আবু তাহের সরফরাজ
বৃষ্টিস্নাত জুলাই
…………
বৃষ্টিস্নাত জুলাই মাসে খুনরাঙা রাজপথ
পুলিশ-সেনার সাঁজোয়া ট্যাঙ্ক বাজাচ্ছে নহবত।
বৃষ্টিধারার মতোই বুলেট ছুটছে দিগ্বিদিক
মরছে যত বাড়ছে তত জন স্রোতের দিক।
মাগো তোমার কোলের খোকা দুধমাখা ভাত ফেলে
সেই যে গেল ফিরল না আর… ভাবছো, বোকা ছেলে
খিদে পেলে ফিরবে ঠিকই, তাই তো বসে ঘরে
জানলা দিয়ে চেয়ে আছো তিন রাস্তার মোড়ে।
ওই পাড়াতে জ¦লছে আগুন সেই পাড়াতে কার্ফু
পাশের বাড়ির হামিদ মিয়া ছুটে আসেন, শোন বু—
খোকা যে তোর আর বেঁচে নেই বুলেটে বুক ঝাঁঝরা
লুটিয়ে পড়েন স্নেহময়ী মা আমাদের হাজরা।
ঝর ঝর ঝর বৃষ্টি ঝরে নাকি রক্তবন্যা?
রক্তজবার টকটকে লাল বাংলা মায়ের কন্যা।
মাগো তোমার সন্তানেরা এবার ক্ষেপেছে
মানুষখেকো ডাইনিটা তাই পালিয়ে বেঁচেছে।
জুলাই এপিটাফ
………..
লাল জুলাইয়ে জন স্রোতে ভাঙলো কারাদূর্গ
মুক্ত হলো মানবতা স্বাধীনতার সূর্য।
নতুন দিনের রক্তরাঙা পূব-আকাশের গায়
নবীন প্রাণের সম্ভাবনা উঁকি দিয়ে যায়।
অন্ধকারের ভাঁজ খুলে যে আনলো রাঙা ভোর
সেই কিশোরের রক্তে ভেজা বাংলা মায়ের ক্রোড়।
ঘরে-ঘরে মাতম করেন স্নেহময়ী মা
হামার বেটাক মারলু কেনে? জবাব দিয়ে যা।
বাংলা মায়ের সবুজ আঁচল বাঙালির মানচিত্র
শহিদ ছেলের রক্তে লেখা বৃষ্টি ভেজা পত্র।
কী লিখেছে আবু সাঈদ? কী লিখেছে মুগ্ধ?
জুলাই কেন লাল হয়ে যায়, লাল কেন হয় যুদ্ধ!
শহিদ ভাইয়ের রক্তে লেখা জুলাই এপিটাফ
যুগান্তরের সন্ধিক্ষণে স্মারক ফটোগ্রাফ।
এই ছবিটা সব বাঙালির বুকের ফ্রেমে থাক
বাংলা মায়ের সন্তানেরা আবার দেবে ডাক।
বাংলা মায়ের দামাল ছেলে
…………….
বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ লক্ষ-কোটি জনতা
প্রতিরোধের দূর্গ গড়ে কাড়তে খুনির ক্ষমতা।
স্বৈরশাসক বাংলাদেশের রক্তচোষা রানি
শাসন-ত্রাসে জনগণের রুদ্ধ মুখের বাণী।
কণ্ঠ ছেড়ে দেশের মানুষ গর্জে ওঠে আজ
স্বাধীনতার নতুন বিজয় রক্ত কারুকাজ।
পুলিশ-সেনার তপ্ত বুলেট ভেদ করে যায় বুক
মৃত্যু হবে জেনেও মানুষ রাজপথে উন্মুখ।
অন্ধকারের কার্ফু ভেঙে নামলো জনঢল
খুনি রানির মসনদে ঝড় উঠলো যে টলমল।
বাংলা মায়ের সবুজ জমিন বারুদ দিয়ে জ¦ালিয়ে
আগস্ট মাসের ৫ তারিখে রানি গেলেন পালিয়ে।
স্বাধীনতার সূর্যোদয়ে নতুন দিনের ভোর
রক্তজবার রঙে সূর্য রাঙায় মাতৃক্রোড়।
বাংলাদেশের ফুল-ফসলে সম্ভাবনার হাসি
বাংলা মায়ের দামাল ছেলে ছাত্র শ্রমিক চাষি।
ডাইনিমুখো বুড়ি
……………
ডাইনিমুখো বুড়ির হাতের মুঠোয় বন্দি দেশ
ইচ্ছেমতো যা-খুশি তা দ্যায় যে সে নির্দেশ।
তার কথাতেই ওঠা-বসা তার কথাতেই চলা
তার প্রশস্তি না-হলে ভাই নিষেধ কথা বলা।
নিষ্পেষিত দেশের মানুষ নিষ্পেষণের যন্ত্রে
ডাইনি বুড়ি বলছে, এটাই নিয়ম গণতন্ত্রে।
নির্বাচনে ভোট পড়ে না নেই জনগণ সঙ্গে
ডাইনি তবু প্রধানমন্ত্রী কী তামাশা বঙ্গে!
ডাইনি বুড়ির পদলেহী সহযোগী যারা
দেশবাসীকে জিম্মি কোরে দেশটা চালায় তারা।
জনগণের নেই অধিকার খেয়ে-পরে বাঁচার
নুন আনতে পান্তা ফুরায় কলিমুদ্দি চাচার।
দেয়ালে পিঠ ঠেকলো বলেই উঠল কেঁপে দেশ
প্রতিবাদে মুখর হলো সারা বাংলাদেশ।
পথে-পথে চলল গুলি পড়ল হাজার লাশ
রক্তে ভিজে রাঙা হলো সবুজ মাঠের ঘাস।
প্রতিবাদী ছেলে
……………
আগুন নাকি ঝলসে ওঠে আরও আগুন পেলে?
প্রতিবাদের মিছিলে তাই প্রতিবাদী ছেলে।
দুই দিকে দুই হাত ছড়িয়ে বুক দিলো সে পেতে
স্বৈরাচারীর ঘাতক বুলেট বক্ষে এসে বেঁধে।
বুলেটে বুক ঝাঁঝরা তবু সাহস কী অদম্য
মরণজয়ী এই কাফেলা আনলো দেশে সাম্য।
আবু সাঈদ পথ দেখালো মৃত্যু যে খুব তুচ্ছ
তাই তো রাঙা পলাশ ফুলে ফিঙে নাচায় পুচ্ছ।
গুচ্ছফুলের পাপড়িরাঙা শহিদের ওই দরজা
প্রাণ-পাখিটা উড়ে গিয়ে পরম স্নেহে ধর যা।
পিদিম হাতে সন্ধেবেলা বসে আছেন মা
কবর জিয়ারতে বাবা অশ্রু মোছেন না।
পুঁইলতাটি মাচার ওপর করছে কিসের খোঁজ?
শহিদ ছেলের রক্তে রাঙা সূর্য ওঠে রোজ।







