শান্তা মারিয়া
সাজ্জাদ বিপ্লবের নাম আমি প্রথম শুনি নব্বই দশকে। তিনি তখন বগুড়া থেকে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ করতেন, কবিতা লিখতেন এবং সাহিত্য নিয়ে বেশ তারুণ্য-উত্তাল জীবন যাপন করতেন। সেসময় বগুড়ায় তরুণ কবিদের মধ্যে সাহিত্য আড্ডা, সাহিত্য নিয়ে কাজ এবং নতুন ধরনের আলোচনা বেশ জমে উঠেছিল। সাজ্জাদ বিপ্লব ছিলেন এই তরুণ কবিদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল।
যতদূর মনে পড়ে তিনি উত্তরাধুনিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাঁর কবিতার সেসময়কার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল শিকড়মুখী অভিযাত্রা।
নব্বই দশকে কবিতা চর্চার ক্ষেত্রে মোটা দাগে দুটি বিভাজন ছিল। একটি ধারা ছিল পরদেশমুখী। তারা অন্য একটি দেশের কবিতার ভাষাকে অনুসরণ করতো, প্রতিবেশীদের পিঠ চাপড়ানিকে পরম প্রাপ্তি বলে জ্ঞান করতো।
আরেকটি ধারা ছিল বাংলাদেশের নিজস্ব ঐতিহ্যকে ধারণ করে সৃষ্টির ভুবন গড়ে তোলা। এরা আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, ফজল শাহাবুদ্দীন, আবদুল মান্নান সৈয়দ, ফররুখ আহমদ, আহসান হাবীবসহ বাংলাদেশের কবিদের ধারণ করতেন। তাদের অনেকে সুফিবাদ ও আধ্যাত্মিক দর্শনও কবিতায় চিত্রিত করতেন। সাজ্জাদ বিপ্লবের কবিতাচর্চার ধারা ছিল দেশপ্রেমিক ও নিজস্ব ঐতিহ্যকে ধারণ করার।
পরবর্তিকালে এই ধারার অনেক কবিকেই দেখেছি প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সাথে আপোষ করে আওয়ামি রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে। অনেককে দেখেছি নিজের অস্তিত্বসংকটে পড়ে প্রচলিত স্রোতে গা ভাসাতে। কিন্তু কবি সাজ্জাদ বিপ্লব সেটি করেননি। তিনি নিজস্ব ব্যক্তিত্ব ও স্বাতন্ত্র্য ধরে রেখেছেন। সেটা যে তিনি করেছেন তার প্রবল প্রমাণ মেলে ২০২৪ সালে।
আরেকটু ধাক্কা দিন
……….
‘আরেকটু ধাক্কা দিন
দেখবেন, পড়ে যাবেন তিনি
তার গদি যাবে উল্টে
চেটেপুটে যা-যা খেয়েছেন
সবকিছুই বের হয়ে আসবে হড়হড় করে
তারপর হবে ইতিহাস, আমাদের।’
কি অমোঘ দৃঢ়তায় এই সাহসী উচ্চারণ করেন কবি। সত্যিই দেশবাসীর প্রবল ধাক্কায় পতিত হয় স্বৈরাচারী সরকার।
জুলাই বিপ্লবের সময় দেখেছি সাজ্জাদ বিপ্লব একের পর এক সাহসী পোস্ট দিয়েছেন। তার কবিতায় ঝলসে উঠেছে প্রতিবাদ। তিনি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। এই সময়ে তিনি লিখেছেন,
‘কোথায় পালাবে
……….
‘তুমি দেশ বিক্রি করেছো, তোমার আত্মাও বিক্রি করেছো
বিবেক দিয়েছো বন্ধক, অজানা কারো কাছে
তোমার হাতে আবু সাঈদের রক্তের দাগ
কোথায় পালাবে তুমি?’
এই কবিতা তিনি লিখছেন ২১ জুলাই। যখন স্বৈরাচারের দোসররা প্রবল প্রতাপে আস্ফালন করছে। তখনও কিন্তু মানুষ জানেন না স্বৈরাচারী হাসিনা পালাতে বাধ্য হবে। কবি যে ভবিষ্যতের কথাও বলতে পারেন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এই কবিতাটি। পতিত স্বৈরাচারের ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডকে উদ্দেশ্য করে তিনি লেখেন,
এতো ঘৃণা তুমি রাখবে কোথায়
………
‘তুমি জিম্মি করেছো দেশকে
দেশের নিরীহ জনগণ
আজ, তোমার হিংসার বলির পাঠা
তুমি, চুলায় দিয়েছো
এদেশের মানুষের ভালোবাসা
তোমার প্রতারক চোখে ও মুখে
পিতৃহত্যার প্রতিহিংসা
তুমি নিষ্ঠুর, রঙ হেডেড এবং সাইকো
তোমার মতো অতীতের সব স্বৈরাচার, লোভী, মাতাল–
কেউই রক্ষা পায়নি
মানুষের অফুরান অভিশাপ থেকে
এতো ঘৃণা তুমি রাখবে কোথায়?’
জুলাই বিপ্লবে সাজ্জাদ বিপ্লব একের পর এক সাহসী কবিতা লিখেছেন। তিনি ভীরু ও সুবিধাবাদী কবি নামধারীদের প্রতি লেখেন,
তবে কি তারা বিক্রি হয়ে গেলেন
……….
‘তাদের দাঁড়াবার কথা ছিলো সম্মুখে
বুকে সাহস এবং কণ্ঠে দীপ্ত উচ্চারণ নিয়ে
স্লোগানে প্রকম্পিত করার কথা ছিলো, রক্তে রাঙা রাজপথ
সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় শপথের কথা
তাদের অজানা নয়
তারা কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করেনি অতীতে
তাদের কর্মফল বলে, তারা বিশ্বাসী এবং বিশ্বস্ত
কি তবে তাদের মধ্যে শংকা হয়ে দাঁড়ালো?
কী তাদেরকে ভীরু ও অচল খরগোশে পরিণত করলো?
তবে কি তারা বিক্রি হয়ে গেলেন!’
এই কবিতাটি যে ভীরু খরগোশদের কথা বলেছে, জানি না এই কবিতা পড়ে তারা লজ্জিত হয়েছিলেন কিনা। সত্যিই, মনে পড়ে, সেসময় ফ্যাশিস্ট দোসর কবি নামধারীরা কি বেহায়াপনা করেছে। তাদের অনেকেই প্রবাসে আছেন। এরা কিভাবে পতিত স্বৈরাচারকে সমর্থন দিয়েছে।
সেসময় শিশু কিশোররা গুলিতে মরছে যেন আবাবিল পাখি। রক্তাক্ত স্বদেশভূমিকে নিয়ে সাজ্জাদ বিপ্লবের কবিতা–
রক্তাক্ত স্বদেশ
…………
‘আমার মতো একদিন ঘুরে দাঁড়াবে–
রক্তাক্ত স্বদেশ
তার পীঠে তখনো লালজবার মতো ঘা থাকবে
হাতে হয়তো অদৃশ্য হাতকড়া
সামনে তাক করা অজস্র ফ্যাসিবাদী রাইফেল
কণ্ঠনালীর উপর প্রভুদের পা
তবু, মরতে গিয়ে একদিন ঠিক দাঁড়িয়ে যাবে
খাঁড়া আলিফের মতো
যেমন আমি দাঁড়িয়ে আছি, হিম্মত নিয়ে, স্বৈরাচার পিরামিডের সামনে’
এই কবিতাগুলো আমি উদাহরণ হিসেবে পাঠকের দরবারে পেশ করলাম। সেই উত্তাল সময়ে সাজ্জাদ বিপ্লব আরও অনেক কবিতা লিখেছেন। শুধু নিজের কবিতার মাধ্যমেই তিনি প্রতিবাদ জানিয়েছেন এমন নয়। তিনি বাংলা রিভিউতে একের পর এক সাহসী লেখা প্রকাশ করেছেন। আমার মনে পড়ে তখন আমার প্রতিটি লেখা তিনি প্রকাশ করেছেন নিজের উদ্যোগে। আমাকে অনুরোধও করতে হয়নি, ফেসবুকের টাইম লাইন থেকে তিনি পোস্ট নিয়ে শেয়ার করেছেন, বাংলা রিভিউতে তুলেছেন। শুধু আমার নয়, আরও অনেকের সাহসী পোস্ট তিনি শেয়ার করেছেন। সেসময় আমরা যারা দেশের ভিতরে থেকে স্বৈরাচারের সহিংসতার প্রতিবাদ করছিলাম তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বাংলা রিভিউর সম্পাদক সাজ্জাদ বিপ্লব। স্বৈরাচারের পতনের পরও আওয়ামি, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও ফ্যাসিস্ট দোসরদের হুমকি ধামকির মুখে দাঁড়িয়ে তিনি সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন।
জুলাই বিপ্লবের কবিতাসমূহ নিয়ে তিনি বাংলা রিভিউর যে সংখ্যাটি প্রকাশ করেন তা বাংলা একাডেমির সংকলন থেকে শতগুণে শ্রেয় হয়েছে একথা আমি সবসময় বলবো। আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো বাংলা একাডেমি জুলাই বিপ্লবের সত্যিকারের রাজপথে দাঁড়ানো কবিদের কবিতা তাদের সংকলনে স্থান দিতে ব্যর্থ হলেও বাংলা রিভিউ সেই কাজটি করতে পেরেছে। এটা যে কত বড় একটি অর্জন তা আগামি দিনের ইতিহাস বলবে।
কবি সাজ্জাদ বিপ্লবের কবিতায় আগেও দেখেছি, এখনও দেখছি সাহস, প্রতিবাদ ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান। সেইসঙ্গে তিনি উপমা ও চিত্রকল্পের ব্যবহারেও দারুণ আধুনিক ও দক্ষ।
‘আমাদের কারণেই সংঘটিত হচ্ছে অমানবিক পারমাণবিক যুদ্ধ, সাইবার যুদ্ধ, স্নায়ু যুদ্ধ ও মল্ল যুদ্ধ
ঘর থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে নিষ্পাপ ছেলেরা, দেশ থেকে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে সুন্দর বন
পৃথিবীতে অভয়ারণ্য বলে আর কিছু থাকছে না
থাকছে না নিরাপদ দেশ ও বাসস্থান
ঘরে-ঘরে এমনকি বুকে-বুকে ঢুকে যাচ্ছে সন্দেহ ও অবিশ্বাস
ঘুমের ভেতরেও তাড়া করছে হিংসুটে দু: স্বপ্ন
তাহলে, আমরা কোথায় যাব? কার কাছে খুঁজব নিরাপদ আশ্রয় ও আশা?
আমাদের মন ও ভালোবাসা এখনো সতেজ ও নিষ্পাপ’
এই কবিতায় তিনি সাইবার যুদ্ধ শব্দটিকে কি অবলীলায় কবিতায় প্রবাহিত করলেন।
‘আমরা দাঁড়িয়ে যাবো খাড়া আলিফের মতো সোজা হয়ে, শির উঁচু করে
আমরা ভেদ করব শয়তানের তীব্র ফুঁৎকার
আমাদের বিশ্বাস ও কমিটমেন্ট, আকাশ ছোঁয়া…’
এখানে ‘আলিফের মতো শির উচুঁ করে’ কি দুর্দান্ত উপমা ব্যবহার করেছেন কবি। কমিটমেন্ট শব্দটিকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন কবিতায়।
এইখানেই কবি সাজ্জাদ বিপ্লবের সার্থকতা। তিনি আধুনিক জীবনের প্রাত্যহিক শব্দগুলোকে দক্ষতার সঙ্গে কবিতায় প্রয়োগ করতে পারেন। তাঁর কবিতায় প্রাচীন পুণ্ড্রনগরীর ঐতিহ্য যেমন রয়েছে তেমনি ধারণ করছে আটলান্টা সিটির একুশ শতকের জীবন প্রবাহ। পাশাপাশি তার কবিতায় আধ্যাত্মিক অনুভূতি ও অস্তিত্ববাদী দর্শনের প্রকাশও ঘটেছে। আল্লাহর প্রতি প্রেম, তাঁর অপার মহিমায় বিস্ময় ও পুলক সাজ্জাদের কবিতাকে ভিন্ন মাত্রায় উন্নীত করেছে।
সাজ্জাদ বিপ্লবের জন্মদিন তাঁর পাঠক, বন্ধু ও স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষীদের জন্য অবশ্যই আনন্দের উপলক্ষ। কত বয়স হলো কবির? আমার কাছে মনে হয় তিনি চিরদিনই তারুণ্যের ও বিপ্লবের কবি। নব্বই দশকে যে তরুণ কবিকে আমি চিনতাম তিনি এখনও তেমনি আছেন। তার কবিতা আরও ঋদ্ধ হয়েছে, শাণিত হয়েছে, সমৃদ্ধ হয়েছে। তার কাব্যভুবন পুণ্ড্রনগর থেকে আটলান্টা অবধি প্রসারিত হয়েছে। পৃথিবীর দুই গোলার্ধে তার ব্যপ্তি তাকে পাঠকের আরও আপন ও নিজস্ব করে তুলেছে। কবির দীর্ঘ, সুস্থ, সৃষ্টিশীল জীবন কামনা করি। শুভ জন্মদিন প্রিয় কবি সাজ্জাদ বিপ্লব।








ভালো আলোচনা করেছেন শান্তা আপুু। শুভেচ্ছা আপনাকে ও সাজ্জাদ বিপ্লবের জন্য।