মাহমুদ মেঘ
ব্যক্তিগতভাবে আমি পিরোজপুরের সন্তান। তাই অবচেতনভাবেই হোক, কিংবা রক্তের টানেই হোক—যখন প্রথম জেনেছি বাংলা সাহিত্যের এই দিকপাল কবির বাড়ি আমাদের পিরোজপুরে, তখন থেকেই তাঁর লেখার প্রতি আমার এক অগাধ ভালোবাসা আর নাড়ির টান জন্ম নেয়। পরে আমি নিজে যখন সাহিত্যের আঙিনায় পা রাখলাম, ছন্দ আর শব্দের সঙ্গে সখ্যতা গড়তে শুরু করলাম, তখন এক আশ্চর্য অনুভূতি আমাকে তাড়া করত। মনে হতো, এই একাকী সাহিত্যযাত্রায় আমি একা নই; আমার মাথার ওপর ছায়া হয়ে, পরম অভিভাবক হয়ে পিরোজপুরেরই শঙ্করপাশা গ্রামের সেই মৃদুভাষী অথচ ইস্পাতকঠিন মানুষটি দাঁড়িয়ে আছেন। আজ ১০ জুলাই, কবি আহসান হাবীবের মৃত্যুবার্ষিকী।
তিরিশের দশকের আধুনিকতার উত্তরসূরি হয়েও আহসান হাবীব তাঁর কবিতায় যুক্ত করেছিলেন সম্পূর্ণ নিজস্ব এক নাগরিক ও গ্রামীণ সংবেদনশীলতা। এই স্মরণাতুর দিনে প্রথাগত জীবনবৃত্তান্তের বাইরে তাঁর জীবনের কয়েকটি প্রসঙ্গ নিয়েই এই লেখা।
বাংলা সাহিত্যে আহসান হাবীবকে সাধারণত ‘মৃদুভাষী কবি’ হিসেবেই অভিহিত করা হয়। কিন্তু এই আপাত শান্ত মানুষটিই যখন ‘দৈনিক বাংলা’—সাবেক ‘দৈনিক পাকিস্তান’-এর সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তখন রুচি ও মানের প্রশ্নে হয়ে উঠেছিলেন ইস্পাতকঠিন, আপসহীন এক ব্যক্তিত্ব। স্বজনপ্রীতি, অনুরোধ আর পরিচয়ের চাপে যখন তৎকালীন সাহিত্যপাতাগুলো প্রায় প্লাবিত, তখন তিনি তৈরি করেছিলেন এক অনন্য মানদণ্ড। তাঁর নির্মোহতার একটি উল্লেখযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় কবি শামসুর রাহমানকে ঘিরে একটি ঘটনায়। শামসুর রাহমান তখন একই পত্রিকার প্রধান সম্পাদক। একবার তিনি একটি কবিতা আহসান হাবীবের টেবিলে পাঠালে, সাহিত্যিক গুণের বিচারে সেটি পছন্দ হয়নি তাঁর; তাই প্রধান সম্পাদককে তা বদলে দিতে বলেন। শামসুর রাহমানও অগ্রজের এই সাহিত্যিক সততাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে কবিতাটি পরিবর্তন করে দেন। যাঁদের লেখা মানোত্তীর্ণ না হওয়ায় তিনি ছাপতে পারতেন না, তাঁদের অনেকের কাছ থেকেই তাঁকে শুনতে হয়েছে তীব্র গালিগালাজ; এমনকি রিকশায় যাতায়াতের পথেও সহ্য করতে হয়েছে অশ্লীল কটূক্তি। কিন্তু শিল্পের বিচারে তিনি আজীবন অটল ও নির্বিকার ছিলেন। সাহিত্যকে তিনি ব্যক্তিগত সম্পর্কের নয়, যোগ্যতার জায়গা থেকেই বিচার করতেন।
আহসান হাবীবের গদ্য, তাঁর সম্পাদিত বিশেষ সংখ্যা এবং সম্পাদকীয় কাজের ভেতরেও রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতার পরিচয় পাওয়া যায়। পাকিস্তান আমলে যখন সমাজতান্ত্রিক কিংবা বামঘরানার সাহিত্যকে বাঁকা চোখে দেখা হতো, তখন তিনি গভীর আন্তরিকতায় সম্পাদনা করেছিলেন ‘ম্যাক্সিম গোর্কি সংখ্যা’। কলকাতা জীবনের প্রগতিশীল যে চিন্তাধারা তিনি আত্মস্থ করেছিলেন, তা আমৃত্যু বহন করে গেছেন। তাঁর সাহসের আরও উজ্জ্বল পরিচয় মেলে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে। প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকার কারণে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পড়েন, চাকরি হারান এবং পরবর্তীকালে মৃত্যুবরণ করেন। এমন এক অবরুদ্ধ সময়ে, ১৯৭১ সালের অক্টোবরে, সামরিক জান্তার চোখের সামনে ‘দৈনিক পাকিস্তান’-এর পাতায় ‘ওয়ালীউল্লাহ সংখ্যা’ প্রকাশ করা কেবল শিল্পরুচির পরিচয় ছিল না; এটি ছিল দেশপ্রেম, নৈতিক সাহস এবং সাহিত্যিক দায়বোধের এক দৃষ্টান্ত। উল্লেখযোগ্য যে, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘কমরেড পাবলিশার্স’ থেকেই ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত হয়েছিল আহসান হাবীবের প্রথম কাব্যগ্রন্থ রাত্রিশেষ। এই সূত্রে দুই লেখকের সম্পর্কের ভেতর একটি সাহিত্যিক ও বৌদ্ধিক সেতুও খুঁজে পাওয়া যায়।
পিরোজপুরের শঙ্করপাশা গ্রামের এক অসচ্ছল পরিবারে জন্ম নেওয়া আহসান হাবীবকে কবি হয়ে ওঠার পথে মোকাবিলা করতে হয়েছিল এক কঠোর সামাজিক বাস্তবতা। স্কুলজীবনে তাঁর শিক্ষক বরদা চক্রবর্তী একজন মুসলমান ছেলের কবিতা লেখাকে ভালো চোখে দেখতেন না। একদিন শ্রেণিকক্ষে সবার সামনে শ্লেষাত্মক সুরে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তুই কপি হয়েছিস, কপি?”—এই একটি বাক্যের মধ্যেই ধরা পড়ে সময়ের সংকীর্ণতা, অবজ্ঞা এবং মানসিক আঘাতের ইতিহাস। কিন্তু সেই শৈশবের আঘাত তাঁকে স্তব্ধ করেনি; বরং আরও দৃঢ় করেছে। পরবর্তী সময়ে তাঁর বিখ্যাত ‘আবহমান’ কবিতায় আমরা দেখি, তিনি নিজেকে কোনো বহিরাগত বা আগন্তুক হিসেবে দেখতে অস্বীকার করছেন। গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মাছশিকারি খালেক নিকিরির জীবনের সঙ্গে নিজের সত্তাকে একাকার করে তিনি উচ্চারণ করেন—“আমি কোনো আগন্তুক নই।” এই উচ্চারণ শুধু কাব্যিক ঘোষণা নয়, মাটির সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে এবং স্বদেশের সঙ্গে তাঁর আত্মপরিচয়েরও ঘোষণা। জীবনের অর্থনৈতিক সংকট, সময়ের নিষ্ঠুরতা, যুদ্ধের অভিঘাত—সবকিছুর ভেতর দিয়েও তিনি শেষ পর্যন্ত আশাবাদী ছিলেন। বিদীর্ণ দর্পণে মুখ দেখার অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল, কিন্তু তবু বিশ্বাস হারাননি। তিনি ভরসা রাখতেন—ডাক বিলি হোক বা না হোক, শুভ দিনের উত্তর একদিন আসবেই।
আহসান হাবীব মূলত কবি হলেও তাঁর গদ্যের গঠনশৈলী ছিল ঋদ্ধ, সংযত ও যুক্তিনির্ভর। তাঁর উপন্যাস অরণ্য নীলিমা এবং জাফরানী রং পায়রা পাঠ করলে বোঝা যায়, মানুষের মনস্তত্ত্ব, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং প্রতিকূলতার মাঝেও জীবনের রস নিংড়ে নেওয়ার এক আশ্চর্য ক্ষমতা তাঁর ছিল। তিনি জীবনকে কেবল ভোগ করেননি; গভীরভাবে দেখেছেন, বুঝেছেন এবং শিল্পে রূপ দিয়েছেন। তবে তাঁর সাহিত্যকর্মের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক শিশুসাহিত্য ও ছড়া। ছোটদের জন্য তিনি যে বিপুল ভাণ্ডার রেখে গেছেন, তা বাংলা শিশুসাহিত্যের এক মূল্যবান সম্পদ। রাণী খালের সাঁকো কিংবা ছোট মামা দি গ্রেট শুধু কিশোরসাহিত্যের উল্লেখযোগ্য সংযোজনই নয়, তাঁর ভাষার সহজতা, কল্পনাশক্তি এবং শিশুমনের প্রতি মমত্বেরও পরিচায়ক। একজন শিশুসাহিত্যিক ও ছড়াকার হিসেবে তাঁর এই বিশাল ভাণ্ডার আমাকে গভীরভাবে সমৃদ্ধ করেছে। আমার নিজের সাহিত্যচর্চায়, বিশেষ করে শিশুতোষ রচনা ও ছড়ার জগতে, তাঁর কাজ বারবার প্রেরণা জুগিয়েছে। এই গদ্যঐতিহ্যের উত্তরাধিকার আমরা দেখতে পাই তাঁর সুযোগ্য পুত্র মঈনুল আহসান সাবেরের সাহিত্যকর্মেও। বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন; তবু কোথাও যেন পিতার সাহিত্যিক সংবেদন, রুচি ও গদ্যের শুদ্ধতার একটি উত্তরসূত্র সেখানে থেকে গেছে।
১৯৮৫ সালের ১০ জুলাই, ৬৮ বছর বয়সে জীবনের ওপারে পাড়ি জমান এই নিভৃতচারী, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন শিল্পী। তাঁর প্রস্থান শুধু একজন কবির মৃত্যু নয়; বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এক স্বতন্ত্র কণ্ঠের বিদায়। নিজের মাটির সন্তান হিসেবে তাঁর চলে যাওয়ার দিনে বারবার মনে হয়, আহসান হাবীব শুধু একজন আধুনিক কবিই ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক নীরব অভিভাবক, এক সাহিত্যিক বিবেক। তাঁর কবিতা, গদ্য, সম্পাদনা, নৈতিক সাহস এবং সাহিত্যিক সততা—সব মিলিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য উচ্চতার নাম। আজ তাঁর প্রয়াণদিবসে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করি। পিরোজপুরের মাটি তাঁকে জন্ম দিয়েছিল, কিন্তু তিনি নিজেকে সমগ্র বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সম্পদে পরিণত করেছেন। তবু ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে মনে হয় আমাদেরই মানুষ—নিজের মাটির এক অভিভাবক, যাঁর ছায়া এখনও শব্দের ভেতর, স্মৃতির ভেতর, সাহিত্যের ভেতর জেগে আছে।
কবি আহসান হাবীবকে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।







