প্রচ্ছদগল্পউপন্যাসএকজন নৃশংস দুষ্কৃতকারী

ধারাবাহিক উপন্যাস : নেয়ামত ইমাম

একজন নৃশংস দুষ্কৃতকারী

নেয়ামত ইমাম

প্রথম খণ্ড

৬.

বাসায় পৌঁছাতে বেশ খানিকটা দেরি হয়ে গেলেও আমি সামিয়ানাকে জেগে থাকতে দেখি। “ঘুম আসছিল না,” সে বলে, “অনেক চেষ্টা করলাম। ঘুমাতে না পারলে শুয়ে থেকে লাভ কি? তাই সোফায় বসে সময় কাটাচ্ছি।” আমার ক্ষেত্রে অবস্থাটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সারাটি দিন বাইরে কাটানো শেষে আমি ছিলাম ভীষণ ক্লান্ত এবং আমার মনে হয় বিছানায় কাত হয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়বো। আমি তাকে তা বলার পর সে মৃদু হাসে, বলে, “আপনি খুবই ভাগ্যবান। আপনার মন ও শরীর ভালো থাকবে। প্রত্যেকদিন সকাল বেলা একজন নতুন মানুষ হয়ে ঘুম থেকে উঠবেন। বাঁচবেন অনেক দিন।” আমি তার সামনে বসি। “যদি কিছু মনে না করেন,” আমি বলি, তাহলে আপনাকে একটা কথা বলতে চাই।” সে একটু সোজা হয়ে বসে। “আগামি শুক্রবার আমার বুড়িগঙ্গায় নৌবিহারে যাবার কথা। সচরাচর এসব আমার ভালো লাগে না, কিন্তু এবার কিছু বন্ধুবান্ধব অনেক করে পীড়াপীড়ি করলো বলে রাজি হয়ে গেলাম। আপনি কিছু রান্না করতে চেয়েছিলেন, তার আর দরকার নেই।” “ঠিক আছে,” দেরি না করে সে বলে, “নৌবিহারে যান, আরেকদিন না হয় কিছু করা যাবে।” “আপনি কিছু মনে করেননি তো?” – এমনটি বলার পরই আমার মনে হয় এর দরকার ছিল না, কারণ সে কিছু মনে করলেও আমি নৌবহরে যাবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি। তবে আমি খুশি হই যখন সে বলে, “না, মনে করবো কেন? সব ঠিক আছে। নিজেকে নিয়ে আমি নিশ্চয়ই করার কিছু পাবো। কিছু না পেলে ঘুমাবো বা আশে পাশে হাঁটতে যাবো। তাহলেই তো দিনটা পার হয়ে যাবে।”
হাত-মুখ ধোয়ার পর তোয়ালে ব্যবহার করতে করতে আমার মনে হয় সামিয়ানা এখনো সামনের ঘরে বসে আছে। তা যাচাই করবার জন্য দরজা খুললে আমি তাকে কোলের ওপর একটি ছোট বালিশ টেনে চোখ বন্ধ করে বসে থাকতে দেখি। দরজার শব্দে সে নড়ে না। “শুনছেন?” আমি আস্তে করে বলি, “শুনছেন?” সে সাড়া দেয় না বলে আমি ধরে নেই সে হয়তো সোফার ওপরই আজ ঘুমাবে। বাসা কিছুটা ঠান্ডা হয়ে এসেছে। রাত বাড়লে তা আরো ঠান্ডা হবে। তাকে একটি কাঁথা এগিয়ে দেবো চিন্তা করে মুহূর্তেই আবার মন পরিবর্তন করি। সে বিষয়টিকে কিভাবে নেবে সে ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ হতে পারি না। ঠান্ডা বেড়ে গেলে সে নিজেই ঠিক করতে পারবে কি করতে হবে। দরজা বন্ধ করে বাতি নিভিয়ে আমি বিছানায় চলে যাই এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ি।
সামিয়ানার সঙ্গে আমার এরপর দেখা হয় শুক্রবার সকাল বেলা। নয়টার মধ্যে সদরঘাটে পৌঁছাতে হলে আমাকে বিছানা ত্যাগ করতে হবে সাতটার আগে। পাইকপাড়া থেকে হেঁটে কল্যাণপুর গিয়ে বাসে উঠতে সময় লাগবে। তারপর পল্টন মোড় হয়ে গুলিস্তানে পৌঁছে সদরঘাটের বাস ধরতে সময় লাগবে আরো কিছু। অর্থাৎ সাতটার মধ্যে বাসা ছেড়ে বেরিয়ে না গেলে আমাকে ছাড়াই শুরু হয়ে যাবে নৌবিহার। এজন্য বৃহষ্পতিবারে আমি একটু আগে ঘুমাতে চলে যাই। যাই হোক, সকাল সাতটার আগেই রফিকুল্লার কাছ থেকে ফোন আসে। “দুঃসংবাদ! নৌবিহার আজ হচ্ছে না,” সে বলে, “শাপলা চত্বরে আজ একটা সরকারবিরোধী জনসমাবেশ হচ্ছে, যেজন্য এদিকের প্রধান প্রধান রাস্তাগুলো বন্ধ। কেউ কেউ আসতে পারলেও সবাই আসতে পারবে না। সামনের শুক্রবারে আমরা আবার চেষ্টা করবো।”
হঠাৎ আমার কিছু করার থাকে না বলে ভাবি আজ আমি নাপিতের কাছে যেতে পারি। চুল কাটিয়েছি প্রায় চার মাস হয়ে গেল। ডানে এবং বামে কানের ওপর পাহাড় গজে উঠেছে যেন। বাতাসে উড়ে সামনের দিকে চুলগুলো প্রায়ই ঢেকে ফেলে চোখ। কিন্তু কাছের দুটি নাপিতের কেউই নয়টার আগে দরজা খোলে না বলে আমার জানা। তার মানে আমাকে আরো দুই ঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে। এসময় আমি মেঝেটি ঝাড়ু দেই, পড়ার টেবিলে থাকা বইগুলো কিছুটা গুছিয়ে রাখি, দ্বিতীয় প্যান্টটির পেছনের পকেটের বোতামটি ঝুলে গেছে বলে সুঁই-সুতা নিয়ে সেটি সারতে বসে যাই। তারপর জ্যাকেট পরে বেরোতে যাবো, এমন সময় দেখি সামিয়ানা উঠেছে।
“আরে আপনি,” সে বলে, “নৌবিহারে যাননি? আমি তো ভাবলাম রোদ ওঠার আগেই আপনি বেরিয়ে গেছেন।”
“কেমন আছেন?” আমি জিজ্ঞেস করি। তারপর বলি রফিকুল্লার ফোনের কথা। তাতে সে ব্যথিত হয়, বলে, “কি আর করবেন। জনসমাবেশকে তো আর আমাদের জীবন থেকে মুছে ফেলা যাবে না। তবে সামনের সপ্তাহে বা তার পরে নৌবিহার হবে এটা আপনার জন্য একটা সান্তনা। আশা করি সেদিন আশেপাশে কোনো জনসমাবেশ থাকবে না। তা ছাড়া আজকের দিনটা আপনি বিশ্রাম নিয়ে কাটাতে পারবেন, তাই বা কম কিসের।”
নাপিতের কাছ থেকে ফিরে আসার পর দুপুরবেলাটি সামিয়ানার সঙ্গে আমার ভালোই কাটে। আপনার জন্য রান্না করছি, দরজা দিয়ে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে সে জানিয়ে দেয়। তাতে ধন্যবাদ দেওয়া ছাড়া আমি আর কিছু বলতে পারি না। ভাবি আমি হয়তো তাকে সামনের মাসে কিছু কিনে দেবো। হাতে তখন কিছু টাকা আসবে।
গোসল করে পরিচ্ছন্ন হতে হতে আধঘন্টা লেগে যায়। তারপর আর কিছু করার থাকে না। “আপনাকে কি সাহায্য করতে পারি?” আমি রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করি।
“অবশ্যই,” সামিয়ানা বলে এবং টেবিলের দিকে নির্দেশ করে। “ওই যে প্লেট দুটি দেখছেন, কাপড় দিয়ে মুছে সেগুলো শুকিয়ে ফেলুন।” টেবিলের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলি, “তারপর?” “আগে এটুকু করুন না,” সে বলে। “একবার দেখতে দিন কেমন ভালো শুকাতে পারেন। তারপর কিছু না কিছু পাওয়া যাবে।” কাপড়ের টুকরাটি হাতে নিয়ে প্লেট শুকাতে থাকলে সে আমার কাছে আসে এবং জিজ্ঞেস করে নৌবিহারে যাবার আমন্ত্রণ পাবার পর তাকে সঙ্গে নিয়ে যাবার কথা একবারও আমার মনে হয়েছে কি না। “শুধু কথা বলার জন্য।”
আমি সোজাসুজি বলি, “না।” তাতে সে আমাকে ভুল বুঝতে পারে বিধায় কিছুক্ষণের মধ্যে যোগ করি, “এটা শুধু ছেলেদের নৌবিহার ছিল কি না। এতে যারা আমন্ত্রিত হয়েছে তারা কোনো না কোনো ভাবে একে অন্যের সহকর্মী।” কথাটি আমি বলি যদিও আমি জানি না রফিকুল্লা সঙ্গে করে মাহরুবাকে নিয়ে যাবার কথা ভাবছিল কি না বা শাইখ আব্দুল মোহিত ও লতিফুল ইসলাম তাদের পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে যাবার চিন্তা করছিল কি না।
“আমিও তাই ভেবেছি,” সে বলে। “পরিচিত কাউকে সঙ্গে নিয়ে যাবার সুযোগ থাকলে আপনি হয়তো আমাকে বলতেন। যখন বলেননি, বুঝতে পারি শুক্রবারে হলেও এটা হয়তো হবে পেশাগত লোকদের জন্য বিশেষ কোনো নৌবিহার।”
বিষয়টিকে সে স্বাভাবিকভাবে নিয়েছে বলে আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই, কিন্তু তারপর কৌতুহল বশতঃ জিজ্ঞেস করি আমি যদি সত্যিই তাকে আমার সঙ্গে নিতে চাইতাম, তাহলে সে আসতো কি না।
“অবশ্যই না,” সে বলে, “কেন, কিভাবে, আমি তো আপনাকে চিনি না। এক বাসায় থাকলেও আমরা তো একে অন্যকে সামনে পেলে খুশি হয়ে উঠি না। এমনকি এই পাড়াতেও আমরা কখনো একত্রে বেরোইনি।” এরপর সে আমাকে বলে রান্না শেষ হতে পাঁচ মিনিটের বেশি লাগবে না, এই সুযোগে আমি ময়লার ব্যাগটি বাইরে ফেলে আসতে পারবো কি না। “অবশ্যই,” আমি বলি এবং দেরি না করে ব্যাগটি হাতে নিয়ে বেরিয়ে যাই।
খাবার খেতে খেতে সামিয়ানা আমাকে একটি গল্প বলে। গল্পটি এরকম।
এক কৃষক পরিবারে দুটি ভাই থাকে। প্রাপ্তবয়ষ্ক হবার আগে ছোট ভাইটি বড় ভাইয়ের সঙ্গে অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে দূরের কোনো শহরে চলে যায়। সেখানে সে পড়াশোনো শেখে, নিজেকে উন্নত করে। এক পর্যায়ে সে একটি কোম্পানিতে কর্মকর্তা হিসাবে যোগদান করে এবং তার শ্রম ও অধ্যাবসায় দিয়ে কোম্পানিটিকে উন্নতির চরম শিখরে নিয়ে যায়। তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ কোম্পানীর বোর্ড তাকে একটি পুরষ্কার প্রদান করে, যার ছবি পত্রিকায় ছাপা হয়। বড় ভাই, যার বয়স ততদিনে সত্তর ছাড়িয়ে গেছে, গ্রামের একটি চায়ের দোকানে বসে পত্রিকার পাতায় সে ছবিটি দেখতে পায়। এই কর্মকর্তা আমার ছোট ভাই, সে বুঝতে পারে, যদিও বয়স হয়ে যাওয়ায় তাকে সে পুরোপুরি চিনতে পারে না। কয়েকদিন পর সে ছবিটির একটি কাটিং সহ কোম্পানির ঠিকানায় একটি চিঠি লিখে জানতে চায় সে আসলেই তার ছোট ভাই কি না, যে একদিন রাগ করে বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিল। চিঠির সঙ্গে সে তার নিজের একটি ছবিও পাঠিয়ে দেয়। ছোট ভাইটির হাতে সে চিঠি পৌঁছালে সে তার বড় ভাইকে চিনতে পারে, কিন্তু যেহেতু এতগুলো বছর সে তার খোঁজ নেয়নি, ফিরতি চিঠিতে সে লিখে সে তার ছোট ভাই নয় এবং তার কোনো বড় ভাই নেই, সে অন্য কেউ, যে নিজের জীবনকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাবার চেষ্টা করে যাচ্ছে।
“বাস্তবে এমনটি ঘটা সম্ভব নয়,” আমি বলি।
সামিয়ানা জিজ্ঞেস করে, “কেন?”
“প্রথমতঃ দুই ভাইয়ের মধ্যে অভিমান হতে পারে, ফলস্বরূপ ছোট ভাই শহরে চলে যেতে পারে, কিন্তু সে অভিমানের গভীরতা কখনো এমন বিশাল হতে পারে না যে একজন সফল মানুষ হবার পর সে তার বড় ভাইয়ের খোজ করবে না, বিশেষ করে যখন আমরা জানি না বড় ভাই তার ছোট ভাইটির এমন কোনো মারাত্মক যন্ত্রণার কারণ হয়েছে কি না যে যন্ত্রণার কথা ছোট ভাইটি প্রায় চার দশক পরেও ভুলতে পারেনি। যে মানুষ উন্নত হতে পারে, চেষ্টা করলে সে কিছুটা উদারও হতে পারে। তাছাড়া ভাই বলে কথা। ভাই কখনো ভুল করলে তাকে চিরজীবন ধরে সে ভুলের মাশুল দিতে হবে এটা কেমন কথা। দ্বিতীয়তঃ কোনো কারণে ছোট ভাইটি তার মনের মধ্যে অভিমানটি চার দশক ধরে পুষলেও এই চিঠি পাবার পর সে তা ভুলে যাবে এবং গ্রামের বাড়িতে ছুটে যাবে, তার বড় ভাই এতদিন ধরে তাকে মনে রেখেছে এবং তার কাছে এমন একটি চমৎকার চিঠি লিখেছে বলে তাকে ধন্যবাদ জানাবে। সে বুঝতে পারবে সময় পাল্টে গেছে, বড় ভাইকে সে যেখানে রেখে এসেছে এতগুলো বছর পর সে আর সেখানে নেই। সে তার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করবার জন্য, তাদের সম্পর্কটিকে পুনরায় সতেজ করবার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছে।”
“আমি কিন্তু ব্যাপারটাকে ভিন্নভাবে দেখি,” সামিয়ানা বলে।
“যেমন,” আমি জিজ্ঞেস করি।
“প্রথমতঃ আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন, সে বলে, ছোট ভাই বা বড় ভাই দুজনের কেউই কিন্তু অভিমানের সমস্যাটির সমাধান করতে চেষ্টা করেনি। ছোট ভাইটি যখন শহরে চলে যায়, তখন সে অভিমানী হিসাবেই সেখানে যায়। সে যথেষ্ট পড়াশোনা শিখলেও বা নিজেকে উন্নত করলেও অভিমানটি পড়ে থাকে জগদ্দল পাথরের মতো। এমনকি চার দশক পরেও এটি একই ক্ষুরধারভাবে বেঁচে থাকে। দ্বিতীয়তঃ বড় ভাই যেহেতু বড় ভাই, তাকে তার ছোট ভাইয়ের অভিমান ভাঙ্গানোর জন্য প্রয়োজন হলে আত্মত্যাগ করতে হতো। যে কোনো সন্ধিতে কিছুটা আত্মত্যাগ দরকার। আমরা দেখি চিঠিতে বড় ভাই জিজ্ঞেস করেছে পত্রিকায় ছাপানো ছবির লোকটি তার ছোট ভাই কি না, কিন্তু এতগুলো বছর পার হয়ে গেলেও আমরা দেখি না সেই চিঠিতে বড় ভাই লিখছে আমাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে বা যা হয়েছে আমি তা পরিবর্তন করতে পারবো না, তবে আজ আমি আমার অপারগতার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। আমরা দেখি চিঠির সঙ্গে সে তার নিজের একটি ছবি যোগ করেছে। ছোট ভাই যদি বড় ভাইয়ের কারণে কষ্ট পেয়ে থাকে, যে কষ্ট সে বহন করেছে দীর্ঘ চার যুগ ধরে, তাহলে সেই ছবির দিকে তাকিয়ে সে কী দেখবে? এই ছবি কি তাকে তার সেই পুরনো কষ্টের কথা আবারও মনে করিয়ে দেবে না? যদি তাই হয় তাহলে সে কষ্ট না বাড়িয়ে তার পক্ষে বড় ভাইকে এটাই বলে দেওয়া ভালো যে ছবির লোকটি তার ছোট ভাই নয়, অন্য কেউ। একটা কথা মনে রাখা দরকার : শত চেষ্টা করলেও ছোট ভাই কখনো বড় ভাই হতে পারবে না, সুতরাং সে কি করতে পারবে বা পারবে না তা কখনো নিঃসীম হবে না।”
একসময় খাবার টেবিল থেকে উঠে আমরা সামনের ঘরে আসি। আলাপের মধ্যে হারিয়ে গিয়ে আমি খেয়েছি প্রচুর। সামিয়ানাও তাই। “বিকেলের বাকি অংশটা আমি বিশ্রাম নিয়ে কাটিয়ে দিতে চাই,” সে বলে। “পুরো সপ্তাহের খাবারদাবার কেনার জন্য বাজারে যাবার দরকার ছিল, কিন্তু তা করবো আগামিকাল। সবসময় এমন পরিতিৃপ্তি সহকারে সময় কাটানো যায় না।” “চুল কাটাবার ফলে আমার নিজেকে আজ খুব হাল্কা মনে হচ্ছে,” আমি বলি। “আরো সুবিধার ব্যাপার হচ্ছে কাল সকালে একটু দেরি করে উঠলেও চলবে। কাল যাবো মোহাম্মদপুরে। এখান থেকে খুব বেশি দূরে নয়। তা ছাড়া অ্যাপয়েন্টমেন্টটাও দুপুরের পরে।”
এমন সময় বাবার ফোন আসে। দৌড়ে গিয়ে কলটি রিসিভ করতেই তিনি জিজ্ঞেস করেন আরামবাগের পাটোয়ারী সাহেব কাল রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন, এই ব্যাপারে আমি কিছু জানি কি না। আমি বলি, “না, তাই না কি? সেদিনের পর আমি আর আরামবাগে যাইনি। দিন-রাত ব্যস্ত ছিলাম। চাকরিতে কিছু জরুরি কাজ করতে হয়েছে।” “খবর সঠিক,” তিনি বলেন, “খবর সঠিক।” তার গলার স্বর কোমল। আরামবাগে গিয়ে পাটোয়ারী সাহেবকে দেখে আসার জন্য আমাকে আগেরবার তিনি যে রকম ঝাঁঝালোভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন, এখন তার মধ্যে সেই তেজের বিন্দুমাত্র নেই। পরিষ্কার পাটোয়ারী সাহেবের মৃত্যুকে তিনি সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। “কয়েক জায়গা থেকে আমি খবরটা যাচাই করে নিয়েছি, আসাদ,” তিনি বলেন। “তার জানাজা আজ সন্ধ্যায়। সময় করে তো সেখানে যাওয়া দরকার। তার পরিচিত হিসাবে এটা আমাদের দায়িত্ব।” “অবশ্যই,” আমি বলি, “আমি যাবো, বাবা। জানাজা বলে কথা। তা ছাড়া আজ ছুটির দিন। আমার হাতে করবার মতো তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু নেই।”
টেলিফোনটি নামিয়ে রেখে আমি সামিয়ানার কাছে যাই। সে আমাদের পিতা-পুত্রের আলাপ অনেকটাই শুনতে পেয়েছে। বাকিটুকু পরিষ্কার করতেই সে বলে, “আপনার সঙ্গে আমিও আরামবাগে যেতে চাই। পাটোয়ারী সাহেব হয়তো আমার পরিচিত কেউ নন, কিন্তু মৃত্যু একটা মানবিক ব্যাপার। কখন যেতে চান, বলুন।”
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সময় প্রায় তিনটা। বলি, “আমরা চারটার দিকে বেরোতে পারি। বাসের জন্য অপেক্ষা না করে একটা সিএনজি ভাড়া করবো, যাতে তাড়াতাড়ি সেখানে যাওয়া যায়।”
“ঠিক আছে,” বলে উঠে গিয়ে সামিয়ানা চুল আঁচড়াতে শুরু করে।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা