জগলুল আসাদ
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আর ফিরে আসবেন না, এমনটাই মনে হচ্ছিলো । তাঁকে এখনকার প্রজন্ম খুব ভালোভাবে চেনে, এমন নয়৷ তাঁর ফিকশন নিয়েও আলোচনা নাই বললেই চলে। অথচ তিনি আমাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্পকার ও ঔপন্যাসিক। যারা ঢাবিতে ইংরেজি বিভাগে পড়েন নি, তাঁরা তাঁর নাম জেনেছেন “সংবাদ” পত্রিকায় প্রকাশিত “অলস দিনের হাওয়া” নামে বিশ্বসাহিত্য নিয়ে লেখা প্রবন্ধনিবন্ধ-এর কলাম থেকে। “অলস দিনের হাওয়া” শিরোনামটি গীতবিতান থেকে নেওয়া। আশির দশক থেকে শুরু করে একদম একবিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত বিশ বছর ধরে চলমান ছিল তাঁর এই কলাম ৷ আমরা নব্বই দশকের শেষ দিকে এই কলাম পড়েছি। ৯৭-৯৮-৯৯ সালের দিকে। আমি নিজে তাঁকে চিনেছি বিটিভিতে দেখে ও এই কলাম পাঠ করে ৷
তিনি যাদের নিয়ে লিখতেন অনেকেই পরে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ৷ একটা সময় ছিল কেউ নোবেল পুরস্কার পেলে মনজুর স্যার তাঁকে নিয়ে লিখবেন না, তা ভাবাই যেতো না ৷ ১৫/১৬ বছর আগে মনজুর স্যারের কোন এক লেখায় লিওতারের “দ্য পোস্ট মডার্ন কনডিশন” বইটার নাম প্রথম শুনেছিলাম ৷ পড়েছিলাম, কী কঠোর সাধনায় পুঁজি বইটা তিনি পড়ে শেষ করেছিলেন, সে কথা! ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক-ছাত্ররা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তত্ত্ব বিষয়ে বেশ অগ্রসর থাকে। এখনও যেসব তত্ত্বকে অন্য ডিসিপ্লিনের লোকেরা বিশাল জ্ঞান ভেবে চর্চা করে, ইংরেজি বিভাগের মোটামুটি কিসিমের শিক্ষার্থীদের কাছে সেগুলো ছিল কাণ্ডজ্ঞান, আলাদা ক’রে আলোচনা করার মতো তেমন কিছু নয়। মনজুর স্যার ও তার কিছু আগের প্রজন্মের সাহিত্যের শিক্ষকদের হাত ধরে প্র্যাকটিকাল ক্রিটিজম বা নিও ক্রিটিসিজমের ধারা বাংলাদেশে ফেরি হয়, যেটা ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা এখনও চর্চা করে। পোস্ট-মডার্নিস্ট/পোস্ট স্ট্রাকচারালিস্ট সাহিত্যতত্ত্ব ও ফিকশন নিয়ে নব্বই দশকে বা আরও আগে মনজুর স্যারেরা আলাপ করতেন, লিখতেন। সাহিত্য ও সংস্কৃতিতত্ত্ব বিষয়ে মনজুর স্যারদের বোঝাপড়াকে আমরা এখনও ছাড়িয়ে অধিক কিছু জানতে-বুঝতে পেরেছি এমন নয়। তবে, আমরা এখন অধিক দক্ষতার সাথে ওই তত্ত্বগুলো মনজুর স্যারদের চেয়েও সফলভাবে প্রয়োগ করতে সক্ষম।
তাঁর “অলস দিনের হাওয়া” বই আকারে বের হবার পর কেনা হয় নি। বইটি আর পাওয়াও যায় না এখন। তবে, “অলস দিনের হাওয়া” কলামের উল্লেখযোগ্য কিছু লেখা নিয়ে ২০১৩/১৪ সালের দিকে “লেখাজোখার কারখানা” নামে একটি বই বের হয়েছিল, বইটা কিনেছিলাম। সম্ভবত এখন এই বইটাও আউট অব প্রিন্ট। বাংলাদেশী পাঠকরা ভিনদেশি নতুন নতুন লেখকের সাথে পরিচয় হয়েছিলেন মনজুর স্যারের সুবাদে। বিটিভিতে নব্বইয়ের দশকে “বিশ্বনাটক” বলে একটা অনুষ্ঠান হতো। সেই অনুষ্ঠান আমি দেখতাম, ফাইভ বা সিক্সে পড়ি তখন সম্ভবত। বিশ্বনাটক অনুষ্ঠানটি উপস্থাপন করতেন সাইদ আহমেদ, সেই অনুষ্ঠানে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামও আসতেন। সম্ভবত সেই অনুষ্ঠানেই প্রথম আমি স্যামুয়েল বেকেটের নাম শুনি মনজুর স্যারের মুখ থেকে। বিশ্বনাটক অনুষ্ঠানটি বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে জানাবোঝার দারুণ এক সুযোগ ছিল। এই মাপের অনুষ্ঠান এরপর আর হয়েছে কি-না জানা নাই। “অলস দিনের হাওয়া”র মতো এমন কলামও সম্ভবত আর কেউ লেখেন নি। তাঁর যে বইটি আমার পছন্দ হয় নাই, সেটা এক ছোট বই, নাম “নন্দনতত্ত্ব”। হয়তো খুব প্রাথমিক পরিচিতিমূলক বই বলেই ভালো লাগে নি। তাও পড়েছি ১২/১৩ বছর আগে৷ নতুন সংস্করণও হয়তো বের হয়েছিল এটার৷
সম্ভবত মনজুর স্যার তাঁর ফিকশনের নেরেটিভ টেকনিকের জন্যে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। স্বাধীনতা-উত্তর কালে এতো বৈচিত্র্যপূর্ণভাবে আধুনিক-উত্তরাধুনিক বয়ান-পদ্ধতি মেনে আর কেউ নাগরিক জীবনের বিবিধ জটিলসম্পর্কসূত্রকে এতো দক্ষতায় ফিকশনে তুলে এনেছেন কি-না জানি না। তিনি আমাদের অন্যতম প্রধান কথাসাহিত্যিক।
তাঁর প্রকাশ্য রাজনীতিচিন্তা খুব পরিপক্ক ছিল বলে মনে হয় না। গড়পড়তা বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের মতোই ছিলেন বলে মনে হয়। আর, অধ্যাপক, সাহিত্য সমালোচক, সাহিত্যতাত্ত্বিক ছাড়াও বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান চিত্রসমালোচকও ছিলেন তিনি। তাঁর বইগুলো আবার হয়তো ঘাঁটবো কয়েকদিন। তখন তাঁর সম্পর্কে নতুন বিবেচনা-পুনর্বিবেচনা হাজির করা যাবে।
স্যারের অসুস্থতা ও মৃত্যুর খবর খুব ব্যথিত করলো। খুব নি:সঙ্গ জীবন ছিল তাঁর। তাঁর কাছের মানুষগণ এগুলো নিয়ে লিখবেন হয়তো, তাঁর সরাসরি শিক্ষার্থীগণও লিখবেন । অন্তত তাঁর ফিকশন, যেটা তাঁর লেখালেখির প্রধান এলাকা, নিয়ে আলোচনা হোক এখন। মরণ না এলে আমরা যে কারো মূল্য দেই না, মূল্য বুঝি না!







