প্রচ্ছদপ্রবন্ধকবির চেতনায় আবদুল আলীম

লিখেছেন : আমিনুল ইসলাম

কবির চেতনায় আবদুল আলীম


আমিনুল ইসলাম


নিজের জীবন তখনই ধন্য হয়, যখন সে জীবন কাজে লাগে অন্য হাজারো জীবনের আঙিনায় আলোকায়নের আয়োজনে । কেবল খেয়ে পরে আর নিজের পরিবার পরিজনের জন্য পদ-পদবি কিংবা অঢেল ধনসম্পদ অর্জন বা রেখে যাওয়া কোনো ‘ধন্য জীবন’ নয়। চাঁদের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে পৃথিবী, পৃথিবী খুঁজে পায় অন্ধকারে পথচলার পথ। সেজন্যই চাঁদ এতটা ধন্য, এতটা প্রশংসিত। সকল মানুষ সমান প্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন না এবং সেই প্রতিভাকে বিকাশের সুযোগও সমানভাবে পান না সবাই। কিন্তু প্রতিকূলতাকে জয় করে যে নিজের প্রতিভার সম্যক বিকাশ ঘটাতে পারে, বৃহত্তর পৃথিবীর কল্যাণে, সার্থক হয় তার প্রতিভা, ধন্য হয় তার জীবন। আবদুল আলীম তেমনি এক সার্থক প্রতিভা– একটি ধন্য জীবনের নাম। উগ্র রাজনীতির দলান্ধ পণ্ডিতরা বুঝুক কিংবা না বুঝুক, এটাই সত্য যে, আমাদের চিন্ময় জাতিসত্তাকে বলিষ্ঠ ও বেগবান করে তোলার ক্ষেত্রে যেসকল কবি-কথাসিাহিত্যক-সংগীতশিল্পীর অদৃশ্য ও অপরিমাপযোগ্য ভ‚মিকা আছে, তাঁদের মধ্যে আবদুল আলীম অন্যতম।
কোনো একটি জনগোষ্ঠীর ‘জাতি’ হয়ে ওঠার পেছনে জনসংখ্যার পরিমাণের পাশাপাশি কাজ করে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও সমৃদ্ধি। সমৃদ্ধ ও সবল সংস্কৃতি থাকলে সেই জাতিরূপী জনগোষ্ঠীকে স্থায়ীভাবে পরাজিত করতে পারে না অন্য কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। সবল সংস্কৃতির অধিকারী কোনো জাতি কখনো সামরিকভাবে পরাজিত হয়ে রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব হারিয়ে ফেললেও তারা সংগ্রাম করে সময়ের ব্যবধানে পুনরুদ্ধার করে নেয় সেই সার্বভৌমত্ব। আরবজাতি একসময় সারা মধ্যপ্রাচ্য জয় করে ফেলেছিল। অধিকাংশ দেশে চাপিয়ে দিয়েছিল আরবি ভাষা ও সংস্কৃতি। কিন্তু পারস্যদেশ জয় করেও সেখানে আরবরা তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি চাপিয়ে দিতে পারেনি। কারণ পারস্য সাহিত্য ও সংস্কৃতি ছিল অনেক পুরোনো এবং অনেক বেশি সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী। অবশ্য আরবদের কাছ থেকে তারার গজল এর মতো সংগীতকে সাদরে গ্রহণ করে তার মানে উন্নয়ন ঘটিয়েছিল। সেটা অবশ্য “চাপানো” কোনো ব্যাপার ছিল না। এক মহাকবি ফেরদৌসীর ‘শাহনামা’ মহাকাব্য পড়ে নিজেদের অতীতদিনের বীরত্ব ও গৌরবময়তার কথা সম্পর্কে পুনশ্চ সচেতনতা ফিরে পেয়ে এবং তার মাধ্যমে অনুপ্রাণিত ও উদ্বুদ্ধ হয়ে পারসিয়ানরা ঘুরে দাঁড়িয়েছিল এবং ফিরে পেয়েছিল রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বসহ হারানো সকল গৌরব। ‘শাহনামা’ সম্পর্কে কবি মোহিতলাল মজুমদার তাঁর এক কবিতায় বলেছেন,
‘তার সেই পৌরুষের প্রবল বন্যায়
জীবনের সর্বগ্লানি নিত্য ধুয়ে যায়।’
বৃটিশরা এক সময় পৃথিবীর বড় অংশই দখল করে নিয়েছিল। বিজিত জাতিগুলোর চাপিয়ে দিয়েছিল নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি। আজ অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, কানাডা এবং আরও অনেক দেশের আদি বাসিন্দারা প্রায় অস্তিত্বহীন। কারণ তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি থাকলেও তা বিজয়ী জাতিকে প্রতিহত করার মতো সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী প্রকৃতির ছিল না। কিন্তু ১৯০ বছর শাসন শোষণ করেও বৃটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় চূড়ান্ত পর্যায়ে ব্যর্থ হয়েছিল। কারণ ইলোরা-অজন্তা-মেঘদূত-কালিদাস-তানসেন-বৈজু বাউরা-আমীর খসরু- আকবর-নুরজাহান-জাহাঙ্গীর-শাহজাহান-তাজমহল-গালিব-বাহাদুর শাহের ভূগোল বৃটিশদের নিজস্ব দেশ ও সংস্কৃতির চেয়ে অনেক অনেক বেশি পুরোনো, ঐতিহ্যবাহী ও সাহিত্য সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ। সেই আমলে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরাও দেখেছিলেন যে, বাঙালি জাতিরও সাহিত্য সংস্কৃতি অনেক মজবুত ও সমৃদ্ধ। আমরা যদি বর্তমান সময়ের পৃথিবীর দিকে তাকাই–দেখতে পাবো- বড়ো বড়ো রাষ্ট্রগুলো আবার সেই ‘সাংস্কৃতিক আগ্রাসন’ চালাচ্ছে নানা ভাবে নানা কৌশলে এবং ভয়ংকর চাতুর্যের সাথে। তাদের প্রধান অস্ত্র ভাষা ও মিডিয়া। এসব কারণেই সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনের মানুষগুলোর গুরুত্ব অনেক বেশি। তাদের অবদানের সঙ্গে অন্যদের অবদান তুলনীয় নয়। সংস্কৃতির প্রধান প্রধান দিকগুলো হচ্ছে ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, সিনেমা এবং চিত্রকলা । বাংলাদেশ ভাষা , সাহিত্য ও সংগীত–এই তিনটি ক্ষেত্রেই অনেক বেশি সমৃদ্ধির অধিকারী।
আজকের বাংলাদেশ সংগীতের যে শাখায় অতুলনীয়ভাবে সমৃদ্ধি ও স্বাতন্ত্র্য-এর দাবিদার, তা হচ্ছে লোকসংগীত ও দেশাত্মবোধক গান। আর এই গানের কাণ্ডারীদের অন্যতম প্রধান হচ্ছেন আবদুল আলীম। উল্লেখ্য, আব্বাসউদ্দীন আহমদ পল্লীগীতির প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট। আবদুল আলীম পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন অধিকতর বিস্তারিত সাম্রাজ্যের সম্রাট । আব্বাসউদ্দীন আহমদ এবং আবদুল আলীম লোকসংগীত সাম্রাজ্যের যথাক্রমে সম্রাট বাবর এবং সম্রাট আকবর। পঞ্চাশের দশক থেকে আশির দশক বাংলার সংগীতভুবনে রাজত্ব করেছেন আবদুল আলীম। তিনি প্রধানত লোকসংগীত শিল্পী ছিলেন। তাঁকে মরমী শিল্পীও বলা হয়ে থাকে। কিন্তু শুধু পল্লীগীতি নয়, অসংখ্য ছায়াছবির গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। তিনি গেয়েছেন লালনগীতি, দু-একটি নজরুলসংগীতও। তিনি যে-গানই গেয়েছেন, সে-গানই তুমুলভাবে জনপ্রিয় হয়েছে। তিনি এমনই কণ্ঠ-মাধুর্য এর অধিকারী ছিলেন যে তাঁর কণ্ঠে গানের প্রতিটি শব্দ হয়ে উঠেছে সুরের পাত্র। বাংলা সাহিত্য-সংগীতের বিকাশ ও বিস্তার ঘটেছিল কলকাতাকে কেন্দ্র করে। কারণ লালন-হাসন রাজা ছাড়া প্রধান প্রায় সকল গীতিকার-সুরকার- শিল্পীর কাজের শুরু হয়েছিল ও বিকাশ ঘটেছিল কলকাতা থেকে।
সেই ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর সাহিত্য সংগীতের আরেকটি কেন্দ্র হয়ে ওঠে ঢাকা। অনেক শিল্পীর মতো আবদুল আলীমও কলকাতা ছেড়ে ঢাকা চলে আসেন। অচিরেই তিনি হয়ে ওঠেন লোকসংগীত ও ছায়াছবির গানের প্রধান কণ্ঠ। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ( আজকের বাংলাদেশ) এর সংগীতভুবন স্বনির্ভর ও স্বাতন্ত্র্যখচিত হয়ে ওঠে যে কয়জন কণ্ঠশিল্পীর অসামান্য অবদানে, আবদুল আলীম ছিলেন তাদের শিরোমণি। সত্যিকথা বলতে কি তিনি পশ্চিমবঙ্গের লোকসংগীত ও পূর্ব বাংলার লোকসংগীত (পল্লীগীতি) এর মাঝে একটি স্পষ্ট ব্যবধান রেখা এঁকে দেন। পূর্ব বাংলার লোকসংগীত পশ্চিমবঙ্গের লোকসংগীতকে ছাড়িয়ে অনেক উপরে উঠে যায়, অনেক বিস্তৃতি লাভ করে, অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শুধু গ্রামের মানুষ নয়, শহরের শিক্ষিত লোকেরাও লোকসংগীতের ভক্ত হয়ে ওঠেন। এই গান একইসাথে গ্রামের অশিক্ষিত আধাশিক্ষিত মানুষের এবং শহরের শিক্ষিত বিদগ্ধ জনের গান হয়ে ওঠে। আর এর মূল কৃতিত্ব ছিল আবদুল আলীমের। মাঠের কিষাণ, ঘাটের মাঝি, পালের রাখাল, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, বালক থেকে বৃদ্ধ— সবাই শ্রোতা ওঠে আবদুল আলীমের গানের। আবদুল আলীমের গান হয়ে ওঠে প্রাণজুড়ানিয়া পূবালী বাতাস। এ-দেশের ছায়াছবির গানও শুরু হয় আবদুল আলীমের প্লেব্যাক দিয়ে। আশির দশক অবধি গ্রামের বিয়ের অপরিহার্য অনুষঙ্গ ছিল মাইকে রেকর্ডের গান বাজানো, আর আবদুল আলীমের গান বাজতেই হবে সেখানে। আবদুল আলীমের ব্যাপক জনপ্রিয়তা লক্ষ করে কোলকাতার এইচএমভি তাঁর গানের এলপি বের করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। আবদুল আলীমের সঙ্গে যৌথভাবে গান গাওয়ার সুযোগ পাওয়া সেসময় যে কোনো শিল্পীর জন্য ছিল অনন্য সম্মানের ব্যাপার।
আমি ভাগ্যবান যে আমার শৈশব-কৈশোর-প্রথম যৌবনকে সংগীতমুখী ও সুরময় করে তুলেছিলেন যারা তাদের মধ্যে প্রধান ছিলেন আবদুল আলীম। আমি যে আজ সংগীত নিয়ে এত ভাবি, এত সময় ও সামর্থ্য ব্যয় করি, আমার জীবন যে আজও সুরময়, তার পেছনে আমার কৈশোরের আবদুল আলীম কাজ করেন নীরবে গোপনে। তাঁর গাওয়া কত গানই তো পুরো বা আংশিক মুখস্থ আজও আমার। ‘সর্বনাশা পদ্মানদী, তোর কাছে শুধাই ’, ‘আর কতকাল ভাসবো আমি দুঃখের সারি গাইয়া’, ‘আমারে সাজায়ে দিও নওশার সাজন’, ‘পরের জায়গা পরের জমি ঘর বানাইয়া আমি রই’, ‘বহুদিনের পিরিত গো বন্ধু, একইদিনে ভেঙ্গো না’ ,‘হলুদিয়া পাখি সোনার বরণ পাখিটি ছাড়িল কে’, ‘দোল দোল দোলোনি রাঙা মাথার চিরুনী’, ‘ছলছল কলকল নদী করে টলমল’, ‘অসময় বাশি বাজায় কে রে পরান আমার বাইরাম বাইরাম করে’, ‘প্রেমের মরা জলে ডুবে না’, ‘এ পারে তোর বসতবাড়ি রে’, ‘রূপালি নদীরে রূপ দেখে তোর হয়েছি পাগল’, ‘তোমার লাগিয়ারে সদাই প্রাণ আমার কান্দে বন্ধুরে’, ‘দুখিনীর পরানের বন্ধু রে, আমায় কই গেলি ফেলিয়া’, ‘পিঞ্জিরার পাখির মতো উইড়া যাইয়া দেখি, কোথায় গো আমার কালো পাখি’, ‘ও সুজন বন্ধুরে, আমার যাবার বেলায় নয়নজলখানি যদি তোমার মনে না লয় আমি না যেন জানি’, ‘উজান গাঙের নাইয়া’, ‘স্বরূপ তুই বিনে দুখ বলবো কার কাছে’, ‘মেঘনার কূলে ঘর বান্ধিলাম বড়ই আশা করে’, ‘কে কান্দেরে নদীর কিনারায়, আউলাচুল বাতাসে উড়ে ঘোমটা নাই মাথায়’, ‘এই যে দুনিয়া কিসের লাগিয়া এত যত্নে গড়াইয়াছেন সাঁই’, ‘শোনো গো রূপসী কন্যা গো, কার লাগিয়া গাথো ফুলের মালা’, ‘কে গো নিরালে বসি’, ‘ভাটির গাঙে ভাইটাল সুরে বাঁশি কে বাজাইয়া যাও ও রে বন্ধু একবার চাও ফিরে’, ‘কেহ করে বেচাকেনা কেহ কান্দে রাস্তায় পড়ে’, ‘অকূল দরিয়ায় দিলাম নাও ভাসাইয়া, দয়াল তোমার নাম লইয়া’ ‘প্রেমদরিয়ায় এত যে ঢেউ আগে না জানিতাম’, ‘দুয়ারে আইসাছে পালকী’, ‘মন ভোমরা মজলি না তুই রসুল নামের রসে’, ‘এ সংসারে কেউ নয় আপনজনা’, ‘আল্লাহু আল্লাাহু তুমি জালে জালালুহু’, ‘কত যে রঙের খেলা জানো দয়াল আল্লারে’, ‘ও যার আপন খবর আপনার হয় না’, ‘দুঃখ-সুখের দোলায় দোলে ভবনদীর পানি’, ‘ও মুর্শিদ পথ দেখাইয়া দাও’, ‘ ও গুণের ননদ লো’, ‘এই সুন্দর ফল সুন্দর ফুল, মিঠা নদীর পানি’, ‘এক‚ল ভাঙে ও ক‚ল গড়ে এই তো নদীর খেলা’, ‘বাবু সেলাম বারে বার’, ‘সব সখিরে পার করিতে নিবো আনা আনা’, ‘আমার দেশের মতো এমন দেশ কি কোথাও আছে’, ‘উজান দেশের মাঝি ভাইধন ভাটির দেশে যাও’, ‘বন্ধুর নায়ে ওড়ে নীল বাদাম’ — অসম্ভব রকমের জনপ্রিয় এমন কত যে গানের কণ্ঠশিল্পী আবদুল আলীম।
এবার আমি আমার কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে চাই। আমার জন্ম– বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েক বছর আগে। পাকিস্তান আমলে। ষাটের দশকে। প্রকৃতপক্ষে আমার গান শোনার কান তৈরি হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে। অবশ্য তার শুরু দুয়েক বছর আগে। তখন কান পেতে শুনতাম, সবটুকু আবেগ বিনিয়োগ করে শুনতাম– রেডিওতে প্রচারিত এবং বিয়ের বাড়িতে মাইকে বেজে যাওয়া গান। আর গানের রাজা আবদুল আলীম। গ্রামের হাট-বাজারে ফেরিওয়ালাগণ কবিরাজী ঔষধসহ নানারকমের সওদা বিক্রি করতেন। তার প্রথমে লোক জামায়েত করতেন হাটের একপাশে খোলা জায়গায়। তারপর বিক্রির কাজ। লোক জমায়েত করার জন্য তারা প্রায়শ আবদুল আলীমের গান করতেন দোতরার সাথে ‘এই যে দুনিয়া কিসের লাগিয়া’, ‘কেহ করে বেচাকেনা, কেহ কান্দে রাস্তায় পড়ে’, ‘প্রেমের মরা জলে ডুবে না’ ইত্যাদি। তখনও যেসব মুসলমান বিশেষত মৌলবী-মাওলানা গান-বাজনা শোনাকে পাপের কাজ বলে মনে করতেন এবং সেভাবেই কথা বলতেন জুমআর মসজিদে কিংবা ইসলামী জলসায়, তারাও আবদুল আলীমের কণ্ঠসুধার কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। ‘দুয়ারে আইসাছে পালকী’, ‘পরের জায়গা পরের জমিন ঘর বানাইয়া আমি রই’, ‘আমারে সাজাইয়া দিও নওশার সাজন’, ‘নবী মোর পরশমণি— নবী মোর সোনার খনি’, ‘ও মুর্শিদ পথ দেখাইয়া দাও’, ‘আল্লাহু আল্লাহু তুমি জাল্লে জালালুহু’, ‘এ সংসারে কেউ নয় আপনজনা’, ‘দুঃখ-সুখের দোলায় দোলে ভবনদীর পানি’, ‘এই সুন্দর ফুল সুন্দর ফল মিঠা নদীর পানি’, ‘প্রেমের মরা জলে ডুবে না’, ‘মোহাম্মদ মোর মোর নয়নমণি’, ‘মনে বড়ো আশা ছিল যাব মদিনায়’–এসব গান দিয়ে আবদুল আলীম সংগীতপ্রেমিক মানুষের পাশপাশি ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সংগীতবিমুখতা ঘুচিয়ে দিয়েছিলেন পুরোটাই যার শুরু হয়েছিল কাজী নজরুল ইসলাম–আব্বাসউদ্দীন আহমদ জুটির ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গান দিয়ে। যখন মাইকে বাজতো–‘শোনো গো রূপসী কন্যা গো– কার লাগিয়া গাঁথো ফুলের মালা’ কিংবা ‘সব সখিরে পার করিতে নিবো আনা আনা/ তোমার বেলা নিবো সখি তোমার কানের সোনা’ তখন আমার নবীন কিশোরমন কৈশোর ডিঙিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক প্রেমিক হয়ে উঠতো মনে মনে। ‘অসময় বাঁশি বাজায় কে রে / পরাণ আমার বাইরাম বাইরাম করে’ অথবা ‘বধূর বাড়ি মধুপুর, আমার বাড়ি অনেক দূর /এরই মাঝে কে বাজালে গো,মোদের মিলন বাঁশির সুর’ — বেজে উঠতো রেডিওতে কিংবা মাইকে, নিজেকে সেই গানের প্রেমিক-নায়ক মনে হতো। আবার যখন তাঁর কণ্ঠে বাজতো ‘কে কান্দে রে নদীর কিনারায়– আউলাচুল বাতাসে ওড়ে ঘোমটা নাই মাথায়’– তখন দুঃখের স্রোতে ভেসে যেতো আমার আবেগচালিত হৃদয়মন। রক্তমাংসের মানুষের কণ্ঠ একইসঙ্গে এতটা সুরেলা, মিষ্টি ও দরদভরা হতে পারে, ‘কে কান্দে রে নদীর কিনারায়’ গানটি শোনার সময় সেই বালকবয়সেই আমি আমার সবুজ-অবুঝ হৃদয় দিয়ে অনুভব করতাম। নদীর কিনারে ক্রন্দনরত অজানা অচেনা সেই দুঃখিনী নারীর অশ্রুসজল ছবি ভেসে উঠতো আমার কল্পনার চোখে। সচ্ছল গেরস্তের বিয়ের বাড়ি থেকে যখন মাইকে ভেসে আসতো “ভাটির গাঙে ভাইটাল সুরে বাঁশি কে বাজাইয়া যাও ওরে বন্ধু একবার চাও ফিরে…”, আমার গরুর পাল কোনদিকে গেল কিংবা স্কুলের পড়া ভুলে গিয়ে আমি ভেসে যেতাম সুরের নদীতে…. আমার কল্পনা চোখে ভেসে উঠতো গাঙ, মাঝি, নৌকা আর এক বিচ্ছেদগ্রস্ত গ্রাম্য যুবতির আকুল মুখ। সক্রিয় অসচেতনে সেভাবেই গড়ে উঠেছিল আমার কবিতার জন্য প্রয়োজনীয় ‘চিত্রকল্প’ রচনার মন ও সামর্থ্য।
আমি আজও যখন শুনি ‘পিঞ্জিরার পাখির মতো আমি তারে উইড়া যাইয়া দেখি / কোথায় গো আমার কালো পাখি’, –তখন স্মৃতিনিবিড় প্রেমের কবিতা রচনার উদগীরিত আবেগ উসকানি দেয় আমার মনে ও মননে। ‘বহু দিনের পিরিত গো বন্ধু—- একই দিনে ভেঙো না’—-প্রেমের এমন আকুল আবেদন আর কোথায় মিলবে? লেখক হওয়ার জন্য একটি বহুবর্ণিল সমৃদ্ধ শৈশব-বাল্যকাল খুবই প্রয়োজন। আমার শৈশব-বাল্যকাল-কৈশোরকালকে রঙিন ও সমৃদ্ধ করে তুলেছিল কবিতা, রূপকথা ও গান। আর আমার শৈশব-কৈশোরের গান মানেই আবদুল আলীম, সেই সঙ্গে ফেরদৌসী রহমান ও নীনা হামিদ। সিনেমার গানে সাবিনা ইয়াসমিন, খুরশিদ আলম, সৈয়দ আবদুল হাদী প্রমুখ। পরে যোগ দেন রুনা লায়লা, এন্ড্রু কিশোর। আরও পরে মোহাম্মদ রফি, ফিরোজা বেগম, মেহেদী হাসান, কিশোর কুমার, নাজিয়া হাসান এবং আরও অনেকেই….। আমার কবিজীবনেও সংগীতের প্রভাব নিবিড়, গভীর ও বহুমাত্রিক। আমার শতভাগ শহুরে কবিতাতেও যে উপমা-চিত্রকল্পের চোরাপথে গ্রামের ঘ্রাণ এসে সঞ্চারিত হয়ে যায়, এর পেছনে বাল্যকৈশোরের সংগীত উপভোগের অভিজ্ঞানও গোপনে-গোপনে কাজ করে।
আমার পরিস্কার মনে আছে, হাটে-মাঠে-ঘাটে-শহরে-বন্দরে-রাখালের বাঁশিতে-শহুরে শিক্ষিতজনের বেঠকখানায় কলের গানে, সিনেমায়–যাত্রায়–বিয়ের অনুষ্ঠানে সবখানেই আবদুল ছিলেন উৎসবের ঝাড়বাতির তুলনা হয়ে। লোকসংগীত বা পল্লীগীতি কেবল গ্রামের অশিক্ষিত লোকজনের গান বলে নাক সিটকানো উন্নাসিকদের নেতিবাচক সমালোচনার বন্ধ করে দিয়েছিলেন আবদুল আলীম এবং তাঁর সহযোগী ছিলেন কয়েকজন গীতিকার ও কণ্ঠশিল্পী। আমাদের সাংস্কৃতিক সৌধ নির্মাণে আবদুল আলীম ছিলেন অন্যতম প্রধান কর্মী। আবদুল আলীম এখনও জনপ্রিয়। তাঁর গান এখনও কোথাও বাজলে কান পাতে সংগীতপিয়াসী মানুষ। গ্রামেগঞ্জে এখনও বহু মানুষ আবদুল আলীমের গান আড্ডা জমিয়ে তোলেন। মীর্জা গালিব কোনো এক প্রসঙ্গে তাঁর কবিতা সম্পর্কে প্রবল আত্মবিশ্বাসে বলেছিলেন:
‘যে কবির কবিতা বালাখানায় ডোমনি আর
রাস্তায় ফকিরেরা গায়,
তাকে কে মারতে পারে?’
[মীর্জা গালিব]
আবদুল আলীমের গান সেভাবেই রাজধানীর রাজনীতিবিদের কান থেকে গ্রামের গ্রামের রাখালের অধর পর্যন্ত তার স্থান অর্জন করেছিল। আর যাকে “সাধারণে” গ্রহণ করে, তাকে নাকচ করতে পারে কে? একশ্রেণির পণ্ডিত-বুদ্ধিজীবীর বৈরিতাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে নজরুল-জসীমউদদীন একই ফরমুলায় অতুলনীয় গ্রহণযোগ্যতা ও শৈল্পিক অমরত্ব অর্জন করেছিলেন।
মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। আবদুল আলীম কেন এতটা জনপ্রিয় হতে পেরেছিলেন? মূল কারণ বিধাতা প্রদত্ত অনন্য সুরেলা কণ্ঠ। তাঁর কণ্ঠ শ্রাবণের নদীর স্রোতের মতো প্রবল, শরৎ আকাশের নিচে মাঠের বাতাসের মতো খোলা এবং কোকিলের কণ্ঠের মিষ্টতা মাখা। আর ছিল তাঁর সুরের সাধনা এবং আপন কণ্ঠের ওপর সবখানি নিয়ন্ত্রণ। তিনি গানের কাব্য বা বাণীর মধ্যে অন্তর্লীন আনন্দ, বেদনা, অভিমান, অনুরাগ, উচ্ছলতা, বিষাদ– এসব বুঝতেন নিবিড়ভাবে। অতঃপর কণ্ঠের সুরেলা উচ্চারণে বাণীর সেই ব্যঞ্জনাকে ছড়িয়ে দিতেন শ্রোতার শ্রবণে ও আবেগে, আকাশে ও বাতাসে। গান হয়ে উঠতো প্রাণবন্ত সৃষ্টি। তবে সবচেয়ে বড়ো কারণ তাঁর সুরের সম্মোহন সৃষ্টির অপিরমেয় ক্ষমতা। গানের কথা আছে, সুর আছে। শ্রোতা আকৃষ্ট হয় প্রথমত সুরের সম্মোহনে । পরে কথা কথা নিয়ে ভাবে। লোকসংগীত সুর সহজ সরল এবং সেখানে ক্লাসিক্যাল ধাঁচ বা রাগ-রাগিণীর খেলা থাকে না বললেই চলে। কিন্তু আবদুল আলীম সেই সহজিয়া সুরের গানেও তাঁর কণ্ঠের মাধুর্য ও পরিবেশনার সৌকর্যে শ্রোতার জন্য মন মাতোয়ারা করা সম্মোহন সৃষ্টি করতে পারতেন। সুরের সহজিয়া নদীতে তাঁর প্রবল কণ্ঠের বাতাস ঢেউ, ছলছল শব্দ আর ঘূর্ণি তুলতো অনায়াসে। তিনি ‘কে কান্দে রে নদীর কিনারায়’ গানটি এমনভাবে গেয়েছেন যে সুর ও বাণীর মাধুরী বিমুগ্ধ বেদনার স্রোত হয়ে শ্রোতার আবেগকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় অজানা নদীর সাথে– নাম না-জানা নারীর আকুল অনুভবের মোহনায়। আবার তাঁর ‘এ সংসারে কেউ নয় আপনজনা’ শুনে মানুষ দার্শনিক অনুভবের আকুলতায় বিজড়িত হয়ে পড়ে জীবনঘনিষ্ঠ চিন্তায়। তেমনি তাঁর গাওয়া ‘ছলছল কলকল নদী করে টলমল’ গানটিতে শব্দের উচারণ ও সুরের জোয়ার এমনভাবে ফুটে উঠেছে যে তাতে স্রোতেলা ও তরঙ্গায়িত নদীর সবখানি আবহ উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। গানটি শোনার সময় গায়কের সঙ্গে শ্রোতা একাত্ম হয়ে আপন অনুভবে ও অস্তিত্বে গতিশীলতার শিহরণ অনুভব করে প্রবলভাবে ও নিবিড়ভাবে। আবার ‘ও মুর্শিদ পথ দেখাইয়া দাও’ শোনার সময় ধর্মে অবিশ্বাসী একজন শ্রোতার মাথাটিও নড়ে ওঠে গানের সুরে, তালে ও স্রোতে। ‘আমারে সাজাইয়া দিও নওশার সাজন’ গানটিতে মৃত্যুকালীন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অগ্রিম ছবি আঁকা হয়েছে। সুরটিও আবেদনমাখা। আবদুল আলীম তাঁর সুরেলা কণ্ঠে গানটি পরিবেশনার সময় এতটাই দরদ ঢেলে দিয়েছেন এবং ‘মা গো’, ‘আমারে সাজানের কালে’, ‘হৈলে পরে’ , ‘লগন’ , ‘আমার মনেতে বাসন’, ‘আমারে করাইও সিনান’ , ‘লোবানেরই সুবাস দিও’ প্রভৃতি শব্দগুলো এতটাই হৃদয় ও আবেগ বিনিয়োগ করে সুরেসুরে উচ্চারণ করেছেন যে তা শোনামাত্র শ্রোতার হৃদয়-মন বেদনার মাধুরীতে মুগ্ধ ও আকুলিত হয়ে ওঠে সবখানি। কিংবা ধরা যাক্ ‘মদিনার ঐ ফুলবাগিচায় ফুইটাছে এক ফুল’ গানটিতে তিনি প্রতিটি শব্দ এমন জাদুমাখা গতিশীল ব্যঞ্জনায় উচ্চারণ করেছেন এবং সুরের এমন স্রোতেলা সম্মোহন সৃষ্টি করেছেন যে শোনার সময় শ্রোতা সেই সম্মোহনের স্রোতে ভেসে যেতে বাধ্য হয়। এমনই প্রবল তাঁর পরিবেশনার শক্তি ও মাধুরী। তিনি যে গানই গেয়েছেন, কণ্ঠের জাদুময়তা ও পরিবেশনার অনন্যতার গুণে তা সবখানি আবদুল আলীমের গান হয়ে গেছে; গানের গীতিকার বা সুরকার কে তা নিয়ে শ্রোতার মনে প্রশ্ন ওঠার অবকাশ থাকেনি। এমনটি ঘটেছে মহম্মদ রফির গাওয়া সিনেমার গান, মেহেদী হাসানের গাওয়া গজল, দেবব্রত বিশ্বাসের গাওয়া রবীন্দ্রসংগীত অথবা ফিরোজা বেগমের গাওয়া নজরুল সংগীতের বেলায়। মোহাম্মদ আবদুল জব্বারের গাওয়া আধুনিক গান এবং রুনা লায়লার গাওয়া সিনেমার গানেও ক্ষেত্রে এই কথাটি কমবেশি প্রযোজ্য। আবদুল আলীমের গায়কীর ধরন, বৈশিষ্ট্য ও প্রভাব প্রসঙ্গে প্রখ্যাত কবি আল মাহমুদের ‘আবদুল আলীম স্মরণে’ কবিতাটির কথা মনে পড়ে। কবিতাটি তাঁর কবির ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত।
‘কিছু কিছু নাম জানি যার অর্থের কোনো স্থিরতা নেই
কিংবা এমনই অর্থবহ যে নদীর ঢেউয়ের ওপর দিয়ে
হাঁটতে হাঁটতে সে পার হয়ে যায় নদী।
গাছের সবুজের মধ্যে সে মিশে যেতে পারে। পারে
সবুজ পতাকার ভেতর সূর্যের স্থায়ী লাল রং বিছিয়ে দিতে।
আবদুল আলীম–যেন ধানের জমির ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাস।
যেন মেঘনার মাঝির ঘাম মুছে ফেলা ঠাণ্ডা শরীরের ওপর
অস্তগামী আলোর শেষ রশ্মি।
যখনই তার কথা ভাবি, আমার ভেতরের সবগুলো শিরায়
রক্তের কলরোল–
যেন আত্মা এক গায়ক মাঝির ভাটিয়ালি। যার অনিঃশেষ
গানের মাধুরী বৃষ্টি মতো গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে
পানির ফোঁটা ঝরিয়ে যায়।’
[‘আবদুল আলীম স্মরণে’, আল মাহমুদ]

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘–নামে মানুষকে বড় করে না, মানুষই নামকে জাঁকাইয়া তোলে।’ আবদুল আলীম নামটিও সেভাবেই আজ কিংবদন্তিতে উন্নীত হয়েছে। আমার জন্ম গ্রামে। বেড়ে ওঠা সেই পদ্মা বিধৌত সবুজ ভূগোল। রাখালের বাঁশি আর পাখপাখালির গান শুনে শুনে আমার বালক-কৈশোর কানদুটি হয়ে উঠেছিল বিদগ্ধ শ্রোতার কান। তখন গাছে গাছে গানের রাজা ছিল কোকিল আর রেডিওতে মাইকে গানের রাজা ছিলেন আবদুল আলীম। আমার চিন্ময় অস্তিত্বকে ছন্দময় ও সুরময় করে তোলার ক্ষেত্রে এসবের ভ‚মিকা ছিল গভীর নিবিড় যদিও বিষয়টি আমি বুঝেছি কবিতালেখায় সক্রিয় হওয়ার পর। আমার একটি কবিতায় সে প্রসঙ্গ এসেছে।
‘মাথায় আকাশ নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চরের ভ‚গোল থেকে উঠে আসা
এক প্রাণ; আলীমের সুরে দোলায়িত দিনে
ছিল মাঠের রাখাল, ঘাটের কিশোর, আমবাগান মাতিয়ে রাখা
কোকিলের প্রতিদ্বন্দ্বী বালক: কুহু কুহু! কুহু কহু!’
[‘প্রান্তরের পা শহরের সিঁড়ি’, আমিনুল ইসলাম]
আবদুল আলীমের গান অনেকের মতো আমারও যৌবনকে রূপে-রসে-রঙে-স্বপ্নে-কল্পনায় রাঙিয়ে দিয়েছিল। আবদুল আলীম আমার বাল্যকালেই মারা গেছেন। বাংলা সিনেমার গান, ভারতীয় আধুনিক বাংলা গান, হিন্দি-উর্দু সিনমার গান , রবীন্দ্রসংগীত, নজরুল সংগীত, পপ গান এবং আরও কত কি এসেছে দখল করতে থেকেছে সংগীতের উঠোন এবং আমাদের মনেও ঠাঁই করে নিয়েছে সেসব। কিন্তু আবদুল আলীম প্রথম প্রেমের মতো রয়ে গেছে হৃদয়ে-মগজে-মননওে সৃজনশীলতায়। এই তো সেদিনও যখন আমি বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পেশাগত উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণে ব্যস্ত, তখনও আমার অন্তরঙ্গ সন্ধ্যার কণ্ঠে ভর করেছে আবদুল আলীম। আমি সেই একান্ত অভিজ্ঞানকে কবিতায় ক্যানভাসে চিত্রিত করে তুলতে চেয়েছি।
‘আমি যখন দূরের প্রেয়সীকে শুনিয়েছি আমার স্বরচিত কবিতা,
যখন জব্বার-মান্নার গান গলায় নিয়ে
সীমাবদ্ধতা ও সিলমোহরকে অতিক্রম করে
আমি হয়ে উঠেছি ভার্সিটি-দিনের কণ্ঠ,
তখন তোমার প্রতিক্রিয়া কী হয়েছে,
আমার খেয়াল করার সময় ছিল নাকো;
আমি যখন রাতের আকুল উঠোনে
আবদুল আলীম হয়ে উঠেছি-
‘তোমারো লাগিয়া রে- সদাই প্রাণ আমার কান্দে বন্ধু রে’
আর দূরে উত্তরের এক শ্যামল ভূগোল হয়ে উঠেছে
অশ্রুসিক্ত প্রেমের প্রদেশ,
অভিজ্ঞ এক সহকর্মীর তির্যক রসিকতায়ও
দমে যায়নি আমার কণ্ঠ, তুমি কি আমার
সেই সাস্টেনেবল যৌবন দেখে হেসে উঠেছিলে পিএটিসি?’
[‘বিপিএটিসি তোমাকে’, আমিনুল ইসলাম]
কবিতা লিখি বলে আমি জানি একটি গানের উৎসভূমি হচ্ছে কবি-গীতিকারের হৃদয়-মন। তারপরও একথা সত্য যে মূলত গায়কই গানটিকে সকলের সামনে নিয়ে আসেন এবং সেটিকে জনপ্রিয় করে তালেন। ‘ও দুনিয়াকে রাখওয়ালে শুন্ দরদ ভারে মেরে নালে’ গানটি মহম্মদ রফির কণ্ঠ না পেলে এমন জগদ্বিখ্যাত পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা পেতো না । একই কথা খাটে মেহেদেী হাসানের কণ্ঠে অমরত্ব লাভকারী ফয়েজ আহমদ ফয়েজ রচিত ‘গুলমে রঙ ভারে বাদ-ই নও বাহার চলে’ গজলটির ক্ষেত্রেও। আবদুল আলীমের গাওয়া অনেক গানের বেলাতেও অমন কথা বলা যায়। আমার আব্বা ছিলেন ধর্মপ্রাণ কৃষক মানুষ। তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল কম কিন্তু তিনি ব্যাপকভাবে বইপড়ুয়া ছিলেন। তিনি আবদুল আলীমের গাওয়া ‘পরের জায়গা পরের জমিন ঘর বানাইয়া আমি রই / আমি তো সেই ঘরের মালিক নই’ গানটি খুবই পছন্দ করতেন । তিনি এই গানটিকে মারফতী গান বলে গণ্য করতেন । তিনি বলতেন যে এই গানে ইহকাল-পরকাল-স্রষ্টা এ-সমস্ত বিষয় আছে– কথার আড়ালে। গানটি আমারও খুবই প্রিয়। একসময় আমি এই গানটিকে মিথ হিসেবে ব্যবহার করে একটি প্রেমের কবিতা লিখি ‘কৃষিকথা’ শিরোনামে যা আমার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘কুয়াশার বর্ণমালা’-তে অন্তর্ভুক্তি লাভ করে। কবিতাটি:
‘ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে যে মৌ- সে আড়াল রেখেছে
খাসখামারের তুলনা;
এই চোখের জল আর বুকের ঘাম একদিন সব মিশেছে
ওই জমিনে।
মাঘের শেষেই বর্ষেছিল বেশ; ধন্য রাজা!
পুণ্য জমেনি তবুও।
বোশেখে আকাশে উঠিয়েছি হাত-
বর্ষায় নিবিড় বীজতলা;
আর কী যে স্বপ্ন! অথচ হেমন্ত হাসেনি উঠোনে।
আইল বাঁধার প্রসঙ্গে আজ বিস্তর কথাবার্তা হয়।
এবং কত না সখের বাগান!
ফুল ও ফসল সবি ওঠে মহাজনের গোলায়।
দশ বছরের খাজনা ফলে তো সবই পানিতে।
আমার উঠোনে আজ আবদুল আলীমের গান;
আর কত যে দরদী উচ্চারণ;
এত যে কৃষিজ্ঞান-
তবুও কেন সে গণি মিয়ার মতো কাম করতে গেল!
[‘কৃষিকথা’, আমিনুল ইসলাম]

আমার মেজচাচা কলিমুদ্দিন এবং বড়ো দুলাভাই আলতাব হোসেনের প্রিয় কণ্ঠশিল্পী ছিলেন আবদুল আলীম।দুলাভাই ছিলেন সুরেলা কণ্ঠের অধিকারী। তিনি আবদুল আলীমের গান গাইতেন চমৎকারভাবে।পাকিস্তান আমলে নর্মিত ‘সাতভাই চম্পা’ ছবিতে আবদুল আলীম-সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া ‘বাণিজ্যের নামেতে আমি এলাম এ কোন্ হাটে / কি যে করি বেচাকিনি মন-মাঝির ঘাটে’ গানটি আমার মনকে মাতোয়ার করে দিতো। আমার বড়ো দুলাভাই আলতাফ হোসেনের গায়ের রং আবদুল আলীমের মতো কালো। তাঁর কণ্ঠও দারুণভাবে সুরেলা। তিনি ছিলেন আবদুল আলীমের গানের দারুণ ভক্ত। আবদুল আলীমের গাওয়া অনেক গান তিনি আমাকে খালি গলায় গেয়ে শোনাতেন। ‘কেহই করে বেচাকেনা কেহই কান্দে রাস্তায় পড়ে’, ‘প্রেমের মরা জলে ডুবে না’, ‘এ সংসারে কেউ নয় আপন জনা’, ‘আমারে সাজাইয়া দিও নওশার সাজন’, ‘রূপালী নদীরে রূপ দেখে তোর হইয়াছি পাগল’, ‘মনে বড়ো আশা ছিল যাবো মদীনায়’ প্রভৃতি গান তাঁর খোলা ও সুরেলা কণ্ঠে দারুণভাবে ফুটে উঠতো। আমাদের কলেজ-ভার্সিটি জীবনের সময়কালে মাওলানা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদী তাঁর কোনো কোনো বক্তৃতায় আবদুল আলীমের গাওয়া ‘মন ভোমরা মজলি না তুই রসুল নামের রসে’, ‘নবী মোর পরশমণি নবী মোর সোনার খনি’ গানগুলির অংবিশেষ গেয়ে মজলিস জমিয়ে তুলতেন। এসব গান আমি এখনও শনি কম্পিউটারে সামনে বসে। পল্লীকবি জসীমউদদীনের লেখা এবং আবদুল আলীমের গাওয়া ‘আমি বাইয়া যাইয়া কোন্ ঘাটে লাগাব রে সোনার নাও’ এবং আবদুল আলীমের লেখা ও গাওয়া ‘আর কতকাল ভাসব আমি দুঃখের সারি বাইয়া’ এই গান দুটি আমাকে ছোটোকাল থেকেই আলোড়িত করে এসেছে। আমি পদ্মা-মহানন্দা-পাগলা প্রভৃতি নদী বিধৌত চর এলাকার মানুষ। আমার গ্রামের নামটিও সেরকম ‘টিকলীচর’। উল্লিখিত গানদুটি একদিকে আমার শৈশব-কৈশোর-প্রথম যৌবনে স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়, অন্যদিকে গানের মাঝে প্রবাহিত আধ্যাত্মিকতার সুর জীবন-নদীর স্রোতে-ঢেউয়ে দোলাতে দোলাতে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় কল্পনার মোহনায়। আমার কবিতায় তার ছাপ পড়েছে। আমি প্রচুর কবিতা লিখেছি যেখানে রয়েছে নদীর অনুষঙ্গ। সেভাবেই নদী ও জীবনের একাকার অনুষঙ্গের ভাবনা আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে একটি জীবনঘনিষ্ঠ কবিতা। কবিতাটির নাম ‘কোন্ ঘাটে লাগাইবা রে সোনার নাও’। স্পষ্টতই কবিতাটির নামকরণে এবং বিষয়-ভাবনায় আবদুল আলীমের গাওয়া গানের প্রভাব পড়েছে। তাঁর নামটি এসে গেছে। কবিতাটি:

‘ভেসে ভেসে দুলে দুলে গাঙ হতে গাঙে
রোদে চেনা সাঁঝ আর রাতে চেনা ভোর
ভুলের বিশ্রামে যদি ভুল যায় ভেঙে
ব্যর্থতার ঘাট ছেড়ে উঠুক নোঙর!
দিক ভুল, ঘাট ভুল, ফলে ভুল স্রোতও
ধ্রুবতারা ভুল নাকি ভুল তাকে চেনা?
আলীমের গান হলে ভাসমান ব্রত
দাঁড়-সহ ভেসে যাক—দাঁড়টানা দেনা।’
[‘কোন্ ঘাটে লাগাইবা রে সোনার নাও’, আমিনুল ইসলাম]

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আবুদল আলীম একুশে পদক, স্বাধীনতা পদকসহ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। তবে তাঁর জনপ্রিয়তার কাছে সেসব ছোটোই বলা চলে। তিনি কোনো পুরস্কার না পেলেও লোকসংগীতের মুকুটহীন সম্রাট থাকতেন যেমনটি রয়েছেন আজও। আমাদের দেশের সরকারি কর্মকর্তাগণ এবং রাজনীতিবিদগণের অনেকেই দেশকে সিঙ্গাপুর বানানোর স্বপ্নের কথা বলেন। আমি মনে মনে প্রতিবাদ করি। আমরা সিঙ্গাপুর হতে যাব কেন? কোন্ দুঃখে? সিঙ্গাপুরের কিছু অর্থ ছাড়া আর কী আছে ? তাদের কী চণ্ডীদাস, আলাওল, লালন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বেগম রোকেয়া, জীবনানন্দ দাশ, জয়নুল অবেদীন, আব্বাসউদ্দীন আহমদ, আবদুল আলীম কিংবা একজন রুনা লায়লা আছে? তাদের কি একজন ববিতা আছে? তাদের কোনো ‘লালনগীতি’ নেই, ‘গীতাঞ্জলি’ নেই, ‘অগ্নি-বীণা’ নেই, ‘সোনালি কাবিন’ নেই; নেই ভাটিয়ালি কিংবা ভাওয়াইয়া। তাদের কোনো ‘আবদুল আলীম’ কিংবা ‘রুনা লায়লা’ নেই। আবদুল আলীমের মরমী কণ্ঠে আজও যখন শুনি, ‘আমার দেশের মতন এমন দেশ কি কোথাও আছে ’, তখন মন ভরে ওঠে আনন্দে ও গর্বে।
অথচ বিশ্বায়ন প্রযোজিত ও আকাশ মিডিয়া পরিচালিত সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে আমাদের নতুন প্রজন্ম আজ ভুলে যেতে বসেছে আবদুল আলীমসহ অনেক মহান শিল্পী-অভিনেতা-সাহিত্যিকের কথা। আমরা নিজেরাই ভূমিকা রাখছি সেই সর্বনাশা বিস্মৃতি সংঘটনে। রাজনীতির মাঠ, সংস্কৃতির অঙ্গন– সবখানেই কেবল ব্যবসা আর ব্যবসা! আর সংবাদপত্রগুলোতে নেতিবাচক সংবাদ দিয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের সর্ববিধ সস্তা প্রয়াস। যারা আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির মজবুত ভিত রচনা করে দিয়ে গেছেন, তাদের কথা আমাদের নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে, শোনাতে হবে। একটানা বিস্মৃতি যেন আমাদের সোনালি গৌরব থেকে বিমুখ না করে দেয়। আমাদের গভীর নিবিড় ও নিরবচ্ছিন্ন সক্রিয় সাংস্কৃতিক চেতনাই জাতি হিসেবে টিকে থাকার এবং আরও বেশি স্বকীয় সমৃদ্ধি অর্জনের প্রকৃষ্ট পথ। আমার একটি কবিতায় সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের চিত্র আঁকার প্রয়োজনে প্রতিতুলনা হয়ে আবশ্যিকভাবে এসে গেছে আবদুল আলীমের নাম।
‘নদীর বিরুদ্ধে আজ উচ্চকণ্ঠ রমনার খাল,
সাম্পান-নিন্দায় দ্যাখো ঝড় তোলে বৃদ্ধবটম‚লে,
নবীন মাল্লারা ছিঁড়ে নিজহাতে সাতরঙা পাল
খালের প্রশস্তি গায়–আলীমের ভাটিয়ালি ভুলে।’
[‘নতুন বাতাসে বাজে খালের প্রশস্তি’, আমিনুল ইসলাম]
এই তো সেদিনের কথা। সদ্যবিগত হওয়া ২০২০-২০২১ সাল। করোনা অতিমারীর আকস্মিক আগ্রাসন ও তাণ্ডবের কাল। আমিও আক্রান্ত হয়েছিলাম। তখন সেটা ভ‚তড়ে মহামারি । টিকা কিংবা দাওয়াই অবিস্কৃত হয়নি। পড়ছে লাশ! পিতার লাশগ্রহণের সাহস নেই এমনকি পুত্রেরও। কিন্তু ছাত্রজীবনে প্রায় ক্লাসে এক নম্বর রোল নম্বর অধিকারী এই আমার আজারাইলের তালিকায় রাল নম্বর ছিল অনেক নিচে, অনেকের পরে। অবশ্য সেই রোল নম্বর এখনও জানি না আমি। অতিমারীর থেকে ছোবল খেয়েও বেঁচে যাওয়া সেই আমি হাঁটতাম রমনা পার্কে। নদীর যেমন ঝরনা আছে- আমার ছিল এবং আছে লীনা । তো হাঁটার সঙ্গীও লীনা। সচিব নিবাস থেকে সেটা খুব কাছেই ছিল। পার্কে যেখানে একটি বিদেশি স্টাইলের রেস্তোরাঁ আছে, তারই সন্নিকেট গাছতলায় রোজ বাঁশি বাজাতের এক বাঁশিওয়ালা। গায়ের রঙ কালো। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। তিনি বাঁশের বাঁশি তৈরি করে বিক্রয় করতেন। এলিফ্যান্ট রোডে তাঁর দোকান ছিল । তাঁর বাঁশিতে ফুটে উঠতো জনপ্রিয় লোকসংগীতের সুর। আব্বাসউদ্দীন-আবদুল আলীম-নীনা হামিদ। আমি তাঁর পাশে বসেও সেই সুর উপভোগ করতাম মাঝেমাঝে। আমার করোনা অতিমারীতে বিধ্বস্ত হয়ে ওঠা মৃন্ময়-চিন্ময় অস্তিত্ব ফিরে পেতো হারানো শক্তি। সচিব নিবাসে ফিরে আমি লিখে ফেলি ‘রমনা পার্কের মুখোমুখি’ নামক কবিতা। সে কবিতায় অপরিহার্যভাবে আবদুল আলীমের গানের কলি।
‘আমি প্রেমিক বলে হৃদয়ের গন্ধ চিনতে পারি
যেমনটি পারতেন ইবনে সিনা খোশবুর উৎসকে
তার রাডারের মতো নাক লাগিয়ে চাহারবাগের হাওয়ায়;
আচ্ছা, এই যে তোমার উঠোনে বসে হরপ্রভাতে বাঁশি বাজায়
এলিফ্যান্ট রোডের কালো রঙের লাল মিয়া,
“তোমার লাগিয়ারে সদাই প্রাণ আমার কান্দে বন্ধুরে……..”
ষাটোত্তর প্রাণে সে কি তোমার আঁচলে পায়
মুক্তিযুদ্ধের বছরে হারিয়ে যাওয়া ঘামভেজা শরীরের ঘ্রাণ?’
[‘রমনা পার্কেও মুখোমুখি’, আমিনুল ইসলাম]
আমার আরেকটি কবিতার নাম ‘মাঘের চিঠি’। সেটি একটি দীর্ঘ কবিতা। সে কবিতায় মাঘ হচ্ছে শীতপ্রধান পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতীক । কবিতাটিতে আমি পশ্চিমা সাহিত্য সংস্কৃতির আগ্রাসনকে প্রতীকের সাহায্যে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। কবিতাটি বহুল আলোচিত ও প্রশংসিত। এটি আমার ‘মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’ নামক দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। কবিতাটিতে আকাশ মিডিয়া চালিত পশ্চিমা সংস্কৃতির আগ্রাসনের মুখে আমাদের লোকসংস্কৃতি তথা নিজস্ব সংস্কৃতির হুমকি গ্রস্তহওয়ার ছবি আছে। কবিতাটিতে একটি অনুচ্ছেদ আছে যেখানে অবধারিতভাবে আছে লোকসংগীত সম্রাট আবদুল আলীমের প্রসঙ্গ।
‘দ্যাখো, নগরীর প্রতিটি চূড়ায় জেঁকে বসেছে
অদ্ভুত জ্যাকেটে আবৃত ফানুস প্রজন্ম:
তাই রে নাই রে না! তাই রে নাই রে না..
রাজধানীর কুটিল দালান হতে ছড়িয়ে পড়ছে
প্রবাদের ঘুঘু যত প্রাচীন জনপদে।
বর্ণহীন তাদের উভয় ডানায় উৎকীর্ণ বেয়াড়া চারটি অক্ষর;
ডানাপ্রক্ষিপ্ত ধুলো উড়ে এসে
‘না’ ‘না’ শব্দের আকারে সেঁটে যায়
গফুর বয়াতীর চুলে,
আবদুল আলীমের গানে,
জায়নামাজের নকশায়।
এবং বেড়েই চলেছে উত্তুরে হাওয়ার দাঁতাল দাপট।
বেতসলতার মতো নেতিয়ে পড়ে
এ মন
এ মাটি
ভালোবাসার ভিত
ধুলোয় তাজমহলের স্বপ্ন!’
[‘মাঘের চিঠি’, আমিনুল ইসলাম]
আমারও কিছু কবিতায় আবদুল আলীম উপমা,উৎপ্রেক্ষা কিংবা চিত্রকল্পের প্রধান উপকরণ হয়ে এসেছেন। আজকের সাংস্কৃতিক সা¤্রাজ্যবাদের এই সর্বমুখী আগ্রাসন মোকাবিলা করা প্রয়োজন। আমরা অবশ্যই বিশ্বসংস্কৃতি ও বিশ্বসাহিত্য থেকে প্রয়োজনীয় উপকরণসমূহ গ্রহণ করবো। কিন্তু নিজের সংস্কৃতির কথা বিস্মৃত হয়ে ভিনদেশীয় সংস্কৃতির স্রোতে ভেসে যাওয়া চলবে না। আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির শেকড়ে পানি ও সার সরবরাহ করে যেতে হবে। সংরক্ষণ করতে হবে আমাদের শেকড়ের সাহিত্য ও সংগীত। সময়ের চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে সেসবের পুনর্নির্মাণ করতে হবে, পুনরুজ্জীবন ঘটাতে হবে। মুক্তবাজার প্রযোজিত ও আকাশ মিডিয়া পরিচালিত আজকের সর্বব্যাপী ও সর্বমুখী সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনের কালে যাদের কথা সবার আগে মনে আসে আবদুল আলীম তাদের মধ্যে একজন এবং অগ্রগণ্য। কিন্তু সেটাই শেষকথা নয়। সংগীত আমাদেরকে ঘরে বসেই অন্যের কোনো ক্ষতি না করেই মানসিক তৃপ্তির রসদ জোগায়। সংগীতকার -সংগীতশিল্পীরা কখনো সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, অন্যায় যুদ্ধ কিংবা সাম্প্রদায়িক ইথনিক কজ ক্লিনজিং চায় না। ধর্-বর্ণ-জাতি-ভাষা-ভূগোল-লিঙ্গ-বয়স নির্বিশেষে তাঁরা মানুষকে নির্মল আনন্দদান করতে চান। সেজন্য ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান বলে গেছেন যে তোমরা দুনিয়ার রাষ্ট্রনেতাদের সংগীত মিখিয়ে দাও কারণ সংগীতকারগণ কেউ যুদ্ধ বাঁধায় না। আবদুল আলীমের গান শোনার সময় মানপ্রাণ ভরে ওঠে এক অনির্বচনীয় আনন্দসুধায় নরনারীর প্রেম, আন্তঃগোত্র শান্তি, সামাজিক সুস্থতা ও যাবতীয় অহিংসার অনুকূলে সবল ও সচ্ছল করে তোলে মানবীয় চেতনাকে। আমার সৃষ্টিশীল চেতনাকে সবুজতায় সচ্ছল, প্রাণবন্ততায় সজল এবং অন্তরঙ্গতায় প্রেমময় করে রাখার ক্ষেত্রে সংগীতের অবদান অনেক যা পরিমাপযোগ্যতায় আওতায় পড়ে না ।
–০–


আমিনুল ইসলাম
কবি ও গবেষক
ঢাকা
প্রকাশিত গ্রন্থ: ৩৪টি।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা