প্রচ্ছদসাম্প্রতিকসাম্প্রতিক ভাবনা

লিখেছেন : আমান আবদুহু

সাম্প্রতিক ভাবনা


আমান আবদুহু

হিটলার যখন যুদ্ধে হেরে গেলো, ইমিডিয়েটলি জার্মান আর্মির কিছু জেনারেল, কিছু ভাড়াটে বুদ্ধিজীবী, দেশপ্রেমিক সম্ভ্রান্ত ধর্মপরায়ণ রাজনৈতিক লোকজন এবং ‘ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট’রা সকলে মিলে একটা ন্যারেটিভ নিয়ে কাজে নেমে পড়লো। এ থিওরির নাম ছিলো “ক্লিন ভে’মাখ্ট”। অর্থ্যাৎ, পরিস্কার বা নিষ্পাপ সামরিক বাহিনী। তারা বুঝাতে চেষ্টা করলো হিটলার খুব খারাপ ছিলো। তার নাৎসি বাহিনী খারাপ ছিলো। শুটসস্টাফেল (এসএস), বিশেষ করে ওয়াফেন এসএস আরো বেশি খারাপ ছিলো কিন্তু আসলে ভেতরে ভেতরে সেনা, নৌ এবং বিমান বাহিনী ছিলো ভালো। তারা বাধ্য হয়ে বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ করতে গিয়ে কিছু খারাপ কাজ করেছে বটে। কিন্তু তারা আসলে দেশপ্রেমিক বাহিনী।

এইটা ছিলো এই ক্লিন ভেমাখট বয়ানের মূল কথা।

জার্মান ভাষায় ভেমাখট (ভে এর পরে এবং মা এর আগে প্রায় শোনা যায়না এমনভাবে একটা র উচ্চারণ হবে) মানে হলো সামরিক বাহিনী। ইনস্টিটিউশনালাইজড সেনা, নৌ এবং বিমান বাহিনীকে এক সাথে এই শব্দ দিয়ে ডাকে। আমরা যেমন বলি সামরিক বাহিনী। এর বাইরে হিটলার তার বিশেষ বাহিনী তৈরি করেছিলো। যাদের ক্ষমতা ছিলো অপরিসীম। তারা হলো এসএস। বাংলাদেশের র‍্যাব যেমন।

জার্মান আর্মির যুদ্ধনীতি ছিলো পোড়ামাটি। কনভেনশনাল যুদ্ধের বদলে তারা সব কিছু ধ্বংস করে দেয়া এবং নির্বিচারে সিভিলিয়ান হত্যা ও ধর্ষণ করতো। সব ধরণের মানবতাবিরোধী অপরাধই ছিলো তাদের যৌদ্ধকৌশল। এ যুদ্ধে এক কোটি সত্তর লাখের মতো ভেমাখট সদস্য অংশ নেয়। তাদেরকে পরিচালনা করতো এসএস। যুদ্ধে অংশ নেয়া এসএস সদস্য সংখ্যা প্রায় দশ লক্ষ।

জার্মান শাহবাগিদের প্রচারিত ক্লিন ভেমাখট থিওরি খুব বেশি একটা হালে পানি পায় নাই। এটা ঠিক যে সমস্ত অন্যায় কাজের সিদ্ধান্ত নিতো এবং পরিচালনা করতো এসএস। কিন্তু এটাও ঠিক যে তাদের সমস্ত আদেশ বাস্তবায়ন করতো ভেমাখট। প্রতিটা যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক বাহিনী এসএস বাহিনীর আদেশ মেনে এবং এসএস এর নেতৃত্বে সব কাজ করতো। সুতরাং যুদ্ধ শেষে পুরো জার্মান মিলিটারিকে ডিসম্যান্টল করা হয়। ক্লিন ভেমাখট যারা প্রচার করতে চেষ্টা করেছিলো তাদেরও চাকরি টিকে নাই। পরবর্তীতে সম্পূর্ণ জার্মান সেনাবাহিনী নতুন করে পূণর্গঠন করা হয়।

যে কোন মিথ্যা কথারও গোড়ায় কিছু সত্য থাকে। যে কোন শয়তানির গোড়াতে গেলে দেখা যায় কিছু ভালো বা সঠিক বা সত্য বিষয়কে ঐ শয়তানিটা ব্যবহার করেছে নিজের ভিত্তিস্থাপনের জন্য। যেমন বাংলাদেশে ত্রিশ লাখ শহীদের গল্প বা মুক্তিযুদ্ধ ইন্ডাস্ট্রির ফা*ফাকির গোড়ায় পাকিস্তানী বাহিনীর পোড়ামাটি নীতি এবং জুলুম-নির্যাতনের অস্তিত্ব আছে। ক্লিন ভেমাখট থিওরিরও এমন কিছু ভিত্তি ছিলো।

জার্মান সেনাবাহিনীর খুবই ক্ষুদ্র একটা অংশ, অল্প কিছু জেনারেল এবং উচ্চপদস্থ অফিসার কখনোই হিটলারের নাৎসি নীতির সাথে একমত হয়নি। তাদের ভেতর মানবতাবোধ ছিলো, জার্মান প্রাইড ছিলো যেইটাকে নাৎসি পারভার্শনের সাথে তারা রিকনসাইল করতে পারে নাই। এমন কিছু আর্মি অফিসার এমন কি হিটলারকে শেষ করে দেয়ারও চেষ্টা করেছিলো। টম ক্রুজের সিনেমার কারণে অপারেশন ভালকেরির কথা সবাই জানে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একজন কর্ণেল ক্লাউস স্টাউফেনবার্গের কারণে অন্য অপরাধী জেনারেলদের দায়মুক্তি পাওয়ার সুযোগ নাই। আমাদেরও তো মেজর জিয়া আছে, মেজর শাফায়াত আছে, কর্ণেল মুস্তাফিজ আছে যারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নানাভাবে দাঁড়িয়েছেন, তারা যেহেতু আর্মির লোক তাই বলে কি জল্লাদ ও মানুষখেকো মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানরা দায়মুক্তি পেয়ে যাবে?

আমরা এক দিক থেকে ভাগ্যবান, আমাদেরকে এখনো যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি। কিন্তু ভবিষ্যতে যেতে হবে না, এমন নিশ্চয়তা নাই। ভারত তার সব রকমের চেষ্টাই করে যাবে।

সুতরাং এখনো যেহেতু বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা সম্মিলিতভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধমূলক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করে নাই, তাদের যেইসব অফিসাররা এই ধরণের কাজে অংশ নিয়েছে এবং নেতৃত্ব দিয়েছে, তাদেরকে তাদের অপরাধের শাস্তি দেয়াটা হলো বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর নৈতিকতা এবং অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ভবিষ্যত যুদ্ধ এড়ানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই কাজটা হতে না দেয়ার জন্য দেশের ভেতরে ও বাইরে সম্ভাব্য সব ধরণের প্রচেষ্টাই হবে। এই যে গ্রেফতারি পরোয়ানা ঘোষণা হলো, এতটুকু আশাও তো আসলে ছিলো না। দাবী ছিলো, কারণ আমাদেরকে দাবীটুকু ধরে রাখতেই হবে। পাশাপাশি ধারণা ছিলো অন্য অনেক কিছুর মতো বাংলাদেশে মন্দই জয়ী হবে। কিন্তু ট্রাইবুনাল ওয়ান ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার আমলে গুমের অপরাধের কারণে বিভিন্ন ক্রিমিনাল জেনারেল, বিগ্রেডিয়ার জেনারেল, কর্ণেল এবং ল্যাফটেনেন্ট কর্ণেলদের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করতে সক্ষম হয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এটা একটা বিরল ঘটনা।

বাংলাদেশের ইতিহাস এবং বাস্তবতা হলো ক্ষমতাবান ও শক্তিশালী অপরাধীরা খুব সহজে সবসময় নিস্তার পেয়ে যায়। তাদের সামাজিক মর্যাদা এবং অবস্থান পর্যন্ত অটুট থাকে, এতোটাই কদর্য ও নিকৃষ্ট আমাদের দেশ ও সমাজ। কিন্তু কদাচিত, খুব কদাচিত এইরকম ঘটনাগুলো আমাদেরকে আশা জোগায়। মনে হয় হয়তো কোনদিন এইটা স্বাভাবিক ও সুস্থ মানুষের একটা সমাজ হয়ে উঠতে পারে।

পরিহাসের বিষয় হলো শেখ হাসিনার রেখে যাওয়া জল্লাদ ও ন্যায়ভ্রষ্ট ট্রাইবুনালের কাছে ভালো কিছুর প্রত্যাশা ছিলো না। কিন্তু তারাই শেষ পর্যন্ত পেরেছে ফ্যাসিবাদের মুখে এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় থাপ্পড়টা বসিয়ে দিতে। অন্যদিকে হাসিনা ও তার সামরিক বেসামরিক পান্ডাদের হাতে যারা বেশি নির্যাতিত ছিলো, তারা এখন আপোষকামী। হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে তারা নিমুরোদ আনসালিদের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ এখন গুরুত্বপূর্ণ একটা সময় অতিক্রম করছে। এটা প্রকৃতপক্ষেই সংবেদনশীল এবং সুক্ষ্ম একটা বিষয় এবং ঘটনা। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি কেবলমাত্র প্রথম ধাপ। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া এখনো বাকিই পড়ে আছে। এইসব বড় বড় জেনারেল, যারা নিজেদেরকে এই দেশের মালিক মনে করে এবং এই দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষও যাদেরকে নিজেদের মালিক হিসেবে বিশ্বাস করে, এদেরকে কাঠগড়ায় তোলা গেলে এবং যথাযথ ন্যায়বিচার করতে পারলে, এইটা হবে আমাদের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার রক্ষাকবচ সেনাবাহিনীকে তার যথাযথ মর্যাদা ও আসনে পুনঃস্থাপিত করার পথে বড় একটা পদক্ষেপ। এই ডেলিকেট প্রসেসের মধ্যে তথাকথিত ভাবমূর্তি বা ‘ক্লিন ভে’মাখট’ মার্কা বয়ান নয়, বরং সত্য এবং ন্যায় হলো একমাত্র মুক্তির উপায়।

বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে যেমন সংস্কার এবং পরিস্কার করতে হবে, কারণ এই সেনাবাহিনী ক্লিন না, থাকতে পারে নাই বা হাসিনা থাকতে দেয় নাই, তেমনি বাংলাদেশের ওয়াফেন এসএস র‍্যাবকেও ডিসম্যান্টল করতে হবে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষমতাবান লোকদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কোন প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের জন্য দরকারী, এবং কোন প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের জন্য বোঝা। কার অপরাধ আসলেই কতটুকু।

সেনাবাহিনী এবং অন্যান্য আরো অনেক প্রতিষ্ঠান যেমন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা/ডিজিএফআই যেমন বাংলাদেশের প্রয়োজন, এইসব প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করার কোন সুযোগ নাই, আমাদের অস্তিত্বের স্বার্থেই, একই সাথে এইসব প্রতিষ্ঠানকে যারা কম্প্রোমাইজ করেছে তারাও এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করে না। বরং গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ এসব প্রতিষ্ঠানের সুবিধা ব্যবহার করেও এসব জেনারেলরা ভয়াবহ অপরাধ করেছে। ক্রিমিনাল জেনারেলদের অপরাধ কেবল গুমেই সীমাবদ্ধ না। গুমের অপরাধে বেসামরিক আদালতে শাস্তির পাশাপাশি শপথ ভঙ্গের অপরাধে সামরিক আদালতেও এদের বিচার হওয়া দরকার। সামরিক আদালতে ন্যায়বিচার হলে সম্ভবত ফায়ারিং স্কোয়াড হবে এদের যথাযথ প্রাপ্য শাস্তি।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা