আবু তাহের তারেক
আধুনিক কবিতার বৈশিষ্ট আছে গো, জাদুমনি। বিশেষ করে, কলকাতাবাহিত আধুনিক কবিতার। এইসব কবিতা একটা গড় প্যাটার্ন ফলো করে। নিচে তার কয়েক পদ নিয়া আলাপ করা হইল।
০১. আধুনিক কবিতার এক নম্বর বৈশিষ্ট হইল শব্দনির্ভরতা। এই প্রকারের কবিতা ‘নাগরিক’ ও ‘ব্যক্তি’ নামক দুইখানা প্রায়-ভুয়া পদার্থরে ফেটিসাইজ করতে গিয়া, কবিতায় শব্দের পর শব্দ ইউজ করে। ফলত, আধুনিক কবিতা হাসফাসের বাইরে গিয়া কিছু হইতে বা করতে পারে না।
হজরত মণীন্দ্র গপ্তের একখানা কবিতা আছে। আমাদের আধুনিক কবিতা কিভাবে শব্দ ও হরফের মিনিংলেস ব্যায়ামে পরিণত হইল, তার সুন্দর বর্ণনা আছে এতে। টাইটেল, যতদূর মনে পড়ে, ‘হাজার বছরের বাংলা কবিতা’। এই বাবতে, কবিতাটা দেখতে পারেন।
বিপরীতে, আবহমান বাংলা কবিতার এক নম্বর বৈশিষ্ট যদি ধরি, তা হবে ভাবপ্রবণতা। আমাদের কবিতা কখনো ফাকা ছিল না। এতে শব্দের বাজিগরিই থাকত না। এছাড়া, আমাদের কবিতার একটা বড় গুণ আছিল গদ্যময়তা। যেইখানে ভাব ও তাল জলের ছন্দে প্রবাহিত হইত।
০২. তো, জীদাদের ধার করা আধুনিক কবিতার দুই নম্বর বড় চরিত্র হইল ‘এস্থেটিক প্রবণতা’। উনারা কবিতারে পিপলের কাছ হইতে ছিনায়া লইয়া, গুটিকয়েক মানুষের জন্য করার খাতিরে, কবিতায় অতিরিক্ত পরিমাণে ইমেইজ, সিম্বল ও উপমা ব্যবহার করেন।
এর একটা উৎকৃষ্ট নমুনা হইল হাসান রোবায়েতের কবিতা। রোবায়েত তুলনা করা ছাড়া স্ট্রেইট কুনু লাইনই লেখতে প্রায় পারেন না। ফলত, উনার কথা বলবার ভংগি আড়ষ্ট হয়*। কলকাতা বাহিত সকল কবির একটা কমন বৈশিষ্ট্য হইল আড়ষ্টতা।
বিপরীতে, আবহমান বাংলা কবিতা আড়ষ্টতা মুক্ত। সে সাবলীল। আবহমান বাংলা কাব্যে ফিগার অব স্পিচ বা অলংকার তখনই ইউজ করা হয়, যখন তার দরকার পড়ে। ইমেইজ তখনই উৎপাদন করা হয়, যখন ভাবরে রূপদানের জরুরত পড়ে। আবহমান বাংলা কবিতার সাম্প্রতিক দুই উদাহরণ হইলেন ফরহাদ মজহার ও জহির হাসান। মজহারের কবিতায় গদ্যস্বভাব, দার্শনিকতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা লক্ষণীয়। জহির হাসানের কবিতায়ও, এইমতন উপাদানের অভাব নাই। তদুপরি, তান কবিতায় অলংকারের ঘনঘটাও অল্প। অল্প এই অর্থে, যে তান কবিতার অলংকারপ্রবণতা চউখে জ্বল জ্বল কইরা উঠে না।
০৩. কলকাতার আধুনিকতার তিন নম্বর চরিত্র হিসাবে ‘রিদমকে’ চিহ্নায়ন করা যায়। বেপারটা ভাষায় বুঝানি খানিকটা কঠিন যদিও! মানে, এই প্রকারের আধুনিক কবিতা নিজেদেরকে প্রোজায়িক বা গদ্যস্বভাবী বললেও, সেইগুলা ইন ফ্যাক্ট, কাব্যস্বভাবী।
আমাদের ক্লাসিক কবিতার বই, যেমন ময়মনসিংহ গীতিকার কবিতায় সুর তাল ও লয়ের অভাব না হইলেও, পাঠক এর ভাষার গদ্যভংগিমা খিয়াল করবেন। ফলত, ময়মনসিংহ গীতকার বাচনরীতি আড়ষ্ট না। সাবলীল। কিন্তুক, কলকাতাবাহিত আধুনিকদের কাব্যে একটা ঢেউ থাকে, থাকা লাগে। এইটা অতিরিক্ত ছান্দসিকতা। যা বিরক্তিকর বটে। শুধু কি তাই! এইটা এইসব কবিদের ভাষা ব্যবহারে অপটুতারও নমুনা বৈকী!
আল মাহমুদের কবিতায় বেপারটা ভালমত ধরতে পারবেন। আল মাহমুদ আমাদের অন্যতম বড় কবি হইলেও, তান কবিতায় বয়ানের আধুনিক আড়ষ্টতা পষ্ট। বিশেষ করে, সোনালী কাবিন পর্যন্ত। এরপরে, বখতিয়ারের ঘোড়ায় তিনি নয়া গদ্যের দিকে মনযোগ দেন। অবশ্য, সহজ-স্বাভাবিক গদ্যে তিনি অনেক পরে আসতে পারেন। দ্বিতীয় ভাংগনের কবিতায় যার স্বাক্ষর পাইবেন। তো, আল মাহমুদের তথাকথিত ‘গদ্য-কবিতা’ও অনেকটা রিলাক্সড। এই নিয়া একটা প্রশ্নের জওয়াবে তিনি বলছিলেন, ফরাসি আধুনিকতা-বাহিত কবিতার যে গদ্যভাব এইখানে চর্চিত হয়, যা মূলত রিদমিক; তিনি তার বাইরে গিয়া গদ্যে কবিতা লেখার চেষ্টা করেন।
০৪. তো, কলকাতার ভাষা বইলা যেই জিনিস আমাদের দেশে সাম্প্রতিক সময়ে বহুল চর্চিত হয়, সেইটা আধুনিক কবিতার একটা অন্যতম বড় বৈশিষ্ট বটে। আমি এইটারে কলকাতাবাহিত আধুনিক কবিতার চাইর নম্বর বড় চরিত্র কইতে আগ্রহী। যদিও, আমাদের অনেকে, প্রমিত জবানরেই আধুনিক কবিতার পয়লা ও প্রায় একমাত্র চরিত্র ঠাউরান!
আধুনিক কবিরা প্রমিত ভাষা নামক একখানা উপভাষার চর্চাই করেন না, প্রমিতপনাও করেন আকছার। তারা ভাষার ক্ষেত্রে, ডিকশন ও সিনট্যাক্সের কিছু মুখস্ত রীতি ফলো করেন। এদিকে, তাদের কবিতা যেন এইমতন, কিছুটা দুর্বোধ্য হয়, তার চেষ্টা চরিতও জরুর থাকে। ফলে ফলে, আধুনিক কবিতা পাঠ করার লাগিও আপনারে ট্রেইনড হইতে হয়।
সাম্প্রতিক বাংলাদেশে নয়া কবিতার যেই দ্রোহ ও চরিত্র, তা আমাদের কবিতার আধুনিক সব ভংগিমারেই স্বীকার ও আত্মীকৃত করে। এদিকে, সে বাংলা কবিতার শত শত বছরের সিলসিলারেও খতাইয়া দেখতে ইচ্ছুক। ফলত, ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কবিতা উদার। প্রমিত ও নন-প্রমিত, কুনু বুলিতেই তার এলার্জি নাই। যদিও, আধুনিক কবিতার অপরাপর গ্রেট-টেন্ডেন্সির অনেক কিছুতেই সে বেশ ক্রিটিকাল। যেমন, আমাদের সাম্প্রতিক কবিতায় ভাবের একটা বড়সড় পরিসর তৈয়ার হইছে। এদিকে, এইসব কবিতায় এস্থেটিক প্রবণতার প্রতিও একধরণের বিরাগ লক্ষণীয়।
*তান সাম্প্রতিক কিছু কবিতায় এরে উৎরানির চেষ্টা খিয়াল করা যায়।







