প্রচ্ছদপ্রবন্ধসাইয়েদ নাকিব আল আত্তাসের আদব তত্ত্ব ও আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এর প্রয়োগ

ড. মো: খালেদ হোসেন

সাইয়েদ নাকিব আল আত্তাসের আদব তত্ত্ব ও আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এর প্রয়োগ


ড. মোঃ খালেদ হোসেন


গত ৮ মার্চ ২০২৬ তারিখে মুসলিম বিশ্বের প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ও দার্শনিক সাইয়েদ মোহাম্মাদ নাকিব আল আত্তাস ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে সমকালীন মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক জগৎ এক বিরল প্রতিভার অধিকারী মনীষীকে হারাল। আত্তাস ১৯৩১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর, তৎকালীন ডাচ ইস্ট ইন্ডিজের (বর্তমান ইন্দোনেশিয়া) জাভার বোগোর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। আধুনিক যুগে ইসলামি দর্শন, জ্ঞানতত্ত্ব, সভ্যতা-চিন্তা ও শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠনের প্রশ্নে তিনি ছিলেন এক অনন্য পথপ্রদর্শক। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে গড়ে উঠা “ইসলামাইজেশন অব নলেজ”মুভমেন্ট যেখানে মুসলমানদের জন্য উপযোগী জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের সূচনা হয়, সেখানে ইসমাইল রাজি আল ফারুকি ও আত্তাসের তাত্ত্বিক অবদান মুসলিম বিশ্বে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থাকে কেবল অনুকরণ নয়, বরং ইসলামি মূল্যবোধ ও নিজস্ব সভ্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্গঠন করা জরুরি। আল-ফারুকি আধুনিক একাডেমিক পদ্ধতির আলোকে জ্ঞানকে ঔপনিবেশিক ও সেক্যুলার প্রভাবমুক্ত করার কথা বলেন; অন্যদিকে আল-আত্তাস মুসলিম বিশ্বের সংকট মোকাবিলায় ‘তাযকিয়াতুন নফস’—অর্থাৎ আত্মশুদ্ধি ও সুফি ঐতিহ্যভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। তার উদ্ভাবিত অন্যতম তত্ত্ব হল ‘আদাব’ বা ‘আদব।’
মুসলিম বিশ্বের সচেতন সমাজ ও রাষ্ট্রসমূহ যারা আধুনিক শিক্ষা ও ইসলামি শিক্ষার সমন্বয়ে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে এবং নিজস্ব সভ্যতার পরিচয় ও মর্যাদা বজায় রাখতে চায় তাদের কাছে আত্তাস এর চিন্তাধারা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ তাঁর দর্শন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষামডেল গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। মালয়েশিয়ার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ইসলামাইজেশন মডেল নিয়ে আমার মাস্টার্স থিসিস লিখার সময় তাঁর চিন্তা ও দর্শন গভীরভাবে অধ্যয়ন করার সুযোগ হয়েছে।
পৃথিবীর বিভিন্ন গবেষণা কেন্দ্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর প্রণীত শিক্ষামডেল নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ও ইসলামপ্রিয় সমাজে তাঁকে নিয়ে উল্লেখযোগ্য আলোচনা ও গবেষণা এখনো তেমনভাবে গড়ে ওঠেনি। অথচ ঔপনিবেশিক মানসিকতায় গড়ে ওঠা এবং নানা সংকটে জর্জরিত আমাদের ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের জন্য তাঁর মতো একজন দার্শনিকের জ্ঞানতত্ত্ব আত্মস্থ করা অত্যন্ত জরুরি। উল্লেখ্য, আজ থেকে কয়েক দশক আগেও মালয়েশিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা অনেকাংশে ঔপনিবেশিক কাঠামো ও মানসিকতার প্রভাব বহন করছিল। সেখান থেকে মহাথির মোহাম্মাদ এবং আনোয়ার ইব্রাহীম-এর নেতৃত্বে দেশটিকে মুসলিম বিশ্বের একটি শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র শিক্ষামডেলে রূপান্তরের যে প্রয়াস শুরু হয়, তার পেছনে যে বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি কাজ করেছে তার অন্যতম প্রধান স্থপতি ছিলেন আল-আত্তাস।
আধুনিক শিক্ষার সংকটের সমাধান হিসেবে ‘আদব’
আল-আত্তাসের ‘আদব’ ধারণা বর্তমান সময়ে মুসলিম সমাজ যে শিক্ষাগত সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে, তার একটি যুক্তিসংগত সমাধানের প্রয়াস। ধর্মনিরপেক্ষ পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাবের ফলে জ্ঞান ও নৈতিকতার মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে এমন মানুষ তৈরি হচ্ছে যারা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে উন্নত হলেও নৈতিক দিকনির্দেশনা ও আধ্যাত্মিক সচেতনতার অভাবে ভোগে। আল-আত্তাসের মতে, এটি কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব নয়; বরং এটি একটি সভ্যতাগত সংকট, যার মূল কারণ হলো ‘আদব’-এর হারিয়ে যাওয়া। ‘আদব’ এমন একটি কাঠামো প্রদান করে যার মাধ্যমে আধুনিক জ্ঞানকে গ্রহণ করা যায় তবে ইসলামি নৈতিক ও অধিবিদ্যাগত মূল্যবোধ বিসর্জন না দিয়ে। আল-আত্তাস আধুনিক জ্ঞানকে প্রত্যাখ্যান করার কথা বলেন নি; বরং তিনি এগুলোকে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে পুনর্বিন্যাস করার আহ্বান জানান। এই পদ্ধতি মুসলিম সমাজকে আধুনিকতার সঙ্গে সমালোচনামূলক ও ফলপ্রসূভাবে সম্পৃক্ত হতে সাহায্য করে, একই সঙ্গে তাদের নৈতিক ভিত্তি ও আধ্যাত্মিক পরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখে।
‘আদব’ আধুনিক শিক্ষার মূল্যবোধ-নিরপেক্ষ (ভ্যালু নিউট্রাল) প্রবণতার বিরুদ্ধে একটি কার্যকর প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করে। যখন শিক্ষা শুধু দক্ষতা, প্রতিযোগিতা ও বাজারভিত্তিক ফলাফলের ওপর গুরুত্ব দেয়, তখন তা তার নৈতিক দিকনির্দেশনা হারিয়ে ফেলে। আল-আত্তাসের ‘আদব’-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষাকে নতুনভাবে অর্থ প্রদান করে যেখানে শিক্ষা ব্যবস্থা আল্লাহ, সমাজ এবং নিজের প্রতি জবাবদিহিতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে শিক্ষা শুধু দক্ষতা অর্জনের প্রক্রিয়া না হয়ে, নৈতিক চরিত্র গঠনের একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে। এছাড়াও, ‘আদব’-ভিত্তিক শিক্ষা নৈতিক সংযম এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিনয় গড়ে তোলে যা বর্তমানে প্রযুক্তির আধিপত্য ও তথ্যের অতিরিক্ত প্রবাহের যুগে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষার মূল লক্ষ্য হিসেবে ‘আদব’
আল-আত্তাস মনে করেন, ‘আদব’ই হলো মানবিক শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য। তিনি মনে করেন, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য শুধু দক্ষ কর্মী বা প্রযুক্তিবিদ তৈরি করা নয়; বরং এমনভাবে মানুষকে গড়ে তোলা, যারা নৈতিকভাবে সৎ এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ। মূলত ‘আদব’ বলতে বোঝায়—এই বাস্তব জগতে আল্লাহ, মানুষ, জ্ঞান ও সমাজ—সব কিছুরই একটি সঠিক ও যথাযথ স্থান আছে, এবং সেই স্থান সম্পর্কে সঠিক উপলব্ধি থাকা। যখন একজন মানুষের মধ্যে সঠিকভাবে ‘আদব’ গড়ে ওঠে, তখন তার মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ন্যায়বিচার (ʿআদল) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীতে সমাজের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়। এছাড়াও, আল-আত্তাস জোর দিয়ে বলেন যে, ‘আদব’-কেন্দ্রিক শিক্ষা একজন মানুষের নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গুণাবলিকে সুন্দরভাবে সমন্বিত করে। যখন ‘আদব’ অনুসরণ করা হয়, তখন জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্য হয় সত্য ও প্রজ্ঞা (হিকমাহ) লাভ করা—অহংকার, ক্ষমতা বা আর্থিক লাভের জন্য নয়। এই পদ্ধতি ব্যক্তি ও সমাজ উভয় ক্ষেত্রেই বিনয় ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলে।
আদব’ জ্ঞানের স্তরবিন্যাস করে
আল-আত্তাস জ্ঞানের সঠিক স্তরবিন্যাসকে ‘আদব’-এর একটি মৌলিক অংশ হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি সমসাময়িক শিক্ষাব্যবস্থার সেই প্রবণতার সঙ্গে একমত নন, যেখানে প্রযুক্তিগত ও অভিজ্ঞতালব্ধ বিজ্ঞানকে ওহী ভিত্তিক ও অধিবিদ্যাগত জ্ঞানের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বরং তাঁর মতে, ওহিভিত্তিক জ্ঞান (ইলমুল ওয়াহি) সর্বোচ্চ স্থানে থাকা উচিত, কারণ এটিই মানুষের জীবনের চূড়ান্ত অর্থ ও নৈতিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে। অন্যদিকে, অভিজ্ঞতালব্ধ ও বুদ্ধিনির্ভর বিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা অবশ্যই ওহির নির্ধারিত সীমার মধ্যে পরিচালিত হওয়া উচিত। আল-আত্তাসের মতে, এই স্তরবিন্যাস নষ্ট হয়ে গেলে সত্য বিকৃত হয় এবং জ্ঞানগত বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ ‘আদব’ নির্ধারণ করে কিভাবে জ্ঞান অর্জন, বোঝা এবং ব্যবহার করা হবে। এটি শিক্ষার্থীদের শেখায় যে মানবীয় বুদ্ধির সীমাবদ্ধতা আছে এবং বাস্তবতাকে সঠিকভাবে বুঝতে ঐশী দিকনির্দেশনার প্রয়োজন। এই ধারণা আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থার বিপরীত, যেখানে প্রায়ই অতিরিক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা ও আপেক্ষিকতাবাদ উৎসাহিত করা হয় যা সমাজের ঐক্য ও নৈতিক স্বচ্ছতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
তাঁর মতে, জ্ঞান কখনোই নিরপেক্ষ নয়; এর উৎস ও ব্যবহার অনুযায়ী এর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রভাব থাকে। যখন ওহিভিত্তিক জ্ঞানকে তার যথাযথ স্থান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তখন অন্যান্য জ্ঞান নৈতিক উদ্দেশ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং সহজেই অপব্যবহারের শিকার হয়। এই অবস্থায় মানুষের বুদ্ধি নিজেকে সর্বময় কর্তৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যা আল-আত্তাসের মতে ‘বুদ্ধিবৃত্তিক অহংকার’ সৃষ্টি করে। এর ফলে ওহী ভিত্তিক দিকনির্দেশনা উপেক্ষিত হয় এবং নৈতিক দায়িত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে।
শিক্ষক–শিক্ষার্থী সম্পর্কের মধ্যে ‘আদব’
‘আদব’ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যকার নৈতিক সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। আল-আত্তাসের মতে, একজন শিক্ষক কেবল জ্ঞান বিতরণকারী নন; বরং তিনি একজন নৈতিক আদর্শ, যার আচরণ তাঁর শেখানো নীতিগুলোকেই প্রতিফলিত করে। এই সম্পর্কের মধ্যে ‘আদব’-এর প্রধান প্রকাশগুলো হলো শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ববোধ, শিক্ষাদানে আন্তরিকতা, এবং শিক্ষকের প্রতি যথাযথ সম্মান। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদেরও উচিত শৃঙ্খলা, বিনয় এবং জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা নিয়ে তাদের পড়াশোনার দিকে অগ্রসর হওয়া। তিনি মনে করেন, শিক্ষাক্ষেত্রে ‘আদব’-এর অবক্ষয় ঘটলে জ্ঞান বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়, শিক্ষকের মর্যাদা ও কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে, এবং শিক্ষাকে একটি লেনদেনভিত্তিক কার্যক্রমে রূপান্তরিত করা হয়। এছাড়াও, আল-আত্তাস জোর দিয়ে বলেন যে, প্রকৃত জ্ঞান (ʿইল্ম) অর্জন অনেকাংশে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। তাঁর মতে, জ্ঞান শুধু বই বা বক্তৃতার মাধ্যমে নয়; বরং শিক্ষকের নৈতিক চরিত্র ও আধ্যাত্মিক অবস্থার মাধ্যমেও প্রেরিত হয়। শিক্ষকের মনোভাব, উদ্দেশ্য এবং ‘আদব’-এর প্রতি তাঁর নিষ্ঠা শিক্ষার্থীদের জ্ঞান গ্রহণ ও তা অন্তরে ধারণ করার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। এমন পরিবেশে শিক্ষার্থীরা ভয় বা জোরের কারণে নয়, বরং স্বতঃস্ফূর্তভাবে শিক্ষকের দিকনির্দেশনা মেনে চলে, কারণ তারা বুঝতে পারে যে শিক্ষক তাদের নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতির জন্য দায়িত্বশীল।
পাঠ্যক্রম ও শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণে ‘আদব’-এর প্রভাব
‘আদব’-কে শিক্ষার মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করলে পাঠ্যক্রম ও শিক্ষার লক্ষ্য গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। ‘আদব’-ভিত্তিক পাঠ্যক্রমে শুধু একাডেমিক বিষয়বস্তু নয়, বরং—নৈতিক উন্নয়ন, আধ্যাত্মিক সচেতনতা, এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ভারসাম্য—এসবকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষার সাফল্য শুধু পরীক্ষার ফলাফল, সনদপত্র বা আর্থিক অর্জনের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয় না; বরং শিক্ষার্থীরা কতটা ন্যায়পরায়ণ, প্রজ্ঞাবান এবং দায়িত্বশীল আচরণ করছে—এটাই প্রকৃত সফলতার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। ‘আদব’-এর পুনঃপ্রতিষ্ঠা এমন একটি সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলে, যা—জ্ঞান, ঈমান, এবং দায়িত্ববোধ—এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে। এর মাধ্যমে এমন পরিপূর্ণ মানুষ (ইনসানে কামিল) তৈরি হয়, যারা আধুনিক মুসলিম সমাজের নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সভ্যতাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আদব তত্ত্বের প্রয়োগের আবশ্যকতা
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ‘আদব’-এর সংকট এখন স্পষ্ট যেখানে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জনের পরিবর্তে ফলাফল, প্রতিযোগিতা ও চাকরিমুখী দক্ষতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতায় আত্তাসের ‘আদব’ তত্ত্বকে নীতিগতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। এক্ষেত্রে প্রথমেই জাতীয় শিক্ষানীতিতে স্পষ্টভাবে নৈতিকতা, চরিত্রগঠন ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরিকে মূল লক্ষ্য হিসেবে পুনঃনির্ধারণ করা জরুরি। পাঠ্যক্রমে শুধু তথ্যভিত্তিক বিষয় নয়, বরং নৈতিক শিক্ষা, আত্মশৃঙ্খলা, সামাজিক দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা—এসবকে বাধ্যতামূলক উপাদান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
শিক্ষক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায়ও বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। শিক্ষকদের শুধু বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা নয়, বরং নৈতিক আদর্শ, আচরণগত দৃষ্টান্ত এবং শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠনে ভূমিকা রাখার সক্ষমতা অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শিক্ষককে কেবল “ইনস্ট্রাক্টর” নয়, বরং “মোরাল গাইড” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা দরকার। শুধুমাত্র পরীক্ষার নম্বর বা জিপিএ দিয়ে সাফল্য নির্ধারণ না করে, শিক্ষার্থীর আচরণ, দায়িত্ববোধ, সততা ও সামাজিক অংশগ্রহণকে মূল্যায়নের অংশ করতে হবে। যেমন—কমিউনিটি সার্ভিস, দলগত কাজ, এবং নৈতিক আচরণের মূল্যায়ন চালু করা যেতে পারে।
প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নীতিমালা প্রয়োজন। ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থায় “ডিজিটাল এথিক্স” বা প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহারকে বাধ্যতামূলকভাবে শেখাতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা তথ্যকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে শেখে এবং অপব্যবহার থেকে বিরত থাকে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ও সম্মানভিত্তিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে প্রশাসনিক উদ্যোগ জরুরি। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ককে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দায়িত্বের ভিত্তিতে গড়ে তোলার জন্য আচরণবিধি (কোড অব কন্ডাক্ট) কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
সবশেষে, এই নীতিগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ‘আদব’-কেন্দ্রিক এই সংস্কার শুধু শিক্ষার মান উন্নত করবে না; বরং দীর্ঘমেয়াদে দুর্নীতি হ্রাস, সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং একটি নৈতিকভাবে সচেতন নাগরিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

…………..
লেখক : কলামিস্ট, রাজনীতি বিশ্লেষক ও একাডেমিক ডিরেক্টর, সেন্টার ফর গভার্ন্যান্স অ্যান্ড সিভিলাইজেশনাল স্টাডিজ (সিজিসিএস)।
khaled.du502@gmail.com

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা