প্রচ্ছদসাম্প্রতিকআবরার ফাহাদ : ঘটনা ও পরিচিতি

লিখেছেন : তাজ ইসলাম

আবরার ফাহাদ : ঘটনা ও পরিচিতি


তাজ ইসলাম

আওয়ামী দুঃশাসনের নির্মমতায় প্রাণ হারান মেধাবী ছাত্র আবরার।

২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর বুয়েটের শেরেবাংলা হলের আবাসিক ছাত্র ও তড়িৎ কৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করেন বুয়েট ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী।

শিবির সন্দেহে তাকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে মেরেছে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। আবরার হত্যাকাণ্ডে বুয়েট ছাত্রলীগের ১৯ জন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে ।

আবরার ফাহাদ ১৯৯৮ সালে ১২ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহণ করেছেন। তার গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায়। বাবার নাম মো. বরকত উল্লাহ এবং মায়ের নাম রোকেয়া খাতুন। তিনি কুষ্টিয়া মিশন প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা এবং পরে কুষ্টিয়া জেলা স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে তিনি নটরডেম কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করেছেন। ২০১৮ সালের ৩১ মার্চ আবরার বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিক প্রকৌশল বিভাগে পড়াশোনা শুরু করেছিলেন।

আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ ব্র্যাকে অডিটর এবং মা রোকেয়া খাতুন কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক ছিলেন। আবরার দুই ভাইয়ের মধ্যে বড় ছিল, তার ছোট ভাই আবরার ফায়াজ কুষ্টিয়া সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হন। তিনিও পরবর্তীতে বুয়েটে চান্স পেয়েছিলেন ।

আওয়ামী দুঃশাসনের সময় মানুষ ছিল অবরুদ্ধ। বাক স্বাধীনতা ছিল নিষিদ্ধ। তখনকার সময়ই আবরার কথা বলছিলেন সোশ্যালমিডিয়ায়। আবরার হয়তো ভেবেছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কথায় সরকার এতো প্রতিক্রিয়া দেখাবে না। কোথাও যে নিরাপত্তা নাই আবরার তা উপলব্ধি করতে পারেননি।তিনি দেশের পক্ষে কথা বলেছিলেন।
এই কথা বলাই কাল হল তার।

আবরারের সহপাঠীরা ধারণা থেকে বলেন আবরার সম্ভবত ফেসবুকে লেখার জন্যই নিহত হয়েছিলেন।

ফেসবুক স্ট্যাটাসে, নিহত আবরার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চার দিনের সরকারি সফরের সময় দ্বিপাক্ষিক দলিল স্বাক্ষরের সমালোচনা করেছিলেন।

তার ফেসবুক পোস্টে ভারতকে মংলা বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া, ফেনী নদী থেকে পানি প্রত্যাহার এবং বাংলাদেশ থেকে এলপিজি আমদানি করার বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।

তার স্ট্যাটাসটি হচ্ছে:

“ ১৯৪৭ এ দেশভাগের পর দেশের পশ্চিমাংশেে কোন সমুদ্রবন্দর ছিল না। তৎকালীন সরকার ৬ মাসের জন্য কলকাতা বন্দর ব্যবহারের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ করল। কিন্তু দাদারা নিজেদের রাস্তা নিজেদের মাপার পরামর্শ দিছিলো। বাধ্য হয়ে দুর্ভিক্ষ দমনে উদ্বোধনের আগেই মংলা বন্দর খুলে দেওয়া হয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ ইন্ডিয়াকে সে মংলা বন্দর ব্যবহারের জন্য হাত পাততে হচ্ছে।

২. কাবেরি নদীর পানি ছাড়াছাড়ি নিয়ে কানাড়ি আর তামিলদের কামড়াকামড়ি কয়েকবছর আগে শিরোনাম হয়েছিল। যে দেশের এক রাজ্যই অন্যকে পানি দিতে চাই না সেখানে আমরা বিনিময় ছাড়া দিনে দেড়লাখ কিউবিক মিটার পানি দিব।

৩. কয়েকবছর আগে নিজেদের সম্পদ রক্ষার দোহাই দিয়ে উত্তরভারত কয়লা-পাথর রপ্তানি বন্ধ করেছে অথচ আমরা তাদের গ্যাস দিব। যেখানে গ্যাসের অভাবে নিজেদের কারখানা বন্ধ করা লাগে সেখানে নিজের সম্পদ দিয়ে বন্ধুর বাতি জ্বালাব।

হয়তো এসুখের খোঁজেই কবি লিখেছেন–

“পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মত সুখ কোথাও কি আছে
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।”

এই স্ট্যাটাসের পরই নেমে আসে তার উপর নির্যাতনের নির্মমতা।

৬ অক্টোবর ২০১৯
রাত ৮.১৩।
বুয়েট শেরেবাংলা হলের ১০১১ নাম্বার কক্ষে ঘুমাচ্ছিলো আবরার। একই ব্যাচের তানিমসহ তিনজন এসে তাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে।
তারা এসে বলে
‘বড় ভাইয়েরা তোকে ডাকছে। ২০১১ তে আয়।’

২০১১ তেই তাকে শেষ পর্যন্ত পিটিয়ে হত্যা হয়।

বুয়েটের EEE বিভাগে ২০১৮ সালে ভর্তি হওয়া আবরারের পূর্ণ নাম আবরার ফাহাদ রাব্বি। অসাধারণ মেধাবী ছাত্র। ঢাবি ‘ক ইউনিট’ ভর্তি পরীক্ষায় ১৩ তম হয়েছিলো। চান্স পেয়েছিলো ঢাকা মেডিকেলেও। তার লক্ষ ছিল ইঞ্জিনিয়ার হবে।ভর্তি হল তাই বুয়েটে।

বড় ভাই নামক আওয়ামী ছাত্রলীগের গুণ্ডাদের ডাকে ২০১১ নাম্বার রুমে যান আবরার।

পূর্ব থেকে অবস্থানরত বা অপেক্ষারত ছাত্রলীগের গুণ্ডাদের চোখে আবরারের অপরাধ গুরুতর।

সে স্ট্যাটাস দিয়েছে
ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে।

আবরারেরই রুমমেট মিজান।তার সন্দেহ, “আবরার শিবির করে।”
শিবিরকে শায়েস্তা করার জন্যই বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের আজ এই আয়োজন।

কক্ষে ঢোকার পরই আবরারের মোবাইল, ল্যাপটপ তারা নিজেদের কব্জায় নিয়ে যায়। তারা তার সমস্ত এক্টিভিটি চেক করে।

তেমন কোন প্রমাণ না পেয়ে রুমে থাকা রবিন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
আবরারকে হুকুম করে চশমা খুলতে।

চশমা খোলার পর রবিন প্রচন্ড জোরে তার গালে কয়েকটি চড় মারে। হাত দিয়ে গাল চেপে বসে পড়ে আবরার। তারপর বৃদ্ধি পেতে থাকে নির্যাতনের নির্মমতা।

মোরশেদ কাঠের তৈরি শক্ত ক্রিকেট স্ট্যাম্প নিয়ে আসে। ইফতিও রবিনের মতো গায়ের জোরে থাপ্পড় মারতে থাকে।

ক্রিকেট স্ট্যাম্প দিয়ে আঘাত করতে থাকে সর্বাঙ্গে। আবরারের
পিঠ, পা, পায়ের তালুসহ সারা শরীর আঘাতে জর্জরিত হয়।
মারতে মারতে স্ট্যাম্প ভেঙে দুই টুকরা হয়ে যায়।
আবরার জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে। তার আর্তচিৎকারে কেউ এগিয়ে আসেনি। উপরন্ত ছাত্রলীগের ভয়ে অন্যরা সব রুমের জানালা বন্ধ করে রাখে।
এহতেসামুল, রাব্বি ও তানিম আরেকটি নতুন স্ট্যাম্প নিয়ে আসে।
স্ট্যাম্প হাতে এগিয়ে আসে অনিক। আবরারের নিস্তেজ দেহেই সে উপর্যুপরি আঘাত করতে থাকে। আঘাত করতে করতে অনিক নিজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
মেঝেতে পড়ে আবরারের শরীর কাতরাতে থাকে। মৃতপ্রায় দেহে মুজাহিদ ও শামিম স্কিপিং রোপ (মোটা দড়ি) দিয়ে আঘাত করে।

আবরার বাঁচার জন্য আকুতি-মিনতি করে কোন দয়া পায়নি।
কারো মন গলেনি। অমানুষরা আরও পশু হয়ে ওঠে।

অনিকের হাত থেকে ক্রিকেট স্ট্যাম্প নেয় জিয়ন।
এবার মারতে থাকে জিয়ন।
রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত তাকে পালা করে মারতে থাকে।

রাত এগারোটায় ২০১১ নাম্বার কক্ষে এসে হাজির হয় এস এম মাহমুদ সেতু।

সেতু এসে হুকুম করে
‘মারতে থাক’।

সেতুর নির্দেশে ক্রিকেট স্ট্যাম্প, স্কিপিং রোপ দিয়ে আবারও মারা শুরু হয়। আবরারকে নির্যাতনকারী দলে ছিল
তাবাখখারুল, নাজমুস সাদাত, তানিম, জেমি।
প্রচন্ড নির্যাতনে মুমূর্ষু আবরার তখন বমি ও প্রস্রাব করে ফেলে। ব্যথায় চিৎকার করার মতো শক্তিও অবশিষ্ট নেই। বাঁচার জন্য ইশারা-ইঙ্গিতে কাকুতি-মিনতি করে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয়। শ্বাসকষ্ট দেখে ইফতি আবরারের মাথার নীচে বালিশ দেয়। পরপর আরো কয়েকবার বমি করে আববার। তাকে এবার নেওয়া হয় ২০০৫ নাম্বার রুমে। ওখানে আরেক দফা নির্যাতন করার পর আবরারের অবস্থা খুবই খারাপ পর্যায়ে চলে যায়।

রাত দুইটায় সিদ্ধান্ত হয় আবরারকে হল থেকে বের করে পুলিশে দেওয়া হবে।
চকবাজার থানা পুলিশকে ফোন দেয় মেহেদী। বলা হয় শিবির ধরা পড়েছে।

” চকবাজার থানা পুলিশ একটা টহল দল পাঠায় শেরে বাংলা হলের গেইটে। কিন্তু দেরী হওয়ায় গেইট থেকে পুলিশকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

ইফতি, মুজাহিদ, তাবাখখারুল ও তোহারা
আবরারের নিশ্চল দেহ হলের দোতলার সিঁড়িতে এনে রাখে। ততক্ষণে আবরার পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যায় অনন্তের পথে।
আবরারের খালি গায়ে তখন স্পষ্ট কালো কালো দাগ। সারা শরীরে স্ট্যাম্পের বাড়ির কারণে কালশিটে পড়ে আছে।
খুনীরা সিদ্ধান্ত নেয় আবরারের লাশ গুম করে ফেলা হবে। কিন্তু ততক্ষণে কিছু শিক্ষার্থী দেখে ফেলায় তা আর সম্ভব হয়নি।তারা গণপিটুনিতে মারা গেছে,মাদকের অপপ্রচার করতেও চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত সারাদেশের মানুষ জেনে যায় ছাত্রলীগের নৃশংসতার কথা। দেশ বিদেশে তীব্র প্রতিবাদ হয়।

৭ অক্টোবর ২০১৯। ভোরের আলো ফোটার আগেই বুয়েটের শিক্ষার্থীরা উপহার পায় এক সতেজ তাজা লাশ। পাঁচ ঘন্টা অমানুষিক নির্যাতনে একটা তরতাজা মেধাবী সন্তান লাশ হয়ে নিথর পড়ে রইল।

পরদিন এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল্লাহ চকবাজার থানায় একটি মামলা করেন। সেখানে অভিযোগ করা হয়, শিবির সন্দেহে তাকে ডেকে নিয়ে পিটিয়ে মেরেছে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। সেখানে বুয়েট ছাত্রলীগের ১৯ জন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়। অজ্ঞাত ছিল আরও। তদন্তে যুক্ত হয় আরও কিছু নাম।

মামলার তদন্তের পর ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা বলেছিলেন, আসামিরা র‍্যাগিংয়ের নামে বুয়েটে আতঙ্ক বা একটা ভয়ের রাজত্ব কায়েম করেছিল, তার ধারাবাহিকতায় একাধিক কারণে নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে।

দুই বছর পর (৮ ডিসেম্বর ২০২১)আবরার হত্যা মামলার রায় দেওয়া হয়। রায়ে ২০ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ৫ জনের যাবজ্জীবনের আদেশ দিয়েছেন আদালত। বুধবার (৮ ডিসেম্বর ২০২১) দুপুরে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক আবু জাফর মো. কামরুজ্জামানের আদালত এ রায় ঘোষণা করেন।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা