প্রচ্ছদসাম্প্রতিকজুলাই আন্দোলনে নেত্রকোণা : দৃশ্যের আড়ালে অদৃশ্য বাস্তবতা

লিখেছেন : এনামূল হক পলাশ

জুলাই আন্দোলনে নেত্রকোণা : দৃশ্যের আড়ালে অদৃশ্য বাস্তবতা

  • এনামূল হক পলাশ

২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট ২০১৮ সালের সরকারি পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করলে কোটা প্রথা পুনরুত্থিত হয়। এর প্রতিবাদে ১ জুলাই থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে শিক্ষার্থীরা দেশব্যাপী অহিংস আন্দোলন শুরু করে।জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে শিক্ষার্থীরা সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে “বাংলা ব্লকেড” কর্মসূচি পালন করে।

জুলাই মাসের শুরুতে আন্দোলন গতি পাওয়ার পর ৮ জুলাই নেত্রকোণায় প্রথম ছাত্র সমাবেশ ঘটে। তৎকালীন শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি রাজুর বাজার এলাকা থেকে শুরু হয়ে পুরো শহর প্রদক্ষিণ করে এবং মোক্তারপাড়া মাঠে এসে শেষ হয়। এসময় শিক্ষার্থীরা কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
২০২৪ সালের ১৪ জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম একটি টার্নিং পয়েন্ট বা গুরুত্বপূর্ণ দিন ছিল। ওই দিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফর শেষে সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য (রাজাকারের নাতিপুতি) করায় সারাদেশে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়।

একই দিন কোটা সংস্কারের দাবিতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে বঙ্গভবন অভিমুখে গণপদযাত্রা করেন এবং রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন।

২০২৪ সালের ১৫ জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সহিংস দিন ছিল। দিনটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর বাংলাদেশ ছাত্রলীগ দফায় দফায় হামলা চালায়, যা পরবর্তীতে সারাদেশে ব্যাপক সংঘর্ষ ও রক্তপাতে রূপ নেয়।

১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে নেত্রকোণাতেও শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসেন। তৎকালীন শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় ও নেত্রকোণা সরকারি কলেজ এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা শহরের বিভিন্ন মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কেবল ক্যালেন্ডারের একটি সাধারণ তারিখ ছিল না। এই দিনটি ছিল বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার ইতিহাসে এক অগ্নিগর্ভ দিন। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গণের আকাঙ্ক্ষা এদিন এক নির্মম, রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ে রূপ নেয়। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের বুক পেতে দেওয়া বীরত্ব এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঝরে যাওয়া ৫ টি তাজা প্রাণ এই আন্দোলনকে একটি অবিস্মরণীয় গণঅভ্যুত্থানের দিকে ধাবিত করে।

১৬ জুলাইয়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে রংপুরে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের দ্বাদশ ব্যাচের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ বুক টান করে, দুহাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছিলেন পুলিশের বন্দুকের নলের সামনে। সেই বুক পেতে দেওয়ার সাহসী দৃশ্য ধারণ করেছিল সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা। পুলিশের একের পর এক ছররা গুলিতে সাঈদের লুটিয়ে পড়ার দৃশ্য মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সাঈদের এই আত্মত্যাগ দেশের কোটি তরুণ ও সাধারণ মানুষের বিবেককে নাড়া দেয় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বৈশ্বিক প্রতীকে পরিণত হয়। ২০২৪ সালের এই দিবাগত রাতে খুব একটা ঘুম হয় নি। পরের দিন সকালে নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তটি নিই। বুঝতে পারি, তদানিন্তন সরকারের আর ক্ষমতায় থাকার বৈধতা নেই। দেশ ও জনগণের জান মাল হেফাজতের জন্য লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার সময় এসে গেছে।

শুধু রংপুরে নয়, দেশের অন্যান্য প্রান্তেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নেমে আসে নির্মম নির্যাতন। তারমধ্যে, চট্টগ্রামে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও সংঘর্ষে কলেজ ছাত্র মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরামসহ তিনজন নিহত হন। রাজধানীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রামপুরা, বাড্ডা এবং কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও রাজপথে নেমে আসেন। ঢাকায় সংঘর্ষে নিহত হন আরও দুজন। শিক্ষার্থীদের সড়ক ও রেলপথ অবরোধের কারণে ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের রেল এবং সড়ক যোগাযোগ প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তৎকালীন সরকার বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেয়। তার অংশ হিসেবে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও রংপুরসহ বড় বড় শহরগুলোতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের সব স্কুল, কলেজ, মাদরাসা এবং পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সব পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেয়।

১৬ জুলাইয়ের রক্তপাত বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে পুরোপুরি বদলে দেয়। এটি আর সাধারণ কোনো কোটা সংস্কার আন্দোলন হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। দ্রুত এটি রূপ নেয় কর্তৃত্ববাদ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক গণসংগ্রামে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতেও আবু সাঈদের ছবি এবং বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ওপর রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের খবর প্রধান শিরোনাম হয়ে ওঠে। বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই বর্বরতার তীব্র নিন্দা জানায়। ১৬ জুলাই-ই ছিল সেই ভিত্তিপ্রস্তর, যা পরবর্তীকালে ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব ঐক্য তৈরি করে।

১৭ জুলাই ২০২৪ তারিখে বাংলাদেশের কোটা সংস্কার আন্দোলন একটি তীব্র গণআন্দোলনে রূপ নেয় এবং দেশজুড়ে ব্যাপক সংঘর্ষ ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। আগের দিন রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ সারা দেশে ৬ জন নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে।
সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। সেই সাথে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার অজুহাতে আবাসিক হলগুলো খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে শিক্ষার্থীরা এই নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

এদিন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের সব স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা এবং পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট বন্ধ করা হয় এবং ১৮ জুলাইয়ের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে সকাল থেকেই আবাসিক হলগুলো থেকে শাসক দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বের করে দেন এবং ক্যাম্পাস ছাত্রলীগ শূন্য ঘোষণা করেন। নিহতদের স্মরণে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিলের কর্মসূচি দেওয়া হয়। সেখানে শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে গেলে পুলিশ টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট, জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে চরম দমনপীড়ন চালায় এবং উপাচার্য ভবনের সামনে শিক্ষার্থীরা জানাজা সম্পন্ন করেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও বরিশালে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের তীব্র ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং টিয়ারশেল ও রবার বুলেট নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।

দেশজুড়ে অন্তত ১০টি প্রধান সড়ক-মহাসড়ক এবং দুই জায়গায় রেলপথ অবরোধ করা হয়। ঢাকার শনির আখড়া ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সারাদিন অবরুদ্ধ থাকে। ঢাকার যাত্রাবাড়ী ও মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের টোল প্লাজা এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয় এবং সেখানে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।

ঢাকা, চট্টগ্রাম, বগুড়া, রাজশাহী ও রংপুরসহ দেশের অন্তত ৮টি জেলায় আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়।
দেশের বিভিন্ন স্থানে মোবাইল ইন্টারনেট ধীরগতির হয়ে পড়ে এবং ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে সমস্যা দেখা দেয়।

সন্ধ্যায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে এক সংক্ষিপ্ত টেলিভিশন ভাষণ দেন। তিনি শোকের কালো পোশাক পরে আন্দোলনকারীদের আদালতের রায় আসা পর্যন্ত ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান এবং হত্যাকাণ্ডের তদন্তের জন্য বিচার বিভাগীয় কমিটি ঘোষণার কথা বলেন। তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা এই ভাষণ প্রত্যাখ্যান করে রাজপথে অবস্থান ধরে রাখে।

সেদিন আমি একটি কবিতা লিখলাম। কবিতার নাম হচ্ছে, আবু সাঈদের বুক।
কবিতাটি এমন,

আবু সাঈদ,
ভাই আমার,
পুত্র আমার,
বাংলাদেশের মানচিত্রের মতো
এক বিশাল বুক নিয়ে
জন্মেছিলে এই অভাগা দেশে।

তারপর ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই
পুলিশ ঝাঁঝরা করে দিলো তোমার বুক,
পুলিশ ঝাঁঝরা করে দিলো মানচিত্র।

আমি কীভাবে ভুলে যাব ভাই হারানোর বেদনা?
আমি কীভাবে ভুলে যাব পুত্র হারানোর বেদনা?
আমি কীভাবে বয়ে বেড়াবো এই ঝাঁঝরা মানচিত্র?

তুমি বুক পেতে নিরস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিলে
গাঢ় নীল অথবা হালকা জলপাই কালারের
সসস্ত্র কুকুরগুলোর মুখোমুখি।

ইয়াবা ব্যবসায়ী কুকুরের দল মানচিত্রটি
সদম্ভে নিজেদের পকেটে ভরে
গুলি করে দিলো তোমার নিরস্ত্র বুকে।

তুমি হাঁটু গেড়ে চেটে খাওনি শুয়োরের পা,
বাংলাদেশকে ফেলে রেখে দেখাওনি পিঠ,
বেজন্মার মতো চেপে ধরোনি মায়ের টুটি,
কেননা একদিন তুমি জন্মেছিলে মাতৃগর্ভে।

আবু সাঈদ, তোমার বুক ঝাঁঝরা করে দিলো
আমার গাঢ় নীল জারজ ভাইয়ের দল।
হয়তোবা কোন মায়ের পেটে তাদের জন্মই হয় নাই,
হয়তো কোনো মা গোপনে জরায়ুতে ধারণ করেছিল
অসংখ্য অসভ্য ইতরের বীর্য আর
হয়তোবা আমিই এইসব কুকুরের পিতা।

আমি ঘরে বসে আছি তাই
আমাকে হত্যা করো।
আবু সাঈদ, তুমি আমার ভাই
আবু সাঈদ, তুমি আমার পুত্র
আবু সাঈদ, তুমিই আমার শিকার।

আবু সাঈদ, আমি এক শিকারী ভাই
তোমার জানাজায় যেতে পারি নাই,
আমি এক শিকারী পিতা
যার রূহানী আত্মায় তুমি জন্মেছিলে বৃথা।

এমন এক সময়ে এসে গেছি আমরা-
ভাইয়ের মুখোমুখি ভাই থাকেনা নিরাপদ
আর
পিতার মুখোমুখি নিরাপদ থাকে না সন্তান।

মুখোমুখি দাঁড়িয়েছো!
কি চাও? অধিকার?
মুখোমুখি আছো তাই
তুমি আমার সহজ শিকার।

আমি পুলিশের ভাই
আমি পুলিশের পিতা
আমার সামনে অথবা পেছনে কেউ নাই।

আমি অসংলগ্ন অপ্রকৃতস্থ হয়ে আছি
আবু সাঈদ,
ইয়াবা ব্যবসায়ী কুকুরদের পিঠই আমার পিঠ।

আবু সাঈদ,
তোমার চিতিয়ে রাখা বুকই আমার বুক।
ক্ষমা করে দিও ভাই আমার
ক্ষমা করে দিও পুত্র আমার
তোমার কবরে আমি সহযাত্রী হতে পারিনি।

এই কবিতা থেকে পরের দিন পোস্ট করলাম কয়েকটি লাইন। বেশকিছু কমেন্টে আমাকে কুকুরের বাচ্চা বলে গালি দেয়া হলো (ইদানিং কমেন্টগুলো পাচ্ছি না। তারা সেগুলো ডিলিট করে দিয়েছে। তাতে আমি ক্ষুব্ধ নই, কারণ আমরা পরবর্তীতে জয়ী হয়েছি।) তারপর হঠাৎ ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। অবিরাম ফোনে খবরাখবর নিচ্ছিলাম অনার্য শান্ত আর পলিয়ারের কাছ থেকে। তারা বারবার আশ্বস্ত করছিলো জনতার বিজয় হবেই।

১৭ জুলাই সন্ধ্যা থেকে মোবাইল ইন্টারনেট ও ৪জি নেটওয়ার্ক ক্রমান্বয়ে বন্ধ করা শুরু হয়। ১৮ জুলাই রাত ৯টা থেকে সারাদেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটও পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। কোন টেলিভিশনকে বিশ্বাস করা যাচ্ছিল না। তারপর পাঁচ দিন পর ২৪ জুলাই রাতে পরীক্ষামূলকভাবে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালু করা হয় এবং ২৮ জুলাই মোবাইল ইন্টারনেট পুনরায় চালু করা হয়। এসময় বিচ্ছিন্নভাবে আন্দোলন পরিচালিত হয়েছে। সবার মনে সন্দেহ আর অনিশ্চয়তা ছিল। মনে হচ্ছিল লক্ষ লক্ষ মানুষ মেরে ফেলা হচ্ছে। সরকারের প্রতি জনগণের এই সন্দেহ আন্দোলনকে আরও তীব্র করে।

আমাদের ছেলে ইতিপূর্বে আমাকে গোপন করে কোটা বিরোধী আন্দোলনের মিছিলে গিয়েছিল সেই ১৭ তারিখেই। আমি নেত্রকোণা শহরে চলে এসেছিলাম কর্মস্থল ত্যাগ করে।

১৮ জুলাই দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের ঘোষিত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে নেত্রকোণায় আন্দোলন গড়ে ওঠে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা নেত্রকোণা শহরের প্রধান প্রধান সড়ক, আবু আব্বাছ কলেজের সামনে ও সাতপাই রেলক্রসিং এলাকায় ব্রিজ এলাকায় অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করলে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের দফায় দফায় ধাওয়া ও হামলায় আন্দোলন সংগঠিত হতে পারে নি। বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু শিক্ষার্থী লাঞ্চিত ও আহত হন। ১৯ জুলাই কারফিউ জারির আগ পর্যন্ত এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি বজায় ছিল। বিশেষ করে তৎকালীন শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয়, নেত্রকোণা সরকারী কলেজ ও দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। এদিন নেত্রকোণা জেলার মদন উপজেলায় আন্দোলন তীব্র রূপ ধারণ করে। হঠাৎ ফোন করে কবি শোকরান খান জানান, তার পিতা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার ব্যবস্থা নিতে। আমি মদনের কয়েকজনকে ফোন করি খবর নিয়ে সাহায্য করতে। সেখান থেকে পরিস্থিতি জানতে পারি। কবি শোকরান খানের পিতার নাম আব্দুল হক। তিনি জুলাই যুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছিলেন। কিন্তু, ঘটনাক্রমে তার নাম আহতদের তালিকাভূক্ত হয় নি। যাই হউক, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম থেকে ঘটনাপ্রবাহ পরে জানা গেছে।

১৮ জুলাই দুপুর সাড়ে ১২ টার দিকে শহীদ আব্দুল কদ্দুছ মগড়া সেতু এলাকায় নেত্রকোনার মদন উপজেলায় কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে ইউএনও, এএসপি, ওসিসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হন। সংঘর্ষে পাঁচ শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শহীদ আব্দুল কদ্দুছ মগড়া সেতু এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশের দুটি গাড়ি ভাঙচুর করে মালামাল ভাসিয়ে দেন শিক্ষার্থীরা। সংঘর্ষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহ আলম মিয়া, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (খালিয়াজুরী সার্কেল) রবিউল ইসলাম, ওসি উজ্জল কান্তি সরকার, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল হান্নান তালুকদার শামীমসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় হওয়ায় গুলিবিদ্ধ পাঁচ শিক্ষার্থীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। জানা গেছে, মদন উপজেলার সাধারণ শিক্ষার্থীরা বেলা ১১টা থেকে মদন সরকারি কলেজ মোড়ে জড়ো হতে থাকেন। একই সঙ্গে পুলিশও সেই স্থানে অবস্থান নেয়। বেলা ১১টার দিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা একটি মিছিল নিয়ে উপজেলা পরিষদের দিকে আসতে থাকা অবস্থায় ডাকবাংলো মোড়ে পুলিশের ব্যারিকেডের মুখে পড়ে। পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙেই শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে পাবলিক হলের দিকে রওনা হন। একই সময় আন্দোলনের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ মিছিল বের করেন আওয়ামী লীগের অঙ্গসহযোগী সংগঠন ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা। দুটি মিছিল উপজেলা খাদ্যগুদামের সামনে মুখোমুখি হলে প্রশাসন তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পরে শিক্ষার্থীরা শহীদ আব্দুল কদ্দুছ মগড়া সেতুর পূর্ব পাড়ে অবস্থান নেন। রাস্তায় গাছ রেখে অবরোধ করলে পৌরসভার সব রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী অবরোধের পর পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা পুলিশের দুটি গাড়ি ভাঙচুর করলে পুলিশ রাবার বুলেট ছোড়ে। পুলিশ একটি দোকানে আশ্রয় নিলে সেখানেও শিক্ষার্থীরা হামলা করেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের সদস্যরা লাঠিসোঁটা নিয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হন। পরে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়। এ ঘটনায় ওসি সহ ১৩ পুলিশ সদস্য আহত হন।

এর মধ্যে হঠাৎ রাস্তার দেয়ালগুলো ভরে উঠতে থাকল অপরিচিত ভাষায়, লেখায়। তাতে প্রতীয়মান হয়, নেত্রকোণার দ্রোহী শিক্ষার্থীরা ও ছাত্র ইউনিয়নের ছেলে-মেয়েরা লিখে যাচ্ছে দ্রোহের গ্রাফিতি।

২৯ জুলাই মন্ত্রিসভার বৈঠকে কোটা আন্দোলনকে ঘিরে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে ৩০ জুলাই মঙ্গলবার দেশব্যাপী শোক পালন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এটি প্রত্যাখান করে ৩০ জুলাই লাল কাপড় মুখে ও চোখে বেঁধে ছবি তোলা এবং অনলাইনে ব্যাপক প্রচার কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়।

সরকার ঘোষিত শোক দিবসকে প্রত্যাখ্যান করে শোকের কালো রং বাদ দিয়ে ৩০ জুলাই আন্দোলনকারী এবং জনপ্রিয় ব্যক্তিবর্গ, সাধারণ নাগরিক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশ এমনকি সাবেক সেনাপ্রধানও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাল প্রোফাইল ছবির মাধ্যমে কোটা আন্দোলনকারীদের সাথে সমর্থন জানান। বিকেল ৩টায় উদীচীসহ ৩১টি সংগঠনের পদযাত্রা ও বিক্ষোভ করে। প্রতিবাদমুখর শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা বলেছেন, “ছাত্র ও জনসাধারণকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করায় এই সরকার নৈতিকভাবে ক্ষমতায় থাকার অধিকার হারিয়েছে। অবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। একই সঙ্গে এই সরকার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলেও ঘোষণা দিয়েছেন।”

সেদিন সারাদেশের সাথে সংহতি প্রকাশ করে নিজেদের প্রোফাইল পিকচার লাল করেছিলেন নেত্রকোণার অনেক মানুষ। শহরের ছাত্রনেতা, অভিভাবক, সাংবাদিক, লেখক ও চিন্তকদের ফোন করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা হুমকি দিচ্ছিলো।
মূলত এই দিনটিতে শিক্ষার্থীদের সাথে অভিভাবকেরা সরাসরি আন্দোলনে যুক্ত হন। আমি আন্দোলনের সাথে সংহতি প্রকাশ করে ১ আগস্ট প্রোফাইল পিকচার লাল করি এবং বিভিন্ন ধরনের হুমকির সম্মুখীন হই।

১ আগস্ট নেত্রকোণা জেলা আওয়ামী লীগের অফিসে সিদ্ধান্ত হয় যে, নেত্রকোণার সকল সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনকে দিয়ে সরকারের পক্ষে একটি শান্তি সমাবেশ করানো হবে। ৩ আগস্ট নেত্রকোণা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের নির্দেশে শহরের সকল সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনকে শহীদ মিনারের সামনে পতাকা মিছিল ও শান্তি সমাবেশ করার আহবান জানানো হয়। তাতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যানারে কোন সংগঠন সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন না। তবে আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ত অনেক সংস্কৃতিকর্মী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তারা আন্দোলনকারীদের রাজাকার আখ্যা দিয়ে সমাবেশ শেষ করেন। এই সমাবেশে নেত্রকোণা উদীচীর সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান খান এবং সহ সাধারণ সম্পাদক মোঃ আলমগীর উপস্থিত ছিলেন না। আমাকে উপস্থিত থাকার জন্য বলা হলেও আমি উপস্থিত হই নি। মোস্তাফিজুর রহমান খান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং মোঃ আলমগীর ছাত্র জনতার আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছিলেন।

একই দিনে নেত্রকোনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অসীত সরকার সজলের সভাপতিত্বে একটি শান্তি সমাবেশ করেন মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি নেত্রকোণা জেলা শাখা। বিকালে শহরের মোক্তারপাড়ার জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের সামনে থেকে একটি শোভাযাত্রা বের হয়ে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের সামনের সড়কে শান্তি সমাবেশ করেন। তারা এই সমাবেশের মাধ্যমে সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। কিন্তু সকল মুক্তিযোদ্ধা এই সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন না।

৪ আগস্ট, রোববার সকাল থেকে শহরের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দ ‘রাস্তায় আর নামিস না, পিঠের চামড়া থাকবেনা’ স্লোগানসহ দেশীয় অস্ত্রসহ মহড়া দেয়। জেলার পূর্বধলা উপজেলার নেত্রকোনা-ময়মনসিংহ সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীরা। শ্যামগঞ্জ বাজারে আন্দোলনকারীরা পুলিশের গাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। এসময় পুলিশের অস্ত্র লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। ৬ পুলিশ সদস্য আহত হয় এবং সাতটি পিস্তল লুট করে নিয়ে যায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
এদিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের সাথে কুড়পাড়, পারলা বাসস্ট্যান্ড, নাগড়া সাতপাই কলেজ রোড এলাকায় ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতাকর্মীদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়।

সময় টিভি ও বাংলাদেশ প্রতিদিন এর জেলা প্রতিনিধি আলপনা বেগমকে জেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ফোনে ক্রমাগত প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছিল। তারা ৪ আগস্ট তাদের দলীয় কার্যালয়ে আলপনা বেগমকে দেখা করতে বললেও তিনি সেখানে যান নি।

যমুনা টিভির জেলা প্রতিনিধি কামাল হোসেন জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করে বাসসকে বলেন, ৪ আগস্ট সকাল দশটার দিকে একরামুল হক সানিম নামে একজন শিক্ষার্থী তাকে ফোন করে জানান, তারা নেত্রকোণা সরকারি কলেজের মাঠের কোণায় ১০ টার দিকে একত্রিত হয়ে আন্দোলন করবেন এবং এ তথ্য যেন আর কাউকে না জানানো হয়। যথারীতি তারা সেখানে জমায়েত হতে থাকেন। কিন্তু তাদের এ জমায়েত হওয়ার খবর আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা জেনে যায় এবং সেখানে অতর্কিত আক্রমণ করে। ফলে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এসময় সাইকেলে করে দাঁড়ি, টুপি, পাঞ্জাবি পরিহিত এক যুবক যাচ্ছিলেন সরকারি কলেজের সামনে দিয়ে। তার সাথে এক নারী ছিলেন। ঐ যুবককে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা পথ আটকে দাঁড় করিয়ে তার ব্যাগ চেক করে বাংলাদেশের একটি জাতীয় পতাকা ও একটি চাকু পায়। তারা ঐ যুবককে কলেজের সামনে থাকা ফটোকপির দোকানে নিয়ে অনেক মারধর করে রাস্তায় ফেলে দেয়। এসময় ছাত্র-জনতার সাথে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ধাওয়া, পাল্টা ধাওয়া হয়। ইট, পাটকেল ছোড়াছুড়ি হয়। আওয়ামী সন্ত্রাসীরা চাপাতি, রামদাসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া করলে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং কলেজের পেছন দিয়ে গিয়ে আনন্দ বাজার হয়ে ঢাকা বাসস্ট্যান্ড, আনসার অফিস, বিএডিসি ফার্ম এলাকায় গিয়ে জমায়েত হওয়ার চেষ্টা করে। এদিন পৃথ্বীরাজ রুদ্র নামের একজন শিক্ষার্থী পারলা বাসস্ট্যান্ডে আন্দোলনে শরীক হওয়ার পথে যুবলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী দ্বারা মারধরের শিকার হন।

আমার সাথে যোগাযোগ রেখে যাচ্ছিল সায়েম, তানভীর, নাদিমের নেতৃত্বে সংগঠিত ছাত্র ইউনিয়নের একটি অংশ। নিয়মিত যোগাযোগ চলছিলো ঢাকায় কবি পলিয়ার ওয়াহিদ আর কবি অনার্য শান্তর সাথে। ঘন্টার পর পর ঘন্টা আলোচনা হচ্ছিল চিন্তক অনুপ সাদীর সাথে। মাঝে মাঝে চিন্তক আনোয়ার স্যারের সাথে কথা হচ্ছিলো। আমি আর সাদী মনে করতাম হাসিনাকে বিদায় করতে সশস্ত্র লড়াইয়ের প্রয়োজন হতে পারে। আমি ছাত্র ইউনিয়নকে সর্বাত্মক সহায়তা ও মানসিক শক্তি যোগাচ্ছিলাম। সারা শহর নিরব অথচ উত্তেজনায় টান টান। শহরের অধিকাংশ মানুষ মনে মনে হাসিনাকে পরিত্যাগ করে। হাসিনা বিরোধী চাপা ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বুঝা যাচ্ছিলো, যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরা গোপনে আমার সাথে উত্তরা হোটেলের সাথে একটি মার্কেটের একটি রুমে দেখা করত। এর মধ্যে পলিয়ার ঢাকা থেকে ৪ আগস্ট আমাকে জানালো, হাসিনা সম্ভবত পলায়ন করেছে। ফোন পেয়ে আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল হাসিনা পলায়ন করেছে। আমি তখন ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেদের সুদিনের জন্য অপেক্ষা করতে বলি। আমাদের আড্ডাগুলোতে প্রায় প্রতিদিন উপস্থিত থাকতো প্রথম আলো পত্রিকার নেত্রকোণা প্রতিনিধি পল্লব চক্রবর্তী। সে কখনো আলোচনায় অংশগ্রহণ করতো না। নিরবে আমাদের কথাগুলো শুনে যেতো। সেই সময়গুলোতে আমার আড্ডার অধিকাংশ বন্ধু ও অংশীজনরা আমাকে পাগল হয়ে গেছি মনে করতে থাকল। শুধুমাত্র পল্লব মাঝে মাঝে বলতো, পলাশ ভাইয়ের কথাগুলো ফেলে দেওয়ার মত না। এমন পরিস্থিতিতে চলে আসল ৫ আগস্ট বা ৩৬ জুলাই।

৫ তারিখ বুঝতে পারলাম আওয়ামী লীগের পেটোয়া বাহিনী আর গণহত্যার ভয়ে মানুষ ঘরে বন্দী থাকলেও তাদের সমর্থন ছিল ছাত্রদের পক্ষে। এক অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী হলো নেত্রকোণা শহরের মানুষ। লাখো জনতা নেমে পড়েছে রাস্তায়। এতো মানুষ, এতো চেনা অচেনা মানুষ একত্রে আমি কখনো দেখিনি। সবাই রাস্তায় নেমে এসেছে যেন বিজয় উদযাপন করছে।

প্রথমেই আমার মনে হলো এই দৃশ্য যদি আমার স্ত্রী সন্তানকে না দেখাই তাহলে জীবনের এই মহান দৃশ্য দেখা থেকে তারা বঞ্চিত হবে। মোটর সাইকেলে আমরা বের হলাম। বাতাসে মুক্তির স্বাদ। রাস্তায় মানুষের ঢল। আওয়ামী লীগ অফিসে কারা যেন আগুন দিয়েছে। থানার সামনে অনেক লোক পাহাড়ায় যুক্ত হয়েছে যেন কেউ থানা আক্রমণ করতে না পারে। প্রশাসনের সকল অফিসার আত্মগোপনে চলে গেছেন। আমাদের ১৪ বছর বয়সী ছেলেকে বললাম, “বাবা, এখান থেকে শিক্ষা নিও। কখনো মানুষের ঘৃণা অর্জন করবে না, জুলুম করবে না। জালিমের কি পরিণতি হয় তা দেখানোর জন্য তোমাকে নিয়ে বের হয়েছি।”

স্ত্রী আর ছেলেকে বাসায় রেখে আসার পথে মোক্তারপাড়া এলাকায় একজন মা কে পেলাম তার দুই কন্যা সন্তান নিয়ে রাস্তায় বের হয়েছেন। তাকে বলতে শুনলাম, “আল্লাহর রহমতে ফেরাউনের পতন হয়েছে। আমরা মুক্ত বাতাসে ঘুরতে পারতেসি।”

শহরে টহল দিচ্ছে সেনাবাহিনী। ছাত্রজনতা তাদের দিকে হাত ওড়াচ্ছিল। সেনাবাহিনীর কতক সদস্য হাত উঁচিয়ে প্রতি উত্তর দিচ্ছিলেন। যমুনা টিভির সাংবাদিক ও কবি কামাল হোসাইনকে উপরে উঠিয়ে একদল ছাত্র জনতা উল্লাস প্রকাশ করে অভিনন্দন জানায়। বিএনপি, হেফাজত, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ শহর রক্ষার টহলে নেমেছেন। প্রশাসন নেই, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নেই। তবুও যেন এক অসম্ভব শৃঙ্খলা। অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে মীর ফরেন ফার্নিচার, দুর্গা কেবিন মিস্টির দোকানে কিছু সুযোগ সন্ধানী দুর্বৃত্ত লুট করে। পরবর্তীতে জানা গেছে দুদিন আগে যারা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ঘুরেছে ছাত্রলীগের হয়ে তারাই এ ঘটনার সাথে যুক্ত। এর সাথে রাজনৈতিক কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। বিচ্ছিন্নভাবে আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মীদের বাসা বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাংচুর করা হলেও কোন হতাহতের ঘটনা ঘটে নি। এদিন রাজনৈতিক নেতৃত্ব সকল প্রকার ভাংচুরের চেষ্টা প্রতিহত করেছেন।

স্ত্রী ছেলেকে বাসায় রেখে আবার রাস্তায় নামলাম। শহরের আগুন থামাতে হবে। ইতিমধ্যে নাজু ভাইদের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ অফিসের আগুন নেভানোর কাজ শুরু হয়ে গেছে। কারণ এই আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে বড়বাজার ও ছোটবাজারের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোতে। বড় বাজারের লোকজন সংগঠিত হয়েছে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে। মোক্তারপাড়ার গলিতে গলিতে টহল চলছে যেন কেউ ভাংচুর করতে না পারে। তারপরও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা কেউ কেউ ঘটিয়েছে পূর্ব শত্রুতার জেরে। সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয়েছে।

তারপর থেকে আমাদের মাথায় এসেছে, যে কোন মূল্যের বিনিময়ে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক হওয়ার আগ পর্যন্ত আমাদের সকলের সম্মিলিতভাবে মাঠে থাকতে হবে। বিএনপি, হেফাজত, জামায়াত, প্রগতিশীল দলমত নির্বিশেষে এই কাজটি করে গেছেন অভ্যুত্থানের পরবর্তী আরও কমপক্ষে এক সপ্তাহ। তখন এদেশে আইনশৃঙ্খলা বলতে কিছু ছিল না।

লেখক – কবি ও ভাবুক।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা