প্রচ্ছদগল্পউপন্যাসএকজন নৃশংস দুষ্কৃতকারী

ধারাবাহিক উপন্যাস : নেয়ামত ইমাম

একজন নৃশংস দুষ্কৃতকারী

নেয়ামত ইমাম 

প্রথম খণ্ড 

৫.

মোহাম্মদ আশরাফ খানের সর্বশেষ কয়েকটি কথায় চিন্তিত হবার পর্যাপ্ত কারণ থাকলেও চুক্তিপত্রে সই করা হয়ে যাওয়ায় আমি মনে মনে খুব খুশি হই। যদিও এই সফলতার পেছনে রফিকুল্লার উপস্থিতি থাকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, আমি মনে করতে থাকি সে যেহেতু অন্য যে কোনো বিক্রয় প্রতিনিধির পরিবর্তে আমাকে সাহায্য করবার জন্য বেছে নিয়েছে, তাতে প্রমাণিত হয় এই সফলতায় আমারও কিছু ভ‚মিকা রয়েছে। খুব ছোট আকারের হলেও আমি নিজেকে নিয়ে গর্বিত হতে পারি, যা খুব কম সংখ্যক দিনেই আমার বেলায় ঘটেছে এবং এত প্রবলভাবে ঘটেছে।

নয়ানগর থেকে বাসায় ফিরে আমি মনে মনে সামিয়ানাকে খুঁজতে থাকি। অবসর সময়ে সে একটি নারী সংগঠনের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে কাজ করে বলে সন্ধ্যার দিকে কখনো কখনো তাকে বাইরে যেতে হয়। আজও নিশ্চয়ই সে বাইরে গিয়ে থাকবে, কারণ বাসাটি থাকে একেবারে নিরব। আমি হাত-মুখ ধুই, বিছানাটি ঝাড়ি, তারপর বালিশে হেলান দিয়ে একটু বিশ্রাম নিতে চেষ্টা করি। যে কোনো মুহূর্তে প্রধান দরজাটি খুলে যাবে – এমনটি আশা করে জানতে চাই প্রতিটি ছোটখাটো শব্দ কোথা থেকে আসছে বা সেগুলো তার জুতার শব্দ কি না। আমাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না। দরজা খুলে সে ভেতরে ঢোকে, হাতে কয়েকটি পত্রিকা। “এই যে আপনি, কেমন আছেন?” জিজ্ঞেস করলে সে মাথা নোয়ায় এবং পত্রিকাগুলো সোফার ওপর নামিয়ে রাখে। “কিসের পত্রিকা এগুলো?” আমি জিজ্ঞেস করি। “সংগঠনের মাসিক পত্রিকা,” সে জানায়। “এগুলো বিক্রি করে পাওয়া টাকা নারীদের সেবামূলক কাজে ব্যবহার করা হবে।” “আমি কি কয়েকটা কিনতে পারি?” আমি বলি। “কয়েকটা মানে?” সে আশ্চর্য হয়, বলে, “কিনলে একটা কিনতে পারেন, দাম কিন্তু পঞ্চাশ টাকা।” “প্রতিটার দাম পঞ্চাশ টাকা হলে দশটার দাম হয় পাঁচশ টাকা,” আমি বলি। “ঠিক আছে, আমাকে দশটা দিন।” “দশটা?” সে বলে, “দশটা দিয়ে কি করবেন? পড়তে চাইলে একটা নিয়ে যান, টাকা দিতে হবে না, পড়ে ফেরত দিয়ে দেবেন।” “না,” আমি বলি, “আমি সত্যিই দশ কপি কিনতে চাইছি। কিছু বন্ধুবান্ধব আছে, তাদেরকে উপহার দেয়া যাবে। আপনারও কিছুটা সাহায্য হবে।” পকেট থেকে খুচরা টাকাগুলো বের করে গুনে পাঁচশ টাকা তার হাতে তুলে দেই। সে কিছুটা হতবুদ্ধি হয়ে আমার হাতে দশ কপি পত্রিকা তুলে দেয় এবং আমি দরজা দিয়ে আমার কক্ষে চলে যাওয়া পর্যন্ত আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।

আমি দশ কপি পত্রিকা কিনেছি – বিষয়টি আমার সাধারণ বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মেলে না। সে তা বুঝতে পারে বলে তার মনে প্রশ্ন জাগে। এটি খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। বসার ঘর থেকে সে কখনো আমার দিকে তাকায়, দেখে আমি কি করছি। আমিও অন্যদিনের মতো আজ এক জায়গায় বসে থাকতে পারি না। কখনো চেয়ারে বসি, কখনো বিছানায় যাই। কখনো হাঁটি। আমি যে থেকে থেকে তার দিকে তাকাচ্ছি সে তা লক্ষ করে এবং এক সময় উঠে এসে আমার দরজায় দাঁড়ায়। সব ঠিক আছে কি না জিজ্ঞেস করলে আমি মাথা নাড়াই। তবে সব যে ঠিক নেই সে তা বুঝতে পারে, যখন আমি বলি তার সঙ্গে আমার জরুরি কিছু কথা আছে।

আমরা সামনের কক্ষে বসি। আমাদের কোম্পানিতে ইদানিং কিছু রদবদল হচ্ছে, আমি বলি, যার ফলস্বরুপ ম্যানেজার সাহেব আমাকে চট্টগ্রামে পাঠাতে চান। আমি জানি না শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত টিকে থাকবে কি না এবং ঠিক কত তারিখে আমাকে সেখানে যেতে হবে। তবে খুব শীগ্র চলে গেলেও সাবলেটটি আমি রাখবো কমপক্ষে আরো একমাস, যাতে করে নতুন ভাড়াটিয়া পাবার জন্য তার হাতে যথেষ্ট সময় থাকে। তাতে তাকে অনাকাঙ্খিত আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়তে হবে না। তার জন্য আরেকটি সুবিধা হবে চাইলে আরেকটু চড়া দামে সে সাবলেটটি ভাড়া দিতে পারবে। 

“দেখেছেন?” সে বলে, “বিক্রয় প্রতিনিধির কাজকে ছোট করে দেখতে হয় না। এর মধ্যেও থাকতে পারে জীবন পরিবর্তন করা সফলতা। আপনি আমাকে একটি বাস্তব জীবনের গল্প উপহার দিলেন। সংগঠনের কাজে আমাকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম মানুষের সঙ্গে দেখা করতে হয়। তাদের অনেকে সংসার হারিয়েছে। অনেকে ব্যবসায় নেমে হারিয়েছে সব জমানো টাকা। অনেকের আছে আকাশ সমান ঋণ। অনেকে পঙ্গু কিংবা রোগাক্রান্ত। আমার মনে হয় আপনার গল্প বলে আমি তাদের অনেককে সফলতার স্বপ্ন দেখাতে পারবো। আজকের অবস্থায় পৌঁছার জন্য আপনি অনেক পরিশ্রম করেছেন। এবার আপনার খুশি হবার পালা। আপনার জন্য কাল রান্না করবো। কি খেতে চান বলুন।”

“কিছুই রান্না করতে হবে না,” আমি বলি। “ইদানিং আমি বিভিন্ন জায়গায় বেশ ভালো খাচ্ছি। বাসায় সেজন্য কিছু তৈরি করবার দরকার পড়ছে না।” 

“ব্যাপারটা তাহলে আমার ওপর ছেড়ে দিন,” সে বলে। “আপনার সফলতায় আমি খুব খুশি। আমি এটাকে আমার মতো করে উদযাপন করতে চাই। কাল সন্ধ্যায় আপনার কোনো জরুরি কাজ নেই তো?” 

“এমন কিছু নেই, তবে আমার এক বন্ধুর বাড়িতে যাবার চিন্তা করছি। সেখান থেকে ফিরতে হয়তো দেরি হবে। তবে এখনই কিছু বলতে পারছি না।” 

“ঠিক আছে,” সে বলে। “শুক্রবারে না হয় কিছু রান্না করবো। শুক্রবারে তো আপনি বাসায় থাকবেন?”

“ছুটির দিন, বাসায় থাকার কথা,” আমি বলি, “তবে সত্যি বলছি আপনাকে কিছু করতে হবে না।” 

“তা দেখা যাবে,” সে বলে।

পরদিন আমাকে যেতে হয় জলসিঁড়ি। সেখানে মাদানি রোডের উত্তরপার্শ্বে নির্মাণ কোম্পানি নর্দার্ন ডেভেলপার্স দুই বছর আগে খুলেছে ডায়নামিক মোটর্স ক্লাব। ক্লাবের সদস্যদের প্রত্যেকের রয়েছে একাধিক গাড়ি। প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদানের মাধ্যমে তারা যে কোনো সময়ে তাদের গাড়িগুলো মেরামত বা পরিষ্কার করবার জন্য ক্লাবে নিয়ে আসতে পারেন। ব্যবসাটির ওপর আমার চোখ পড়ে প্রায় এক বছর আগে। কিন্তু অনেক যোগাযোগ করা সত্তে¡ও এবং অর্ডার প্রতি বিশেষ পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি দেবার প্রতিশ্রæতি দেয়া সত্তে¡ও তাদের কাছে আমি কখনো কিছু বিক্রি করতে পারিনি। ক্লাবের নির্বাহী পরিচালক ডা. শ্যামল দত্ত আমাকে ভালো করে চেনেন এবং অনেক ব্যস্ততা সত্তে¡ও আমার সঙ্গে কয়েকবার চা খেতে বসেন। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার কাছে কিছু বিক্রি করতে পারি না, কি গুরুত্ব থাকে সে চায়ের? আমি তার বন্ধু বা আত্মীয় নই, আমি একজন বিক্রয় প্রতিনিধি। পরিস্থিতি যা-ই থাকুক, আমাকে বিক্রি করতে হবে। এটাই শেষ কথা।

সুনির্দিষ্ট সময়ে আমি শ্যামল দত্তের অফিসে ঢুকি। আমাকে সময় দেবার জন্য তিনি প্রস্তুত হয়েই ছিলেন। আসতে কোনো অসুবিধা হয়েছে কি না এই প্রশ্নের মাধ্যমে তিনি আলাপ শুরু করেন। মনে পড়ে এমন একটি প্রশ্ন তিনি প্রতিবার করেছিলেন। “না, কোনো অসুবিধা হয়নি,” আমি আগ্রহ সহকারে বলি। “চমৎকার,” তিনি বলেন। “সময়মতো কোথাও পৌঁছাতে পারা এই শহরে আজকাল একটা বিরাট চ্যালেঞ্জের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু আপনার ক্ষেত্রেই আমি কোনো নড়চড় হতে দেখিনি। এই তো গতকাল, আব্দুর রউফ নামক একজন গাড়ি পেইন্টার আমার সঙ্গে এখানে দেখা করার কথা সকাল সাড়ে নয়টায়, কিন্তু সে আসে সাড়ে এগারটায়। সে জানে না আমার সঙ্গে দেখা করবার অগেই সে আমাকে বলে দিচ্ছে আপনি সতর্ক হোন, আমাকে বিশ্বাস করলে আপনার ব্যবসার ক্ষতি হবে, দয়া করে অন্য কাউকে নিয়োগ করুন। জরুরি কাজ, সেজন্য আমরা তাকে রেখেছি, কিন্তু ভালো কাজ ও ভালো আচরণ দিয়ে আমাদের আস্থা অর্জন করবে এমন কাউকে আমরা খুঁজছি।” 

বিনয়ের সঙ্গে বলি, “না, এমন কাউকে আমি চিনি না। আপনি হয়তো আব্দুর রউফের সঙ্গে খোলামেলাভাবে কথা বলতে পারেন, তাকে বোঝাতে পারেন সকাল সাড়ে নয়টায় আসবে বলে কথা দিলে তার ঠিক সে সময়েই আসা উচিত, দুই ঘন্টা পরে নয়। তাতে হয়তো আপনাকে নতুন একজন পেইন্টার খুঁজে বের করতে হবে না।”

আমার পরিকল্পনা থাকে বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক এবং অগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কিছুক্ষণ আলাপ করে তারপর চুক্তির কথায় আসবো। এজন্য আমি ধৈর্য সহকারে তার রূপগঞ্জ সুইমিং পুলে সাঁতার কাটার কাহিনী শুনি, ডায়নামিক ক্লাবের সদস্যদের সম্মানে আয়োজিত বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার কথা শুনি, এবং শুনি কিভাবে একজন নির্ভরযোগ্য বিক্রয় প্রতিনিধির মাধ্যমে কন্টিনেন্টাল টায়ারের সঙ্গে সম্প্রতি তিনি একটি বিশাল অঙ্কের চুক্তি সম্পন্ন করেছেন। আলাপের এক পর্যায়ে তাকে চাপে ফেলবার জন্য আমি সুমন এন্টারপ্রাইজের প্রসঙ্গ টেনে আনি এবং বলি তাদেরকে আমরা যতটুকু সুবিধা দিতে রাজি হয়েছি, তাকে আমরা তার চেয়েও বেশি সুবিধা দিতে পারবো। আমরা চাই ডায়নামিক মোটর্স ক্লাব সুমন এন্টারপ্রাইজের মতো কমপক্ষে সত্তর বছর টিকে থাক, এবং শুধু জলসিঁড়ি বা রূপগঞ্জ কেন, কিংবা ঢাকা কেন, দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরেও প্রবল বেগে এর ব্যবসা ছড়িয়ে পড়–ক। বাড়তি হিসাবে আমি বলি আমরাও কন্টিনেন্টাল টায়ারের সঙ্গে কাজ করি এবং কন্টিনেন্টাল ছাড়াও আমাদের হাতে রয়েছে মিশেলিন, গুডইয়ার, ব্রিজস্টোন ও হ্যানকুক। তিনি চাইলে টায়ারের ক্ষেত্রেও আমরা তাকে এমন গভীর ভর্তুকি দিতে পারবো যা অন্য কোনো কোম্পানি কখনোই দিতে পারবে না। 

প্রায় এক ঘন্টা আলাপ করার পর আমি যখন তার অফিস থেকে বেরিয়ে যাই, ডা. শ্যামল দত্ত থেকে যান আমার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে – ঠিক আগের দিনগুলোর মতো। এমনকি ছোটখাটো একটি চুক্তি করবার ব্যাপারেও আমি তাকে রাজি করাতে পারি না। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয় ওই এক বৈঠক শেষেই আমি আমার শরীরের সব শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। অথচ তখনো আমার যাবার কথা রয়েছে চন্দরার তায়েরুন্নেসা মেকানিক্সে এবং উত্তরার গাউসল আজম অটো বডিতে। আকস্মিকভাবে এই দুটি ব্যবসায় কয়েক লক্ষ টাকার চুক্তি সম্পন্ন করতে পারলেও দিনটিকে আমি একটি অসফল দিন হিসাবেই গণ্য করতে থাকি এবং ভাবি রফিকুল্লার মাধ্যমে শ্যামল দত্তকে একটা শিক্ষা দিতে না পারলে আমি আর বিক্রয় প্রতিনিধির কাজ করবো না। 

শেষ বিকেলে অফিস থেকে বেরিয়ে রফিকুল্লার সঙ্গে দেখা করার জন্য আমি কমলাপুরে যাই। তাকে যখন বলি রজব আলী সাহেব আমাকে চট্টগ্রামে পাঠাবার চিন্তা করছেন এবং আমাকে দ্রæত জানাতে হবে রাজি আছি কি না, সে রেগে যায়। “কি আশ্চর্য কথা,” সে বলে, “আপনি চট্টগ্রামে যাবেন কেন? চট্টগ্রামে এখন মানুষ থাকে না কি? জীবনে যারা বড় কিছু করতে চায়, তারা থাকে ঢাকায়। চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল, রংপুর – এগুলো অন্ধকার জায়গা। কুমিল্লাও ওই একই কাতারে পড়ে। এমনকি ঢাকার কাছের শহর নারায়ণগঞ্জও ভিন্ন কিছু নয়। নারায়ণগঞ্জে থাকে এমন একজন বড় অভিনেতা বা শিল্পী বা লেখক বা সাংবাদিকের নাম বলুন। পারবেন না। এসব জায়গায় বেশিদিন থাকলে মন এমনিতেই ছোট হয়ে যায়। বললে বিশ্বাস করবেন না, কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখুন, চট্টগ্রামের সব বুদ্ধিমান মানুষ ঢাকায় আসার জন্য একপায়ে দাঁড়িয়ে আছে। বরিশালের ক্ষেত্রেও তাই। এটাই বাস্তব। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে আমরা যে পরিকল্পনামাফিক এগোচ্ছি, তার পরিধিতে চট্টগ্রাম নেই। চট্টগ্রামে হয়তো এমন কিছু করা সম্ভব, কেউ না কেউ নিশ্চয়ই করছে, কিন্তু তার জন্য দরকার সময়। দরকার অনেক তথ্য। বলেছি না আমি একটা এক্সপেরিমেন্ট করছি। যথেষ্ট তথ্য হাতে না থাকলে কি এক্সপেরিমেন্ট করা সম্ভব? অন্তত এটুকু জানতে হবে সেখানে কারা সবচাইতে প্রভাবশালী লোক এবং তারা কাকে, কিভাবে বা কতটুকু প্রভাবিত করতে পারে। তা ছাড়া প্রভাবশালী লোকেরা তো আর এমনি এমনি আপনার জন্য কিছু করবে না। তাদের সঙ্গে দিনের পর দিন কথা বলতে হবে। তাদেরকে কিভাবে খুশি করা যায়, তাও সঠিকভাবে জানতে হবে। সেই জন্য এই মুহূর্তে আমি এমন কিছু ভাবছি না।” 

“এখানে আমি একটু সমস্যা দেখতে পাচ্ছি,” আমি বলি। “রজব আলী সাহেবের সঙ্গে কথা বলে মনে হয় তিনি ধরেই নিয়েছেন আমি তার প্রস্তাব গ্রহণ করবো। যদিও আমি বলেছি তাকে পরে জানাবো, তার প্রস্তাব ছিল আমি তার পরামর্শমতো চট্টগ্রামে যাই এবং সেখানে আমাদের কাস্টমার বেইজ প্রসারিত করি। যদি বলি আমি যেতে পারবো না, বা এখন যেতে পারবো না, আমি জানি না তিনি তা কিভাবে নেবেন।” 

রফিকুল্লা জোরে হেসে ওঠে। “আপনার জন্য রজব আলী সাহেব কোনো সমস্যা হবেন না,” সে বলে। “আপনাকে কথা দিচ্ছি। শুধু মনে করুন তিনি আপনাকে চট্টগ্রাম যাবার ব্যাপারে কিছু বলেননি এবং ভবিষ্যতে কখনো কিছু বলবেন না। একবার ভেবে দেখুন : আশরাফ খানকে যদি আমরা সুমন এন্টারপ্রাইজ থেকে আমাদের অফিসে নিয়ে আসতে পারি, তবে কেন আমরা রজব আলী সাহেবকে বোঝাতে পারবো না আপনাকে থাকতে হবে এখানে, ঢাকায়, চট্টগ্রামে বা অন্য কোথাও নয়? এমন হতে পারে যে আপনাকে অফিসে ডেকে ব্যক্তিগতভাবে তিনি নিজেই তার প্রস্তাবটি তুলে নেবেন, বলবেন ঢাকাতেই আপনাকে তার দরকার।”

“আপনি কি তাকে ভয় দেখাতে যাবেন বলছেন?” আমি বলি। “তার ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার বা এরকম কিছু আমি চাই না – আমি তা আপনাকে সোজাসুজি বলে দিতে চাই। হয়তো তিনি বুঝতে পারছেন না কেন আশরাফ খান আমাদের অফিসে এসেছেন এবং চুক্তিপত্রে সই করেছেন। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি আমাকে চট্টগ্রামে পাঠানোর সিদ্ধান্তের পেছনে তার কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নেই।” 

“তাকে ভয় দেখানো হবে কে বলেছে আপনাকে,” সে জবাব দেয়। “কেউ কাউকে ভয় দেখাতে হবে না। ভয় দেখিয়ে সব কাজ হয় না কি? এমন হতে পারে যে আশরাফ খান তাকে ফোন করে বলবেন আপনাকে যেন চুক্তির পুরো মেয়াদ অর্থাৎ আগামি পাঁচ বছর ঢাকায় রাখা হয়। তাহলেই তো হয়ে গেল। এজন্য তাকে কোনো কারণ দেখাতে হবে না। কিন্তু কারণ যদি দেখাতেই হয়, তাহলে তিনি বলতে পারেন আপনাকে সামনে রেখেই তিনি চুক্তিপত্রে সই করেছেন। আপনার সঙ্গে কাজ করতে তার ভালো লাগে। এটা একটা সমাধান। এই ধরনের আরো অনেক সমাধান থাকতে পারে। আশরাফ খান নিজে থেকে এমন একটা কথা বলতে রাজি হবেন কি না তা অবশ্য চিন্তার ব্যাপার। কিন্তু আমি যদি বলি আমি সে দায়িত্ব নিচ্ছি এবং তা অবশ্যই হবে, আপনি কি তা বিশ্বাস করবেন?”

তার মানে আমার পদোন্নতি হবে না। প্রধান আঞ্চলিক সমন্বায়ক হওয়া হবে না। বিষয়টি আমাকে পীড়িত করে। যদিও আমি জানি গত কয়েক দিনে আমাকে ঘিরে যা হয়ে গেছে তাতে আমার অংশগ্রহণ ছিল সামান্যই, আমার জীবনটি কিন্তু পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে – ক্ষুদ্রাকারে হলেও এমনটি আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম। রফিকুল্লা যদিও বলেছে চট্টগ্রাম তার বর্তমান পরিকল্পনার পরিধির বাইরে এবং সেজন্য চট্টগ্রামে গেলে একজন সমন্বায়ক হিসাবে আমার সফল হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ, তবু সমন্বায়ক হবার আকাঙ্খা আমার মধ্যে এমন চমৎকার একটি অনুভ‚তি এনে দেয় যে বিগত কয়েক বছরের পেশাগত জীবনে এরকম অনুভ‚তি আমার আর কখনো হয়নি। আমি যখন সামিয়ানার সঙ্গে কথা বলি, আমি আসলেই তাকে বোঝাতে চেষ্টা করি অনেক দেরিতে হলেও আমি এখন সফল একজন মানুষ এবং তার বাসা থেকে আমাকে চলে যেতে হবে। কিন্তু চট্টগ্রামে যদি আমার যাওয়া না হয় তাহলে আমাকে আবার ব্যর্থতায় ফিরে যেতে হবে। সুমন এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে চুক্তির কারণে আমি হয়তো এখনকার চেয়ে বেশি টাকা উপার্জন করবো এবং তাতে হয়তো ঠিকই চলে যাবো সামিয়ানার বাসা থেকে, কিন্তু আমাকে তবুও একজন ভ্রাম্যমান বিক্রয় প্রতিনিধি হিসাবেই দিন কাটাতে হবে। 

এই পর্যায়ে রফিকুল্লাকে আমার ভীষণ হিংসা হয়। সে যা পারে আমি তা পারি না। আরো সঠিকভাবে বললে বলতে হয় আমি এখনো জানি না কারা আশরাফ খানকে আমাদের অফিসে আসতে বাধ্য করেছে এবং কারা তাকে বলবে তিনি যেন রজব আলী সাহেবের সঙ্গে কথা বলে আমাকে চট্টগ্রাম পাঠানোর বিষয়টি থামাতে পারেন। রফিকুল্লা তাদের সঙ্গে শুধু যোগাযোগ রক্ষা করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, সে তাদেরকে তার প্রয়োজনমতো এবং তার সময়মতো কাজ করতে বাধ্য করছে। আশরাফ খানকে আমাদের সঙ্গে ছয় মাস বা এক বছরের চুক্তি করলে চলবে না। সে চুক্তি হতে হবে পাঁচ বছরের। যদিও তিনি আমাকে অনেকদিন ধরে ঘুরিয়েছেন, এবার তাকে আমাদের অফিসে আসতে হবে এবং আসতে হবে দুই দিনের মধ্যেই, এর পরে নয়। আমি রফিকুল্লার অবস্থানে থাকলে বিষয়গুলো ভালো করে বুঝতাম, কিন্তু সত্য হচ্ছে বর্তমানে আমি তার অবস্থানে নেই। কিছু ঘটে গেছে বা ঘটে যাচ্ছে আমি তা জানতে পারি শুধু দৃশ্যমানভাবে তা ঘটে যাবার পর, তার আগে নয়। 

রফিকুল্লা আমাকে আশা দেয়। সে যেন আমার মনের কথা বুঝতে পারে, এমনভাবে বলে, “ভয় পাচ্ছেন কেন, আপনি ঢাকায় থাকলে না হয় ঢাকা অঞ্চলের সমন্বায়ক হবেন।”

“ঢাকায় এরকম সমন্বায়কের পদ রয়েছে বলে আমার জানা নেই,” আমি বলি। “আমরা এই অঞ্চলের সব বিক্রয় প্রতিনিধি রজব আলী সাহেবের সঙ্গে কাজ করি, তাই না? তিনিই আমাদের কাজকর্মের সমন্বয় করেন।” 

“তাতে কি,” রফিকুল্লা বলে, “এমন পদ যদি এখন এখানে না থাকে, তবে তা সৃষ্টি করা হবে। খুব সহজ। ব্যবসার পরিধি বেড়ে গেলে একা তার পক্ষে কি সব কাজ করা সম্ভব হবে? তিনি নিজেই তখন নির্ভরযোগ্য কারো সাহায্য চাইবেন। যার মানে আপনি। কিন্তু একান্তই যদি তা সৃষ্টি করা সম্ভব না হয়, তাহলে আপনাকে আরো ওপরের দিকে তাকাতে হবে।”

“আরো ওপরের দিকে? ম্যানেজারের পদ?” 

রফিকুল্লা হাসে, বলে, “হয়তো।” তারপর সে হাসে আবার। 

“আপনার কি মাথা খারাপ হয়েছে?” আমি বলি। “এসব আবোলতাবোল কি বলছেন?” 

“আসাদুজ্জামান,” সে বলে, “আমরা সবেমাত্র আমাদের যাত্রা শুরু করেছি। আমরা এখনো শিখছি। আমাদের জন্য সুসংবাদ হচ্ছে শেষটি আমরা দেখতে পাচ্ছি না। অর্থাৎ আমরা সাহস করে যে কোনো কিছু আশা করতে পারি। অপ্রাসঙ্গিক বা আবোলতাবোল বলতে কিছু নেই। হয়তো ফল হবে। হয়তো ফল হবে না। কিন্তু যখন আমরা পুরোপুরি শিখে যাবো, এসবের খুব স্পষ্ট অর্থ হবে আপনার কাছে। এখন আমি আপনাকে যা দেখাচ্ছি, আপনি তখন নিজেই তা দেখতে পাবেন।”

আমি মুগ্ধ হই। এমনটি হয়তো সত্যিই করা সম্ভব। যদি তা হয় তাহলে আমার পদোন্নতিও হবে এবং আমাকে চট্টগ্রামেও যেতে হবে না।

এই বৈঠকেই আমি তার কাছে ডায়নামিক মোটর্সের ডা. শ্যামল দত্তের প্রসঙ্গ তুলি। বিস্তারিত শোনার পর সে বলে, “শ্যামল দত্ত! সে তো চুনোপুটি। ফুঁ দিলে উড়ে যাবে। কিন্তু আমরা ফুঁ দেবো না। আমরা তার জন্য তুফান নিয়ে আসবো, তুফান। তাতে এক শিক্ষাতে কাজ হয়ে যাবে। জীবনে আর কখনো সে আপনার সঙ্গে এভাবে আচরণ করবে না। আপনি মোটেই চিন্তা করবেন না। আমাকে একটু সময় দিন। শীগ্রই সে জানতে পারবে তার পায়ের নিচে মাটি নেই।”

এসময় দুজন অতিথি আসেন বিধায় আমাদের আলাপে ছেদ পড়ে। তারা এক হাড়ি মিষ্টি দই, এক হাড়ি রসগোল্লা এবং একটি চমচমের বাক্স নিয়ে আসেন। সেগুলো টেবিলের ওপর রেখে তারা রফিকুল্লার সঙ্গে কোলাকুলি করেন। রফিকুল্লা তাদেরকে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। তাদের একজন শাইখ আব্দুল মোহিত, পেশায় ব্যাঙ্কার, এবং অন্যজন লতিফুল ইসলাম, রাজধানী উন্নয়ন কতৃপক্ষের ভ‚মিজরিপ বিভাগে কাজ করেন। জানতে পারি সম্প্রতি তারাও নিজ নিজ ক্ষেত্রে রফিকুল্লার পরিচিত প্রভাবশালী মহল কতৃক আশীর্বাদপুষ্ট হয়েছেন। শাইখ আব্দুল মোহিত পেয়েছেন কয়েক বছরের প্রত্যাশিত পদোন্নতি। লতিফুল ইসলাম বদলী হয়েছেন পরিকল্পনা বিভাগ থেকে ভ‚মিজরিপ বিভাগে এবং বর্তমানে কাজ করছেন সেক্টর আঠারোতে। শাইখ আব্দুল মোহিত জানান শুক্রবারে বুড়িগঙ্গায় নৌবিহারের আয়োজন করার সিদ্ধান্তটি পাকা করা হয়েছে। শুরু থেকেই থাকবেন জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী লায়লা আরজুমান্দ হক। দুপুরে তার সঙ্গে যোগ দেবেন কৌতুকাভিনেতা উপম চক্রবর্তী। এফডিসিতে কাজ করা প্রধান কয়েকজন এক্সট্রার উপস্থিতিও আশা করা হচ্ছে। “আপনাকে সদরঘাটে আসতে হবে সকাল নয়টার মধ্যে,” লতিফুল ইসলাম আমাকে বলেন। “সোজা চলে আসবেন তিন নম্বর টার্মিনালে। সেখানে আমাদের ব্যানার দেখতে পাবেন।”

আমি রফিকুল্লার দিকে তাকাই। বুঝতে চাই আমন্ত্রণটি তার কাছ থেকে আসছে কি না। একই সঙ্গে মনে পড়ে শুক্রবারে সামিয়ানা কিছু রান্না করবে বলেছে। যদিও তাকে আমি পুরোপুরি কথা দেইনি, আমার মনে হয় আমার বাসাতে থাকাই ভালো। কয়েকদিন পর তো আমি তার বাসা থেকে চলেই যাবো। তার প্রতি এতটুকু কৃতজ্ঞতা না দেখালে কেমন হয়। কিন্তু রফিকুল্লা বলে, “উনি নিশ্চয়ই আসবেন। আমি আগে থেকেই আমন্ত্রণ জানিয়ে রেখেছি।”

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা