রওশন হক
জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করেনি, এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকেও নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের প্রগতিশীল সংস্কৃতির একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাওয়া উদীচী, ছায়ানট, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ কয়েকটি সংগঠন জুলাইকে ঘিরে জাতীয় আবেগের সঙ্গে কতটা সম্পৃক্ত ছিল, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। যখন দেশের তরুণরা শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত জুলাই স্মরণে অসংখ্য অনুষ্ঠান, কনসার্ট, পথনাটক, শিল্পকর্ম ও গণসমাবেশের আয়োজন করেছে, তখন এই তথাকথিত সাংস্কৃতিক অভিভাবকদের ভূমিকা ছিল প্রায় অদৃশ্য।
এটি কেবল অনুপস্থিতি নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার প্রতিচ্ছবি।
বর্ষা বিপ্লবের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত দুটি বিশাল কনসার্টে হাজার হাজার তরুণের উপস্থিতি প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব বদলাচ্ছে। সেই মঞ্চে মানুষ নিজের ভাষায়, নিজের অভিজ্ঞতায় এবং নিজের ক্ষোভে কথা বলেছে। সেখানে প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর অনুমোদনের প্রয়োজন পড়েনি। কারণ সংস্কৃতির মালিক কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, সংস্কৃতির মালিক জনগণ।
দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক বলয় নিজেদের রুচিকেই জাতীয় রুচি, নিজেদের ভাষাকেই গ্রহণযোগ্য ভাষা এবং নিজেদের অবস্থানকেই একমাত্র প্রগতিশীল অবস্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। এই সাংস্কৃতিক আধিপত্য রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গেও বহু ক্ষেত্রে সমান্তরালভাবে চলেছে। ফলে ভিন্নমত, ভিন্ন সাংস্কৃতিক চর্চা এবং বিকল্প কণ্ঠস্বরকে প্রায়ই প্রান্তিক করে রাখা হয়েছে।
আজ সেই একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙছে।
নতুন প্রজন্ম ঘোষণা করছে, সংস্কৃতি আর কয়েকটি সংগঠনের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। সংস্কৃতি জন্ম নেয় মানুষের জীবনে, সংগ্রামে, প্রতিবাদে, গান, কবিতা, নাটক এবং রাস্তায় উচ্চারিত কণ্ঠে।
একটি স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে শুধু প্রশাসনিক শক্তি যথেষ্ট নয়। ইতিহাসের ব্যাখ্যা, সাংস্কৃতিক বয়ান এবং জনমত নির্মাণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে হলে সাংস্কৃতিক পরিসরেও বহুমত, স্বাধীন চিন্তা এবং জবাবদিহির পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
সময় এসেছে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে এই দেশের মাটি, মানুষ, ভাষা ও ইতিহাসের ভিত্তিতে আরও শক্তিশালী করার। জাতীয় সাংস্কৃতিক পরিসরে বাংলাদেশের নিজস্ব ঐতিহ্য, সৃজনশীলতা ও স্বাতন্ত্র্যই অগ্রাধিকার পাবে, এটাই হওয়া উচিত ভবিষ্যতের লক্ষ্য।
সাংস্কৃতিক আধিপত্যের যুগ ফুরিয়ে আসছে। এখন শুরু হোক জনগণের সংস্কৃতির নতুন অধ্যায়, যেখানে নেতৃত্ব দেবে মানুষের অংশগ্রহণ, স্বাধীন সৃজনশীলতা এবং বাংলাদেশের নিজস্ব আত্মপরিচয়।
০৮/০৬/২৬
নিউইয়র্ক







