রেজা কারিম
১.
মনে নেই না, মেনে নেই
……………………..
অনেক কিছুই মেনে নিচ্ছি
তাই বলে আবার ভেবো না
মনে নিচ্ছি
মন থেকে নিচ্ছি
মনের ভেতরে নিচ্ছি।
মেনে নেওয়া আর মনে নেওয়া
কখনোই এক নয়
হ্যাঁ, এটা বলতেই পারো,
‘মেনেতো নিচ্ছো।’
হুম, তা আমি অকপটে
দ্বিধাহীনচিত্তে স্বীকার করি
আমার ইমানের জোর কম
হয়তো গায়ের জোরও কম
কত কত ফুল ফোটে প্রকৃতিতে
কিন্তু আমি মুখ ফুটে বলতে পারি না
নজরুলের মতো লিখতে পারি না
আমার বুকের ভেতরের
হাহাকারের কথাগুলো।
কিন্তু ঐ যে বললাম,
মেনে নিচ্ছি তবে মনে নিচ্ছি না।
নরম স্বরে, অকপটে
সরলতা ও গাম্ভীর্য বজায় রেখে
ষোলআনা ভদ্রতার সাথে
জ্বী জনাব, জ্বী স্যার, জ্বী হুজুর
বলে মেনেই নিচ্ছি।
জানি, আমি অধম
মেনেই নিচ্ছি
মেনেই নিচ্ছি
মেনেই নিচ্ছি
কিন্তু তুমি নরাধম
এতটুকু বুঝতে পারো না?
মনে নিচ্ছি না
মনে নিচ্ছি না
মনে নিচ্ছি না।
এটাই বা কম কীসে।
হয়তো আমি প্রতিবাদী নই
বিপ্লবী নই
জাগরণের অগ্রদূত নই
তবে
তোমার চাপিয়ে দেওয়া তন্ত্র মন্ত্র
আমাকে বশ করে না
কেবল অবশ করে।
তোমার শোষণ
স্বৈরাচারতন্ত্রের যাঁতাকলে
আমি রাজপথের মতো
কেবলই পিষ্ট হচ্ছি
তবু তুমি বেহায়া বেশরম
মেনে নেওয়া আর মনে নেওয়া বোঝো না।
আমি মনে নেই না, মেনে নেই
বলো, কেমন করে মনে নেবো
যেখানে কোনো ভালোবাসা নেই।
২.
বিকলাঙ্গ অন্ধকারে আজ ঝলমলে আলো
…………………………………………
চাকরি পেতে কারো সুপারিশ লাগেনি
লাগেনি ঘামে ভেজা টাকার গতরের শীতল বাতাস
কারো অযাচিত করুণা।
আচমকা চাকরি পাওয়ায় শিহরিত হয় যুবক
তবে পোস্টিং অনেক দূরে
দশ বার ঘন্টা লাগে
(লন্ডন থেকেও দূরে)।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার হাতে পেয়ে
খুশিতে গদগদ হয়ে ডিজিকে বলে ফেলে,
স্যার, বদলি হতে পারব তো?
হ্যাঁ, যে কোন সময় – এমনকি এক মাসের মধ্যে, ডিজি আশ্বস্থ করেন।
দিন গড়ায়, মাস গড়ায়, বছর গড়ায়
বছরের পর বছর গড়ায়।
বদলে যায় ঋতু
শীতের পরে বসন্ত আসে
গাছে গাছে সবুজ পাতা গজায়
পদ্মা ব্রিজের উদ্বোধন হয়
একতলা দালান বহুতল হয়
গ্রাম শহর হয়
শহর আরো বড় শহরে পরিণত হয়
বদলি হন ডিজি
ডিজির পর ডিজি
ডিজির পর ডিজি
বদলি হন ডিডি
বদলি হন এডি
বদলি হয় কত কর্মচারী
একমাসেই হয়
টাকার খেলা চলে
সুপারিশের মেলা চলে
লবিংয়ের পর লবিং চলে
কেবল বদলি হয় না ঐ যুবকের
যাকে ডিজি সাহেব কথা দিয়েছিলেন
(শর্ত প্রযোজ্যের মত ডিপ্লোমেটিক ওয়েতে)
‘আমলা’ বলে কথা।
চাকরির জন্য সুপারিশ না লাগলেও
বদলির জন্য মামু লাগে, মাকু লাগে
পীড়াপীড়ি লাগে ধরাধরি লাগে।
ডিজির থেকে বড় আমলা খুঁজতে হয়
যুগ্মসচিব, অতিরিক্ত সচিব
সচিব হলেতো কথাই নেই
এমপি, মন্ত্রী খুঁজতে হয়
নিজেকে বিকাতে হয় বিকলাঙ্গ সিস্টেমে।
এ যুবকের মতো এমন যুবক অনেক আছে
যারা আমলা খুঁজে বেড়ায়
নদীর নির্মল জলে সাঁতার কাটা
বিশুদ্ধ হৃদয়ের যুবকেরা এভাবেই
একসময় অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়।
জানি, টাকা দিয়ে আমলা কেনা যায়
কেনা যায় এমপি, মন্ত্রী ও পাওয়ার
কিন্তু টাকা দিয়ে বিশুদ্ধ হৃদয়ের মানুষ কেনা যায় না।
৩.
আমার চারপাশে বুযুর্গদের আনাগোনা
……………………………………..
কিছু বুযুর্গ ব্যক্তির আনাগোনা লক্ষ্য করি
তারা ঠিক আমার পাশেই ঘোরাফেরা করে
সুযোগ পেলেই আমার ভুল ধরে।
তারা আমাকে তাদের চেয়েও বড় বুযুর্গ বানাতে চায়
কত বড় তা আমি জানি না
তারা কেবল আমাকে এটা করতে বলে ওটা করতে বলে
জনৈক বুযুর্গের সাথে আমাকে তুলনা করে বুঝিয়ে দেয়
আমি কতটা নিচে পড়ে আছি
তার নখের যোগ্যও নই আমি।
একদিন এক বুযুর্গ ব্যক্তি তার মেয়ের জন্য পাত্র খুঁজছে
আমি তাকে বললাম, আমার কাছে পাত্র আছে।
যোগ্য ও নিজগুণে প্রতিষ্ঠিত। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে সোনার হরিণ ধরেছে। বেতন ছাড়া উপরি ইনকামও আছে। আরেকজন কুরআনের হাফেজ। মাদ্রাসা থেকে কামিল শেষ করে একটা মসজিদের ইমাম ও খতিব। ইনকামের চেয়ে সম্মান বেশি।
দু’জনার ছবি নিয়ে বুযুর্গ চলে গেলেন।
পরদিন বুযুর্গ আমার হাত ধরে বললেন, মেয়েতো হুযুর টুযুর পছন্দ করে না। এ যুগের মেয়েতো, দাড়িও তার পছন্দ না। ইমামের স্ত্রী হলেতো কমপ্লিট পর্দাও করতে হবে। আমার ভার্সিটি পড়ুয়া মেয়ে- ভার্সিটি পড়ুয়া ছেলেটিকেই পছন্দ করেছে। আর আমিও বলি কি; একজন ইমামের বেতন কত বলেন! এ বেতন দিয়ে কি আর সংসার চলে? আপনি সরকারি চাকুরিজীবী ছেলের মা বাবার সাথে কথা বলেন।
আমি বুযুর্গের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের রহস্যময় হাসি দিলাম।
……………
রেজা কারিম
সহকারী শিক্ষক
ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড উচ্চ বিদ্যালয়
রাজেন্দ্রপুর, গাজীপুর।
০১৮৪০৯৭৫১৪৩
০১৬৭৫৬৩৬৫০৯







