প্রচ্ছদপ্রবন্ধপদাধিকারী বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণির নন্দনতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সংকট

লিখেছেন : আবু জুবায়ের

পদাধিকারী বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণির নন্দনতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সংকট


আবু জুবায়ের

সৃজনশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মধ্যকার সম্পর্কটি মানব সভ্যতার ইতিহাসে সর্বদাই এক অমীমাংসিত সমীকরণের মতো বিরাজমান। শিল্পের স্বকীয়তা এবং ক্ষমতার আধিপত্য এই দুই মেরুর টানাপোড়েন কেবল শৈল্পিক উৎকর্ষের প্রশ্ন নয় এটি একটি গভীর সত্তাতাত্ত্বিক (Ontological) সংকট। যখন কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় পদের ক্ষমতাবলে নিজেকে কবি, সাংবাদিক বা শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস পান, তখন সেখানে সৃজনশীলতার মৌলিক সংজ্ঞাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। পদাধিকার এবং প্রজ্ঞা এই দুইয়ের মধ্যে যে দুর্লঙ্ঘ্য ব্যবধান রয়েছে, তা অনুধাবনে ব্যর্থ হওয়াই সমকালীন বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অবক্ষয়ের অন্যতম প্রধান কারণ। রাষ্ট্রীয় অনুশাসন বা প্রশাসনিক আদেশ কোনো ব্যক্তিকে ‘সৃজনশীল’ হিসেবে ঘোষণা করতে পারে, কিন্তু তা সেই ব্যক্তির সৃষ্টিকর্মের প্রতি জনমানসে কোনো শৈল্পিক আবেদন বা নন্দনতাত্ত্বিক বৈধতা তৈরি করতে সক্ষম হয় না । এটি এক প্রকার নন্দনতাত্ত্বিক কুহক, যেখানে ক্ষমতার দাপটকে মেধার বিকল্প হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়।

নিকোলো মেকিয়াভেলি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য প্রিন্স’-এ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার রক্ষণাবেক্ষণ এবং সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিলেও, সেখানে নৈতিক বা শৈল্পিক উৎকর্ষের কোনো স্বতন্ত্র স্থান ছিল না। মেকিয়াভেলির মতে, ক্ষমতার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখা । যখন কোনো রাষ্ট্রযন্ত্র কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ‘বিশিষ্ট শিল্পী’ বা ‘কবি’ হিসেবে উপাধি প্রদান করে, তখন তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিল্পের উৎকর্ষ সাধনের জন্য নয়, বরং রাষ্ট্রের নিজস্ব বয়ান বা ‘ন্যারেটিভ’ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই প্রক্রিয়াটিকে পিয়েরে বোর্দিও ‘প্রতীকী মূলধন’ (Symbolic Capital) অর্জনের একটি বিকৃত চেষ্টা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন । রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা বা পুরস্কারের মাধ্যমে যে প্রতীকী শক্তি অর্জিত হয়, তা যদি সেই ব্যক্তির প্রকৃত মেধা বা সৃজনশীলতার সাথে সংগতিপূর্ণ না হয়, তবে তা এক প্রকার ‘প্রতীকী সহিংসতা’ (Symbolic Violence) হিসেবে আবির্ভূত হয় । বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রবণতাটি গত কয়েক দশকে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পদাধিকার বলে কবি বা সাংবাদিক হওয়ার যে অপসংস্কৃতি, তা কেবল ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফল নয়, বরং এর সাথে জড়িত রয়েছে এক গভীর আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক জটিলতা। যখন রাষ্ট্র কোনো অযোগ্য ব্যক্তিকে সংস্কৃতির ধারক হিসেবে তুলে ধরে, তখন সাধারণ মানুষের কাছে সেই ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে না, বরং রাষ্ট্রের নিজস্ব ভাবমূর্তিই সংকটাপন্ন হয়।কেবল সাহিত্যিক বা শিল্পীর জন্য বিড়ম্বনা নয়, রাষ্ট্রের জন্য এক দীর্ঘমেয়াদী অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায় ।

ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বোর্দিও তাঁর সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বে ‘পুঁজি’ শব্দটিকে কেবল অর্থনৈতিক অর্থে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি সাংস্কৃতিক পুঁজি (Cultural Capital), সামাজিক পুঁজি (Social Capital) এবং প্রতীকী পুঁজি (Symbolic Capital)-এর ধারণা প্রবর্তন করেন । প্রতীকী পুঁজি হলো এমন এক ধরনের মর্যাদা বা সম্মান যা সমাজ কোনো ব্যক্তিকে প্রদান করে। যখন কোনো লেখক বা শিল্পী তাঁর কাজের মাধ্যমে পাঠকদের হৃদয়ে স্থান করে নেন, তখন তিনি এক ধরনের প্রতীকী পুঁজি অর্জন করেন যা রাষ্ট্রের যে কোনো পদমর্যাদার চেয়ে শক্তিশালী । তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে এই প্রতীকী পুঁজি ‘উৎপাদন’ করার একটি ব্যর্থ চেষ্টা চলছে। সরকার যখন কোনো আমলা বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে তাঁর পদাধিকারের কারণে বিশেষ সম্মান বা পুরস্কার প্রদান করে, তখন তারা মনে করে যে এর ফলে সেই ব্যক্তি একটি শৈল্পিক বৈধতা লাভ করবেন। বোর্দিওর তত্ত্বে একে বলা হয় ‘মিসরিকগনিশন’ (Misrecognition) অর্থাৎ এমন এক ধরনের সামাজিক প্রক্রিয়া যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহারকে বৈধতা হিসেবে ভুল করা হয় ।

জনমানসে এই প্রক্রিয়াটি সফল হয় না কারণ মানুষের কাছে শিল্পীর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয় তাঁর ‘হ্যাবিটাস’ (Habitus) বা দীর্ঘদিনের চর্চার মাধ্যমে অর্জিত শৈল্পিক রুচির দ্বারা, রাষ্ট্রের কলমের খোঁচায় নয় । রাষ্ট্রীয় পদাধিকারী ব্যক্তি এবং স্বতঃস্ফূর্ত শিল্পীর মধ্যে এক গভীর চারিত্রিক বৈপরীত্য বিদ্যমান। যেখানে রাষ্ট্রীয় পদাধিকারীর ক্ষমতার উৎস হলো প্রশাসনিক আদেশ, সরকারি গেজেট ও রাজনৈতিক আনুকূল্য , সেখানে স্বতঃস্ফূর্ত শিল্পীর ভিত্তি হলো ব্যক্তিগত মেধা, নিরন্তর সাধনা ও জনমানসের প্রীতি । পদাধিকারী ব্যক্তিরা প্রায়শই কৃত্রিম প্রতীকী পুঁজি ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার ওপর নির্ভর করেন , কিন্তু প্রকৃত শিল্পীরা অর্জন করেন দীর্ঘমেয়াদী বুদ্ধিবৃত্তিক সম্মান । প্রশাসনিক বৈধতা আইনি কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেও , নন্দনতাত্ত্বিক গ্রহণযোগ্যতা কেবল জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত স্বীকৃতির মাধ্যমেই সম্ভব । সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা হলো, এই পদাধিকারী লেখকদের অস্তিত্ব সরকারের পরিবর্তনের সাথে সাথে বিলীন হয়ে যাওয়ার বা বিব্ররত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে , অন্যদিকে প্রকৃত শিল্পীরা মহাকালের বিচারে এবং ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় অক্ষয় হয়ে থাকেন । রাষ্ট্রের জবরদস্তিমূলক প্রভাব প্রায়শই সীমাবদ্ধ এবং উপহাসের পাত্র হিসেবে আবির্ভূত হয় , অথচ অকৃত্রিম শিল্প অনুপ্রেরণামূলক এবং আত্মার মুক্তির সহায়ক হিসেবে কাজ করে । যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন বাংলা একাডেমি বা শিল্পকলা একাডেমি প্রকৃত সৃজনশীলদের বাদ দিয়ে কেবল পদস্থ কর্মকর্তাদের বা রাজনৈতিক অনুগতদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে, তখন এই সংকট আরও ঘনীভূত হয় ।

শিল্পে রাষ্ট্রীয় বা ব্যক্তিগত পৃষ্ঠপোষকতার ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন এবং বৈচিত্র্যময়। প্রাচীন মিশরের ফারাও থেকে শুরু করে রেনেসাঁ যুগের ফ্লোরেন্সের মেদিচি পরিবার বা ফরাসি সম্রাট চতুর্দশ লুই শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন । তবে সেই পৃষ্ঠপোষকতার একটি মূল শর্ত ছিল শিল্পীর নিজস্ব প্রতিভা। মেদিচিরা যখন মাইকেলেঞ্জেলো বা লিওনার্দো দা ভিঞ্চিকে সমর্থন দিয়েছেন, তখন তারা শিল্পীদের প্রতিভা তৈরিতে হাত দেননি, বরং তাদের প্রতিভার বিকাশে আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন । এখানে পৃষ্ঠপোষকতা প্রতিভার পরিপূরক ছিল, কিন্তু স্রষ্টা ছিলেন শিল্পী নিজে। আধুনিক বাংলাদেশে এই ধারণাটি উল্টে গেছে; এখানে রাষ্ট্র নিজেই প্রতিভা ‘তৈরি’ করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।

সময়ের বিবর্তনে পৃষ্ঠপোষকতার ধরণ এবং সৃজনশীলতার স্বাধীনতার মধ্যে নেতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। প্রাচীন ও মধ্যযুগে সম্রাট বা রাজারা রাজকীয় অনুজ্ঞার মাধ্যমে পৃষ্ঠপোষকতা করলেও তা প্রতিভার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল ছিল, যার ফলে কালজয়ী স্থাপত্য ও ধ্রুপদী সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব হয়েছিল । রেনেসাঁ যুগে মেদিচি বা অন্যান্য অভিজাত পরিবারের ব্যক্তিগত অর্থায়ন শিল্পীকে ব্যাপক স্বাধীনতা ও উচ্চ মর্যাদা প্রদান করেছিল, যা আধুনিক শিল্পের জন্ম দেয় । কিন্তু বিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে, বিশেষ করে সামরিক শাসন বা একদলীয় ব্যবস্থার অধীনে, এই পৃষ্ঠপোষকতা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত ও তোষামোদনির্ভর হয়ে পড়ে । এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে ফরমায়েশি সাহিত্য এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অবক্ষয়। সমকালীন প্রেক্ষাপটে আমলাতান্ত্রিক বা দলীয় পৃষ্ঠপোষকতা এতটাই চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পদাধিকারের মাধ্যমেই পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা করা হচ্ছে, যা পুরস্কার বিতর্ক এবং প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদাহানির অন্যতম কারণ । শিল্প হলো এমন এক ক্ষেত্র যা coercion বা জবরদস্তি থেকে মুক্ত থাকতে চায় । রাষ্ট্র যখন শিল্পে অর্থায়ন করে, তখন সেই অর্থের সাথে আসে অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ। জেন আলেকজান্ডার বা রবার্ট ব্রুস্টেইনের মতো সমালোচকরা মনে করেন যে, সরকারি অনুদান শিল্পীকে একটি ‘সিল অব অ্যাপ্রুভাল’ বা স্বীকৃতির ছাপ দেয়, যা তার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়; কিন্তু বিপরীত মতানুসারে, এটি শিল্পীকে রাষ্ট্রের দাসে পরিণত করে । বাংলাদেশে ‘দলদাস বুদ্ধিজীবী’ পরিভাষাটি এই সংকটেরই এক ভাষাগত বহিঃপ্রকাশ ।

বাংলাদেশের ইতিহাসে পদাধিকার বলে কবি হওয়ার সবচেয়ে প্রকট উদাহরণ হলেন সাবেক সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। ক্ষমতা দখল করার পর তিনি নিজেকে কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের সর্বাত্মক ব্যবহার করেছিলেন । তাঁর কবিতা সংবাদপত্রগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে ছাপা হতো এবং বেতার-টেলিভিশনে প্রচার করা হতো। এটি ছিল ক্ষমতার মাধ্যমে নন্দনতাত্ত্বিক আধিপত্য বিস্তারের এক নগ্ন মহড়া। কিন্তু জনমানসে এর কোনো প্রকৃত গ্রহণযোগ্যতা ছিল না; বরং সাধারণ মানুষ তাঁর এই ‘কবি’ পরিচয়কে চরম উপহাস হিসেবে গ্রহণ করেছিল। ক্ষমতার দাপটে তিনি অনেক প্রতিষ্ঠিত কবিকে পাশে পেয়েছিলেন, যারা সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে তাঁর কাব্যপ্রতিভার গুণগান করতেন । এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা যখন সামরিক শাসকের কবিতার আলোচনা লিখতেন, তখন তারা মূলত শিল্পের নৈতিক ভিত্তিকেই ধূলিসাৎ করতেন।

এরশাদ আমলের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৮২-৯০ সালের সামরিক শাসনে রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে যে কবির ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা করা হয়েছিল, তা কবিতা উৎসব ও রাজপথের দ্রোহের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল । একদল লেখকের সরকারি আনুকূল্য গ্রহণ তাদের কেবল জনবিচ্ছিন্নই করেনি, বরং তাদের দীর্ঘমেয়াদী বিশ্বাসযোগ্যতাও কমিয়ে দিয়েছিল । অন্যদিকে নূর হোসেন ও রাউফুন বসুনিয়াদের মতো তরুণদের আত্মত্যাগ এবং পোস্টার-স্লোগানের মাধ্যমে গড়ে ওঠা প্রতিরোধই শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারের পতন নিশ্চিত করে । এরশাদের পতনের পর দেখা গেল, তাঁর যে সব কবিতা রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে প্রচারিত হয়েছিল, তা সাহিত্যের ইতিহাসে কোনো স্থান পায়নি। এই ঐতিহাসিক শিক্ষা সত্ত্বেও পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারগুলোতেও একই তোষামোদ ও পদাধিকারের সংস্কৃতি লক্ষ্য করা গেছে, যা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজকে সুবিধাভোগী ‘সরকারি বুদ্ধিজীবী’ এবং প্রান্তিকীকৃত ‘সত্যনিষ্ঠ লেখক’ এই দুই ভাগে বিভক্ত করেছে । সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখেছিলেন কীভাবে ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে অনেক লেখক আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের সুবিধাভোগী হয়েও পরে প্রগতিশীল সাজার চেষ্টা করতেন; এই দ্বৈত চরিত্র বা ‘হিপোক্রেসি’ আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজের এক গভীর ক্ষত ।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা পদাধিকার বলে শিল্পী বা লেখক হওয়ার সংকটের একটি জীবন্ত দলিল। ২০২৪-২০২৫ সালের পুরস্কার প্রদানের প্রক্রিয়া এবং পরবর্তীতে তা স্থগিত করার ঘটনাগুলো নির্দেশ করে যে, কীভাবে রাজনৈতিক পরিচয়ের কাছে সৃজনশীলতা জিম্মি হয়ে পড়েছে । যখন কোনো লেখককে তাঁর রচনার গুণের বদলে তাঁর রাজনৈতিক আনুগত্য বা ‘অতীতের রাজনৈতিক ভূমিকার’ ভিত্তিতে বিচার করা হয়, তখন সেই পুরস্কারের গরিমা ক্ষুণ্ণ হয় । ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পুরস্কার ঘোষিত হওয়ার পর থেকেই নেটদুনিয়ায় ব্যাপক সমালোচনা ও ক্ষোভ শুরু হয় । এর প্রেক্ষিতে ২৫ জানুয়ারি সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী পুরস্কার স্থগিতের ঘোষণা দেন এবং মনোনয়ন প্রক্রিয়ার আমূল সংস্কারের দাবি জানান । পরবর্তীতে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম গণহত্যার সাথে সংশ্লিষ্ট বা জনবিরোধী রাজনীতির সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের পুরস্কার বাতিলের ঘোষণা দেন । ফেব্রুয়ারিতে নতুন তালিকা প্রকাশ করা হয় যেখানে কয়েকজনকে বাদ দেওয়া হয়, যা মনোনীত ও নির্বাচকদের মধ্যে এক প্রকার বিভাজন ও অসন্তোষ তৈরি করে ।

এই অস্থিতিশীলতা প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র যদি কোনো ব্যক্তিকে জোর করে ‘বিশিষ্ট’ বানাতে চায়, তবে শেষ পর্যন্ত সরকারকেই বিব্রত হতে হয় । এই সংকটের মূলে রয়েছে ‘ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট’ বা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সাহিত্যিক মূল্যায়ন করার একটি উদ্ভট প্রশাসনিক ব্যবস্থা । শিল্পীর মূল্যায়ন করবেন পাঠক এবং সমালোচক, কিন্তু যখন রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা নির্ধারণ করে কে কবি হওয়ার যোগ্য, তখন সেখানে সৃজনশীলতার মৃত্যু ঘটে। এটি বোর্দিও বর্ণিত সেই ‘প্রতিষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক পুঁজি’ অর্জনের এক ভ্রান্ত পথ, যা কেবল পদের ওপর নির্ভর করে কিন্তু প্রকৃত শিল্পবোধকে অবজ্ঞা করে । নানা ব্যক্তিদের নানা সময়ে পুরস্কার কেন্দ্রিক বিতর্কে পদত্যাগ নৈতিক কারণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যা নির্দেশ করে যে প্রতিষ্ঠানের সম্মান যখন ধূলিসাৎ হয়, তখন প্রকৃত সৃজনশীলরা সেখানে থাকতে পারেন না ।

বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক সংকটের আরেকটি দিক হলো ভাষার রাজনৈতিক ব্যবহার। তথাকথিত ‘অভিজাত’ বা ‘শিষ্ট’ ভাষার আড়ালে সাধারণ মানুষের ভাষাকে অবদমিত করার একটি প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে । রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ধন্য বুদ্ধিবৃত্তিক গোষ্ঠী এমন এক ধরনের তৎসম ও আভিজাত্যপূর্ণ ভাষারীতি ব্যবহার করেন যা সাধারণ মানুষকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে হীনম্মন্য করতে সাহায্য করে । পদাধিকারী সাহিত্য প্রায়শই অলংকারিক ও সারবত্তাহীন হয়, যার প্রধান লক্ষ্য থাকে শাসকের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন । কিন্তু ইতিহাসের বাঁকবদলে দেখা যায়, যখনই কোনো আধিপত্যবাদী ব্যবস্থা জেঁকে বসেছে, তখনই মানুষের ভাষার মধ্য দিয়ে প্রতিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশের ‘জেন-জি’ প্রজন্ম যে ভাষা ব্যবহার করেছে, তা প্রচলিত অ্যাকাডেমিক বা শিষ্ট ভাষার তোয়াক্কা করেনি । তারা স্ল্যাং এবং নতুন নতুন শব্দবন্ধের মাধ্যমে প্রচলিত মিথ্যে বয়ান ও ক্ষমতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে। আমলাতান্ত্রিক নন্দনতত্ত্ব যেখানে সর্বদা ‘পলাতক’ এবং সত্যকে এড়িয়ে সুন্দর শব্দে অলংকৃত তোষামোদ তৈরি করে , সেখানে জনগণের ভাষা হলো ‘উত্তপ্ত’, যা সরাসরি অ্যাকশন এবং অস্তিত্বের সংকটকে ধারণ করে । বোর্দিও যেমনটি বলেছিলেন, ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমেই নির্ধারিত হয় কে সঞ্চয়ী এবং কে নিঃস্ব ; পদাধিকারী বুদ্ধিজীবীদের ভাষা সত্যের অভাবে এক পর্যায়ে প্রাণহীন হয়ে পড়ে এবং হাস্যরসের উপাদানে পরিণত হয়।

একজন প্রকৃত শিল্পীর পরিচয় তাঁর সত্যনিষ্ঠায় বা ‘অথেনটিসিটি’তে। সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবীর মূল লক্ষ্য থাকে পদোন্নতি, পুরস্কার ও রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য, যার ফলে তাদের আচরণে প্রায়শই ডিগবাজি খাওয়া ও তোষামোদ করার প্রবণতা দেখা যায় । এর নন্দনতাত্ত্বিক ফলাফল হলো রুচির বিকৃতি ও অবক্ষয়, এবং ঐতিহাসিকভাবে এরা ঘৃণিত ও বিস্মৃত হয়ে থাকেন । অন্যদিকে, নীতিবান বুদ্ধিজীবীর লক্ষ্য থাকে সমাজ সংস্কার এবং সত্য প্রকাশ। তারা অন্যায়ের প্রতিবাদে স্পষ্টবাদী হন এবং তাদের অনুপ্রেরণা সমাজকে পথ দেখায়, যা তাদের কালজয়ী করে তোলে । রাষ্ট্র যখন শিল্পীকে তার ব্যক্তিগত রূপকল্প থেকে সরিয়ে এনে সরকারি পরিকল্পনার মধ্যে আটকে দিতে চায়, তখন শিল্পের মৃত্যু ঘটে । সাংবাদিকতা ক্ষেত্রেও এই সংকট বিদ্যমান; সরকারি কার্ড বা পদের মোহে যারা সত্যকে আড়াল করেন, তারা সরকার পরিবর্তনের পর সবচেয়ে বেশি বিব্ররত হন । সৈয়দ আবুল মকসুদ এই অবস্থাকে ‘বিশ্বাসহীনতা’ বলে চিহ্নিত করেছেন; বুদ্ধিজীবী যদি নীতিনিষ্ঠ না হন, তবে তিনি সমাজের ‘বাতিঘর’ হওয়ার যোগ্যতা হারান ।

পদাধিকার বলে কবি বা শিল্পী হওয়ার বাসনার মূলে রয়েছে এক গভীর ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্ব (Colonial Psyche)। ব্রিটিশ আমলের ‘রায় বাহাদুর’ বা ‘খান বাহাদুর’ উপাধির যে কৃত্রিম শ্রেষ্ঠত্বের বিভ্রম ছিল, আধুনিক বাংলাদেশে তার জায়গা নিয়েছে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ও পদাধিকারী কবি পরিচিতি । ব্রিটিশদের রাজকীয় ফরমান আজ সরকারি গেজেট বা নিয়োগপত্রে রূপান্তরিত হয়েছে, যা ক্ষমতার সাথে মেধাকে গুলিয়ে ফেলার সুযোগ করে দেয় । আহমদ শরীফ এই ‘সাহেব সংস্কৃতি’ বা আমলাতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবী সমাজের কড়া সমালোচনা করেছেন । তাঁর মতে, বিদেশি শাসক বা তাদের আদর্শে প্রভাবিত এই বুদ্ধিজীবী সমাজ প্রায়শই নিজস্ব সৃজনশীলতার অভাব এবং আত্মবিশ্বাসের সংকটে ভোগে, যার ফলে তারা বিদেশি ডিগ্রি ও পদের দাপট ব্যবহার করে সাধারণের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে চায় । মানুষ যখন দেখে যে এই সব ‘বড় সাহেব’দের সৃজনশীল কাজগুলো আসলে অন্তঃসারশূন্য, তখন তারা তাদের প্রত্যাখ্যান করে এবং এতে সরকারকেও বিব্ররত হতে হয়।

রাষ্ট্র যখন সৃজনশীলতার জগতে অনধিকার প্রবেশ করে, তখন তার পরিণতি হয় বিব্ররতকর। নন্দনতত্ত্বের ভাষায়, সৌন্দর্য হলো সেই বস্তু যা কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই আনন্দ দেয়; কিন্তু পদাধিকারী শিল্পীদের কাজের পেছনে থাকে পদোন্নতি বা রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের মতো সুনির্দিষ্ট পার্থিব উদ্দেশ্য । ডিজিটাল যুগে তথ্যের অবাধ প্রবাহের কারণে এখন আর ক্ষমতার জোরে কাউকে ‘বিশিষ্ট’ বানিয়ে রাখা সম্ভব নয় । বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজকে যদি মেরুদণ্ড সম্পন্ন হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তবে পুরস্কারের রাজনীতি এবং তোষামোদের সংস্কৃতি ত্যাগ করতে হবে। প্রকৃত শিল্পী কোনো সরকারের কর্মচারী নন; তিনি জাতির বিবেক। কলমের খোঁচায় নাম বানানো যায়, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে নাম খোদাই করতে হলে প্রয়োজন নিঃস্বার্থ সৃজনশীলতা, যা কোনো গেজেট বা পদাধিকারের তোয়াক্কা করে না । পদাধিকারের অহংকার যেখানে শেষ হয়, প্রকৃত সৃজনশীলতার যাত্রা সেখান থেকেই শুরু হয়।

কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা