প্রচ্ছদসাম্প্রতিকএ ক্রনিকল অফ এ ডেথ ফোরটোল্ড

লিখেছেন : এবাদুর রহমান

এ ক্রনিকল অফ এ ডেথ ফোরটোল্ড

এবাদুর রহমান 

নাহিদকে বডি শেমিং করা কার্টুন দেখলাম। 

জাইমা রহমানকে স্লাট শেমিং করা ব্যঙ্গচিত্র কোথায়?

অথবা, ড. রেহনুমা, ড. সাঈদিয়া গুলরুখ, ড. সামিনা লুৎফা 

ও ফটো শহিদুল শুধু কেফায়া পরিধান করে গাজ্জা ফ্লোটিলায় 

মাস্তি করছেন, আর তানজিম ওয়াহাব ও মুনেম ওয়াসিফ 

লেইকা এম সিক্স-এ ৫০ মিমি লেন্স লাগিয়ে ছবি তুলছেন, 

আর শ্বাসের নিচে শীৎকার করছেন: ইয়েস ডাডি,  ইয়েস

ইয়েস ডাডি,  ইয়েস ইয়েস  ইয়েস ইয়েস  ইয়েস ইয়েস…

—এই কার্টুন আমরা কবে দেখবো? 

আদৌ দেখবো? 

আমি কি বলতে চাইছি বুঝতে পারতেসেন?

আমরা কবে দেখবো মুক্তিযোদ্ধাদের বেহারী ধর্ষণ নিয়ে কার্টুন?

সৈয়দপুরের বেহারী জেনোসাইড নিয়ে বাঙালিয়ানাকে বিদ্রুপ? 

কবে দেখবো বেলবটম পরা টেডি চুলকাটা ২ নং সেক্টরের 

আরবান মুক্তিযোদ্ধা মতিঝিলে হাইজ্যাক করতে গিয়ে ধরা 

পরে জনগণের কাছে ফুঁন মারা খাচ্ছে—এই বিষয়ে নিয়ে 

 মোদী মিডিয়ার ল্যাপডোগ শিল্পীরা বা শিশির কার্টুন এঁকেছে?

বা, আরো পুরানো ক্ষততে হাত দেই, 

—হিম্মত আছে নোয়াখালীর দাঙ্গা তদন্ত করে মুসলিমদের সাথে রগড় করার?

মনে রাখবেন, যতদিন পর্যন্ত আমরা যোগেন মন্ডল ও 

নোয়াখালীর দাঙ্গাকে পলিটিক্যালি ও এথিক্যালি ডিল না করবো 

ততদিন বাঙালি মুসলমানের ইতিহাসের কাছে দায়মুক্তি ঘটবে না! 

আশা করি বুজতেসেন, শিল্পীর স্বাধীনতা এখানে প্রশ্নের সম্মুখীন নয়। 

এখানে আমি প্রশ্ন করছি সমাজ ও রুচির সেই অদৃশ্য বায়াসকে, 

যা আপনাকে একটি বিষয় নিয়ে ব্যঙ্গ করার অনুমোদন দেয়,

আরেকটা বিষয়কে পবিত্র বানায় ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখে, 

সেই বিষয় নিয়ে বিদ্রুপ করা: পার্ভার্শন, অরুচিকর, 

ভদ্রতার সীমার বাইরে, অসভ্যতা, দেশদ্রোহ,

এবং কখনো কখনো অধর্ম ও ধর্মীয় অনুভূতির অবমাননা। 

খেয়াল করবেন, ২ ক্যাটেগরির কোনোটাই কিন্তু বেআইনি নয়। 

অন্ততঃ নাম মাত্র গনতন্ত যেখানে আছে, বা বাক স্বাধীনতার 

হুজুগ যেখানে তোলা গেছে সেখানে রাষ্ট্র, বিদ্রূপকে, বেআইনি করছে না; 

কিন্তু, সমাজ ও লোক রুচির অজুহাতে একটার অনুমোদন দিচ্ছে, 

কিন্তু, আরেকটার অনুমোদন দিচ্ছে না। 

নিচের কার্টুন গুলো 

ক্লাস এইট পাস বেগম খালেদা জিয়াকে “গুলাপি বিবি” বলে,

শিক্ষিত মধ্যবিত্ত কি তীব্র তাচ্ছিল্য প্রকাশ করতো!

তাঁকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের ছররা বয়ে যেত ভদ্র সমাজে। 

কিন্তু, বরাবরের মতো আসল শত্রু ছিল হুজুররা। 

মুসলিম পরিচয়-চিহ্ন বহন করা যে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী। 

বাঙালি জাতীয়বাদ ও তার নির্মিত “বাঙালি সংস্কৃতি” 

কি যে তীব্র ইসলাম বিদ্বেষ ও দলিত ও মুসলিম যৌনতার 

ভয় বুকে নিয়ে দিন গুজরান করে, তা কহতব্য নয়। 

বাংলাদেশে গত ৫০ বছরের কার্টুন নিয়ে গবেষণা করলে দেখবেন,  

মুসলিম পরিচয়ের কিছু চিহ্নকে ক্যারিকেচার করে, 

বিদ্রুপ করা হচ্ছে; 

বিদ্রুপের ভাষা খেয়াল করলে দেখবেন: 

এই ভাষা আধুনিক নয় বরং মধ্য যুগ থেকে আসা;

মধ্য যুগ এমনকি রেনেসাঁ পরবর্তী সময়ে ইয়াহুদীদের 

শরীরী এট্রিবিউট, যেমন ভুঁড়ি, বড় বাঁকা নাক, 

ইত্যাদি নিয়ে ঠিক এইভাবে ব্যঙ্গ করা হতো; 

১৯৩০-এর দশকে নাৎসিরা এই ঐতিহ্য আবার পিক করে;

ইয়াহুদীদেরকে বিদ্রুপে ইঁদুর, মোটা শুয়োর 

ও ডিমন, রাক্ষসের সাথে তুলনা করা হয়;

এই বিদ্রুপ ইয়াহুদীদেরকে হত্যাযোগ্য করে তুলতে সাহায্য করে। 

এই বিদ্রুপ ছাড়া হলোকস্ট বা ৬ মিলিয়ন ইয়াহুদী হত্যা এত সহজ হতো না। 

যে ইতিহাসটি গোপন করা হয়, তা হচ্ছে,

নাৎসিদের অসম্ভব মুসলিম ঘৃণার কথা। 

আউশভিৎজ ও অন্যান্য কুখ্যাত ডেথ ক্যাম্পে সবচেয়ে খারাপ গালি ছিল: 

die Muselmaenner = মুসলিম। 

এই বিষয়ে ইংরেজিতে খুব বেশি গবেষনা না হলেও, 

স্তানিস্লাভ ক্লোডজিনস্কি ও রায়ান জডিজিসলো, 

তাঁদের দা বোর্ডারলাইন বিটুইন লাইফ এন্ড ডেথ: এ স্টাডি 

অফ দা ফেনোমেনন অফ দা মুসলমান ইন দা কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্প 

বহিতে কিছু আলোচনা করেছেন। 

কিন্তু, ইতালিয়ান দার্শনিক জর্জিয়ো আগামবেন বলেছেন খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা: 

তিনি বলতেন মুসলিম গেস্টাল্ট একটা এথিকাল ক্যাটেগরি;

য়োরোপীয়দের জন্য মুসলিম গেস্টাল্ট একটা রাজনৈতিক সীমা বা দিঙরেখা। 

তাইলে, নাহিদকে নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র তাইলে নূতন আর কি, তাই না?

এইটা তো বাঙালি সমাজের গেস্টাল্ট, রাজনৈতিক সীমা প্রকাশ করতেসে।

একই সাথে বলতেসে,

রাজনীতিতে কে আগামীতে হত্যাযোগ্য হবে সেইটাও প্রকাশ করতেসে…

প্রকাশ করতেসে কাকে কোরবানি দিলে স্ট্যাটাস-কো 

খুব বেশি পাত্তা দিবে না। 

নিচের কার্টুনগুলো আবার দেখুন। 

মামলাটা ইসলামোফোবিয়া বা বাঙালি জাতীয়বাদী বয়ানের নয়। 

মামলাটি হচ্ছে, কার ক্ষমতা আছে?

কার দাপ আছে? 

কার এজেন্সী আছে বলে সমাজ ও স্টাব্লিশমেন্ট বিশ্বাস করে?

আর কাকে দুর্বল বলে বিবেচনা করে?

উজিরে খামাখা শান্দা মাহফুজ আর পেটকা নাহিদের যে 

নিজের ইমেজ কন্ট্রোল করার ক্ষমতা নাই এইটা,  

স্টাব্লিশমেন্ট সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলসে। 

স্টাব্লিশমেন্ট সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলসে যে জুলাইয়কে 

লিবারাল ভ্যালু অথাৎ সংবিধান, বাক স্বাধীনতা ইত্যাদি 

দিয়া প্রথমে নিউট্রালাইজ করা হবে, 

ডিজারম করা হবে, 

July CDI করা হবে,

জুলাই প্রজন্মকে বিদ্রুপ করে শাসক শ্রেণীর বাইরের 

অযোগ্য, নালায়েক ছাপড়ি প্রতিপন্ন করা হবে, 

এই কমবয়সী, গ্রাম্য, মাদ্রাসা-পাশ, আধুনিক কেতাহীন ছেলেগুলা যে,  

মধ্যবিত্ত চৈতন্য, মূল্যচেতনা, শিক্ষা ও কৃষ্টির জন্য ক্ষতিকর, 

নারী স্বাধীনতা, প্রাগ্রসরতা ও অর্থনৈতিক মুক্তির অন্তরায়, 

এইটা প্রমান করা কঠিন, তাই বিদ্রুপ করে করে,  

সমাজের অবচেতনে থাকা কিছু ভয় ও চিহ্ন সামনে এনে,

প্রথমে, এদের ৪ মাসের পোয়াতির মত পেট আর 

থলথলে শরীর তুলে কথা বলে বলে  

সমাজের গভীরে সুপ্ত থাকা লজ্জা, শ্লেষ 

ও বায়াসকে বের করে আনতে হবে  …

জুলাই প্রজন্মকে বিদ্রুপ করে করে, সমাজের অবচেতনে থাকা বিশ্বাস,

এরা যে হারাম খাইতে খাইতে বাংলাদেশের সব সম্পদ খাইয়া ফেলতেসে 

এরা যে নিষ্কর্মা দুর্নীতিবাজ বোঝা, 

এই অসত্য রিপিট করে করে  মানুষে মন বিষিয়ে দিতে হবে, 

আর এই বিষিয়ে দেয়াতে কোন যুক্তির প্রয়োজন কিন্তু নাই; 

কোন তথ্যের প্রয়োজন নাই; 

সব তো ফান, হাসি-মজা, ইয়ার্কি, বাক-স্বাধীনতা। 

তারপর আলগোছে জুলাই প্রজন্মকে পুরাতন শত্রুর কাতারে ফেলে দিতে হবে:

পাকিস্তান বীর্য; রাজাকারের বাচ্চা, জামাত, ছাপড়ি, টোকাই, 

কালো ডাকাতের মত—দেখলেই ভয় লাগে, 

বাংলা উচ্চারণে কথা বলতে পারে না ইত্যাদি ইত্যাদি। 

প্রমান করাটা , দিলেজিটিমাইজ করাটা প্রথম ধাপ। 

দ্বিতীয় ধাপে বিচার হবে বিচার। 

তৃতীয় ধাপে হবে ফাঁসি। 

মনে রাইখেন, জুলাই প্রজন্ম আপোষ করে সংবিধানের ধারাবাহিকতা,

রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাইখা নিজেরা ক্ষমতায় না গিয়ে, 

নূতন রাষ্ট্র তৈরী না করে, 

পুরাতন রাষ্ট্র, আমলাতন্ত্র ও স্টাব্লিশমেন্ট বহাল রাইখা 

বিএনপিকে ক্ষমতায় আনসেন। 

নিজামী সাহেব বা কাদের মোল্লার মতো আপনাদের ফাঁসি হবে। 

এই কার্টুন আপনাদের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পূর্বপত্র। 

আমি মার্কেজ হইলে আজকে ক্রনিকেল অফ এ ডেথ ফোরটোল্ড 

লেখা শুরু করতাম।

সাধু সাবধান !

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা