নেয়ামত ইমাম
প্রথম খণ্ড
৩.
রফিকুল্লা যেমন বলেছে, তিন দিনের মাথায় সুমন এন্টারপ্রাইজ থেকে আমার জন্য খবর আসে।
অফিসে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই ম্যানেজার রজব আলী সাহেব এগিয়ে এসে বলেন চুক্তিপত্রে সই করবার জন্য সুমন এন্টারপ্রাইজ থেকে একজন লোক আসবেন, কাল সকালে আমি যেন অফিসে থাকি। “আজ তারা ফোন করে জানিয়ে দিয়েছেন আমাদের দরপত্রে তারা খুশি। আপনি যেহেতু তাদের সঙ্গে বারবার দেখা করতে গিয়েছেন, এবার তারা নিজেরাই ঠিক করে নিয়েছেন তারা আমাদের অফিসে আসবেন এবং সব কাগজপত্র চ‚ড়ান্ত করে ফেলবেন।”
তিনি আরো বলেন আমাদের কোম্পানির ইতিহাসে কখনো এমন ঘটনা ঘটেনি। তিনি অনেক বাঘা বাঘা বিক্রয় প্রতিনিধি দেখেছেন, যাদের মধ্যে অনেকেরই দুই যুগের বেশি অভিজ্ঞতা ছিল এবং যারা কোটি কোটি টাকার চুক্তি সম্পাদন করেছে। কিন্তু কখনোই একজন কাস্টমার নিজস্ব উদ্যোগে আমাদের অফিসে এসে চুক্তিপত্রে সই করবার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করেনি। তিনি জানতে চান সুমন এন্টারপ্রাইজের জন্য আমি এমন কি করেছি যে তারা শুধু তাদের মত পরিবর্তন করেনি, অতি দ্রæত তাদের মালগুলো পাঠাবার জন্যও অনুরোধ করেছে।
“দেরিতে হলেও হয়তো তারা এই মালের জন্য যথার্থ কাস্টমার খুঁজে পেয়েছে,” আমি বলি। “আমাদের কাছ থেকে মাল কিনে সেগুলো তাদেরকে খুচরা ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করতে হবে। এমন ক্রেতা যদি হাতে থাকে তাহলে মাল নিতে অসুবিধা কোথায়? আমার মনে হয় তাদের ক্ষেত্রে ঠিক এই ব্যাপারটি ঘটেছে। আমার ম্যানেজার হিসাবে আপনি নিশ্চয়ই জানেন আমি কখন কি করছি এবং চেষ্টা করলেও কতটুক্ইু বা আমার পক্ষে করা সম্ভব। আপনি এও জানেন আপনার নির্দেশ বা কোম্পানির সংশ্লিষ্ট নীতিমালার বাইরে গিয়ে আমি কখনোই কিছু করি না। সেদিক থেকে বলবো ব্যাপারটা আপনার কাছে যেমন, আমার কাছেও আশ্চর্যজনকই মনে হচ্ছে।”
পরদিন সকালে অফিসে হাজির থাকবো বলে দ্রæত আমি ম্যানেজারের সামনে থেকে বিদায় হই। মনে হয় তার সঙ্গে আরো কিছুক্ষণ কথা বললে পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। সহকর্মী রফিকুল্লার সঙ্গে আলাপের দৃশ্যটি আমার মনে পড়ে যায় এবং আমি জানি সুমন এন্টারপ্রাইজের ক্ষেত্রে সে যা বলেছে ঠিক তাই ঘটছে। ভয় হয় তারা এখনই আবার রজব আলী সাহেবকে ফোন করে বসবে এবং পেছনের কথাগুলো খুলে বলবে। তাতে স্বপ্রণোদিত হয়ে ম্যানেজার সাহেব কোম্পানির পক্ষ থেকে তাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন এবং লোক মারফত একটি গিফটবক্স পাঠিয়ে তাদেরকে তুষ্ট রাখবার চেষ্টা করবেন। তার পরের দৃশ্যটি হবে ভয়াবহ। আমাকে ডেকে বলা হবে আমি আর এই কোম্পানিকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবো না এবং শাস্তি স্বরূপ এই মাসে ষড়ঋতু বা অন্যান্য ব্যবসার সঙ্গে চুক্তিপত্র সম্পন্ন করে যা সামান্য আমি উপার্জন করেছি তাও কেড়ে নেওয়া হবে। সঙ্গে ফিরিয়ে নেওয়া হবে আমার বিক্রয় প্রতিনিধির ব্যাজটি। এমনটি ঘটলে তা অযথার্থ হবে না, কারণ সুমন এন্টারপ্রাইজ মুখ খুললে ব্যবসা জগতে খবরটি দ্রæত ছড়িয়ে পড়বে এবং আমার জন্য আমাদের অন্যান্য বিক্রয় প্রতিনিধি থেকেও মুখ ফিরিয়ে নেবে ব্যবসায়ীরা। সমস্যাটি সেখানেই শেষ হবে না। এরপর কোনো কোম্পানিতে বিক্রয় প্রতিনিধি পদে আবেদন করতে গেলে সহজেই কেউ স্মরণ করতে পারবে সুমন এন্টারপ্রাইজকে একদিন আমি কেমন নিষ্ঠুরভাবে ঠকিয়েছি, যার মানে আমাকে নিয়োগ করা যাবে না, তাদের ব্যবসার কাছাকাছিও আসতে দেয়া যাবে না। এই পরিস্থিতির অপরিহার্য উপসংহার হচ্ছে : আমার এত দিনের অভিজ্ঞতার আর কোনো মূল্য থাকবে না।
অফিস থেকে বেরিয়ে যাবার সময় দরজায় দাঁড়ানো নিরাপত্তা কর্মিটি আমার দিকে এগিয়ে আসে এবং আমাকে উচ্চস্বরে সালাম দেয়। “কেমন আছেন, আসাদ সাহেব,” সে বলে, “আপনি নিশ্চয়ই আজকাল অনেক টাকা কামাচ্ছেন। তা বেশ ভালো, বেশ ভালো। টাকা কামানোর জন্য কপাল লাগে, তাই না? অনেকেরই যে সেই কপাল থাকে না তা তো আমার দিকে তাকালেই বোঝা যায়। আপনার সফলতার জন্য আমি খুব খুশি।” তার কথা আমাকে আরো ভয় পাইয়ে দেয় বলে আমি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিতে পারি না। “ম্যানেজার সাহেবের কাছে আপনার অনেক সুনাম শুনেছি,” সে আরো বলে। “আপনি তো অসাধ্য সাধন করে ফেলেছেন, ভাই। শুধু কমিশন কেন, শুনেছি এবার আপনাকে অনেক বড় একটা পদোন্নতিও দেওয়া হবে।” আমি সামান্য হেসে বিষয়টি শেষ করতে গেলে সে তা গ্রহণ করে না। “শুধু হাসলে চলবে? মিষ্টি খাওয়াতে হবে না? এরকম সুখবর তো প্রতিদিন আসে না।”
“আপনাকে নয় শুধু,” আমি বলি, “অফিসের সবাইকে মিষ্টি খাওয়াবো। আগে চুক্তিপত্রে সই হয়ে যাক। বলা তো যায় না।” “চুক্তিপত্রে সই তো কাল হয়ে যাবে,” সে বলে। “তখন বলবেন না যেন আগে হাতে কিছু টাকা আসুক, তারপর মিষ্টি খাওয়াবো।” “না,” আমি আবার হেসে জবাব দেই। “আপনাকে অবশ্যই ততদিন অপেক্ষা করতে হবে না। বিষয়টা নিয়ে আমি ভাবতে শুরু করেছি।”
ফোন করে জানতে পারি রফিকুল্লা এখনো বাইরে। তার সঙ্গে অতি সত্ত¡র দেখা করা দরকার বললে সে আমাকে এই প্রথমবারের মতো কমলাপুরে তার বাসায় যেতে বলে। “আসছি,” আমি বলি এবং পথে নামি। দিনের শেষে পেটে ক্ষুধা থাকলেও কিছু খাবার মন-মানসিকতা এখন আমার নেই। আমার হিসাবে সুমন এন্টারপ্রাইজের চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত অনুমোদিত না হলেও ষড়ঋতুর চুক্তিটি অনুমোদিত হয়ে যাওয়ায় মাসের শেষে আমার আর্থিক অবস্থা একেবারে খারাপ হবে না। আমি চাইলে পোড়ামাটির ব্যাংক ভেঙ্গে পাওয়া টাকাগুলো থেকে কিছুটা এখন খরচ করতে পারি, কিনতে পারি রাস্তার পাশ থেকে কিছু খাবার ও এক বোতল পানি। তবে রফিকুল্লার সঙ্গে বসবো বলে তখনই কিছু খাবো বলে কমলাপুরের দিকে চলতে থাকি।
কমলাপুরে পৌঁছে দেখি রফিকুল্লা আমার জন্য বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক পা এগিয়ে সে শক্ত করে আমার সঙ্গে হাত মিলায়। তার হাসিখুশি ভাব দেখে বুঝতে পারি আমি কেন এসেছি সে তা জানে। “আজ আমরা বাসাতেই বসবো,” সে বলে। “অসুবিধা নেই তো?” “মোটেই না” বললে সে আমাকে টেনে গেইট দিয়ে ভেতরে নিয়ে যায় এবং যে নারীটি দরজা খুলে দেয়, তাকে সে মাহরুবা, তার স্ত্রী, বলে পরিচয় করিয়ে দেয়। আমি মাহরুবাকে সালাম জানাই, বলি, “আমার নাম আসাদুজ্জামান, বিক্রয় প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করি।” “আপনার কথা অনেক শুনেছি,” মাহরুবা বলে। “আপনি বর্তমানে দক্ষিণ পাইকপাড়ায় থাকলেও সামনের মাসে এদিকে চলে আসার চেষ্টা করছেন। আপনি এখনো সংসার করেননি, তবে শিগ্রই করবেন বলে খুঁজে বেড়াচ্ছেন দুই রুমের একটি বাসা। টাঙ্গাইল থেকে আপনার বাবা আপনার সঙ্গে যোগ দেবেন। আপনাকে বলতে পারি কমলাপুর এখন আগের চেয়ে অনেক অনেক ভালো জায়গা। বিশেষ করে এদিককার নতুন আবাসিক এলাকাগুলোতে ভাসমান মানুষের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। এসে পড়–ন। আপনার পছন্দ হবে।”
আমি মাথা নাড়িয়ে তার প্রতিটি কথায় সায় দেই, যদিও মনে মনে ভাবি রফিকুল্লা তার কাছে আমার সম্পর্কে আর কি কি বানিয়ে বলেছে।
“আমি রান্নাঘরে যাচ্ছি,” মাহরুবা বলে, “আজ রাতে আপনি অবশ্যই আমাদের সঙ্গে খাবেন।” তার কথায় এত জোর থাকে যে তাতে সায় না দিয়ে উপায় থাকে না।
মাহরুবা চলে গেলে আমি রফিকুল্লার দিকে তাকাই। “ঠিক আছে,” সে বলে, “একটু না হয় বাড়িয়ে বলেছি। কিন্তু তাতে কি? এমন কিছু তো বলিনি যা করা যাবে না। সুমন এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে চুক্তিটা হয়ে গেলে কমপক্ষে পাঁচ বছরের জন্য আপনাকে আর টাকা-পয়সার কথা চিন্তা করতে হবে না। তা ছাড়া সঙ্গে সঙ্গে বউ না পাওয়া গেলেও বাবাকে তো আনা যাবে। সুতরাং দুই রুমের বাসা খোঁজার বিকল্প নেই।”
“পাঁচ বছর আপনি কোথায় পেলেন?” আমি জিজ্ঞেস করি। “সুমন এন্টারপ্রাইজ যদি কাল আসে এবং চুক্তিপত্রে সই করে, তবে তা হবে মাত্র পাঁচশ রেডিয়েটর প্রেশার টেষ্ট কিটের প্রথম অর্ডারের জন্য। আমাদের সঙ্গে ব্যবসা করে যদি তাদের ভালো লাগে, তবে হয়তো আগামিতে তারা আমাদের কাছ থেকে মাল্টিফাংশান রেফ্রাক্টোমিটার, সিলিÐার লিকেজ টেষ্টার বা কমপ্রেশান টেষ্টার নেবে। এরকমই তাদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে।”
“বিষয়টি এখন আর ঠিক এই অবস্থায় নেই,” সে বলে। “গতকাল তাদেরকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে এই চুক্তি হবে কমচে কম পাঁচ বছরের জন্য। তাদেরকে বলা হয়েছে এখন থেকে তিন মাস পরে তাদের একমাত্র বিক্রয় প্রতিনিধি হবেন আপনি। ইনফ্রারেড থার্মোমিটার, কুলেন্ট টেষ্টার, টিউবিং কাটার এবং বল জয়েন্ট ইনষ্টলার সহ যত মাল লাগে সব আমরা দেবো। এই তিন মাসে তারা তাদের অন্যান্য বিক্রয় প্রতিনিধির সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেন গুটিয়ে ফেলবে।”
আমার বিশ্বাস হতে চায় না, কিন্তু রফিকুল্লা আগ বাড়িয়ে বলে তিন মাস পরে আমার কমিশন হয়ে যেতে পারে কমপক্ষে পাঁচগুণ এবং সেই সঙ্গে আমাকে যদি পদোন্নতি দেয়া হয়, যেমনটি ম্যানেজার রজব আলী তাকে বলেছেন, তাহলে আজই আমার বাসা খুঁজতে বেরিয়ে পড়া উচিত।
আমার জন্য আরো বিস্ময় অপেক্ষা করে যখন আমি জিজ্ঞেস করি সে যদি আমার জন্য এত কিছু করছে, কেন সে নিজের জন্য কিছু করছে না। “আপনার বাসার দিকে তাকিয়ে মনে হয় বিক্রয় প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করার আপনার দরকার নেই,” আমি বলি। “সবকিছু সঠিক জায়গায় সঠিকভাবে ও সঠিক পরিমাণে রাখা। কোথাও কোনো কমতি নেই। কিন্তু আপনি হয়তো আরো ভালো কিছু চান। এই যে লোকদের কথা বলছেন যারা আমার হয়ে কাজগুলো করছে, যাদের হাতে আলাদীনের চেরাগ রয়েছে বলে মনে হয়, তারা কি একইভাবে আপনাকেও সাহায্য করতে পারে না?”
সে বলে তারা যে তাকে সাহায্য করছে না তাই বা আমি ভাবলাম কি করে। তারা হয়তো তাকে সাহায্য করছে অন্যভাবে। আমি তার ব্যাখ্যা শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে বসে থাকি। “আমি আরো দুটি কোম্পানির সঙ্গে কাজ করছি,” সে বলে। “তা ছাড়া আমার আরো কিছু আয়ের উৎস আছে, যা এখনো আপনাকে বলা হয়নি। আপনি এদিকে চলে আসলে সবকিছু এমনিতেই আপনার জানা হয়ে যাবে।”
মাহরুবা ডেকে বলে টেবিলে খাবার দেয়া হয়েছে। “চলুন তাহলে, কিছু খেয়ে নিই,” বলে রফিকুল্লা। “আমাদের কথা কিন্তু শেষ হয়নি,” আমি বলি। “খাওয়া শেষ হলে আবার বসবো,” এই বলে হাত ধোয়ার জন্য সে আমাকে ওয়াশরুমের দরজাটি দেখিয়ে দেয়।







