প্রচ্ছদপ্রবন্ধমনসুর আজিজের কবিতায় ইতিহাস চেতনা

লিখেছেন : সোহেল মাহবুব

মনসুর আজিজের কবিতায় ইতিহাস চেতনা


সোহেল মাহবুব

কবিতা হলো শব্দ নিয়ে খেলা। শব্দকে ভিন্ন আঙ্গিকে ভিন্ন মাত্রায় প্রয়োগ করা হয় কবিতায়। এছাড়া শব্দ দিয়ে চিত্রকল্প তৈরী করা হয় কবিতায়। যিনি যত সুন্দরভাবে এসব শব্দ নিয়ে খেলতে পারেন তিনি তত পাঠকের হৃদয়ে স্থান করে নেন কবি হিসেবে। কবিতা শুধু চিত্রকল্প বা স্বপ্নীল জগত নিয়ে রচিত হয় না। কবিতায় সময়, ইতিহাস, সম-সাময়িক মানুষের চাল-চলন আচার ব্যবহার, প্রেম, দ্রোহ, বিদ্রোহ, সমাজ, সামাজিক অসঙ্গতিসহ সহ সব কিছুই বলা হয়ে থাকে।
কবিতায় ইতিহাস চেতনা হলো ইতিহাসের ঘটনা। ঐতিহ্য ও সময়ের প্রবাহকে কাব্যের মাধ্যমে প্রকাশ করে কবিতা যা পাঠককে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। সেইসঙ্গে সময়ের গভীরতা উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। কবি ইতিহাস থেকে ঘটনা, চরিত্র বা ঐতিহ্যকে তুলে এনে কবিতায় নতুন জীবন দেন। যেমন, জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতায় অতীতের এক দীর্ঘ যাত্রার কথা বলা হয়েছে।
ইতিহাস চেতনা বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে একটি সেতু তৈরি করে। কবি সময়ের বিবর্তন এবং মানুষের অনন্ত যাত্রার কথা তুলে ধরেন, যা পাঠক বর্তমানকে ভিন্ন আঙ্গিকে দেখতে পান। কবি ইতিহাস থেকে প্রাপ্ত ঐতিহ্য, গল্প বা পুরাণের উপাদান ব্যবহার করে নিজেদের কবিতাকে সমৃদ্ধ করেন। অনেক কবি তাদের কবিতায় সমকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ইতিহাসের অংশ হিসেবে তুলে ধরেন। কিছু ক্ষেত্রে, কবি ইতিহাসচেতনাকে মৃত্যুচেতনাকে অতিক্রম করার একটি উপায় হিসেবে ব্যবহার করেন।
জীবনানন্দ দাশের মতো কবিরা ইতিহাসকে কেবল তথ্য হিসেবে উপস্থাপন না করে, তাকে এক মানবিক ও সংবেদনশীল চেতনায় ধারণ করেছেন। তাঁরা ইতিহাসকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখিয়েছেন, যা আমাদের বর্তমানের এক গভীর অর্থ খুঁজতে সাহায্য করে।
ইতিহাস পাঠ এবং চর্চা গবেষণা ও অনুসন্ধানের কাজ। সেভাবে দেখলে ইতিহাস বিজ্ঞানেরই অনুবর্তী। যা অজ্ঞাত তার অনুসন্ধানলব্ধ জ্ঞানই বিজ্ঞান। ইতিহাস বিজ্ঞানের স্বগোত্র। শুধু তা সন্ধিৎসার ক্ষেত্রে ভিন্ন। অতীতের সংঘটিত মানবিক কর্মকাণ্ড ও তৎসংশ্লিষ্ট জিজ্ঞাসার সঠিক উত্তর খুঁজে বের করাই ইতিহাসের বিবেচনাধীন। ইতিহাস এ দায়িত্ব পালন করে তথ্য, প্রমাণ, ব্যাখ্যা ও মীমাংসার মধ্য দিয়ে।
কাব্যসৃষ্টির পক্ষে ইতিহাস মনষ্কতা যে কত জরুরী তার পরিচয় পাওয়া যায় বর্তমান সময়ের শক্তিমান কবি মনসুর আজিজের কবিতায়। তিনি তাঁর কবিতায় বুঝিয়েছেন ইতিহাস চেতনা শুধুমাত্র গল্প, উপন্যাস বা প্রবন্ধেই নয়- কবিতাতেও থাকা জরুরি।
কবি মনসুর আজিজ তাঁর কবিতায় বিভিন্ন আঙ্গিক তুলে ধরেছেন বিভিন্ন উপায়ে। তাঁর কবিতায় ইতিহাসের বিভিন্ন উদ্ধৃতি বেশ উল্লেখযোগ্য—

হঠাৎ চরার সব জনপদে মানুষেরা জেগে ওঠে, কঠিন প্রতিবাদী
মুসার লাঠির আঘাতে পাথরদ্বীপ ফেটে যায়। সিঞ্চিত করে সর্পিল ঝর্ণাধারা
দ্রাবিড় জনপদে হাতছানি দেয় শতাব্দী
নতুন চরায় হেলাল হাসি দেখে হই আত্মহারা।
[দ্রাবিড় হাতছানি/ অনন্ত আকাশের জ্যোর্তিময় নক্ষত্র]

পাঠক স্বাভাবিকভাবেই এই কবিতায় মুসলিম ইতিহাস উপলব্ধি করবেন। ইসলাম ধর্মের অন্যতম নবী ও রাসুল মুসা (আ:) কে মহান আল্লাহ তায়ালা এক অলৈাকিক লাঠি প্রদান করেছিলেন। যেই লাঠির দ্বারা তিনি অনেক অলৌকিক কাজ করতেন। আল্লাহর নির্দেশে মুসা (আ:) এই লাঠি দিয়ে নীল নদে আঘাত করেছিলেন। তখন নদীর পানি দুইপারে সরে গিয়ে মাঝখান দিয়ে রাস্তা তৈরি হয়েছিল। সে রাস্তা দিয়ে তিনি পার হয়ে গিয়েছিলেন। ফেরাউনও নবী মুসাকে তাড়া করে তাঁর পিছু নিয়েছিল। মুসা (আ:) নদী পার হয়ে আবার সেই লাঠি দিয়ে নদীতে আঘাত করতেই নদীর পানি আবার একত্র হয়ে যায়। এতে ফেরাউন তার দলবল নিয়ে পানিতে ডুবে মরে। মুসলিম জাতির এই ঐতিহাসিক ঘটনা কবি মনসুর আজিজ তাঁর কবিতায় ব্যবহার করেছেন।
একই কাব্যগ্রন্থের ‘দৌড়ের গতি’ কবিতায় মুসলিম জাতির বীরোচিত ইতিহাস তুলে ধরে বলেছেন এভাবে—

অথচ আমাদের পূর্বপুরুষের তরবারীর খাপ দেখে
ভয়ে পালাতো এই সাহসী চাড়ালেরা
আমরা সেই ইতিহাস কপচাই এখনো
ধবধবে পাঞ্জাবি তসবিমালা আতর ছিটিয়ে পড়ে থাকি মিলাদে
জলসায় বলি চিকিৎসাশাস্ত্র, গণিতশাস্ত্র, জ্যোর্তিরবিজ্ঞানের জনক আমরাই
নির্বোধ জানে না কালের পরিক্রমা–

আমাদের কালঘুমে কেটে গেছে হাজার বছর
আমাদের দৌড়ের গতি কি পারবে ইতিহাস ছাড়িয়ে যেতে!

সারা বিশ্বে এক তৃতীয়াংশ মানুষ মুসলমান। কিন্তু এতবড় মুসলিম জাতি হওয়ার পরেও আজ সারা বিশ্বে মুসলিমরা মার খাচ্ছে সাহসিকতার অভাবে। অথচ পূর্বের ইতিহাস তা বলে না। ইতিহাস বলে মুসলমানরা বীরের জাতি। কবি মনসুর আজিজ তাঁর এই কবিতায় মুসলিম জাতিকে সেটাই মনে করিয়ে দিয়েছেন।
আত্মশ্লাঘায় তাই তিনি লেখেন—

যে মুহূর্তে একটি ফিলিস্তিনি শিশু নিজেকে প্রস্তুত করে সুইসাইডের জন্য
নবজাতকের চোখ ফেটে বের হয় ইহুদির প্রতি ঘৃণা
তখন তোমরা প্রস্তুতি নাও ইহুদির পানপাত্র সাজাবার
চেয়ে দেখ তোমার পানপাত্রে লুকিয়ে আছে
একশ ত্রিশ কোটি মুসলমানের করুণ মুখ

আমাকে ওমরের তরবারিটি দাও
সবার আগে হত্যা করি নিজেকে।
[বোধের অনবরত নক্ষত্র/ অনন্ত আকাশের জ্যোতির্ময় নক্ষত্র]

আজ ফিলিস্তিনের ভিতরে যে আরববিশ্বের বিষফোঁড়া ‘ইসরাইল’ মাটি ফুঁড়ে জেগে উঠেছে আর স্বভূমিতে ফিলিস্তিনি মানুষের প্রতিদিন যে যুদ্ধের সম্মুখিন হতে হচ্ছে তার বিবরণ ২০০৭ সালে প্রকাশিত তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘অনন্ত আকাশের জ্যোতির্ময় নক্ষত্র’তে তুলে ধরেছেন।
ইতিহাস চেতনা বলতে আমরা সচেতন জিজ্ঞাসায় কিংবা অনুপ্রাণিত কাব্যসৃষ্টির মধ্য দিয়ে কী বুঝি? স্বাভাবিকভাবেই আমাদের সামনে সে প্রশ্ন এসে ধরা দেয়। একজন কবি যিনি তিনি সময়ের মাপকাঠিতে যে ইতিহাসকে প্রত্যক্ষ করতে পারেন একথা আমরা বেমালুম ভুলে যাই। অথচ আমাদের কবি মনসুর আজিজ তাঁর কাব্যে ইতিহাস নির্ভরতা কতটুকু জাগিয়ে তুলেছেন তার চেয়ে বড় কথা হলো ইতিহাস সম্পর্কে তিনি অনেক বেশি সজাগ ও সচেতন তাঁর অনুজ-অগ্রজদের থেকেও। তাঁর বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থ থেকে আমরা সেই প্রমাণ পাই।
তিনি ‘করতলে বৃক্ষের দাগ’ কাব্যগ্রন্থে ‘বর্ণমালা হবে না দুখিনি’ কবিতায় লিখেছেন—

ভাষা শহীদের রক্তের ঋণ এই মনে দেয় দোলা
তাদের ত্যাগের মহিমা জাগায় সাহসের প্রাণখোলা
মায়ের মুখের ভাষা যদি হয় বেহাত কারোর জন্য
তরুন যুবক ফুঁসে ওঠে যদি জাতি হবে তবে ধন্য।

বাংলা আমার জননীর ভাষা এ ভাষায় বলি কথা
কবিতা গল্প কাহিনি কত না বাংলায় পড়ি যথা
পূর্ব পুরুষ ভাষার জন্য দিয়েছিলো বলে প্রাণ
বিশ্বের বুকে বাংলা ভাষার বাড়ে কত সম্মান।
কবিতার এই অংশে কবি বাংলা ভাষা নিয়ে আন্দোলন সংগ্রামের ঐতিহাসিক কথা বলেছেন। যে ভাষার জন্য ভাষা সৈনিকেরা প্রাণ দিয়ে বাংলায় বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁদের আত্মত্যাগের ফলে আমরা আজ মন উজাড় করে বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারছি। এই ভাষা আজ আমাদেরকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। কবিতায় কবি সেই ইতিহাসের কথায় তুলে ধরেছেন পাঠকের কাছে।
এই কবিতার শেষাংশে কবি ২০২৪-এর জুলাইয়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামের কথা উল্লেখ করেছেন। কবি বলেছেন—

আমরা তরুণ জ্ঞান-বিজ্ঞানে বড় হই যদি তবে
দেশপ্রেম বুকে সততা ও ন্যায়ে মাথা উঁচু করি সবে
আবেগে আবার জাগবে স্বদেশ জুলাই নতুন প্রেরণা
নিজের ভিতরে লুপ্ত শক্তি হেলায় ফেলায় মেরো না।

বর্ণমালাও হবে না দুখিনি সাহসীরা যদি জাগে
নতুন পতাকা তরুণের গানে উড়বে সবার আগে।

জুলাই ২৪ আন্দোলন বাংলাদেশের বিশাল দালিলিক ইতিহাস। এই কবিতায় শেষের দিকে কবি তাই পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
বাংলা কবিতায় ইতিহাস চর্চা বলতে সাধারণত কবিদের দ্বারা ইতিহাসকে কবিতার বিষয়বস্তু বা অনুপ্রেরণা হিসেবে ব্যবহার করা বোঝানো হয়। এই পরম্পরা চর্যাপদ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত বিভিন্ন রূপে বিদ্যমান। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ঐতিহাসিক ঘটনা বা চরিত্র নিয়ে লেখা, লোকগাথা ও পুরাণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরা এবং সমকালীন ঐতিহাসিক পরিস্থিতিকে কাব্যে প্রতিফলিত করা। কবিতার মাধ্যমে পাঠককে ইতিহাস সচেতন করে তোলা। কবি মনসুর আজিজ তাঁর কবিতায় অন্যান্য বিষয়ের সাথে সাথে পৌরাণিক থেকে ইতিহাসও পাঠককে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।
ইতিহাস চর্চার ঐতিহ্য হাজার বছরের পুরোনো হলেও বাংলা ভাষায় ইতিহাস চর্চার সূত্রপাত খুব বেশি দিনের নয়। ঔপনিবেশিক শাসনামলেই বাংলা ভাষায় ইতিহাস চর্চার ধারা শুরু হয়েছিল। অষ্টাদশ শতকে কলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠার পর গবেষকদের হাতে যখন ভারতবিদ্যার জ্ঞান বিস্ফোরিত হচ্ছিল, তখন থেকেই ইতিহাস চর্চার ধারা শুরু। কোম্পানির স্বার্থে লিখিত এসব বুদ্ধিজীবীর লেখনীর সূত্র ধরে বাঙালি মনীষীরাও এগিয়ে আসেন। সাহিত্যিকদের হাত ধরে বাংলা ভাষায় ইতিহাস চর্চার ধারা শুরু হয়েছিল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের হাতে। ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দে শ্রীরামপুরের প্রেস থেকে জন মার্শম্যানের বাংলায় লেখা ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’ বইটি প্রকাশিত হয়েছিল। ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দে জন ক্লার্ক ম্যার্শম্যানের ‘আউটলাইন অব দ্য হিস্ট্রি অব বেঙ্গল’ অবলম্বনে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে রচনা করেন ‘বাংলার ইতিহাস দ্বিতীয় ভাগ’। জীবনচরিত বা ‘বায়োগ্রাফি’ ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আঞ্চলিক ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রেও ঔপনিবেশিক শাসনামলে বাঙালি ইতিহাসবিদেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সতীশ চন্দ্র মিত্রের ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’, কেদারনাথ মজুমদারের ‘ময়মনসিংহের ইতিহাস’, যামিনী মোহন রায়ের ‘ঢাকার ইতিহাস’ ইত্যাদি। ব্রিটিশদের গেজেটিয়ারের আদলে বাঙালিরাই এরকমভাবে লিখতে থাকেন স্থানীয় ইতিহাস, যা আজও যেকোনো অঞ্চলের ইতিহাসের আলোচনায় অধিকাংশ ঐতিহাসিক আকরগ্রন্থ হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। ইতিহাস দর্শন ইতিহাসের মতোই পরিবর্তনশীল। নতুন চিন্তার আলোকে ইতিহাস যুগে যুগে নতুন রূপ পরিগ্রহ করে। গোটা উনিশ শতকে পজিটিভিজম ইতিহাসচর্চাকে প্রভাবিত করেছিল। ক্যামব্রিজ বা অক্সফোর্ড হিস্ট্রি চর্চার ঢেউ বাঙালি ইতিহাসবিদদের আকর্ষণ করেছিল।
বাংলা কবিতাতেও ইতিহাসের চর্চা বেশ লক্ষ্যনিয়। বরীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম থেকে বর্তমান সম-সাময়িক কবিদের কবিতায় ইতিহাসের চর্চা প্রবল। কবি মনসুর আজিজও তার ব্যতিক্রম নন। তিনি তাঁর বেশ কিছু কবিতায় ইতিহাসের বিভিন্ন বিষয় সন্নিবেশিত করেছেন তাঁর কাব্যিক ঢঙে।
কবিরা কবিতায় সময়কে ধরে রাখেন। সম-সাময়িক কালের ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা আমরা কবিতার মাধ্যমে জানতে পারি। কবি মনসুর আজিজ তাঁর ‘করতলে বৃক্ষের দাগ’ কাব্যগ্রন্থে ২০২৪-এ জুলাই আন্দোলন কে ধরে রেখেছেন পরবর্তী প্রজন্মের পাঠকদের জন্য। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো রচিত হয়েছে জুলাই-২৪ এ ঘটে যাওয়া ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলনকে ঘিরে। যে আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্র থেকে মুক্তি পায়। তিনি এই কাব্যগ্রন্থের ‘লাল সালাম’ কবিতায় উল্লেখ করেছেন—

তুমি শহীদ হয়েছো বলে আমি হয়েছি এতিম
তুমি লাশ হয়েছো বলে আমি বহন করেছি কফিন
কিন্তু বিশ্বাস করো পুত্র, কফিনের কোনো ওজন নেই আমার কাঁধে
হৃদয়টা পাথরের মতো ভারী হয়ে আছে তোমাকে হারাবার বেদনায়
জানাজার লোকেরা মনে করে তুমি মৃত
কিন্তু বিশ্বাস করো পুত্র,
আন্দোলিত পাতার মতো আমি শুনতে পাই তোমার নিঃশ্বাসের শব্দ
মানুষেরা তোমার জানাজা পড়ছে,
কিন্তু আমি দেখছি তুমি নামাজ পড়ছো আমার পাশে দাঁড়িয়ে।

বিপ্লব কতোটুকু দীর্ঘ হলে ৩৬ শে জুলাই হয়
তা বুঝতে পারে কেবলÑবন্দুকের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যুবক
শোক কতোটুকু ভারি–
তা বুঝতে পারে সন্তানের কফিনবাহী পিতা!

প্রিয় পুত্র! আমার কোনো আফসোস নেই।
একটি জাতির মুক্তির জন্য
যে সন্তান জীবন দিতে জানে
তাকে জানাই লাল ‘সালাম’।

একজন পিতার কাছে বিশ্বের সবচেয়ে ভারি বস্তু হলো সন্তানের লাশের কফিন। কিন্তু দেশ ও জাতির জন্য প্রাণ দেয়া পুত্রের শোকে শোকাহত নন একজন পিতা। জুলাই ২৪ এর গণআন্দোলনে প্রাণ হারানো পুত্রের জন্য একজন পিতা গর্বিত। কবি মনসুর আজিজ তাঁর এই কবিতায় সাহস ও উজ্জয়নী বেদনার্ত ভাষায় আবেগী পঙক্তিতে তার উল্লেখ করেছেন। এখানে দেখানো হয়েছে, এই আন্দোলনে অংশ নিয়ে একজন বীর সন্তান তাঁর জীবন দিয়েছেন। সেই সন্তানের লাশের দাফন-কাফন করা হচ্ছেÑএই সময় একজন পিতা পুত্রের শোকে মুহ্যমান থাকার কথা। কিন্তু এই সন্তানের পিতা দেশের জন্য তাঁর সন্তানের এই আত্মত্যাগকে জাতির মুক্তির জন্য উৎসর্গ করেছেন। এই আত্মত্যাগের কারণে সন্তানকে ‘লাল সালাম’ জানাচ্ছেন। এই আন্দোলনের ইতিহাস সুচারুরূপে পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন উজ্জীবিত শব্দমালায়।
কবি মনসুর আজিজ তাঁর ‘নিমগ্ন সন্ধ্যার আলো’ কাব্যগ্রন্থের ‘মানব বসতি’ কবিতায় উল্লেখ করেছেন—

কী নিতে চায় তামাটে দেহ খুলে–
লাল হৃৎপিণ্ড; নাকি নাকের সুড়ঙ্গে ঢুকে ঝাঁঝরা করে নিতে চায় অসহায় শরীর
এ কেমন বিভীষিকা ছেয়েছে পৃথিবীকে!
হালাকু, চেঙ্গিস, হিটলার, মুসোলিনী…তাদের চাইতেও ভয়ঙ্কর এ কোন যুদ্ধবাজ!
একা লড়ে যাচ্ছে পুব থেকে পশ্চিমে, উত্তর থেকে দক্ষিণে!

করোনা চিনে না ধনী ও নির্ধন, ক্ষমতা ও অর্থের পোদ্দার
যুদ্ধবাজ কিংবা সাধারণ নাগরিক…
এই ক্ষুদ্র অণুজীব সৃষ্টিকূলে চিনেছে কেবল মানুষ
আঘাতে আঘাতে  মানুষের ব্যবচ্ছেদে
গড়ে দিতে এক নতুন মানব বসতি…

২০১৯ থেকে ২০২২ পর্যন্ত সারা বিশ্বে দেখা দিয়েছিল করোনা নামের এক ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব। এই ভাইরাস ধনী-গরীব, রাজা-বাদশা কাউকে ছাড় দেয়নি। সবাই তার কাছে পরাজিত হতে বাধ্য হয়েছিল। অথচ এই অণুজীবটার আকার এতো ছোট ছিল যে তা মাইক্রোস্কোপ যন্ত্র ছাড়া দেখা যায় না। এতো ছোট অণুুজীব মানুষ জাতিকে একেবারে নাজেহাল করে ফেলেছিল। বড় বড় দাঙ্গাবাজ, যুদ্ধবাজরাও এর কাছে হার মেনেছিল। কবি মনসুর আজিজ তাঁর এই কবিতায় ঐতিহাসিক এই সময়ের কথা বর্ণনা করেছেন।
একই কাব্যগ্রন্থে দেশপ্রেম নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘এ দেশ আমার মা’ কবিতা। এই কবিতায় দেশপ্রেম ধরা দিয়েছে অন্তরঙ্গ মুগ্ধতায়। তিনি লিখেছেন—

দেশকে মা বলে জেনেছি
স্বাধীনতাকে মেনেছি মায়ের সবুজ আঁচল
মাঝখানে যার লালবৃত্ত
ওরা আমার মাকে বিবস্ত্র করলো,
ওরা আমার দেশকে ধর্ষণ করলো
  ওরা কারা,
অর্ধশত বছর পর এ কোন কাপালিক কৃপাণ হাতে নেচে উঠছে বর্বর উল্লাসে!
পিতার কবর থেকে ভেসে আসছে গোঙ্গানির শব্দ,
আমার অবশ শিরায় আবার জেগে উঠছে সাহস
বখতিয়ারের ঘোড়ার আওয়াজ কানে ভাসে
ঈশা খাঁর অসীম সাহসের ঢেউ নেচে উঠছে
বুকের উত্তাল সমুদ্রে,
  আবার কি হবে যুদ্ধ,
   আবার কি হবে সংগ্রাম!

দেশকে ভালোবেসে কবি মনসুর আজিজ তাঁর এই কবিতায় উল্লেখ করেছেন বিশ্বখ্যাত বীর ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি ও বাংলার  ঈশা খাঁর কথা। যাঁদের দেশপ্রেম আজো ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। পাঠক মনসুর আজিজের কবিতা পড়লে এরকম অসংখ্য ঐতিহাসিক ঘটনার কথার কথা জানতে পারবেন তাঁর কবিতায়।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা