তৌফিক জহুর
বয়ান শুরু :
………….
নব্বই দশকের ট্রেনে যে ক’জন কবি আসন গেড়ে বসেছিল, যাঁরা জানতো না গন্তব্য কতদূর, যাঁরা ক্রমাগত ট্রেনেই রয়ে গেছেন এবং এখনো অবাক সচল তাঁদের মধ্যে কবি শান্তা মারিয়া একজন। ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং পৌরাণিক চরিত্রদের সৌন্দর্য যাঁর কবিতায় বারেবারে ফিরে ফিরে আসে তিনিই শান্তা মারিয়া। ত্রিশ বছর ধরে নব্বইয়ের বগিতে বসে এমন সব কবিতার জন্ম দিয়েছেন যা ইতোমধ্যে আলোচিত, বহুল পঠিত এবং পাঠক নন্দিত। তাঁর কবিতার রস আস্বাদন করার জন্য তিনটি কবিতা বাছাই করে নিয়ে এলাম আমার কবিতা কারখানায়। অতঃপর কবিতা তিনটির অন্দরমহলে প্রবেশ করে শুরু হলো আমার নিজস্ব শল্য জগৎ। আমি কিছু আবিষ্কার করলাম। কিছু পেলাম। কি পেলাম। তা বয়ান করছি, তার আগে তিনটি কবিতা আর একবার পাঠ করি।
ওম মণি পদ্মে হুম
শান্তা মারিয়া
……………
তারপর কোশলের প্রাচীন সড়কে
রাত্রি নেমে এলো।
আরতির প্রদীপ আর ধূপের ধোঁয়া
মিলিয়ে এলো শিশিরের জলজ সৌরভে।
বিষ্ণু মন্দিরের দেবদাসীরা
কামজ লীলা শেষে
আঁচলে বেঁধে নিল প্রগাঢ় রাত্রিকে।
নগর নটীর উচ্ছ্বল নূপুর
ক্লান্ত হতে হতে
আকাশের দেহে উৎকীর্ণ করে চলে
বাসনার ক্ষীণ ক্যাসিওপিয়া।
ঘুমন্ত কপিলাবস্তুর উদ্যান প্রাসাদে
শাক্যকুমার
জীবনের অনিঃশেষ ক্লান্তিতে বিপর্যস্ত।
তবে কি যযাতিই ঠিক?
বাসনার রক্তবীজ
দেহকে উত্তাল করে
যে দেহ কীটের খাদ্য
সে দেহের অলিতে গলিতে
কন্দর্পের অক্ষয় রাজ্যপাট।
তক্ষশীলা থেকে গান্ধার মিথিলা
আকণ্ঠ নিমগ্ন কেন মৃগয়া মৈথুনে
সুপ্রাচীন আর্যভূমি জুড়ে
চার্বাকের অট্টহাসি
ভয়ংকর প্রতিধ্বনি তোলে।
যশোধরা অথবা রাহুল
চেতনার স্তরে স্তরে নতুন পলল।
গৌতম হেঁটে যান।
তার পদশব্দে
আড়মোড়া ভাঙে যাবতীয় মোহান্ধ অসুর।
কাঁচ ভাঙার শব্দে ভেঙে পড়ে
বৈশালী, শ্রাবস্তী, বারাণসী, লিচ্ছবি নগর।
বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি
সংঘং শরণং গচ্ছামি
পথ শুধু পথ
অন্তহীন প্রবাহণ
শ্রাবস্তীর জেতবনে উচ্চারিত অলংঘ্য বিধান
শ্রেষ্ঠী, নৃপতি, ক্ষত্রপ, বনিতা
স্বয়ম্ভুর স্তূপে জ্বলে অমোঘ প্রদীপ।
মহা উচ্চতায় মাথা হেঁট করে
অন্নপূর্ণা, কাঞ্চনজংঘা, সাগরমাতা
তীব্র শিখায় বিস্ময়ে বিমুগ্ধ দূরবর্তী কাল।
সিদ্ধার্থ দুইচোখ করুণায়
অবিরল নিম্নমুখী।
ব্যধি জরা মৃত্যু ধ্বংস
তবুও নির্বাণ নয়
বড় বেশি আকাঙ্ক্ষিত মানবজীবন
অবন্তিকা মালবিকা বাসবদত্তা
এখনও উত্তাল
বাজে প্রলয় নিক্কণ।
আমাদের নিভৃত রক্তকণিকায়
বাৎস্যায়ন জয়ধ্বনি তোলে
যশোং দেহি ধনং দেহি
হোমাগ্নি আচ্ছন্ন আকাশ।
তুষিত স্বর্গ ছেড়ে আরেকবার যদি
বোধিসত্ত্ব দিয়ে যায় অবারিত প্রেম
অনিঃশেষ আর্যভূমি
কুমার মৈত্রেয়
বোধিদ্রুমের প্রাচীন শিকড় ছুঁয়ে
আরেকবার উচ্চারিত হোক
ওম মণি পদ্মে হুম।
ইউসুফের আহত ঈগল
শান্তা মারিয়া
……………
জুলেখার প্রাণের ভিতর
ডানা মেলে অচেনা ঈগল
তীক্ষ্ণ আর্তনাদে উড়ে যায় পর্বত শিখরে
ফসলের ক্ষেত থেকে ভেসে আসে আদিম নির্যাস।
বনিআদমের কন্যাগণ
মেতে ওঠে নবান্ন উৎসবে
সুপ্রাচীন আইসিস হাসে
নির্জন রাত্রির বেশবাস খুলে
নিনেভা সম্রাট মুগ্ধ অপলক
দেবীর গোপন রূপে।
আন্দোলিত হয় একান্ত নদীর জল
অস্থির নক্ষত্র সব
তাণ্ডব প্রবাহ বর্ষণ করে সুতীব্র ঘৃণায়।
প্রাজ্ঞ নক্ষত্র জানে,এরা সব অবোধ বালক
সারিবদ্ধ কাফেলার উট।
এবং নিয়তির এমনি নির্বন্ধ
ইউসুফের মোহন রূপে
পাড় ভাঙ্গা আহ্বান গীত।
বাঘবন্দি খেলায় একজনকে তো হারাতেই হবে
অপরূপ আলোর জানালা।
জুলেখার প্রাণ চিরে বাস করা
সোনালি ঈগল নেমে আসে ফসলের ক্ষেতে
কান পেতে শোনে সমুদ্রের বিক্ষুব্ধ গর্জন।
কাহিনির ভাঁজে ভাঁজে লেখা হয় অন্য কাহিনি।
রহস্যের গভীর আঁধারে
বাক্সবন্দি তুলোট কাগজ
প্রাচীন হরফে বলে যায়
ভালোবাসার নিগূঢ় আলাপ।
মিশরের রাজপথে
যতবার প্রবাহিত জুলেখার শব
সুশোভিত শবাধার ছুঁয়ে
ততোবার উড়ে যায়
ইউসুফের আহত ঈগল।
বিরল প্রেমিকদের জন্য
শান্তা মারিয়া
……………
[উৎসর্গ: একবার ভালোবেসে যদি
ভালোবাসিতে চাহিতে তুমি সেই ভালোবাসা
–জীবনানন্দ দাশ, ১৩৩৩]
ভালোবাসাগুলোকে ঠিকমতো
ভালোবাসা হলো কি না …
ভালোবাসা নিয়ে দ্রৌপদীর কোনো উৎকণ্ঠা ছিল না।
তিনি বুঝতেন কাম, জয়, মোক্ষ কিংবা স্বর্গ।
ঈশ্বর এবং ভালোবাসা তখনও একটি
অস্পষ্ট অবয়ব, ঝাপসা ধারণা
কাম ও প্রেম জড়াজড়ি করে এক দেহে লীন
ঈশ্বর তখনও দেবতা
প্রায়শই সোম আর সাকিতে
আকণ্ঠ নিমজ্জিত
এবং এখনো
বৃদ্ধ পুরুষেরা হেঁটে হেঁটে
মৃত্যুর দরজায় পৌঁছে
বারে বারে পিছন ফিরে তাকায়
কোথাও ঘাটতি রয়ে গেল কি না
(ভালোবাসা নয়)
যে নারীকে দেখে হাত বাড়িয়েছিল অনেক যুযুধান
আমি তাকে আটকেছিলাম
নিজস্ব খাঁচায়
তৃপ্তিতে ভরে ওঠে বুক
কিংবা হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে মনে হয়
সুকন্যা এখন আলোকিত করে পরের বাগান
পাওয়া হলো না
কিছুই পাওয়া হলো না
কাঁটাগাছ হয়ে
অতৃপ্তি খামচে ধরে পায়ের পাতা
শিরদাঁড়া পাকে পাকে জড়ায়
শীতল অজগর
কবরের কালো মাটি দেখে
মনে পড়ে কৃষ্ণার কালো চুল
(ভালোবাসা নয়,
তোমরা কেউ প্রেমিক ছিলে না)
সোনালি বল নিয়ে
খেলতে খেলতে একদিন
মহিলার আয়ু শেষ হয়
ঠোঁটের কষ বেয়ে গড়িয়ে যায়
পানের রস, বাৎসল্য, এক আধটু প্রেম
রমণী ও জননীর
জীবন যাপনের পালা সাঙ্গ করে
অতঃপর পুঁটিমাছ খুঁটে খায়
তসবির দানা।
হায় ভালোবাসা
তোমার পায়ে নিচে
একখণ্ড জমি নেই কোথাও
তবু কোনো কোনো
জলভাসা বিরল মানুষ
তোমার খোঁজে ট্রামলাইনে
বিছিয়ে দেয় নিজস্ব শরীর
একবার ভালোবেসে
অতঃপর তার পশ্চাৎধাবন
কঠিন-
হয়তো দারুণ বোকামি।
আমার কবিতা কারখানায় শল্য চিকিৎসা :
………………………………………….
শান্তা মারিয়ার তিনটি কবিতা “ওম মণি পদ্মে হুম”, “ইউসুফের আহত ঈগল” এবং “বিরল প্রেমিকদের জন্য” সমসাময়িক বাংলা কবিতায় এক ধরনের বহুমাত্রিক বয়ান নির্মাণ করে, যেখানে ইতিহাস, পৌরাণিকতা, ধর্মদর্শন, দেহতত্ত্ব এবং প্রেমের অন্তর্গত সংকট একে অপরের সঙ্গে জটিলভাবে জড়িয়ে যায়। এই কবিতাগুলোকে একত্রে পাঠ করলে স্পষ্ট হয়, কবি কেবল নান্দনিক ভাষা নির্মাণে আগ্রহী নন; বরং তিনি মানবচেতনার গভীর স্তরে সঞ্চিত আকাঙ্ক্ষা, মোহ, ভাঙন এবং মুক্তির ধারণাকে এক ধরনের আন্তঃপাঠ্য (intertextual) বিন্যাসে উপস্থাপন করতে চান। ফলে এখানে পাঠ কেবল অভিজ্ঞতার নয়, বরং একধরনের বৌদ্ধিক ও দার্শনিক অনুসন্ধানও বটে। যেহেতু কবিতাকে প্রথমত কবিতা হতে হয়, শেষতও কবিতা হতে হয়। কবিতা রচিত হয় আবেগাক্রান্ত হয়েই, কিন্তু সে আবেগ চরিত্রবান আবেগ। কবির আবেগে থাকে শব্দের সম্মোহ, ছন্দের আবর্তমানতা, চিত্রকল্পের সংরোগ, দীর্ঘকালীন অধ্যয়ন, স্বজ্ঞা অনুশীলন ও আকাঙ্খা, রাতের চাঁদ, রাতের আকাশ, দিনের সবুজবীথি, সমুদ্র, নদী, পাহাড়, বৃক্ষের ছায়া। যা একজন কবিকে আন্দোলিত করে। নব্বই দশকের কবি শান্তা মারিয়া এসব ধারণ করেন। এছাড়া তিনি ধারণ করেন সভ্যতা। ইতিহাস। ঐতিহ্য। পৌরাণিক চরিত্র এবং নিজস্ব বিশ্বাস।
প্রথম কবিতা “ওম মণি পদ্মে হুম” মূলত এক আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক ভ্রমণচিত্র, যেখানে বৌদ্ধ দর্শনের জন্ম ও বিস্তারকে কেন্দ্র করে মানবিক কামনা-বাসনার অনিবার্যতা এবং তার অতিক্রমের প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। কবিতার শুরুতেই “কোশলের প্রাচীন সড়ক”, “বিষ্ণু মন্দির”, “দেবদাসী”, “নগর নটী” এইসব চিত্রকল্প একদিকে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার ভোগবাদী ও আচারনির্ভর রূপকে সামনে আনে, অন্যদিকে সেই রূপের মধ্যেই নিহিত ক্লান্তি ও শূন্যতার ইঙ্গিত দেয়। এখানে দেহ কেবল ভোগের উপকরণ নয়, বরং এক অন্তহীন চক্রের প্রতীক, যা “রক্তবীজ”-এর মতো পুনরুৎপাদিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে গৌতম বুদ্ধের আবির্ভাব একটি মৌলিক বিপর্যয় সৃষ্টি করে। কবি দেখান, “গৌতম হেঁটে যান” এই সরল বাক্যটির মধ্যেই নিহিত আছে এক গভীর ঐতিহাসিক ও দার্শনিক রূপান্তর। তাঁর পদশব্দে “মোহান্ধ অসুর”-এর আড়মোড়া ভাঙে, অর্থাৎ অজ্ঞতা ও ভোগলিপ্সার যে আধিপত্য, তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এখানে বৌদ্ধ দর্শনের “নির্বাণ” ধারণা সরাসরি উচ্চারিত না হলেও তার প্রতিধ্বনি স্পষ্ট জীবনের দুঃখ, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর অনিবার্যতার মধ্যেই মুক্তির অনুসন্ধান। তবে কবি একমুখী মুক্তির বয়ান নির্মাণ করেন না। বরং তিনি দেখান, মানবজীবনে কামনা ও আকাঙ্ক্ষা এতটাই প্রোথিত যে তা সহজে লুপ্ত হয় না। “বাৎস্যায়ন জয়ধ্বনি তোলে” এই চিত্রকল্পে কামশাস্ত্রের উপস্থিতি বৌদ্ধ সংযমের বিপরীতে দাঁড়ায়। ফলে এখানে একটি দ্বান্দ্বিকতা তৈরি হয় সংযম বনাম ভোগ, নির্বাণ বনাম আকাঙ্ক্ষা। এই দ্বান্দ্বিকতা আসলে আধুনিকতাবাদী এক ধরনের সংকটচেতনা, যেখানে কোনো চূড়ান্ত সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং সবকিছুই প্রশ্নের মুখে থাকে।
দ্বিতীয় কবিতা “ইউসুফের আহত ঈগল” মূলত এক পৌরাণিক ও কাব্যিক পুনর্নির্মাণ, যেখানে ইসলামি কাহিনি (ইউসুফ-জুলেখা), মিশরীয় পুরাণ (আইসিস), এবং প্রাচীন সভ্যতার ইঙ্গিত (নিনেভা) একত্রে মিশে যায়। এখানে “ঈগল” একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক, যা একদিকে শক্তি ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার চিহ্ন, অন্যদিকে তার “আহত” অবস্থা মানবিক দুর্বলতা ও ব্যর্থতার দিকটি তুলে ধরে। জুলেখার অন্তর্গত আকাঙ্ক্ষা এখানে ঈগলের রূপে প্রকাশিত হয়েছে “ডানা মেলে অচেনা ঈগল” যা কামনা ও প্রেমের এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিকে নির্দেশ করে। কিন্তু এই আকাঙ্ক্ষা পূর্ণতা পায় না; বরং তা বারবার আঘাতপ্রাপ্ত হয়। “ইউসুফের মোহন রূপে / পাড় ভাঙ্গা আহ্বান গীত” এই পংক্তিগুলোতে প্রেমের আকর্ষণ যেমন আছে, তেমনি আছে তার ধ্বংসাত্মক সম্ভাবনাও। এই কবিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইতিহাস ও কাহিনির পুনর্লিখন। “কাহিনির ভাঁজে ভাঁজে লেখা হয় অন্য কাহিনি” এই স্বীকারোক্তি উত্তরাধুনিক (postmodern) দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত বহন করে, যেখানে কোনো একক বয়ান বা সত্য নেই; বরং বহুস্তরীয় অর্থের সম্ভাবনা থাকে। এখানে প্রেম কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়, বরং এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নির্মাণ, যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়।
তৃতীয় কবিতা “বিরল প্রেমিকদের জন্য” প্রেমের ধারণাকে একেবারে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে। এখানে কবি প্রেমকে রোমান্টিক বা পবিত্র কোনো অনুভূতি হিসেবে দেখেন না; বরং তা এক ধরনের ভ্রান্তি, অধিকারবোধ এবং অপূর্ণতার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেন। “ভালোবাসাগুলোকে ঠিকমতো / ভালোবাসা হলো কি না” এই প্রশ্নটি গোটা কবিতার কেন্দ্রে অবস্থান করে। দ্রৌপদীর উল্লেখ এখানে তাৎপর্যপূর্ণ। মহাভারতের এই চরিত্রের মাধ্যমে কবি দেখাতে চান, প্রেম, কাম, জয় এবং মোক্ষএইসব ধারণা প্রাচীনকাল থেকেই একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কিন্তু আধুনিক মানুষের কাছে এই ধারণাগুলো ভেঙে গেছে; ফলে প্রেম আর কোনো নিশ্চিত আশ্রয় নয়। বরং তা হয়ে উঠেছে এক অনিশ্চিত ও বেদনাময় অভিজ্ঞতা। কবিতাটিতে পুরুষতান্ত্রিক অধিকারবোধেরও সমালোচনা রয়েছে “আমি তাকে আটকেছিলাম / নিজস্ব খাঁচায়” এই স্বীকারোক্তি প্রেমের নামে নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রবণতাকে উন্মোচন করে। এখানে নারীর স্বাধীনতা ও পুরুষের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে একটি টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়, যা নারীবাদী পাঠের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
কবিতার শেষে “হায় ভালোবাসা / তোমার পায়ে নিচে / একখণ্ড জমি নেই কোথাও” এই উচ্চারণ প্রেমের চূড়ান্ত অনিশ্চয়তা ও ভঙ্গুরতাকে তুলে ধরে। তবুও “বিরল মানুষ” প্রেমের খোঁজে নিজেদের উজাড় করে দেয় এই চিত্রে এক ধরনের অস্তিত্ববাদী (existential) সুর পাওয়া যায়, যেখানে অর্থহীনতার মধ্যেও মানুষ অর্থের সন্ধান চালিয়ে যায়।
বয়ানে শেষ উপলব্ধি :
……………………..
এই তিনটি কবিতাকে একত্রে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শান্তা মারিয়া মূলত মানবজীবনের তিনটি মৌলিক অভিজ্ঞতা ধর্ম, কামনা এবং প্রেম এই তিনটির পারস্পরিক সম্পর্ক ও দ্বন্দ্বকে অনুসন্ধান করেছেন। প্রথম কবিতায় ধর্ম ও কামনার দ্বান্দ্বিকতা, দ্বিতীয় কবিতায় প্রেম ও আকাঙ্ক্ষার ট্র্যাজেডি, এবং তৃতীয় কবিতায় প্রেমের ভঙ্গুরতা ও সামাজিক নির্মাণ—এই তিনটি স্তর একত্রে একটি সামগ্রিক দার্শনিক চিত্র নির্মাণ করে। ভাষাগত দিক থেকেও কবির একটি স্বাতন্ত্র্য লক্ষ্য করা যায়। তিনি প্রতীক, উপমা ও চিত্রকল্পের মাধ্যমে একটি ঘন ও বহুরৈখিক ভাষা নির্মাণ করেন, যা সরল অর্থবোধকে অতিক্রম করে। একই সঙ্গে তাঁর কবিতায় ইতিহাস ও পৌরাণিকতার যে মিশ্রণ, তা একধরনের আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপ তৈরি করে। সবশেষে বলা যায়, এই কবিতাগুলো কেবল নান্দনিক অভিজ্ঞতা প্রদান করে না; বরং পাঠককে একটি গভীর দার্শনিক ও তাত্ত্বিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায় মানুষ কি সত্যিই তার কামনা, প্রেম এবং মোহকে অতিক্রম করতে পারে, নাকি সেগুলোর মধ্যেই তাকে বারবার ফিরে আসতে হয়? শান্তা মারিয়ার কবিতায় এই প্রশ্নের কোনো চূড়ান্ত উত্তর নেই; বরং আছে এক অন্তহীন অনুসন্ধান, যা পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে। পাঠক ভাবতে ভাবতে আশ্চর্য এক দূরবীন দিয়ে নতুন এক জগৎ আবিষ্কার করে। যে জগৎ শান্তা মারিয়ার কলমের তুলিতে সৃষ্টি হয়েছে। নতুন এক কবিতার পৃথিবী।
……………..
লেখক : কবি ও সম্পাদক, উদ্যান







