শাকিল রিয়াজ
শান্তা মারিয়া তখন মুক্তকণ্ঠে কাজ করতো। আর আমি জনকণ্ঠে। নব্বই দশকের প্রথম ভাগের কথা। পুতুলের মতো দেখতে মেয়েটি মাঝেমধ্যে লেখা দিতে আসতো। কখনও আমাদের সাহিত্য- সাময়িকীর জন্য, কখনও অপরাজিতা বিভাগের জন্য। কথা বলে বুঝলাম, এ তো পুতুল না! বারুদ। টোকা দিলেই বিস্ফোরণ। শান্তার জানাশোনা আর মেধার আলো ও উত্তাপে ঝলসে যেতে হয়।
একসময় জনকণ্ঠে যোগ দিয়ে অপরাজিতার দায়িত্ব নিলো। বুদ্ধিমত্তার পাশাপাশি তুখোর সেন্স অব হিউমার। আর প্রচণ্ড স্মরণ শক্তির অধিকারী। ঠাট্টা করে বলতো, নিজের জন্মের মুহূর্তের কথাও মনে আছে তার। হতে পারে! অবিশ্বাস করি না।
জন্মই মেধাবী পরিবারে। পিতামহ বহু ভাষাবিদ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। পিতা ভাষাসৈনিক, আধুনিক বাংলা দিনপঞ্জির সংস্কারক, গবেষক ও বামপন্হী তাত্ত্বিক মুহম্মদ তকীউল্লাহ। শান্তার রক্তে সেই ধারা।
শান্তা কবি। বিষয় ও প্রকরণে তার কবিতা অনন্য। শান্তার কবিতাই বলে দেয় তার পড়াশোনার গভীরতা। ভারতীয় ও বঙ্গীয় পুরাণ শান্তার কবিতায় নাচের মতো দোলে।
শান্তা আমার বন্ধু হয়ে যায় দ্রুত। আমরা পরস্পরের কবিতা পড়তাম আর আলোচনা করতাম। শান্তাকে উৎসর্গ করে আমার যেমন কবিতা আছে, তেমনি আছে আমাকে নিয়ে শান্তারও। এমনকি দু‘জনে মিলে একটি কবিতা লেখার নিরীক্ষাও আমরা করেছি। কবিতাটি ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়েছিল। আমাদের আড্ডায় সাহিত্য যেমন থাকতো, অসাহিত্যও থাকতো। জীবন তো শুধু সাহিত্য না!
আমাদের সঙ্গে পরে যুক্ত হলো শান্তার স্বামী কবি শাহীন রিজভী, সাংবাদিক ফারহানা মিলি, হাসনাত। অফিসের পর আমাদের বসতেই হতো কোথাও। কখনও ক্যাফেতে, কখনও কাবাবে, কখনও আমার বাসায়, কখনও শান্তা-শাহীনের বাসায়। আড্ডায় রাত পার হতো কত! শান্তার শ্বশুরবাড়ি, শাহীনের সুস্বাদু রান্না, রাতভর নৌ-বিহার কিংবা সোনারগাঁ, জয়দেবপুর, সিলেট, জাফলং। ক্লান্তিহীন ছিল আমাদের সান্নিধ্য, ভ্রমণ, বন্ধুত্ব।
আমার প্রবাস জীবনের ঘাড়ে দায় দিয়েই বলছি, শান্তার সঙ্গে দেখা হয় না বহু বছর। কথা হয়, আড্ডা হয় নেটে। কদাচিৎ। তবে ফেইসবুকের কারণে সব খবরই জানাজানি হয়। মন খারাপ, মন ভালো, সুখ-অসুখ, প্রেম-ঘৃণা-ক্রোধ এমনকি মনের একান্ত ভাবনাটিও জানা হয়ে যায়। শান্তার বাবার মৃত্যুর খবরে প্রচণ্ড আহত হয়েছিলাম। প্রিয় খালাম্মার মানসিক ও শারিরীক স্বাস্থ্যের অবনতিতে মন খারাপ হতো। খোঁজ পেতাম শান্তা তার মনোবল ধরে রাখে। নিজের স্বাস্থ্য, অসুখ-বিসুখ নিয়ে তামাশা করে। বলে, মরে যাচ্ছি। নিজের লো প্রেসারকে মুরগীর প্রেসারের সঙ্গে তুলনা করে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে যন্ত্রপাতিসমেত ছবি আপলোড করে সবার কাছ থেকে বিদায় নেয়। একবার দেখলাম ফেইসবুকে গলা ফাটাচ্ছে। একজন গাইনি ডাক্তার লাগবে তার। এই হলো শান্তা। হিউমারাস, অথচ সোজা সাপটা।
শান্তা উৎসব-পাগল। যে-কোন উৎসব পার্বনে শান্তার উৎসাহ আর আয়োজন বর্ণিল। সেটা ধর্মীয় হোক, বাঙালি হোক অথবা পারিবারিক। সবকিছুর ঊর্ধে শান্তা এক বাঙালি নারী। সাজগোজ, পোশাক-পরিধান, অলংকার, খাদ্যরুচি সবকিছুতে বাঙালিয়ানাই বিবেচ্য। চীনের প্রাচীরে শাড়ীপরা শান্তাকে দেখে বেখাপ্পা লাগে না তাই। বেইজিং থেকে মেসেঞ্জারে জানালো, আলুভর্তা আর লালশাক রাঁধছে। চাইরটা ভাত খাবে। শান্তা নিজের পছন্দ-অপছন্দ, মতামত জানাতে কখনও সংকোচ করে না। নিজে যা সেটা সেভাবেই প্রকাশে স্বস্তি আর আনন্দ পায় সে।
নারী অধিকার আন্দোলনে শান্তা নিশ্চিত অর্থেই প্রথম সারির সংগ্রামী। তার ক্ষুরধার লেখায় উদ্বুদ্ধ হয় নারী-পুরুষ। রাজপথেও নেমে পড়ে প্ল্যাকার্ড হাতে। ছোটখাট গড়নের এই পুতুলটি তখন বারুদ হয়ে ওঠে।
সবকিছু ছাপিয়ে শান্তা আমার বন্ধু। সৌহার্দ্যে সান্নিধ্যে আন্তরিকতায় মোড়ানো এই বন্ধুত্বের দেয়ালেই লেখা রয়েছে সব কথা। সব গল্প। সব ফিকশান।
আজ শান্তা মারিয়ার জন্মদিন। বছর কয়েক আগের এই দিনটিতে স্ট্যাটাস দিয়ে জানিয়েছিল, জন্মদিনটি কাটিয়েছে হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করে। ডাক্তারকে নাকি সাফ জানিয়ে দিয়ে এসেছে, একশো বছর বাঁচতে চায়।
শান্তা শতায়ু হোক, জন্মদিনে এই কামনা।
(ছবি দুটি বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকা তামাবিল চেকপোস্টে সম্ভবত ২০০১ সালে তোলা। একটি ছবিতে আমাদের সঙ্গে শান্তার স্বামী কবিবন্ধু শাহীন রিজভীও রয়েছে)







