প্রচ্ছদসাম্প্রতিকভিন্নমত, “বেয়াদবি” ও কর্তৃত্ববাদের সামাজিক নির্মাণ

লিখেছেন : শামসুল আরেফীন

ভিন্নমত, “বেয়াদবি” ও কর্তৃত্ববাদের সামাজিক নির্মাণ

শামসুল আরেফীন

গতকাল ঝিনাইদাহে এনসিপির নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারীর উপর শারীরিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এরপর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে ঘটনাটি নিয়ে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একদল বলছেন, পাটোয়ারী “বেয়াদব”; ফলে এই আক্রমণ নাকি তার “প্রাপ্য”। আরেকদল বলছেন, রাজনৈতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক বক্তব্যের জবাব কখনোই শারীরিক সহিংসতা হতে পারে না; কথার জবাব কথা দিয়েই দিতে হবে।

এই বিতর্ক আমাকে শহীদ হাদীর কথাও মনে করিয়ে দেয়। তাকেও অনেকেই “বেয়াদব” বলতেন। উত্তেজিত কিছু মুহূর্তের কিছু বক্তব্যকে এতবার রিপ্রোডিউস করা হয়েছে যে তার বৃহত্তর চিন্তা—রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্ক, আধিপত্য, সাংস্কৃতিক ফ্যাসিজম, রিকনসিলিয়েশন কিংবা সংস্কারের প্রশ্ন—ক্রমশ আড়ালে চলে গেছে। ব্যক্তি-চরিত্রের উপর নৈতিক রায় চাপিয়ে দিয়ে রাজনৈতিক চিন্তাকে অদৃশ্য করে ফেলা—এটিও ক্ষমতার একটি কৌশল।

আমি এখানে নাসির বা হাদী “আসলেই বেয়াদব ছিলেন কিনা”—সেই নৈতিক বিতর্কে যেতে চাই না। বরং একজন কন্সট্রাকশনিস্ট ( Constructionist) হিসেবে আমি বলতে চাই, “কে বেয়াদব আর কে নয়”—এটি কোনো চিরন্তন সত্য নয়; বরং এটি একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক নির্মাণ। এই নির্মাণের সাথে সত্য-মিথ্যার সম্পর্কের চাইতেও বেশি সম্পর্ক আছে ক্ষমতা-কাঠামোর।

মিশেল ফুকো দেখিয়েছেন, ক্ষমতা কেবল মানুষকে দমন করে না; বরং ভাষা, জ্ঞান ও ডিসকোর্সের মাধ্যমে “ভদ্র”, “অভদ্র”, “সভ্য”, “অসভ্য”, “দেশপ্রেমিক”, “রাষ্ট্রবিরোধী”—এই পরিচয়গুলোও তৈরি করে। অর্থাৎ “বেয়াদব” শব্দটি কেবল একটি নৈতিক বিশেষণ নয়; এটি কাউকে সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য বানানোর রাজনৈতিক প্রযুক্তি।

ইতিহাসে আমরা বারবার এই কৌশল দেখেছি। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি ভারতীয় উপমহাদেশের বিদ্রোহীদের “বর্বর”, “অসভ্য” ও “ক্রিমিনাল ট্রাইব” হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল। কারণ, বিদ্রোহীদের রাজনৈতিক দাবিকে যদি রাজনৈতিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তাহলে উপনিবেশিক শাসনের নৈতিক বৈধতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তাই বিদ্রোহকে রাজনৈতিক সংগ্রাম হিসেবে না দেখিয়ে “উচ্ছৃঙ্খলতা” হিসেবে দেখানো হয়েছিল।

ফরাসি উপনিবেশবাদীরা আলজেরিয়ার মুক্তিযোদ্ধাদের “সন্ত্রাসী” বলেছিল; দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসন নেলসন ম্যান্ডেলাকে “রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক” হিসেবে নির্মাণ করেছিল; মার্কিন রাষ্ট্র মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র কিংবা ব্ল্যাক প্যান্থার আন্দোলনের নেতাদের “চরমপন্থী” ও “বিশৃঙ্খলাকারী” হিসেবে নজরদারিতে রেখেছিল। আজ যাদের মানবমুক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়, তাদেরকেও একসময় “অসভ্য”, “বিপজ্জনক” কিংবা “অশান্তিকামী” বলে জনগণের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছিল।

বাংলাদেশের ইতিহাসও এর বাইরে নয়। পাকিস্তানি সামরিক শাসন বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে “ভারতীয় ষড়যন্ত্র” ও “দাঙ্গাবাজি” হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদের “উচ্ছৃঙ্খল” বলা হয়েছিল। পরবর্তী সময়গুলোতেও যে কোনো ভিন্নমতকে কখনো “রাষ্ট্রবিরোধী”, কখনো “নাস্তিক”, কখনো “দেশদ্রোহী”, কখনো “অসভ্য” আখ্যা দিয়ে দমন করার চেষ্টা হয়েছে। অর্থাৎ ভাষা এখানে নিরপেক্ষ নয়; ভাষা নিজেই ক্ষমতার হাতিয়ার।

অ্যান্টোনিও গ্রামশির ভাষায়, আধিপত্য কেবল রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের মাধ্যমে টিকে থাকে না; বরং জনগণের সম্মতি (consent) উৎপাদনের মাধ্যমেও টিকে থাকে। ফলে যখন কাউকে “বেয়াদব”, “অশোভন” বা “সমাজের জন্য ক্ষতিকর” হিসেবে বারবার নির্মাণ করা হয়, তখন তার বিরুদ্ধে সহিংসতাকে জনগণের একটি অংশ নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মনে করতে শুরু করে। প্রতীকী সহিংসতা (symbolic violence) ধীরে ধীরে বাস্তব শারীরিক সহিংসতার সামাজিক ভিত্তি তৈরি করে দেয়।

পিয়েরে বুর্দিয়ু যেটিকে symbolic violence বলেছিলেন, সেটি এখানেই কার্যকর হয়। মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারে না যে তারা যে “ভদ্রতা”, “শালীনতা” বা “সভ্যতা”-র ভাষা ব্যবহার করছে, সেটি আসলে বিদ্যমান ক্ষমতা-কাঠামোকেই পুনরুৎপাদন করছে। কারণ, সমাজে “ভদ্র” হওয়ার সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষমতাও সবার হাতে সমানভাবে থাকে না। ক্ষমতাশালীর ভাষাই ধীরে ধীরে সামাজিক নর্মে পরিণত হয়।

সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো—এই দমনপ্রক্রিয়া রাষ্ট্র একা পরিচালনা করে না। জনগণের একটি অংশও তাতে অংশগ্রহণ করে। কারণ, মানুষকে বোঝানো হয় যে “শৃঙ্খলা” রক্ষার জন্য “অসভ্য” মানুষদের নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এভাবেই কর্তৃত্ববাদী সংস্কৃতি ধীরে ধীরে সামাজিক সংস্কৃতিতে রূপ নেয়।

এই কারণেই আজকের প্রশ্নটি কেবল নাসির পাটোয়ারী বা শহীদ হাদীকে নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হলো—আমরা কি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করছি, যেখানে ভিন্নমতকে প্রথমে “বেয়াদব” হিসেবে নির্মাণ করা হবে, তারপর সেই তকমার আড়ালে তার উপর সহিংসতা বৈধ করা হবে?

ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে—যে সমাজ ভিন্নমতকে “অসভ্যতা” হিসেবে দেখা শুরু করে, সে সমাজ ধীরে ধীরে কর্তৃত্ববাদকে স্বাভাবিক করে তোলে। আর যে সমাজ কথার জবাবে লাঠিকে বৈধতা দেয়, সেখানে শেষ পর্যন্ত কেউই নিরাপদ থাকে না।

…………………
মে ২৩, ২০২৬
ম্যাসাচুসেটস, আমেরিকা।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা