শান্তা মারিয়া
মহাভারত পড়তে গেলে আমার খুব কষ্ট হয় তিন বীরের জন্য। কর্ণ, একলব্য এবং অভিমন্যু। এরমধ্যে সবচেয়ে ট্র্যাজিক চরিত্র নিঃসন্দেহে অভিমন্যু। কারণ সে ছিল মাত্র আঠারো বছরের বীর যোদ্ধা। জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব যুধিষ্ঠিরের (যদিও প্রকৃতপক্ষে জ্যেষ্ঠভ্রাতা ছিলেন কর্ণ) অনুরোধে তিনি ঢুকে ছিলেন চক্রব্যূহের ভিতরে। সেখানে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেও সপ্তরথীর সঙ্গে অন্যায় যুদ্ধে নিহত হন এই বীরতরুণ। পুরো গল্পটি এখন বলার কোন মানে হয় না, তাই বিস্তারিত বলছি না।
আমাদের বাংলা সাহিত্যের দুই প্রিয় কবিকে আমার সব সময় মনে হয় অভিমন্যুর মতো। রাজনীতির চক্রব্যূহে যারা সপ্তরথীর হাতে কেবলি অন্যায় অভিযোগের শিকার হয়েছেন।
এদেশের রাজনীতির সবচেয়ে নষ্ট দিক হচ্ছে শিল্প সাহিত্য অঙ্গনকে রাজনৈতিক দলীয় বিভাজনে একেবারে নষ্ট করে ফেলা।
এই বিভাজনের মধ্যে একদল আছেন যারা শামসুর রাহমানকে ‘নাগরিক কবি’র তকমা দিয়ে খর্ব করার প্রয়াস করেন এবং তাকে ‘বিস্মৃতপ্রায়’ কবির তালিকায় ঠেলে দিয়ে স্বস্তি বোধ করেন।
আরেক দল আছেন যারা আল মাহমুদের নাম নিলে নিজেদের জাত যাবে বলে মনে করে আশংকায় তাকে প্রাণপণে অনুচ্চারিত করে রাখেন।
এই দুই দলকেই আমার চপেটাঘাত করে বলতে ইচ্ছা করে ‘আরে গর্দভের দল, যতই চেষ্টা করিস বাংলা কবিতা থেকে শামসুর রাহমান এবং আল মাহমুদকে মুছে দিতে তোরা কখনই পারবি না।’
আমি জানি এই দুই দলই মনে মনে ঠিকই জানে, শামসুর রাহমান এবং আল মাহমুদ বাংলা কবিতায় অমরত্ব পেয়ে গেছেন। তবু উটপাখির মতো বালিতে মাথা গুঁজে তারা সত্যকে অস্বীকার করতে চান।
শামসুর রাহমান এবং আল মাহমুদ এই দুই কবির সঙ্গেই পারিবারিক পর্যায়ে আমার পরিচয় ছিল শৈশব থেকে। তাদের দুজনেই আমার বাবা কমরেড মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহর অত্যন্ত পরিচিত ছিলেন। সেই সূত্রে আমি অনেক বার তাদের বাড়িতে গিয়েছি। মানুষ হিসেবে তাদের দুজনেই কেমন ছিলেন সেটাও জানি। কিন্তু এখানে আমি সে ইতিহাস বলতে বসিনি।
আমি বলতে চাই কবি হিসেবে বাংলা সাহিত্যে তাদের অনন্য উচ্চতা এবং আমাদের সাহিত্য অঙ্গনের কতিপয় ব্যক্তির মানসিক খর্বতার কথা।
প্রথমেই কবি শামসুর রাহমানের কথা বলি। শামসুর রাহমান বাংলা ভাষা ও সাহিত্য যতদিন থাকবে ততোদিন বেঁচে থাকবেন তার অনন্য সাধারণ কবিতার মাধ্যমে। কল্লোল যুগের পর তিনি বাংলা কবিতার যে বাঁক বদল ঘটিয়েছিলেন, যে বুদ্ধিদীপ্ততায় ভাস্বর করে ছিলেন সেখানে তিনি একক মহিমায় বিরাজমান।
আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় তার লেখা ‘ইকারুসের আকাশ’। কবি বা শিল্পসাধক মাত্রই কি ইকারুস নয়? যে সূর্যের আলোয় , আকাশ স্পর্শ করার আনন্দে উড়তে চায় অসীম উচ্চতায়। তিনি ‘নাগরিক কবি’ এই অভিধাটি তাকে কেবলি সীমাবদ্ধ করে। আমার কাছে তিনি আধুনিক মানুষের যন্ত্রণার সার্থক রূপকার কবি। তিনি ঢাকা শহরকে কবিতায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এটা তার প্রতিভাবলেই সম্ভব হয়েছে। ‘মাতুয়ালা রাইত’ কবিতায় পুরান ঢাকার জীবনকে তিনি অমরত্ব দিয়েছেন। ‘বন্দী শিবির থেকে’ বইটির কবিতাগুলো আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধের অবরুদ্ধ ঢাকা, যুদ্ধের যে ছবি তুলে আনে তার তুলনা বিশ্বসাহিত্যেই অনন্য।
যখন তিনি বলেন ‘দাউ দাউ পুড়ে যাচ্ছে নতুন বাজার’ তখন মুক্তিযুদ্ধে পুরান ঢাকার নয়া বাজার পুড়ে যাওয়ার মর্মন্তুদ দৃশ্য ভেসে ওঠে। শামসুর রাহমান শুধু আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শিল্প সার্থক কবিই নন, তিনি মগ্নতার, আধুনিক মানুষের নিঃসঙ্গতারও কবি হয়ে ওঠেন।
যারা বাংলা কবিতায় শামসুর রাহমানকে গৌণ করতে চান তাদের ডেকে বলতে ইচ্ছা করে, ‘”বন্দী শিবির থেকে” (১৯৭২), ”দুঃসময়ে মুখোমুখি” (১৯৭৩), ”ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাটা” (১৯৭৪), ”আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি” (১৯৭৪) ” বা এদের সমতুল্য একটি বই বাংলা সাহিত্য ঘেঁটে খুঁজে বের করো। শামসুর রাহমানের কবিতা আমি একান্ত নিজের জন্য পাঠ করি রাত্রির নিবিড় প্রহরে। শামসুর রাহমান বাংলা সাহিত্যের ধ্রুব তারা।
আল মাহমুদকে অপাংক্তেয় করার প্রচেষ্টা আরও মারাত্মক। এই প্রচেষ্টা এতই বিশ্রী যে, মুক্তিযোদ্ধা আল মাহমুদকে ‘রাজাকার’ বলতেও অনেকের বাঁধে না।
কিন্তু আমি এখানে কবির রাজনৈতিক বিশ্বাস, তার ধর্মবিশ্বাস নিয়ে কথা বলতে বসিনি। আমার মতে, একজন কবি যিনি ব্যক্তি মানুষ তিনি তার সকল প্রকার বিশ্বাস, অবিশ্বাস, ব্যক্তি জীবন, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও মানবিক দুর্বলতাসহ মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যান। রয়ে যায় তার সাহিত্যকর্ম। আর আল মাহমুদের সাহিত্য কর্মের কথা যদি বলি তাহলে বলতে হয় ‘সোনালী কাবিন’ ও ‘কালের কলস’কে বাংলা সাহিত্য থেকে মুছে ফেলার সাধ্য কারও নেই।
আবহমান বাংলার যে রূপ, যে প্রাণ স্পন্দন সেটা আল মাহমুদের কবিতায় এতই সার্থকভাবে রয়েছে যে তা বাংলা সাহিত্যকেই পৌঁছে দিয়েছে হিমালয়ের উচ্চতায়।
আল মাহমুদ বিরোধীদের আমার বলতে ইচ্ছা করে,‘বধূবরণের নামে দাঁড়িয়েছে মহামাতৃকুল/গাঙের ঢেউয়ের মতো বলো কন্যা কবুল, কবুল ।’ এমন একটি পংক্তি আগে লিখে দেখাও তারপর আল মাহমুদ বিষয়ে নেতিবাচক কিছু বলতে এসো।
‘শ্রমিক সাম্যের মন্ত্রে কিরাতের উঠিয়াছে হাত
হিয়েনসাঙের দেশে শান্তি নামে দেখো প্রিয়তমা,
এশিয়ায় যারা আনে কর্মজীবী সাম্যের দাওয়াত
তাদের পোশাকে এসো এঁটে দিই বীরের তকোমা ।
আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন,
পরম স্বস্তির মন্ত্রে গেয়ে ওঠো শ্রেণীর উচ্ছেদ,
এমন প্রেমের বাক্য সাহসিনী করো উচ্চারণ
যেন না ঢুকতে পারে লোকধর্মে আর ভেদাভেদ ।’
এমন কবিতা যিনি লেখেন তার ব্যক্তিগত বিশ্বাস অবিশ্বাস নিয়ে আমার কাছে অন্তত আর কোন কথা ঠাঁই পায় না।
আমার কাছে মনে হয়, যিনি শামসুর রাহমান বা আল মাহমুদকে বাংলা কবিতা থেকে বাদ দিতে চান বা তাদের কোনভাবে অপাংক্তেয় করতে চান তিনি কবিতাই বোঝেন না। তার সঙ্গে কবিতা বিষয়ে কথা বলাই বাতুলতা।







