শান্তা মারিয়া
কালচারাল ফ্যাশিস্টদের খেলাটাই হলো জুলাই বিপ্লবকে শুধু নয়, আওয়ামী লীগের বিপক্ষে যে কোন ব্যক্তি বা মতকেই তারা দাঁড় করিয়ে দিবে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে।
আপনি যদি আওয়ামী লীগের দুর্নীতি, স্বৈরাচার, ভোট ডাকাতি, মানুষের উপর গুলিবর্ষণ নিয়ে কোনো কথা বলেন, ব্যস আর দেখতে হবে না। আপনি হয়ে যাবেন রাজাকার। আপনার চৌদ্দগুষ্ঠি হয়ে যাবে রাজাকার। আপনি হয়ে যাবেন লালবদর। আপনি হবেন জঙ্গী, মৌলবাদী, জামাত শিবির ইত্যাদি। দুনিয়ার যত গালি আছে সব বর্ষিত হবে আপনার প্রতি।
তাদের কথা হলো, আওয়ামী লীগ মানেই মুক্তিযুদ্ধ। তারাই মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র সোল এজেন্ট। জুলাইতে যেহেতু আওয়ামী লীগ সরকারের স্বৈরাচার ও নিরস্ত্র জনতার উপর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে সব দলমতের মানুষ (ফ্যাসিস্ট বাহিনী ও কালচারাল ফ্যাসিস্টগুলো ছাড়া) রাজপথে নেমেছিল তাই জুলাইতে তাদের অ্যালার্জি। আপনি জুলাইয়ের পক্ষে? তারমানে আপনি অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে। এ এক আজব ফর্মুলা তাদের।
অন্যদিকে, জামাত শিবির কোনদিনই মুক্তিযুদ্ধকে হজম করতে পারেনি। তাই তারা চেষ্টা করে জুলাইকে নিজেদের বিজয় হিসেবে চিহ্নিত করে একাত্তরের পরাজয় মুছে ফেলতে। তারা মনে করে জুলাই দিয়ে একাত্তরকে রিপ্লেস করবে। তারা একথা বোঝে না, মুক্তিযুদ্ধ হলো বাংলাদেশের অস্তিত্বের লড়াই। একে অস্বীকার করলে বাংলাদেশকেই অস্বীকার করা হয়।
মৌলবাদী অতিডানপন্থী কিছু গ্রুপ আবার আরেক কাঠি সরেস। তারা মনে করে জুলাই বিপ্লব মানে এখন তাদের রাজত্ব। তারা নারীবিরোধী, প্রগতি বিরোধী মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণাপ্রসূত যত রাজ্যের উদ্ভট পদক্ষেপ নিয়ে হাজির। তারা চায় পুরো দুনিয়াকেই হাজার বছর পিছনে নিয়ে যেতে। এরাই মব সন্ত্রাস করে দেশের কিছু মানুষকে বিরক্ত ও ‘আগেই ভালো ছিলাম’ বলতে ’ উস্কানি দিচ্ছে।
প্রকৃত পক্ষে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। এটি কোন বিশেষ রাজনৈতিক দলের ছিল না। এই যুদ্ধে শহীদ হয়েছে, নির্যাতনের, লুটপাটের, অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছে সব দল, মত, নির্বিশেষে বাংলাদেশের মানুষ। এই যুদ্ধে অংশও নিয়েছে সব, দল, মতের মানুষ(রাজাকার, আলবদর, আল শামস বাদে)। মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার লড়াই।
অন্যদিকে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব হলো স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন। এটি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন। এটি জনবিপ্লব। এটি আওয়ামী সরকারের নতজানু পররাষ্ট্র নীতির বিরুদ্ধে, দুর্নীতি, গুমখুনের বিরুদ্ধে, ভোটচুরির বিরুদ্ধে, নিরস্ত্র জনতার উপর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে জনবিক্ষোভ ও গণআন্দোলন। জুলাইতে রাজপথে জামাত শিবিরের কর্মীরা যেমন নেমেছিল তেমনি বামপন্থী, জাতীয়তাবাদী, বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলও নেমেছিল।
মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাইয়ের প্রেক্ষাপট, চরিত্র এবং ঘটনাক্রম পুরো আলাদা। বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৯০, ২০২৪ সবই ইতিহাসের অংশ। কোনটাই কারও বিপরীত পক্ষ নয়। সবগুলোতেই জনতার অংশগ্রহণ ছিল। রক্ত ঝরেছে সাধারণ মানুষের। জয়ীও হয়েছে সাধারণ মানুষ। আমিও চিরদিনই জনতার পক্ষেই আছি। আমাকে কালচারাল ফ্যাশিস্টরা ‘লালবদর’ বলে গালি দিচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারাই জুলাইতে রাজাকার বলে নিজেদের প্রমাণ করেছে।
কালচারাল ফ্যাশিস্টরা মুক্তিযুদ্ধকে জুলাইয়ের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে একটি ইমোশনাল গেইম তৈরি করেছে। যাতে তাদের ফ্যাশিস্ট শাসকের পক্ষে থাকা, দুর্নীতি, সুবিধা নেয়া,প্লট, বাড়ি, গাড়ি, পদক পুরস্কার বাগানোকে জায়েজ করা যায়। জুলাই তাদের বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছে। তাই তারা মুক্তিযুদ্ধের বিপরীত পক্ষ হিসেবে জুলাইকে উপস্থাপন করে জনতাকে বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছে।
বিভ্রান্ত হবেন না। আমরা যারা একাত্তর, নব্বই ও জুলাইসহ সব যুদ্ধ, আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে থেকেছি, জনতার পক্ষে থেকেছি তাদের বিভ্রান্ত করা এত সহজ নয়। কোনো শহীদের রক্তই বৃথা হবে না। বাংলাদেশের মাটিতে চিরদিন জনতার জয় হবে।







