুঁজিপতিদের এক চেটিয়া গোষ্ঠীর জন্ম হয়। সেগুলো নিজেদের মধ্যে পৃথিবীকে ভাগ করে নেয়; এবং ঙ) বৃহৎ পুঁজিপতি শক্তিগুলো দ্বারা পৃথিবী ভাগবাঁটোয়ারা সম্পন্ন হয়।
দ্র. ভ. ই. লেনিন, ‘ইমেপরিয়ালিজম, দ্যা হাইয়েস্ট স্টেজ অব ক্যাপিটালিজম’, কলেক্টেড ওয়ার্কস, ভলউম. ২২ (মস্কো, ১৯১৬), পৃ. ২৬৬।
১০. Edward Said, ‘Question of Palestine’, দ্র. ফরহাদ মজহার, সাম্রাজ্যবাদ (ঢাকা: আগামী প্রকাশনী, ২০০৮), পৃ. ১১০-১১২।
১১. ফরহাদ মযহার, সাম্রাজ্যবাদ, পৃ. ১১১-১১২।
১২. কুলদীপ নায়ার, “আফগানরা কখনো হারেনি”, মাসুদ মজুমদার (সম্পা.), মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও রক্তাক্ত আফগান (ঢাকা, ২০০২), পৃ. ১২৩-২৪।
১৩. এডওয়াড ডব্লিউ সাঈদ, “অবিচারই সন্ত্রাসের মূল”, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও রক্তাক্ত আফগান, পৃ. ৯৫-৯৬।
১৪. “আমেরিকা এই আক্রমণের ব্যাপারে যে নৈতিক যুক্তি উপস্থাপন করেন তার প্রতি প্রশ্ন তুলেছেন অরুণন্ধতি রায়: “কৌশলগত, সামরিক এবং অর্থনৈতিক কারণে যুক্তরাষ্ট্রবাসীদের এ কথা বোঝানো মার্কিন সরকারের জন্য খুব জরুরি যে, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রতি দেশবাসীর অঙ্গীকার এবং ‘আমেরিকান ওয়ে অফ লাইফ’ আজ হুমকিগ্রস্ত। শোক, সংক্ষোভ আর ক্রোধের এই বাতাবরণে এই তত্ত্ব খাওয়ানো খুব সহজ। কিন্তু তাই যদি সত্যি হয়, তাহলে খটকা লাগে হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে কেন আমেরিকা অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রভুত্বের প্রতীক ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার আর পেন্টাগন বেছে নেওয়া হলো? কেন বেছে নেওয়া হলো না ‘স্ট্যাচু অফ লিবার্টি’? হতে কি পারে, হামলার পেছনে এই নারকীয় ক্ষোভের শেকড় আমেরিকার মুক্তি আর গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ঘৃণায় প্রোথিত নয়, বরং প্রোথিত এ দুটোর ঠিক বিপরীত জিনিসে অর্থাৎ সামরিক ও অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ, অভ্যুত্থান, সামরিক একনায়কতন্ত্র, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অকল্পনীয় গণহত্যা ইত্যাদির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে।” দ্র. অরুণন্ধতি রায়, ‘‘ইনফিনিট জাস্টিস’-এর বীজগণিত’’, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও রক্তাক্ত আফগান, পৃ. ১২৬-১২৯।
১৫. এম. আবদুল হাফিজ, “মার্কিন আধিপত্যবাদের সূর্যাস্ত”, মহিউদ্দীন আলমঙ্গীর (সম্পা.), দৈনিক নয়া দিগন্ত (ঢাকা, ২৩ জুন, ২০০৭), পৃ. ৬।
১৬. বদরুদ্দীন উমর, প্যালেস্টাইন, আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, পৃ. ৭৯-৮০।
১৭. ফরহাদ মযহার, সাম্রাজ্যবাদ, পৃ. ১৪৬-১৪৭।
১৮. আল মাহমুদ, “মৎসগন্ধ্যা ঋতুর উপলব্ধি”, ‘না কোনো শূন্যতা মানি না’, কবিতাসমগ্র ২ (ঢাকা: অনন্যা, ২০০৬), পৃ. ১৩৭।
১৯. অতুল চন্দ্র রায়, ভারতের ইতিহাস (পু.মু.; কলকাতা: মৌলিক লাইব্রেরি, ১৯৯৭), পৃ. ৫২৬-৫৩০।







