প্রচ্ছদকবিতাসাম্প্রতিক কবিতা

লিখেছেন : আর. এম. কারিমুল্লাহ

সাম্প্রতিক কবিতা

আর. এম. কারিমুল্লাহ

জীবাশ্ম
………………

যাপনের ঘূর্ণিপথের নিয়মগুলি আমি পড়ি।
পড়ার সঙ্গে সঙ্গে,
ঠিক তার আগে, ইতিহাস হয়ে ওঠে অনাথ।
খুঁজে বেড়াই অর্থের খণ্ডাংশ,
শিহরণের গোপন নথি থেকে আরেক নথির দিকে।

এখন
আমাকে ঘাঁটতে হয় পাতলা বন্ধুত্বের সোশ্যাল পাতা।
তবুও, বিচিত্র পরিচিতি-বিশ্বাসের সাহিত্য বৃদ্ধি পায়।

কিছুটা নীরব থাকি,
কিছুটা অঙ্কশাস্ত্রকে অভিযোগ করি।
মাঝে মাঝে
ছায়ার বাঁধন খুলে নতুন চোখে দেখি,
নিঃশব্দ জীবাশ্মগুলো কতটা শব্দ হতে পারে….

নদী
……………

সারাদিন ধরেই নদীর কাছে যাওয়ার বায়না,
বিকেল হলেই
জলরঙে আঁকা একটা পৃথিবী ডেকে পাঠাচ্ছে।

দাদুর হাত ধরে কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে গেলে
দূরে দেখা যায়
সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করা জল।
নৌকো ভেসে থাকে অলস মেঘের মতো,
হাওয়া এসে
নদীর বুক জুড়ে গল্প লিখে যায়।
চর থেকে ফিরতে থাকা পাখিরা
ডানায় করে সন্ধ্যা আনে,
আর দুই পাড় জুড়ে ধীরে ধীরে নেমে আসে হলুদ আলো।

অন্ধকার নামার আগে নদীটাকে দেখে মনে হয়
সে বুঝি
সব ক্লান্ত মানুষকে একটু শান্তি দিয়ে রাখে।

মৃৎশব্দ
………………

দেখছো
এই ঘরের জানালাগুলো বহুদিন খোলা হয়নি।
তবু বাতাস ঢুকে পড়ে
ফাইলের নিচে চাপা মৃত পত্রিকার মতো।

রাত একটা তেইশ।
করিডোরে কারা যেন হাঁটে লোহার শব্দ নিয়ে,
দেয়ালের গায়ে পুরোনো টেরাকোটার মুখ।
ওদের চোখে এখনও সভ্যতার ধোঁয়া জমে আছে।
অলিখিত বইগুলো আলমারির ভিতর দাঁত ঘষে,
আর অন্ধকার ধীরে ধীরে মানুষের ভাষা শিখে নেয়।

আজ উড়ে যাওয়ার কথা ছিল—
কিন্তু ডানাগুলো বীজের মতো শুকিয়ে গেছে।

কচুরিপানা
…………………..

পুকুরটা বাইরে থেকে শান্ত।
কচুরিপানারা সবুজ চাদরের মতো ঢেকে রেখেছে জল।
মাছরাঙা স্থির,
মৌমাছি ব্যস্ত,
শিশুরা রোদ শুকোয় খাতার পাতায়।

ভিতরে ভিতরে জলের অসুখ বাড়ছে।
কাদা থেকে ওঠে বুদবুদের দীর্ঘশ্বাস,
মনে হয়-
ডুবে যাওয়া কোনো রূপকথা এখনও নিঃশ্বাস নিচ্ছে।

শিকড় বাঁচাতে না পারলে গাছ টেকে না—
এ কথা জানত পাথরেরাও।
তাই বজ্রপাত নামলে সবচেয়ে আগে কেঁপে ওঠে
জল।

কালো পাখি
…………………..

একটা গাছ
অনেকদিন ধরে কারও নিঃশ্বাসে মাথা রেখে আছে।
দেয়ালের শেওলারা
এখন আর নিচে থাকতে চায় না,
ধীরে ধীরে উঠে আসছে উপরে সভ্যতার গায়ে।

রাস্তার মানুষগুলো
কবে শেষবার আকাশ দেখেছে মনে করতে পারে না।
প্রজাপতিরা হারিয়ে গেছে,
তবু
বাতাসে ডানার শব্দ রয়ে গেছে অল্প।

একটা পাখিকে খুঁজছিল সবাই—
কালো ছিল একসময়।
এখন তার রং বদলে গেছে।
শুধু চোখদুটো এখনও বহন করে পোড়া রাজবাড়ির ইতিহাস।

ব্যাঙ
…………….

বৃষ্টির রাতে একটা সবুজ ব্যাঙ এসে বসে ছিল বারান্দায়।
তার চোখে অদ্ভুত ধৈর্য।
মনে হচ্ছিল
সে পৃথিবীর বহু পুরোনো গোপন খবর জানে—
কিন্তু কাউকে বলবে না।

ঘরের ভিতর
ভেজা জুতো, অর্ধেক লেখা কবিতা,
আর অসংখ্য অনিদ্রা।

ব্যাঙটা নির্বিকার।

হঠাৎ মনে হলো—
মানুষের চেয়ে ওর বিবর্তন অনেক বেশি নিখুঁত।
কারণ
ও এখনো বৃষ্টিকে ভয় পায় না,
একাকীত্বকে আলাদা কিছু ভাবেও না।

টার্মিনাল বাস্তবতা
…………………………

খুব উঁচুতে উঠে গেলে পৃথিবীকে ছোট লাগে।
নদী তখন সুতো,
মানুষ পিঁপড়ে,
আর ক্ষুধা একটা বিন্দু মাত্র।
এইজন্যই বড় বড় বৈমানিকেরা
মাটির কান্না শুনতে পায় না।

স্পঞ্জের মতো চকচকে বিমানবন্দর,
কাচের দেয়াল, স্বয়ংক্রিয় হাসি—
সবকিছু এত পরিষ্কার যে বাস্তবতাকেই সন্দেহ হয়।
এদিকে গ্রামের ভিতর ধান পুড়ে গেলে
একটা শিশু সারারাত কাশে।
কিন্তু খবরের কাগজে শুধু শেয়ার বাজারের গ্রাফ ওঠে।

সাবধান।

অতিরিক্ত উড়তে উড়তে
সভ্যতা একদিন নিজের ছায়াকেও হারিয়ে ফেলবে।
কারণ-
রক্ত আর চোখের জল—
এ দুটো জিনিস এখনও
কোনো জাদুঘরে সম্পূর্ণ সংরক্ষণ করা যায়নি।

ফাটল
……………..

ড্রেনের জলে মুখ নামানোর আগে
খেয়াল করো নি—
তোমার ছায়াটা অনেক আগেই বদলে গেছে।
রাস্তার মোড়ে সবুজ হেলমেট পরে দাঁড়িয়ে আছে
কয়েকটা ছায়া।
ওরা অপেক্ষা করে—কে আগে ভুল করবে।

পার্কের বেঞ্চিতে মাছিরা সভা ডাকে,
আর পুরোনো হ্যাঙ্গারগুলো ধীরে ধীরে
আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকে পড়ে
খালি জামার অভিমানে।

মাথার ভিতর একটা মরিচাধরা লিফট
সারারাত উঠানামা করে।

অসুস্থ বাতি
…………………..

সবাই ভাবে
স্বাভাবিক মানুষদেরই শুধু ঠিকানা থাকে।

ভুল।

রাস্তার পাশে উল্টে পড়ে থাকা জুতোটাও পাগল,
দোকান বন্ধ হওয়ার পর
শাটারের নিচে ঢুকে পড়া বাতাসও পাগল।

একটা পুরোনো লিফট
প্রতিদিন একই তলায় ওঠানামা করতে করতে
নিজের ভেতর মরিচা জমায়।
কে জানে
ওরও হয়তো পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে।

গত সপ্তাহে
একটা কবিতার বই কিনতে গিয়ে দেখি
দোকানদার নিজেই কবিতা মুখস্থ বলছে।
বই শেষ।
কিন্তু শব্দগুলো ব্ল্যাক মার্কেটে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

হ্যাঁ
পাঠকেরাও সন্দেহজনক।
চোখের ভিতর এত আলো নিয়ে
কেউ স্বাভাবিক থাকতে পারে না।

পাখি
…………….

একটা মানুষ আর চারটে পাখি।
একটা শহুরে, একটা মরুভূমির ধুলো মেখে,
একটা সমুদ্রের নোনাজল নিয়ে,
আরেকটা জানালার গ্রিলে বসে থাকা কাক।
ওরা প্রতিদিন
ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলে।

কখনো কখনো সব ডানার ভিতর
একই রকম অস্থিরতা লুকানো।
রাতে ঘুমোতে গেলে পাখিগুলো এসে বসে
বইয়ের আলমারিতে,
ঘরের বাতাসে, অসমাপ্ত কবিতার পাশে।
তারপর
ধীরে ধীরে পুরো ঘরটা ডানার শব্দে ভরে ওঠে।

সীমান্ত
………………

একজন কবি
একবার ভালোবেসেছিলেন একজন ভুল মানুষকে।
ভালোবাসার আগে
ধর্ম ছিল না,
দেশ ছিল না,
শুধু চোখের ভিতর অদ্ভুত শান্ত এক রাত ছিল।

তারপর ইতিহাস এসে
দুজনের মাঝখানে বসে পড়ল।

সংবাদপত্রের শিরোনাম, ট্যাংকের শব্দ,
অসংখ্য মৃত শিশুর ছবি—
সব মিলিয়ে
প্রেম ধীরে ধীরে নিজের ছায়াকেও ভয় পেতে শিখল।

এখনও পৃথিবীর বহু শহরে বসন্ত আসে,
ক্যাফেতে আলো জ্বলে, ট্রামলাইন ভিজে ওঠে বৃষ্টিতে—

তবু কোথাও কোথাও একটা অসমাপ্ত চুম্বনের উপর
পুরো যুদ্ধ দাঁড়িয়ে থাকে।

রোদ
…………….

শীতের দুপুরে রোদ খুব ধীরে এসে বসে উঠোনে,
যেন বহুদিন পর
কারও সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।

বৃদ্ধ দেয়ালের গায়ে জমে থাকা স্যাঁতস্যাঁতে দুঃখ
অল্প অল্প শুকিয়ে যায়,
ঘাসের ডগায় আটকে থাকা শিশিরও হালকা হয়ে ওঠে।

অনেকদিনের নিস্তব্ধতা
রোদের তাপে কিছুটা নরম হয় বোধহয়।

চুপচাপ বসে থাকা বিড়াল,
রেলিংয়ে শুকোতে দেওয়া কাপড়, আর বারান্দার পুরোনো চেয়ার—
সবাই যেন
একটু আলো ভাগ করে নেয়।

দিন শেষে
রোদ চলে গেলে উঠোনে আবার ঠাণ্ডা নামে,
তবু কোথাও একটুখানি উষ্ণতা রয়ে যায়।

——০0০——

পরিচিতি: আর. এম. কারিমুল্লাহ, জন্ম মালদা জেলার হরিশচন্দ্রপুর থানা (ii) নং ব্লকের আলমগঞ্জ গ্রামে। পিতা আবু তালাহা, মাতা নারিজা বিবির চতুর্থ সন্তান।
পঞ্চম শ্রেণি থেকেই লেখালেখির সূত্রপাত। দেশ-বিদেশের ছোট-বড় পাঁচশোর অধিক পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করছেন। প্রথম কাব্যগ্রন্থ Tide of Sadness (ইংরেজি) অন্যান্য গ্রন্থগুলি- রক্তে রাঙা স্নেহ, প্রিয়জনদের স্মৃতিকথা, তুমি আমার অন্তরের লিখিত বিসর্গ, ধূলিমলিন পাণ্ডুলিপি, উপন্যাস- রঙিন কাঠগোলাপ, অন্তরসুধা, হৃদয়ের অদ্বিতীয় রেখা, হৃদপিঞ্জর, শূন্যতার সুর, মেঘে ঢাকা ভালোবাসা, অভূতপূর্ব, মানবপ্রবাহ, তুমি কি সেই নারী- যার জন্য আমার হৃদয় পোড়ে যায়! কাব্যিক জীবনী- সীরাতুন্নবী ﷺ : নূর থেকে নূরে—এক মহাকাব্যিক, “শ্রী গোপাল ভাঁড়” জীবন তাঁর এক অনন্য সৃষ্টি।
সত্য ও সাহিত্যের দীপশিখা প্রজ্বালনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন “নব-কবি আর. এম. কারিমুল্লাহ কাব্যঘর”। যার অধীনে দ্বাদশটি সাহিত্যপত্রিকা সম্পাদনার গুরুদায়িত্ব তিনি দক্ষতার সঙ্গে বহন করছেন। বন্ধুত্ব ও মানবিকতার কারণে তিনি সাহিত্যাঙ্গনে পরিচিত “বন্ধু-প্রেমিক কবি” নামে এবং নিজেকে অভিহিত করেন— “কবিতায় হৃদয়ের গল্প বলা মানুষ”।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা