প্রচ্ছদসাম্প্রতিকমোহন রায়হান বিএনপিকে জুলাই হন্তারক মনে করেন?

লিখেছেন : তাজ ইসলাম

মোহন রায়হান বিএনপিকে জুলাই হন্তারক মনে করেন?


তাজ ইসলাম

কবিতা আমি বুঝি না, আপনি বোঝেন। কবিতা যখন প্রকাশ ও প্রচার হয় তখন পাঠক পাঠ করে। পাঠক আপনার মতো হয়তো বোদ্ধা নন। তবে পাঠক বোঝেন নিজের মতো করে। অগণিত পাঠকের নানারকম বোধ, বিচিত্র উপলব্ধি। আমি বা আমার মতো একজন আনকোরা পাঠক মোহন রায়হান নামক কবির কবিতাটি পাঠ করি। কবিতা পাঠ করে, অথবা পাঠ করতে করতে কবিকেও চিনি। কবির রাজনৈতিক, আদর্শিক অবস্থান জানা থাকলে কবিতা সম্বন্ধে জানতে সহজ হয়। পাঠক হয়েও উপমা, উৎপ্রেক্ষা, ইঙ্গিত ধরা সহজ হয়। মোহন রায়হানের কবিতাটি এক টানে পাঠ করি:

‘জুলাই এখন
ঝুলে আছে গণি রোডের ঝুলবারান্দায়—
লাল ফিতার ফাঁসিতে শ্বাসরুদ্ধ
শহীদের স্বপ্ন।
জুলাই এখন
হাসপাতালের আইসিইউতে,
জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে
এক রুগ্ন শয্যার নিঃশব্দ আর্তনাদ।
জুলাই এখন
নিস্পন্দ মাটির নিচে,
অচেনা গণকবরের অন্ধকারে
নামহীন অগণিত কবরফুল।
জুলাই এখন
গুলিবিদ্ধ পাখির মতো
ডানা ঝাপটায়
অপরাজেয় বাংলা আর রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে।’

এ পর্যন্ত পাঠ করে কবিতা কেমন, কতটুকু শিল্প সম্মত হল তা বুঝতে চেষ্টা করার আগে ভাবতে থাকি কবি কি বলতে চেয়েছেন।
জুলাই এখন
ঝুলে আছে গণি রোডের ঝুলবারান্দায়—

লাল ফিতার ফাঁসিতে শ্বাসরুদ্ধ
শহীদের স্বপ্ন।
জুলাই এখন
হাসপাতালের আইসিইউতে,
জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে

এক রুগ্ন শয্যার নিঃশব্দ আর্তনাদ। এই পর্যন্ত পাঠ করে বুঝতে চেষ্টা করছি। গণি রোড বলতে বাংলাদেশে ঢাকার বুকে যে রোডটা আছে এটি সচিবালয় এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ রোড। এখানে সচিবালয়। সচিবালয়ের সচিবরা চালায় দেশ। দেশ চালায় সরকার। বর্তমান সরকার বিএনপি দলীয় সরকার। জুলাই গণি রোডে লাল ফিতার ফাঁসিতে ঝুলছে, সচিবালয়ের ঝুল বারান্দায় ঝুলছে। এমনকি জুলাই আইসিইউতে চলে গেছে।
জুলাই হওয়াতে গণতন্ত্র ফিরে এসেছে, নির্বাচন হয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। বিএনপিও জুলাইয়ের পক্ষের শক্তিই। অথচ মোহন রায়হানের ভাষায় বিএনপি ক্ষমতায় এসে জুলাইকে সচিবালয়ে ঝুলায়ে রাখছে, জুলাইকে ফাঁসিতে জুলাইছে, অপর জুলাই আইসিইউতে মরণ যাত্রায় আছে।
বাংলাদেশে লীগ পালিয়ে যাওয়ার পর রাজনৈতিক দল হিসেবে অবশিষ্ট থাকে কারা? জাতীয় পার্টি আগে থেকেই লীগের দালাল, মোহন রায়হানের গুরু বাম জাসদের ইনু মেননের পরিচয় কি দেয়া দরকার? মোহন রায়হানের এরপর রাজনৈতিক স্বপক্ষ থাকে কারা? জুলাইয়ের পর মোহন রায়হানদের স্বপ্ন ছিল কাদের নিয়ে যে তারা ক্ষমতায় আসবে? দু দশটা জনবিচ্ছিন্ন বাম! আশা ছিল তারা ক্ষমতায় আসবে? বিএনপিকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিল? দেখার পর বিএনপি ক্ষমতায় এসে বিএনপি মোহন রায়হানের স্বপ্ন ভঙ্গ করেছে? মোহন রায়হান কি বলতে চান বিএনপি ক্ষমতায় আসাতে জুলাই নিহত, জুলাই আইসিইউতে?
মোহন রায়হানের অতীত ঘাঁটলে এই প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ হয়।
কারণ মোহন রায়হান ও তার রাজনৈতিক দর্শন বিএনপির বিপক্ষে। তিনি বিএনপি বিদ্বেষী।
শুধু বিদ্বেষ না বিএনপির প্রতি তার ঘৃণাও আছে। মোহন রায়হান তার ঘৃণা চর্চা করেছেন কবিতায়। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ জিয়াকে ‘খুনি ‘ বলে লিখেছেন কবিতা। সুতরাং আমি একজন পাঠক হিসেবে মোহন রায়হানের কবিতার ভাষা থেকে উদ্ধার করি অর্থ। সে অর্থ দাঁড়ায় মোহন রায়হানের মতে বিএনপি জুলাইকে মেরে আইসিইউতে রেখেছেন, গণি রোডের ঝুলবারান্দায় ঝুলিয়ে রেখেছেন, সরকারী হুকুমে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছেন। মোহন রায়হানের পায়ের তলায় মাটি নাই। তার মেনন-ইনুরা হাসিনাগিরি করে গণশত্রু হয়ে জেলে আছেন। রাজনীতি বিচ্ছিন্ন মোহনের অস্ত্র কবিতা। কবিতা দিয়েই প্রকাশ করলেন মতামত। জুলাইয়ের ময়দানের শক্তি বিএনপি। জুলাই ও জুলাই পক্ষকে দোষারোপ করা আওয়ামী কালচারাল কৌশল। মোহন রায়হান সেই কৌশলী পথই ধরেছেন। আগেই বলেছি ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি, বিএনপির সাথে আর যারা ছিল বিরোধী দলে আছে তারাই। কবিতার মাঝখানে জুলাইয়ের অন্য সব শক্তির প্রতিই ঘৃণার বিষবাষ্প ছড়িয়েছেন। আপনি দেশে বিদেশে যত পতিত লীগার আছে তাদের আলোচনা সমালোচনা খেয়াল করে দেখবেন তারা জুলাই নিয়ে কি ভাবে,কি বলে?
মোহন রায়হান আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলে সে লীগের পক্ষের না।
ষোল বছরের দীর্ঘ সময় পর্যালোচনা করলে মোহন রায়হানের চরিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠবে। খুঁজে দেখা দরকার ষোল বছরে মোহন রায়হানের সাহিত্য চর্চায় হাসিনার ফ্যাসিজম, স্বৈরাচারী আচরণের বিরুদ্ধে কয়টা কবিতা, ছড়া,গল্প লিখেছে? গুম খুনের বিরুদ্ধে তার অবস্থান কী? আওয়ামী এক্টিভিস্টদের মতে লীগের আমলে হেন কোন তদবির নাই যা মোহন রায়হান হাসিনা শাহীতে করেননি। তদবির করে সুবিধা নিয়েছেন। আবার হাসিনাকে বকেছেন। এটি আওয়ামী এক্টিভিস্টদের মতে মোহন রায়হান দুটোতে ব্যালান্সড ছিলেন। এটিকেই বলে সুবিধাবাদ। কবিতাতেও এই সুবিধাবাদ অবস্থান বজায় রেখেছেন। সমগ্র জুলাইকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, জুলাই পক্ষদের গালাগাল করে কবিতার শেষ পর্যায়ে এসে জুলাই কোলে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা। এটা শেষ পর্যায়ের আত্মপক্ষ সমর্থন। নিজেকে নিরাপদ রাখার ব্যাখ্যা। প্রতিবাদ করলে বলতে পারা শেষে ব্যাখ্যা আছে। মুখরা লোকের যুক্তি এমন কেউ মোহন রায়হানকে মা দারচোদ বলল আর মোহন রায়হান প্রতিবাদী হতেই সেই লোক আমার কাছে ব্যাখ্যা আছে,শেষটা শুনুন। শেষটা হল আপনি মাদারচোদ হলেও ভালো মাদারচোদ।খারাপ না।
মোহন রায়হানের কবিতাটিকে যারা জুলাইকে ধারণ করার শ্রেষ্ঠ কবিতা মনে করেন তাদের কাছে বিনীত অনুরোধ এখন জুলাইকে জীবনে একবার, শুধু একবার এখন একাত্তর কিংবা এখন মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই শব্দটা কেটে শুধু একাত্তর বা মুক্তিযুদ্ধ লিখে কবিতাটা আওয়ামী মজলিশে পাঠ করে আসবেন। আপনার পরবর্তী আপডেট আমরা দেখে নেব। যত টাকা লাগে আপনার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করব। এই অনুরোধটুকু রাখবেন কবিতার সমঝদার পণ্ডিতজি!
বাকি থাকে বাকস্বাধীনতা। হাসিনারও বাকস্বাধীনতা আছে। সইতে হবে তার কথা। হাসিনা ভিডিওতে আসে না। অডিওতে শুনতে থাকুন জুলাই একটা ষড়যন্ত্র। হাসিনার কালচারাল সন্তানরা বারবার যেই ভাষায় জুলাইকে ধারণ করে মোহন রায়হান কবিতায় ঠিক তাই অনুবাদ করেছেন। বিশ্বাস না হলে মোহন রায়হানের এই কবিতার কাব্যচিন্তা একশ ফ্যাসিস্ট কবির জুলাই ভাবনার সাথে মিলিয়ে তারপর মোহন রায়হানের পক্ষে লাফ দিন। সাত মিনিটে সাফ করে দাও। ছাত্রলীগই যথেষ্ট। মোহন রায়হানের জুলাই ভাবনা বাকস্বাধীনতার দোহাইয়ে হজম করলে ইনু, মেনন, কাদের, হাসান মাহমুদ, হাসিনার জুলাই ভাবনা মানবেন না কেন? যদি শব্দে শব্দে মিলে যায়!

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা