মনসুর আজিজ
………………
জুলাইয়ের রক্তজবা
…………..
রক্ত কি ফুলের পাপড়ি
চৌরাস্তার মোড় কি তবে বৃন্ত
রক্তজবার কেশকের মতো দাঁড়িয়েছে সাহসী তরুণ
স্লোগানের মাঝে স্বৈরাচার পতনের বিপ্লবী পরাগায়ণ
রাজুভাস্কর্য, মিরপুর গোলচক্কর, যাত্রাবাড়ি, উত্তরা…
প্রতিটি চত্বরে যেন ফুটে উঠেছে বিপ্লবের রক্তজবা
তার সৌরভে সাহসী তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী, বয়স্ক নারী-পুরুষ, সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ ছুটে আসছে
এক দানব জুলুমশাহীর দু:শাসনের অবসান ঘটাতে
কপালে বাঁধা লালফিতা যেন টগবগে রক্তশিরা
বিদ্যুৎতরঙ্গের মতো নেচে ওঠে ধমনিতে
ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র বাংলাদেশে
লাল জুলাইয়ের নবীন বিপ্লবীরা লড়াই করে প্রশিক্ষিত অস্ত্রবাজ যোদ্ধার সাথে।
গড়ে ওঠে নেতাবিহীন জনতার প্লাটুন
রেজিমেন্টে বেজে ওঠে জালিম শাহীর পতনের দামামা
পুলিশ ও হেলমেটবাহিনী মেতে ওঠে মানুষপাখির শিকারে
অস্ত্রবাজ রক্তলোলুপ পুলিশের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় সাহসী তরুণ আবু সাঈদ
হাতে তার সরু এক বৃক্ষডাল
তাকে সঙ্গীন করে বুকচিতিয়ে দাঁড়িয়ে যায় বন্দুকের সামনে
বুলেটবিদ্ধ তরুণ লুটিয়ে পড়ে রাজপথে
একজন, দুজন, শত থেকে হাজারে…
বুলেটবিদ্ধ হয় যেন সমগ্র বাংলাদেশ!
বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের মতো তীব্র নিনাদে গর্জন করে ওঠে মরণজয়ী সাহসী ছাত্র-জনতা
অসীম সাহসে ঝাপিয়ে পড়ে তীব্র প্রতিবাদে
আগুন যেমন গলিয়ে দেয় কঠিন লোহাকে
তেমনি এক দুর্বিনীত জালিম শাসকের জুলুমকে ছিন্ন করে মাকড়সার জালের মতো
আর ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়ে ফুটে ওঠে ছত্রিশে জুলাইয়ের রক্তগোলাপ।
…………….
জুলাই যেন ক্ষোভের বারুদ
…………
রক্তনদী সাঁতরে যখন পেলাম মুক্ত তীর
বিপ্লবীরা পায় না খুঁজে নেতা কিংবা পীর
সবাই যখন ধরতো স্লোগান রক্ত মাখা পথে
মানুষরূপী একটা শকুন থাকতো বসে রথে।
লাশের নেশায় বুঁদ ছিলো সে যেন নরখাদক
বৃদ্ধ যুবক মারলে শিশু আনন্দিত ঘাতক
বরফগলা উত্তাপে তাই ক্ষুদ্ধ জনগণ
করলো শুরু মরণপণে গণআন্দোলন।
রাহুমুক্ত এদেশ হবে সবার মনের আশা
দেশের মানুষ এককাতারে যায় কেটে হতাশা
তপ্ত বুকের রক্ত ঢেলে রক্তজবা ফোটে
ছত্রিশে জুলাই স্বাধীন নতুন সূর্য ওঠে।
জুলাই যেন ক্ষোভের বারুদ শাসক দিশাহীন
জালিম পালায় নিরুদ্দেশে হয়ে স্বপ্নহীন।
………………
জুলাই বৃক্ষের নতুন ফুল
………….
শাসক যখন দম্ভের আফিম খেয়ে রাজ্য শাসন করে
জনগণকে মনে করে পায়ের তলার পিঁপড়ে
মোনাফেক পুজারি যখন ঘিরে থাকে শাসকের চারপাশ
বালির বাঁধের মতো তখন ভেঙে পড়ে জালিমের সিংহাসন
মৌমাছির চাক থেকেই মৌয়াল সংগ্রহ করে মধু
খেজুর গাছের ফোঁটা ফোঁটা রস থেকে পূর্ণ হয় কলস
শাসক যখন ঢিল ছোঁড়ে মৌচাকে জনতা তখন শাসকের শরীরে বিদ্ধ করে যন্ত্রণার হুল
বিষের তীব্রতায় দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে জ্ঞানশূন্য হয়ে
ফেরাউন, নমরুদ, কারুন, সাদ্দাত– তারাও ছিলো ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ শাসক
তাদের পতনের ইতিহাস শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষ রেখেছে মনে
একুশ শতকের বাংলার লেডি ফেরাউনের কথা সূচিবদ্ধ হয়েছে জালিম শাসকের সাথে
পৃষ্ঠা উল্টালে আলিফ লায়লার কাহিনির বদলে ভেসে ওঠে
বাংলাদেশের নিরীহ মানুষের শত সহস্র রোমহর্ষক জুলুমের হৃদয়বিদারক কাহিনি।
রক্তের সিঞ্চনে পাতা মেলেছে জুলাইবৃক্ষ
নতুন ফুল ফুটে ওঠার তীব্র আকাঙ্খায় আকুল হয়ে আছে আঠারো কোটি দর্শক।
…..……….
জুলাই নামের বৃক্ষ
………..
বাতাসে সেদিন তরুণ প্রাণের রক্তের দাগ ছিলো
নিরীহ জনতা জানের ভয়েতে নিজ দেশে গৃহবন্দী
শাসক করেছে সার্থ বিকিয়ে শত্রুর সাথে সন্ধি
নোকারের দল নির্দয় হয়ে গুম-খুনে প্রাণ নিলো।
হেলমেট পরে এপিসি আড়ালে হায়েনারা ফেলে বোমা
রাজপথে খুনি নিয়েছিলো কতো গুলি করে তাজা প্রাণ
বদলে গিয়েছে শহরে নগরে স্লোগানের ভাষা মান
ফুঁসে ওঠে পথ ডর-ভয়-হীন জালিমের নাই ক্ষমা।
জনগণ নামে প্রতি ঘর থেকে রাজপথে বিক্ষোভে
প্রাণের মায়াকে কাফনে মুড়িয়ে রেখেছিলো খিল এঁটে
শান্ত জনতা পাটা ও পুতাতে কতকাল যাবে বেটে!
ফেরাউন দেখে ক্ষমতার ডাট নড়বড়ে হলো লোভে।
জুলাই নামের নতুন বৃক্ষ হবে জানি ছায়াদার
অত্যাচারী শাসকের কাছে মানবে না কভু হার।
…………..
কালো মেঘ উড়ে যায়
……………
সেদিন আকাশে মেঘ জমেছিলো
বিজলি চমকাচ্ছিলো আকাশ জুড়ে
বৃষ্টি, তুমুল বৃষ্টি! আর ঠাডা-পড়া আওয়াজ
আমার দৃষ্টির ভ্রম ছিলো!
সেদিন আকাশে জমেছিলো ফ্যাসিবাদী মেঘ
সাউন্ডগ্রেনেডের আওয়াজ যেন বাজপড়া আওয়াজ
বুলেটের বৃষ্টি দীর্ণ করেছিলো রাজপথে ফুটে থাকা মানবফুল
রক্তে ভেসেছিলো শহর-গ্রাম-গঞ্জ, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়
বৃষ্টির পর রঙধনু উঠেছিলো আকাশে
বহুমত, বহুপথের নরনারী সামিল হয়েছে রাজপথে
বিপ্লবী তরুণ-তরুণীর কপালে বাঁধা লালফিতা
সাহসী কণ্ঠে মেঘের গর্জনের মতো স্লোগান
রক্তে লেগেছে আগুন,
দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে রাজনটীর অন্দরে
ঘাড়ের কাছে তলোয়ার, বুকের কাছে খঞ্জর
পালাবে কোথায়, হে জালিম!
বাংলাদেশের ইঞ্চি পরিমাণ জমিনও অভশপ্ত শয়তানের আশ্রয়স্থল নেই!
অবশেষ কালো মেঘ উড়ে যায়,
শয়তানের ছায়াতলে।







