সাজ্জাদ বিপ্লব
আমাদের, বিশেষ করে আমার, সাহিত্য জীবনের শুরুটা ছিলো বিরোধিতা মোকাবিলা করে। আশির শেষে (১৯৮৮/১৯৮৯) আমি যখন বগুড়ার সাহিত্য জগতে প্রবেশ করি তখন তথাকথিত প্রগতিশীলদের একচেটিয়া দাপট এই অঙ্গনে। কারা আমাদের অগ্রগামী লেখক-কবি?–আমি জানিও না। চিনিও না।
এ সময়ে একদিন স্থানীয় পত্রিকায় একটি সাহিত্য সংগঠন এর আত্মপ্রকাশ ও সাহিত্য আসরের খবর প্রকাশিত হয়। সেই খবর ও তাদের আহবানে সাড়া দিয়ে হাজির হই আমি ও এফ শাহজাহান উডবার্ন পাবলিক লাইব্রেরি চত্বরে। সংগঠনটি “বগুড়া লেখক চক্র”। প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফিরোজ আহমেদ বাবু। আসর বসতে লাগলো প্রতি সপ্তাহে। দুই/তিন সপ্তাহ তাদের সেই আসরে উপস্থিত থাকার পর হঠাৎ সংগঠনটির তৎকালীন সভাপতি শেখ ফিরোজ আহমেদ বাবু আমাকে আলাদা করে ডেকে জানালেন আমি যদি আমার চিন্তা-চেতনা পরিত্যাগ না করি তাহলে তাদের আসরে যেন না আসি। প্রতি উত্তরে আমিও জানালাম, আমার যদি কোন সাহিত্য প্রতিভা বা যোগ্যতা থেকে থাকে তবে আমার উত্থান কেউ ঠেকাতে পারবে না। তাদের সংগঠনের আমার কোন প্রয়োজন নেই।
এরপর শুরু হলো সাহিত্যের পঠন-পাঠন। সিরিয়াস সাহিত্য চর্চা। সমমনা কয়েকজন মিলে সাহিত্য পাঠের আসর করতে লাগলাম “স্বকাল সাহিত্য পরিষদ” ব্যানারে। এই পরিষদের উদ্যোগে ফেব্রুয়ারি ১৯৮৯ সালে শেরপুর রোড, বগুড়া থেকে বের হলো আমাদের লেখার প্রথম সংকলন, আ.ন.ম মোফাজ্জল হক সম্পাদিত “স্বকাল”। প্রকাশ পেলো আমার দু’টি কবিতা।
এর পরের কাল, ঢাকা।
নব্বইয়ের শুরুতে ঢাকায় এমন কোন সাহিত্য আসর ছিলো না, যেখানে আমার ও ছড়াকার মানসুর মুজাম্মিল এর পা পড়েনি। সর্বত্র আমাদের উপস্থিতি ছিলো চোখে পরার মতো। এখানেও আমার সঙ্গে বগুড়া থেকে এসে যুক্ত হলেন সহযোদ্ধা ছড়াকার এফ শাহজাহান। আমাদের রক্তে তখন প্রতিবাদের আগুন। হাতিয়ার : কলম। এর মধ্যে চারুকলায় রবীন আহসান সম্পাদিত একটি আক্রমণাত্মক ছড়াপাতা আমাদের হাতে এলো। তা দেখে আমরাও পাল্টা রাজনৈতিক ছড়াপাতা “বারুদ নিক্ষেপ” প্রকাশ করে ফেললাম। হৈচৈ পরে গেলো রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক অঙ্গনে। পরে এফ শাহজাহানকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ও আমাকে বগুড়ায় হুমকি দেওয়া হলো। এমনকি মিছিল ও প্রতিবাদ সভা করা হলো বগুড়ার সাতমাথায় স্থানীয় একটি পত্রিকায় আমার একটি “ছড়া” প্রকাশকে কেন্দ্র করে।
এর মধ্যে দেখা ও সান্নিধ্য পাওয়া শুরু হলো বাংলা ভাষার খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকদের। যাদের মধ্যে দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, কথাশিল্পী শাহেদ আলী, কবি সৈয়দ আলী আহসান, কবি আবদুস সাত্তার, কবি আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দীন, কবি আল মাহমুদ, কথা সাহিত্যিক রাহাত খান, কবি ফজল শাহাবুদ্দীন, নজরুল গবেষক শাহাবুদ্দীন আহমদ, কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ, কবি সিকদার আমিনুল হক, উপন্যাসিক জামেদ আলী, কবি আবিদ আজাদ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। এরপর বগুড়ায় ফিরে গেলে ১৯৯৩ সালে “অবাচী সাংস্কৃতিক সংসদ”‘ গঠন, পত্রিকা তথা লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ ও আরো পরে(১৯৯৬-২০০১ সালে) আমার বই-পত্রের দোকান “পার্বণ” এর সূত্রে সখ্যতা ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে স্থানীয় অগ্রজ ও সমকালীন সকল সাহিত্যিকদের সঙ্গে। যাদের মধ্যে কবি কে এম শমশের আলী, রম্য লেখক-শিক্ষাবিদ তাজমিলুর রহমান, “দস্যুবনহুর” খ্যাত লেখক রোমেনা আফাজ, কবি ফারুক সিদ্দিকী, কবি মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, কবি রেজাউল করিম চৌধুরী, কবি রহমতুল বারী, কবি খন্দকার বজলুর রহীম, কবি জি এম হারুন, কবি মনজু রহমান, কবি ও তাত্ত্বিক আজিজ সৈয়দ, গল্পকার ফয়জুল কবীর, নাট্যকার শিকদার আ.ন. মঈনউদ্দীন, কবি ফখরুল আহসান, কথাসাহিত্যিক পিয়াল খন্দকার, কবি পান্না করিম, কবি প্রতীক নজরুল, কবি জয়ন্ত দেব, কবি মান্নান আরজু, কবি খৈয়াম কাদের, কথাসাহিত্যিক কবীর রানা, কবি কমল লোদী, কবি ও চিন্তক ফিরোজ আহমেদ, কবি এফ শাহজাহান, ছড়াকার নুরুল ইসলাম খান, কবি কামরুজ্জামান মাসুম, কবি আমীর খসরু স্বপন, কবি অমিত রেজা চৌধুরী, কবি রহীম সরওয়ার, আলোকচিত্রী রাশেদ রোকন, ছড়াকার নীহারিকা খান, কথাসাহিত্যিক সরকার মোস্তফা, কবি ইসলাম রফিক, কবি সৈকত ইসলাম, কবি তৌফিক জহুর, কথাসাহিত্যিক ইফতেখার মাহমুদ, কবি টুটুল রহমান, কবি অনন্ত সুজন, কবি এমরান কবির, কবি মাহমুদ শাওন, কবি মাসুদ কামাল, কবি ইন্দ্রজিৎ সরকার, কবি রহমান তাওহীদ প্রমুখ। আরো অনেকে ছিলেন, যাদের নাম এ মূহুর্তে মনে পরছে না। দু:খিত।
২.
নব্বইয়ের শুরুর এই সময়টা বগুড়ার সাহিত্যের হাওয়া পাল্টে দিল চিরকালের জন্য।
সারা দেশের মতো, বগুড়াতেও, শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনে চেপে বসা তথাকথিত একদল বামপন্থী মোড়লদের এতোদিনের একচেটিয়া সাহিত্যিক জমিদারি (?) ও মিথ্যা অহংকার যেন মিশে গেলো ধুলায়। এদের খবরদারি, দখলদারি ও রাজত্ব সরাসরি অস্বীকার করে সুস্থ, মুক্ত ও নান্দনিক সাহিত্য চর্চার অভিপ্রায়ে ঐতিহ্যবাদী একদল কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবীর হাতে গড়ে উঠলো : অবাচী সাংস্কৃতিক সংসদ, বগুড়া। সংগঠনটির নেতৃত্ব দেন : ফয়জুল কবীর, শিকদার আ ন মঈনউদ্দীন, আজিজ সৈয়দ, কমল লোদী, প্রতীক নজরুল, এফ শাহজাহান, সাজ্জাদ বিপ্লব, রাশেদ রোকন, আব্দুল গাফফার তোতা, রহীম সরওয়ার প্রমুখ। পরে যুক্ত হন : মাসুদ কামাল, রহমান তাওহীদ ও আরো অনেকে।
“আমাদের উদ্যোগ একান্তই নতুনত্ব সন্ধানের। বিকল্প উন্মোচনের। আমরা চাই কাঙ্ক্ষিত সামাজিক বিভাজন প্রক্রিয়ার কোন না কোন স্তরে অবস্থান। চাই সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মনোবন্ধ্যাত্বের অবসান। আমরা চাই জীবন ও জগতের আবেশিত মূল্যবোধের বিকশিত রূপ সহ শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির একটি সুস্থ পরিমণ্ডল। নতুন দিক বলয়। আমরা মন, মনন, বুদ্ধি, মগজ, মস্তিষ্কের সুস্থ বিকাশ চাই। সুকোমল অনুভূতিগুলির স্বচ্ছন্দ প্রকাশ চাই। প্রাণের অন্তরধানে শিল্পের অনুরণন চাই। চাই আবেগ অনুভূতিগুলির অবিকল চিত্রায়ণ। সত্য ও সুন্দরের স্নিগ্ধ স্পর্শমণ্ডিত মঞ্চ। যে মঞ্চে সত্যের গান গাইবো, সুন্দরের দিকে ডাকবো কবিতা দিয়ে, নাটক দিয়ে, চিত্রকর্ম দিয়ে। আমরা আমাদের সকল কর্মের পরিণতিকে একটি মোহনায় মিলিত করতে চাই। [ উত্তর সম্পাদকীয়। এক। সাজ্জাদ বিপ্লব সম্পাদিত “পংক্তি”–‘ অবাচী’র লিটল ম্যাগ’। প্রথম সংখ্যা। জুলাই ১৯৯৫। বগুড়া। ]
অবাচী সাংস্কৃতিক সংসদ এর উদ্যোগে আমরা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করি। যার মধ্যে, ২৮ ও ২৯ জানুয়ারি ১৯৯৫, স্থানীয় টিটু মিলনায়তনে ঢাকা’র ” নাট্যমঞ্চ বাংলাদেশ” কর্তৃক প্রামাণ্য থিয়েটার “অজেয় বসনিয়া” র একাধিক সফল মঞ্চায়ন। উডবার্ন পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে “নজরুল স্মরণ সভা ১৯৯৫” ও ৫ নভেম্বর ১৯৯৬ “কবি ফররুখ এর জীবন কেন্দ্রিক আলোচনা সভা ও নাটিকা” উপস্থাপন। ডিসেম্বর ১৯৯৬ শহীদ খোকন পার্কের উন্মুক্ত চত্বরে স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উপলক্ষে “বিজয়ের কবিতা বিজয়ের আলোচনা” ইত্যাদি অনুষ্ঠান ও কার্যক্রম অন্যতম।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে, এ সকল কার্যক্রম ছিলো একান্তই আমাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ও উদ্যোমে। নিজ দেশ, দেশীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও সাহিত্য ভালোবেসে। আমরা রাজনীতি সচেতন হলেও কোন রাজনৈতিক দলের ব্যানারে আশ্রয়-প্রশ্রয় নেইনি বা গ্রহণ করিনি। আমরা চেয়েছিলাম স্বাধীনভাবে আমাদের মত প্রকাশ করতে। বিজাতীয় আক্রমণ বা অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে আপোষহীন লড়াই করার সেই জেদ ও জিহাদ আমাদের শুরু থেকেই বিদ্যমান। ফলে পরবর্তীতে আমরা আর ‘অবাচী সাংস্কৃতিক সংসদ” এ কেন্দ্রীভূত না থেকে নিজ-নিজ বিবেচনা ও সামর্থ্যে অব্যাহত রেখেছি আমাদের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কার্যক্রম।
এ সময়ে আরো একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা বা মাইলফলক হলো, কবি ইশারফ হোসেন বর্ণিত : “পুণ্ড্রবর্ধন আর পাহাড়পুর বিহারের জ্ঞানময় উত্তরাধিকার লিটল ম্যাগাজিনের গৌরবময় কেন্দ্র” বগুড়ায়, নভেম্বর ১৯৯৫ সালে, অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে, আমার ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠে “পুণ্ড্রনগর লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি “–বই ও পত্র-পত্রিকা সংরক্ষণ কেন্দ্র। প্রায় ১০ সহস্রাধিক বই ও লিটল ম্যাগাজিনের এই সংগ্রহশালাটি পরবর্তীতে দেশী-বিদেশী লেখক-পাঠক-গবেষকদের আগ্রহ ও ভালো লাগায় পরিণত হয়।
চৌদ্দ. এগারো. সাতানব্বই। এদিন “পুণ্ড্রনগর লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি”, বগুড়া কর্তৃক প্রচারিত ও প্রকাশিত হয় সাজ্জাদ বিপ্লব সম্পাদিত, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও গবেষণার কাগজ “স্বল্পদৈর্ঘ্য”।
প্রথম সংখ্যা’য় লিটল ম্যাগাজিন ও সাম্প্রতিক সাহিত্য নিয়ে গদ্য লেখেন : ফারুক সিদ্দিকী, আজিজ সৈয়দ, প্রতীক নজরুল, সৈকত ইসলাম, হোসেন দুদায়েভ ও সাজ্জাদ বিপ্লব।
সাহিত্য ও লিটল ম্যাগাজিন কেন্দ্রিক গবেষণা, আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কের ধাত্রীভূমি হিসেবে গড়ে ওঠা এ পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায় লেখেন : মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, প্রতীক নজরুল ও রানা সুন্দরম। এ সংখ্যার সবকটি গদ্য লিটল ম্যাগাজিন, আড্ডা ও কবিতাকেন্দ্রিক।
তৃতীয় সংখ্যায় গদ্য লেখেন : সাজ্জাদ বিপ্লব, কামরুজ্জামান মাসুম, মামুন রশীদ ও জহুরুল ইসলাম টি. আর ( তৌফিক জহুর)। ঢাকা থেকে কবি ইশারফ হোসেন একটি দীর্ঘ ‘সাহিত্য সমালোচনামূলক পত্র” লেখেন। তিনি লেখেন : “সাম্প্রতিক সময়ে ‘দ্রষ্টব্য’, নিসর্গ, ‘নোয়াজার্ক’ ও অন্যান্য আরো দু’একটি কাগজ বগুড়ার সাহিত্যিক গৌরবকে যখন ছড়িয়ে দিচ্ছিলো, ‘সৌন্দর্য ও প্রতিক্রিয়াশীলতা’ যখন একই সাথে প্রচার করছিলো সে মূহুর্তে তুমি, হ্যাঁ, কবি, ছড়াকার, সাহিত্য সংগঠক, সম্পাদক সাজ্জাদ বিপ্লব, প্রমাণ করলে শিল্প চর্চায় বগুড়ায় আরো অনেক সৈনিক ও সেনাপতি রয়েছে। আমি কারো ট্রেড ইউনিয়ন মার্কা সন্ত্রাসী একাধিপত্যকে শৈল্পিক ও সাহিত্যিক আচরণ মনে করি না, যখন তোমার শহরের কেউ-কেউ চমৎকারিত্বের ভেতর এসব লালন করে চলেছে। ভাল কাজ ও সৃজনশীলতার নানাবিধ জোয়ারে এসব কে বিশুদ্ধ করে দাও। ধ্বংস নয়, বিরোধিতা নয়, অপপ্রচার নয়, সুবিবেচনা, সমালোচনা পাঠ ও বিশ্লেষণের বৌদ্ধক বিচারে প্রত্যেকটি কাজের স্বরূপ উন্মোচন কর। তবেই চোখে পড়বে প্রকৃত সত্যের নির্মোহ নৈর্ব্যক্তিক উৎকর্ষতা ও যথার্থতা।”
পরের বছর, ১৯৯৬ সালে, সাতমাথা, বগুড়ার সন্নিকটে এম. এ. খান লেনে’র নাজ কমপ্লেক্সে, আমার ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে বগুড়ার আড্ডার প্রাণকেন্দ্র : পার্বণ। বাণিজ্যিক ধারায় অবাণিজ্যিক কেন্দ্র। মূলত বিকল্প ধারার বই ও পত্র-পত্রিকার দোকান,পার্বণ, ছিলো তৎকালীন লেখক-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিকর্মীদের অবাধ বিচরণ ভূমি। আমাদের স্লোগান ছিলো : প্রতিদিনের বইমেলা, পার্বণ। প্রতিদিন এখানে কোন না কোন সময় এসে জড়ো হতেন এ শহরের অগ্রসর চিন্তার মানুষেরা। দিনভর, এমনকি মধ্য রাত পর্যন্ত চলতো বিরতিহীন আড্ডা। বই ও পত্র-পত্রিকা আদান-প্রদান। সারাদেশ সহ বিশ্বসাহিত্যের খোঁজখবর। ইত্যাদি। কত লিটল ম্যাগাজিন, বই ও পত্র-পত্রিকার পরিকল্পনা, প্রকাশ ও প্রচার হয়েছে এ স্থান থেকে, তা আজ ভাবলে অবাক হতে হয়। কালের নিয়মে ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠানটি বিলুপ্ত হয়ে যায় চিরকালের জন্য। এ কথা বলা যায়, সকলের প্রিয় এই প্রতিষ্ঠানটি বগুড়ার সাহিত্য আন্দোলনের ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে বেঁচে থাকবে, চিরকাল।
৩.
আমি বলি ও বিশ্বাস করি, বগুড়া হলো সম্পাদকের শহর বা রাজধানী। যেমন, বরিশালকে মনে করি, কবিদের দেশ।
বগুড়া শহরে বা জেলায় যতজন সাহিত্যিক বা সাহিত্যকর্মী দেখা যায় কমবেশি তাদের প্রত্যেকেই এক-দু’টি পত্রিকা বা লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক। অর্থাৎ সম্পাদনা আমাদের রক্তে মেশানো। আমরা যেন প্রত্যেকে বাই বরন এডিটর। এটি ভালো কি মন্দ তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। থাকতে পারে বহুমত। থাকুক। আপাতত সে সব পাশে সরিয়ে রেখে আমাদের কাল (নব্বই দশক) ও সাহিত্য পরিবেশ নিয়ে কিছু বলা যায়।
তার আগে পিছন ফিরে দেখে নেওয়া যায় বগুড়ার অতীত সাহিত্যচর্চা ও আন্দোলনের এক ঝলক চিত্র।
পুণ্ড্রবর্ধনখ্যাত প্রাচীন জনপদ বগুড়ার সাহিত্য ও সংস্কৃতি এক গৌরবময় ধারাবাহিকতায় যুক্ত। করতোয়াবিধৌত এ নগরে জন্মেছেন অনেক খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। যাদের কল্যাণে ও অবদানে সমৃদ্ধ হয়েছে আজকের বাংলাভাষা ও বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি।
প্রথমেই শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে হয়, “বাঙ্গালা সাহিত্যের নূতন ইতিহাস” লিখে যিনি প্রচলিত ইতিহাসে জোর ধাক্কা দেন, সেই নাজিরুল ইসলাম মোহাম্মদ সুফিয়ানকে।
বেশ কয়েকটি গ্রন্থের জনক বিশ্বপরিব্রাজক (তৎকালে যিনি ২২টি দেশ ভ্রমণ করেন) নাজিরুল ইসলাম মোহাম্মদ সুফিয়ান এর একটি গ্রন্থের ভূমিকা লিখেন, তার বন্ধু কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
তিনি তার ভূমিকায় নাজিরুল ইসলাম মোহাম্মদ সুফিয়ানকে উদিত সূর্যের সাথে তুলনা করেন। কবি বলেন, “যে সূর্য উদিত হয়েছে, তাকে আর নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নাই।”
ইনিও ‘’জয়তি’ এবং ‘’ছায়াবীথি’’ নামে ত্রিশের দশকে কলকাতা থেকে দুটি উল্লেখযোগ্য পত্রিকা সম্পাদনা করেন।
এরপর আমরা শ্রদ্ধাসহ উচ্চারণ করি দুই কৃতি ইতিহাসবিদ শ্রী প্রভাসচন্দ্র সেন (বগুড়ার ইতিহাস) ও কাজী মোহাম্মদ মিছের (বগুড়ার ইতিকাহিনী) এর নাম।
প্রবীণ কবিদের মধ্যে উল্লেখ্যোগ্য হলেন: রোস্তম আলী কর্ণপুরী, কে.এম.শমসের আলী(বাংলা একাডেমী পুরস্কারপ্রাপ্ত। সনেটবিশারদ হিসেবে খ্যাত), তাজমিলুর রহমান প্রমুখ।
বগুড়ায় জন্মগ্রহণ না করলেও এক সময় বগুড়া আজিজুল হক কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। এ সময় তিনি, “আঙুর” নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন।
সাময়িকপত্র বা লিটলম্যাগাজিন সম্পাদনার ইতিহাসে বগুড়ার নাম বরাবর-ই শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।
এক্ষেত্রে মহসীন আলী দেওয়ান সম্পাদিত মাসিক “অতএব” (১৯৬১) একটি উল্লেখযোগ্য নাম। বগুড়ার এবং বগুড়ার বাহিরের অনেকে এ পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। মুক্তিযুদ্ধের একজন শহীদ সাংবাদিক মহসীন আলী দেওয়ান, বগুড়া প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতিও ছিলেন।
এনামুল হক সম্পাদনা করতেন, উত্তরণ। কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ জানান: “বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠিক আমাদের অগ্রজ, লেখক হিসেবেও, ছিলেন সেবাব্রত চৌধুরী, হুমায়ুন চৌধুরী, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, হায়াৎ মামুদ প্রমুখ। এনামুল হক (পরে ডক্টর, বিশালায়তন যাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা-প্রধান) ছিলেন স্বভাবনেতা। “সমকালে”র সমকালেই তিনি “উত্তরণ” নামে একই সাইজের একটি দ্বি-মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন। জ্যোতি-হুমা-সেবার-রা (আমরা সংক্ষেপে এভাবেই বলতাম) এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।”
বলা দরকার যে, ড. এনামুল হক বগুড়ার সন্তান।
পূর্বমেঘ (১৯৬১) রাজশাহী থেকে সম্পাদনা করতেন মুস্তাফা নূরউল ইসলাম ও জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। আবদুল মান্নান সৈয়দ এর বর্ণনায় : “রাজশাহী থেকে “পূর্বমেঘ” নামে এক পত্রিকা বেরোত। সম্পাদক ছিলেন মুস্তাফা নূরউল ইসলাম ও জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। মফস্বলের কোন ছাপ ছিল না।নির্ভুল, সুচারু পত্রিকা।তরুণ লেখকদের প্রতি পত্রিকাটির আগ্রহ ছিল।”
উল্লেখ্য, প্রফেসর মুস্তাফা নূরউল ইসলাম বগুড়ার সন্তান। পরবর্তীতে যিনি “সুন্দরম” সম্পাদনা করেন।
ফেব্রুয়ারি ২০০২ “স্বল্পদৈর্ঘ্য, ‘প্রসঙ্গ : বগুড়া’ সংখ্যায় “বগুড়ার সাহিত্য : সেকাল-একাল” রচনায় আমি বগুড়ার ষাটের দশক থেকে নব্বইয়ের শেষ পর্যন্ত লিটল ম্যাগাজিন চর্চার চিত্র আঁকার চেষ্টা করেছি।
তখনও (নব্বইয়ে) আমাদের মধ্যমনি হয়ে আছেন ষাটের কবি ও লিটল ম্যাগাজিন ‘বিপ্রতীক’ [প্রথম প্রকাশ : জানুয়ারী ১৯৬৭] সম্পাদক ফারুক সিদ্দিকী। [বলে রাখা ভালো যে, সম্প্রতি কবি ও সম্পাদক ফারুক সিদ্দিকী ইন্তেকাল করেছেন শুধু বগুড়া নয় সমগ্র বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তার পত্রিকাটি ছিলো একটি দীর্ঘজীবী ও প্রকৃত লিটল ম্যাগাজিন।] আরো আছেন কবি-প্রাবন্ধিক বজলুল করিম বাহার, কবি মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কবি রেজাউল করিম চৌধুরী [ সদ্য লোকান্তরিত ] প্রমুখ। উল্লেখ্য, উনারা প্রত্যেকেই এক বা একাধিক পত্রিকার সম্পাদক।
‘বিপ্রতীক’ বের করছেন কবি ফারুক সিদ্দিকী। কবি রেজাউল করিম চৌধুরী সম্পাদনা করছেন, ‘অর্কেস্ট্রা’। এ সময়ে বগুড়া থেকে প্রকাশিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাগজ হলো : নিসর্গ, দ্রষ্টব্য, নোয়াজার্ক, পংক্তি, লিমেরিক, দরুদ, বিদ্রোহ, দুই বাংলার থিয়েটার, নেমেসিস, বিকেল, স্বল্পদৈর্ঘ্য, উদ্যান, পরমা, সুতরাং, প্রতিকাগজ, ডামি এডিশন, দিঘি, দ্বিবাচ্য, জলছাপ, দোআঁশ, কাকতাড়ুয়া, আঁতুড়ঘর, পুণ্ড্র। ইত্যাদি।
নব্বই কে আমি চিহ্নিত করতে চাই, “লিটল ম্যাগাজিন এর জোয়ার” এর দশক হিসেবে। এ কালখণ্ডে সারাদেশে যত পত্র-পত্রিকা ও লিটল ম্যাগাজিন বের হয়েছে তা অন্য সময়ে হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। এ সময়ে কবিতাও লেখা হয়েছে প্রচুর। দেখা গেছে অসংখ্য কবি। সাহিত্যিক।
লিটল ম্যাগাজিন মানেই বিদ্রোহ ও বিপ্লব। গতানুগতিকতার বাইরে কথা বলা। পথ চলা। এভাবে চলতি পথে (অর্থাৎ লিটল ম্যাগাজিন চর্চা কালে) সম্ভবত ১৯৯৭/৯৮ সালে একদিন হাতে এলো, মামুন রহমান ও ফখরুল আহসান সম্পাদিত ফেব্রুয়ারি ১৯৯০ সালে বগুড়া থেকে প্রকাশিত পত্রিকা ‘পথ’। উক্ত সংখ্যায় কবি আল মাহমুদকে আক্রমণ করে তীব্র বিদ্বেষমূলক একটি লেখায় চোখ আটকে গেলো। লেখাটি লিখেছেন শোয়েব শাহরিয়ার, “দিকভ্রষ্ট আল মাহমুদ ও তার কবিতা”। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম আলোচনা(?)টির পরতে-পরতে হিংসার বিষ আর বিদ্বেষের ছড়াছড়ি। আল মাহমুদ কি এমন পাপ করেছেন যে তাকে এভাবে গালি শুনতে হবে? আরো অবাক লাগলো এই দেখে যে, কেউ এর কোন জবাব বা প্রতি উত্তর তখন পর্যন্ত (১৯৯৮) লিখেন নাই। অবশেষে আমি লিখে ফেললাম পাল্টা জবাব : “লক্ষ্যভেদী আল মাহমুদ ও একটি বিদ্বেষপূর্ণ আলোচনা”। ইটের বদলে পাটকেল। ছাপা হলো কবি তৌফিক জহুর সম্পাদিত ” উদ্যান” পত্রিকায় (পরে এটি “স্বল্পদৈর্ঘ্য” আল মাহমুদ সংখ্যায় সন্নিবেশিত হয়)।
আমার (ও আমাদের) সাহিত্য চর্চার একটি দিক ও চরিত্র হলো সাহিত্যে অন্যায় আচরণ এর প্রতিবাদ করা। কাউকে বিনা চ্যালেঞ্জে না ছাড়া। শুরু থেকে আজ অবধি আমরা, বিশেষ করে আমি, সে লক্ষে অটল ও অবিচল।
এভাবেই আমরা, আমাদের পত্রিকা বা প্রকাশনা ছড়িয়ে দিতে থাকি সারাদেশে। এমনকি দেশের বাইরেও। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতাতেও আমরা যোগাযোগ করি ও গড়ে তুমি সেখানকার সাহিত্যকদের সঙ্গে মেলবন্ধন। শুরু হয় আদান-প্রদান। লেনদেন। ওরা পাঠায় ওদের পত্রিকা। আমরাও বিনিময় করি আমাদের প্রকাশনা।
এ সময় সাহিত্য সচেতন বা লিটল ম্যাগাজিনের পাঠক হিসেবে আমাদের চোখে পড়ে “উত্তর আধুনিকতা, “অধুনান্তিকতা”, ওরিয়েন্টালিজম, সাব অল্টার্ন স্টাডিজ ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা। তর্ক-বিতর্ক। এতে আমরাও আলোড়িত, বিক্ষেপিত হতে থাকি। হতে থাকি শিহরিত। উদ্দীপিত।
ইউরোপ বা কলকাতা বাহিত তাত্ত্বিক পোস্ট মডার্নিজম বা উত্তরাধুনিকতা নয়, বরং আল মাহমুদ এর “সোনালী কাবিন” সহ অন্যান্য কবিতার মনোমুগ্ধকর বয়ান ও তার কবিতাকে “উত্তর আধুনিক” কবিতা হিসেবে চিহ্নিত করে চট্টগ্রাম থেকে এজাজ ইউসুফী সম্পাদিত ও প্রকাশিত “লিরিক” উত্তর আধুনিক কবিতা, সংখ্যাত্রয় আমাদের আশান্বিত করে। আমরা হাতে পাই, উত্তর আধুনিকতা বিষয়ে সমৃদ্ধ আরো কয়েকটি সংখ্যা, যার মধ্যে : একবিংশ, দ্রষ্টব্য, ১৪০০, আড্ডারু, উপমা, পংক্তি, সুদর্শনচক্র, সকাল, প্রান্ত, বিকেল, একলব্য, চম্পকনগর উল্লেখযোগ্য। এরপর শুরু হয় নিজেদের মূল্যায়ন ও পঠন-পাঠন। আমাদের পত্রিকা “বিকেল”, “স্বল্পদৈর্ঘ্য” ইত্যাদিতে প্রকাশ হতে থাকে এ বিষয়ে আমাদের চিন্তা-ভাবনা ও অবস্থান। মূলত এভাবেই আমরা জড়িয়ে পড়ি উত্তর আধুনিক সাহিত্য আন্দোলনে।
৪.
আমাদের (এক্ষেত্রে, আমার) সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্র বা আগ্রহের কথা আমি বলতে পারি।
আমি মূলত এবং প্রধানত একজন লিটল ম্যাগাজিনের লেখক, প্রকাশক ও যোদ্ধা। লিটল ম্যাগাজিন একটি যুদ্ধক্ষেত্রের নাম। বিচরণ ভূমি। এখানে প্রত্যেকটি লিটল ম্যাগাজিন এক-একটি দেশ। সম্পাদক-প্রকাশক-লেখকেরা এদেশের পরিচালক-নাগরিক ও সৈনিক । অঘোষিত এ সব দেশ, সত্যিকারের দেশের মতোই স্বতন্ত্র, স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বাভাবিক [মোটাদাগে কিছু-কিছু ব্যতিক্রম বাদে]।
সাহিত্যে সাম্প্রতিক বিষয়-আশয়-বিতর্ক, ঐতিহ্যের পূনর্মূল্যায়ন, কবিতা, লিটল ম্যাগাজিনের খোঁজখবর ইত্যাদি বিষয়ে আমার আগ্রহ প্রবল। আমার সাহিত্য অভিমুখিতা বিচিত্র ও ব্যতিক্রমী। সে কারনে, যখন যে বিষয় সামনে এসেছে (বা এখনো আসছে) তা খতিয়ে দেখা বা পরখ করার অভিপ্রায়ে স্বাভাবিকসূত্রে জড়িয়ে পড়া উত্তর আধুনিক আন্দোলনে। এ আন্দোলন আমাদের নিজেদের পরিচিত তুলে ধরার আন্দোলন। নিজেদের শেকড় খোঁজার আন্দোলন। নিজেদের আলোড়িত করার আন্দোলন। সঙ্গত কারণেই প্রেরণার উৎস হিসেবে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায় পূর্বজ কবি-সাহিত্যিক-চিন্তকবৃন্দ। নিজেদের তুলে ধরার পাশাপাশি মূল্যায়ন করি তাদেরও। এক্ষেত্রে সমমনা অনেকেই পাশে এসে দাঁড়ায়।
সাম্প্রতিককালে যারা এ আন্দোলন বা কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছেন তাদের সকলকে আমরা আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। আর যারা, বুঝে বা না বুঝে এ আন্দোলন বা চিন্তা-চেতনায় যুক্ত না থেকে নিজেদের মতো কাজ করে যাচ্ছেন, তাদেরকেও মোবারকবাদ।







