নেয়ামত ইমাম
প্রথম খণ্ড
৪.
পরদিন সকাল বেলা নয়টা বাজার আগেই আমি অফিসে চলে যাই। আমি একজন ভ্রাম্যমান বিক্রয় প্রতিনিধি, তাই সেখানে আমার কোনো চেয়ার থাকে না। ম্যানেজার রজব আলী সাহেব দয়া করে আমাকে তার অফিসে বসতে দেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে আমাদের সঙ্গে যোগ দেন সুমন এন্টারপ্রাইজের অন্যতম পরিচালক মোহাম্মদ আশরাফ খান। “একটু আগেই চলে এসেছি,” তিনি বলেন। “আপনাদের কোনো অসুবিধা করছি না তো?” “না, না,” মাথা ঝাঁকিয়ে বলেন রজব আলী সাহেব। “আমরা আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। আসুন। বসুন।”
আশরাফ খানের সঙ্গে আমার আগে দুবার দেখা হয়েছে। দুবারই সুমন এন্টারপ্রাইজে। তবে আমাদের মধ্যে কথা হয়নি, কারণ আমাকে সময় দিয়েছিলেন একজন মধ্য পর্যায়ের ম্যানেজার, যার দায়িত্ব ছিল দর কষাকষি করে একটি আপাত পণ্য তালিকা তৈরি করা। তালিকাটি তৈরি হবার পর এটি পরিক্ষা করে দেখবার জন্য পাঠানো হয় আরেকজন মধ্য পর্যায়ের ম্যানেজারের কাছে, যার অবস্থানও হবে আশরাফ খানের নিচে। কখনো কখনো আমার মনে হয়েছে তালিকাটি কোনো কারণে মধ্য পর্যায়ের ম্যানেজারের ওপরে উঠতে পারছে না। অর্থাৎ যাদের কোটি টাকার মালামাল ক্রয় করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার নেই, তাদের মধ্যেই আটকে ছিল এটি, যার কারণে মাসের পর মাস চলে গেলেও আমি কোনো অর্ডার পাইনি। এই মুহূর্তে মোহাম্মদ আশরাফ খানকে সামনে পেয়ে আমি অনেকটা নিশ্চিত হয়ে যাই যে আজ আমাদের চ‚ড়ান্ত চুক্তিপত্রটি স্বাক্ষরিত হবে।
বাস্তবেও ঘটে তাই। পরিচিতি পর্ব দ্রæত শেষ করে তিনি নিজ দায়িত্বে আমার কাছ থেকে চুক্তিপত্রটি চেয়ে নেন এবং পাতা উল্টিয়ে প্রয়োজনীয় জায়গাগুলোতে সই করেন। তবে সই করার আগে তিনি সামান্য সংশোধন করেন শর্তগুলো। এই চুক্তির ব্যাপ্তি স্বাক্ষর করার দিন থেকে ছয় মাস হবে – এই অংশটিতে ছয় মাস কেটে তার ওপরে তিনি লিখে দেন পাঁচ বছর। তিনি একটি নতুন শর্ত যোগ করেন, যাতে উল্লেখ থাকে আজ থেকে নব্বই দিন পর আমাদের কোম্পানি হবে সুমন এন্টারপ্রাইজের একমাত্র সরবরাহকারী। কোনো ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ যাতে না থাকে সেজন্য দুটি সংশোধনের পাশেই তিনি নিজের নামের আদ্যাক্ষর জুড়ে দেন। “এখন আমরা একে অন্যের অংশ হয়ে গেলাম,” তিনি বলেন। “এই কারণে আমি সামনে আমাদের জন্য সুযোগ আর সুযোগ দেখতে পাচ্ছি। চলেন দুই কোম্পানি মিলে এবার কিছু সিরিয়াস টাকা বানাই।”
কথাগুলো তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বলেন বিধায় রজব আলী সাহেবের সামনে আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যাই। একই সঙ্গে আমার মধ্যে বেশ খানিকটা ভয় কাজ করে। তার এই আলাপ ঠিক কোনদিকে যাচ্ছে তা হিসাব করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। কেবলই মনে হয় যে কোনো মুহূর্তে তিনি রফিকুল্লার কথা পাড়বেন, পাড়বেন সে সব প্রভাবশালী ব্যক্তির কথা যারা আজ তাকে এখানে আসতে বাধ্য করেছে। রজব আলী সাহেব আমাকে বসতে বলেছেন বলে তার অনুমতি ছাড়া আমি উঠে যেতে পারি না। সে জন্য আশরাফ খানের সামনে আমি একজন মনোযোগী শ্রোতার ভ‚মিকায় অবতীর্ণ হই। তিনি জানান তিনি আমাকে একদিন তাদের পণ্যাগারে বেড়াতে নিয়ে যাবেন, যাতে করে তাদের ব্যবসা সম্পর্কে আমি সরেজমিনে কিছু ধারণা লাভ করতে পারি। এই ব্যবস্থা আমাকে তাদের জন্য সঠিক আইটেমগুলো সঠিক পরিমাণে পাঠাতে সাহায্য করবে। অর্থাৎ তাদের জন্য শুধু মাল পাঠালেই চলবে না, মালগুলো কাস্টমারের কাছে যাবার আগ পর্যন্ত তারা সেগুলো কোথায় রাখবেন তাও আমাদের হিসাবে থাকতে হবে। আমি লক্ষ করি রজব আলী সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে দেখছেন আমি সমস্যাটির কি সমাধান দেই। “যদি সুযোগ থাকে এবং যদি এটা আর্থিকভাবে সম্ভবপর হয়,” আমি প্রস্তাব করি, “তাহলে মালগুলো সুমন এন্টারপ্রাইজের নামে আমরা আমাদের পণ্যাগার থেকে সরাসরি আপনাদের কাস্টমারের কাছে পাঠিয়ে দিতে পারবো। তাতে আপনাদের সময় নষ্ট হবে না বা অতিরিক্ত শ্রম কাজে লাগাতে হবে না। মাল পাঠানোর পর রশিদের একটি কপি আপনাদের কাছে পাঠিয়ে দিলে আপনাদের হিসাবরক্ষক কয়েক মিনিটের মধ্যে তা দৈনিক দেনা-পাওনা হিসাবের অন্তর্ভূক্ত করে নিতে পারবে।”
“খুবই চমৎকার,” বলেন আশরাফ খান। “তাহলে তো হয়েই গেল। এবার তাহলে উঠি।” তিনি রজব আলী সাহেবের সঙ্গে হাত মেলান এবং তাকে গেইট পর্যন্ত এগিয়ে দেবার জন্য আমাকে অনুরোধ করেন। রজব আলী সাহেবের সম্মতিতে আমি তার সঙ্গে হাঁটি, অনুমান করতে পারি তিনি হয়তো আমাকে এমন কিছু বলতে চান যা তিনি ভেবেছেন রজব আলী সাহেবের সামনে বলা সমীচিন হবে না। দরজার কাছে এসে তিনি দাঁড়ান এবং আমার দিকে তাকান। তার মধ্যকার সব আনন্দ ততক্ষণে নিঃশেষ হয়ে গেছে, পরিবর্তে চেহারায় ভেসে উঠেছে গভীর উদ্বেগের ছাপ। তিনি আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দেন এবং বলেন, “স্বাধীনভাবে একটা ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া এদেশে কখনো অনেক কষ্টকর ব্যাপার হতে পারে, আসাদ সাহেব, তা সে আপনাদের ব্যবসা বা আমাদের ব্যবসা হোক। আমরা চাই আপনি খুশি থাকুন। একই সঙ্গে আমরা আরো চাই আমাদের ব্যবসাটি যাতে মরে না যায় সেদিকে আপনি একটু নজর দেবেন। সুমন এন্টারপ্রাইজ যাত্রা শুরু করেছে এখন থেকে সত্তর বছর আগে। এটা ছিল আমার দাদার ব্যবসা, তারপর আমার বাবার ব্যবসা। এখন এটা আমার ব্যবসা। আমি আপনাকে বলতে পারি একই খাতে অন্যান্য অনেকের চেয়ে ভালো করলেও এই ব্যবসা মুখ থুবড়ে পড়ে যেতে সত্তর দিনও লাগবে না। যদি এমন কিছু ঘটে যায় যে আমাদেরকে একদিন দরজায় তালা ঝুলিয়ে দিতে হয় বা ছাটাই করে দিতে হয় সব লোক, আপনিই আমাদেরকে রক্ষা করতে পারবেন।”
তাকে কোনো জবাব দেবার আগে তিনি আমার হাত ছেড়ে দেন এবং জোরে হেঁটে তার গাড়ির দিকে চলে যেতে থাকেন।
কিছুক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়ে থাকবার পর আমি রজব আলী সাহেবের কাছে ফিরে যাই। তিনি তখনো তার কক্ষে ছিলেন। আমাকে বসতে বলে তিনি বলেন চুক্তিপত্রে সই করা হয়ে গেছে বিষয়টি এখনো তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না। চুক্তির মেয়াদ পাঁচ বছর এবং আমরাই হবো সুমন এন্টারপ্রাইজের একমাত্র সরবরাহকারী – এই দুটি বিষয়ের কথা তিনি কয়েক বার করে উল্লেখ করেন এবং বলেন এটি হবে আমাদের ব্যবসার ইতিহাসে অন্যতম লাভজনক চুক্তি। সুমন এন্টারপ্রাইজ হয়তো শহরের সবচেয়ে বড় যন্ত্রাংশের দোকান নয়, কিন্তু এর একটি বিশাল ক্রেতাশ্রেণি রয়েছে, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এর সেবা গ্রহণ করছে। আমরা এই ক্রেতাশ্রেণির মধ্যে বিরাট শক্তি নিয়ে প্রবেশ করতে পারবো – যা তিনি একটি দিন আগেও ভাবতে পারেননি। তিনি আমাকে ধন্যবাদ দেন এবং তার সঙ্গে দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান।
আমার ইচ্ছা ছিল রফিকুল্লাকে একবার ফোন করা। চুক্তিপত্রে সই হয়ে গেছে খবরটি তাকে দেয়া। কিন্তু পরক্ষণে মনে হয় আশরাফ সাহেব এখান থেকে বেরিয়ে যাবার পর যাদের সঙ্গে কথা বলবেন তাদের মধ্যে হয়তো সেও হবে একজন। তা ছাড়া তার মধ্যে আমি যে আত্মবিশ্বাস লক্ষ করেছি তাতে বলা যায় সে-ই হয়তো আমাকে অভিনন্দন জানাতে ফোন করবে।
“ঠিক আছে,” আমি রজব আলী সাহেবকে বলি। “তবে সাধারণ এবং ছোটখাটো কিছু হলেই চলবে, বেশি টাকা খরচ করবার দরকার নেই।” “তা দেখা যাবে,” তিনি বলেন। “আজ আমরা একটু আগে বেরিয়ে যাবো। আমি একটা চমৎকার জায়গা চিনি। জায়গাটা বেশ নিরিবিলি। আপনার পছন্দ হবে।”
আমরা লিফটে করে শান্তিনগরের একটি বারো তলা ভবনের ছাদে খোলা একটি রেস্টুরেন্টে যাই। দরজা দিয়ে ঢুকতেই একজন অভ্যর্থনাকারী আমাদের সালাম দেয়। তার কথাবার্তায় মনে হয় রজব আলী সাহেব এখানে প্রায়ই আসেন এবং সেজন্য তারা একে অন্যের পরিচিত। সে আমাদেরকে শাদা কাপড় দিয়ে মোড়ানো একটি গোল টেবিলে নিয়ে যায় এবং আমাদের জন্য দুই বোতল পানি নিয়ে আসে। আমরা স্থির হয়ে বসলে খোঁজ করবার আগেই হাসিমুখে এগিয়ে আসে একজন তরুণ খাবার পরিবেশক। আমরা ভালো আছি কি না তা সে ন¤্রভাবে জানতে চায়, যার প্রতি রজব আলী সাহেব একই ন¤্রভাবে বলেন, “খুব ভালো। আপনি?” হাসিমুখে পরিবেশক মাথা নোয়ায়। টেবিলের ওপর থেকে চামড়া দিয়ে বাঁধানো এবং সোনালী অক্ষরে ছাপানো খাদ্য-তালিকাটি হাতে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে রজব আলী সাহেব পাঁচটি খাবার বেছে নেন। দশ মিনিটের মধ্যে সব রেডি হয়ে যাবে বলে পরিবেশক তালিকাটি নিয়ে চলে যায়।
এই ধরনের রেস্টুরেন্ট আমি আগে কখনো দেখিনি। চারদিক খোলামেলা। মেঝে, দেয়াল, আসবাবপত্র সব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। কোলাহল নেই বললেই চলে। প্রচুর বাতাস আসছে।
রজব আলী সাহেব বলেন, “এখন থেকে আপনি এখানেই খেতে আসবেন। জীবনকে পরিবর্তন করবার জন্য সুবিধামতো মাত্র একটা সুযোগ দরকার। আজ আপনার জন্য সেই সুযোগ এসেছে। যতটা পারেন উপভোগ করে নিন।”
খাবার খেতে আমাদের প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় লাগে। এই সময়ের মধ্যে আমরা নানা বিষয়ে কথা বলি। এর মধ্যে প্রধানতঃ থাকে আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের কথা। আরো সূ²ভাবে বললে বলতে হবে এই সময়ে রজব আলী সাহেব তার নিজের জীবনের কথা বলেন। তার গ্রামের বাড়ি আলীশহরে, যেখানে এখনো থাকে তার চাচাতো ভাইবোনেরা। কেউ ব্যবসায়ী, কেউ উকিল, কেউ কলেজে পড়ান। তার পরিবারের সবাই ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন দেশে। কেউ অষ্ট্রেলিয়ায়, কেউ আমেরিকায়, কেউ ইউরোপে। আমেরিকায় তার একটি ভাই – আরমান আলী, তাদের সবার ছোট – নাসা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। খুবই মেধাবী মানুষ, না দেখলে বোঝা যায় না। বই না পড়ে একটা মুহূর্তও কাটাতে পারে না। একজন জাপানী ভদ্রলোককে বিয়ে করে তার একমাত্র বোন এখন জাপানের ইয়ামাগাতায় থাকে। তিনিও বিদেশে চলে যেতেন, কিন্তু আমাদের কোম্পানিতে ম্যানেজার হবার ব্যাপারটি তিনি প্রচÐভাবে উপভোগ করছেন। তা ছাড়া তার স্ত্রী, হুমাইরা মঞ্জুর, চরমভাবে বিদেশে স্থায়ী হবার বিপক্ষে। তিনি একজন কবি, গত কয়েক বছরে সাবলীল প্রকাশনী থেকে বের করেছেন গোটা তিনেক কবিতার বই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে লেখা তার দুটি বিখ্যাত কবিতার নাম হচ্ছে ‘মাগো, তোমার জন্য এই ভোর’ এবং ‘আমিও একজন বীরশ্রেষ্ঠ’। ‘মাগো, তোমার জন্য এই ভোর’-এর একটি প্রখ্যাত লাইন হচ্ছে, “আমার ধুলিমাখা রিক্ত প্রাণ উড়ে যায় প্রতিটি ঘরের কোণে।” স্ত্রীর যুক্তি : বিদেশে গেলে আমি কবিতা লিখবো কি নিয়ে? না, আমাদেরকে থাকতে হবে এখানে, বাংলাদেশে। গত বছর এক ছুটিতে স্ত্রীকে নিয়ে তিনি বেড়াতে গেছেন কাপ্তাই। সময় করে আমারও সেখানে একবার যাওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
আমি বুঝতে পারি আমার জীবন নিয়ে আসলে বলার কিছু নেই। যা আছে তার অনেকটাই আমি চাই আড়ালে থাক। কি বলবো? দারিদ্র, অসহায়ত্ব, সংগ্রাম, অপমান, লজ্জা ও পরাজয় – এগুলোর বাইরে বলার মতো আমি কিছু দেখি না। এগুলোর কোনোটিই হয়তো তিনি বুঝবেন না। রফিকুল্লার সঙ্গে আমার যে দুরত্ব রয়েছে, আমি দেখি রজব আলী সাহেবের সঙ্গে আমার সে দুরত্ব রয়েছে আরো অনেক বেশি। সে দুরত্ব কিছুটা কমতে পারে যদি আমি কখনো ওপরে উঠতে পারি, কিন্তু কখনোই তা মুছে ফেলা যাবে না। আমার কোনো ভাই-ই নেই। নাসায় যাবার মতো লোক আমি পাবো কোথায়! খালাতো ভাই, মামাতো ভাই, চাচাতো ভাই : সবাই আমার মতো নিরবে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। কেউ তাদের দিকে তাকাচ্ছে না। বাবা-মা থাকতেও শুধু খাবারের জন্য তাদের একজনকে কয়েক বছর থাকতে হয়েছে এতিমখানায়। এখন সে পাটের কলে কাজ করে। কম টাকায় ছোটখাটো একটা ব্যবসা খোলার জন্য কয়েক বছর আগে একজন চলে গেছে সুদূর রাঙামাটিতে। একজন পড়ায় বেরনাইয়া রাসুলিয়া কওমী মাদ্রাসায়। পরোক্ষভাবে আমরা জানি আমরা কে কোথায় থাকি বা কি করি। কিন্তু নিজের ব্যর্থতাকে ঢাকতে গিয়ে সবাই এড়িয়ে চলি একে অন্যকে। আসলে একদিন আমাকে কারো সামনে বসে নিতান্ত ভদ্রভাবে, গুছিয়ে গুছিয়ে নিজের সম্পর্কে কয়েকটি কথা বলতে হবে – এই পুরো জিনিশটিই আমার কাছে কেমন অস্বাভাবিক মনে হয়। এরকম একটি কাজের জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। সে জন্য আমি তাকে শুধু আমার বাবার নাম বলতে পারি, বলতে পারি আমার প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ের নাম, বলতে পারি কোন শিক্ষক আমাকে জ্যামিতি ও ত্রিকোণমিতি বিষয়ে সাহায্য করেছেন, আমাকে দক্ষিণ আমেরিকার কৃষিকাজ ও অষ্ট্রেলিয়ার জীবজন্তু সম্পর্কে বলেছেন, এসব। তিনি মনোযোগ দিয়ে শোনেন।
সবশেষে আমরা ফিরে আসি আমাদের মুল আলোচনায়। আজকের চুক্তি তার মনে দাগ কেটেছে। এই সুযোগে তিনি আমাদের ব্যবসাটিকে নিজের আদলে গড়ে তুলতে চান। “আপনাকে আমি চট্টগ্রাম অঞ্চলের সমন্বয়কারী হিসাবে দায়িত্ব দিতে চাই,” তিনি বলেন। “এই পদে আপনি কাজ করবেন আমাদের পনের থেকে বিশ জন প্রথম সারির বিক্রয় প্রতিনিধির সঙ্গে। কিন্তু সেটাই বড় কথা নয়। সেখানকার এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনে যেসব বড় বড় কোম্পানি রয়েছে তাদের সঙ্গে একটি দীর্ঘস্থায়ী ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে আপনার প্রধান কাজ। চট্টগ্রামে আমাদের একজন ব্যবসা উন্নয়ন কর্মকর্তা রয়েছেন। কয়েক বছর ধরে কাজ করলেও বিভিন্ন কারণে তিনি আমাদের আঞ্চলিক লক্ষমাত্রা অর্জন করতে পারছেন না। তাকে আমরা ঢাকায় তুলে নিয়ে আসবো এবং অন্য কোনো কাজ দেবো। আপনি সেখানে যাবার পর আপনি ও আমি একত্রে কাজ করে এই কোম্পানিকে অনেক অনেক ওপরে নিয়ে যাবো। আপনি যদি রাজি থাকেন, তাহলে মালিক পক্ষকে বলে আমি আজই আপনার জন্য সব কাগজপত্র ঠিক করে ফেলবো, যাতে যত দ্রæত সম্ভব আপনি কাজ শুরু করে দিতে পারেন। আশরাফ খান আমাদের অফিসে আসছেন একথা আমি তাদেরকে গতকাল জানিয়েছি। আপনাকে নিয়ে আমি নতুন করে ভাবছি এমন ইঙ্গিতও আমি তাদেরকে দিয়েছি। আমার মনে হয় পরিকল্পনাটি নিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে যেতে পারবো। কোনো অসুবিধা হবে না।”
আমাকে নিয়ে এতদূর ভাবার জন্য আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই। “আমি আপনার নজরে আসতে পেরেছি এটা ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য একটা অনেক বড় প্রাপ্তি,” আমি বলি। “এমন কিছু আমি আসলে আশা করিনি। তবে আমি এখনো এই ধরনের বড় কোনো দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত নই। বিশেষ করে আঞ্চলিক সমন্বয়কারীর দায়িত্ব, যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছে কোম্পানির ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি। একথা আমি বলছি এজন্য যে সুমন এন্টারপ্রাইজের আশরাফ খান আমাদের অফিসে আসার পেছনে আমি আমার অবদান খুব কমই দেখতে পাচ্ছি। সত্যি কথা বলতে কি – আমি এখনো মনে করছি না একজন বিক্রয় প্রতিনিধি হিসাবে আমার দক্ষতার কারণেই এই চুক্তিটি সম্পন্ন হয়েছে এবং এভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এই মুহূর্তে যদি আপনি আমার কাছ থেকে একটা উত্তর চান, আমি বলবো আমি দায়িত্বটা নিতে পারছি না। দুঃখিত। আপনি অন্য কাউকে খুঁজে দেখুন।”
“আপনাকে এখনই কিছু বলতে হবে না,” রজব আলী সাহেব হেসে বলেন। “আপনি প্রস্তুত কি না তা নিয়ে আপনার প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু আপনি যদি আমাকে তা জিজ্ঞেস করেন আমি বলবো আপনি অবশ্যই প্রস্তুত। সুমন এন্টারপ্রাইজ আপনাকে পছন্দ করে – আপনার কাজে এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় মূলধন, আর কিছুর দরকার নেই। একজন ম্যানেজার হিসাবে আমি আরো বলবো আপনি আমার কাছে কোম্পানির সুনাম রক্ষা ও পণ্য বিক্রয় বিষয়ে আপনার দক্ষতা যথেষ্টভাবে প্রমাণ করেছেন, যার ফলে ব্যবসার প্রসার ও উত্তরোত্তর উন্নতির জন্য আমি আপনাকে চট্টগ্রাম পাঠাতে চাই এবং আমি চাই আপনি সেখানে যান।”
“কয়েকটা জিনিশ আমাকে ভেবে দেখতে হবে, সেজন্য দুয়েকদিন সময় নিয়ে আমি আপনাকে জানাবো,” একথা বলে আমি আলাপ শেষ করি। রজব আলী সাহেব বিল পরিশোধ করার পর আমরা লিফট দিয়ে নামি। দিনের বাকি অংশটি আমি ছুটি নিতে পারি এমনটি বললেও আমি তাকে জানাই টঙ্গীর নয়ানগরে একটি মোটর সাইকেল মেরামতের ব্যবসার সঙ্গে আজ বিকেলে আমার দেখা করার কথা, আমি বরং সেদিকে রওয়ানা করি। “তাদেরকে আমি ফোন করে জানিয়ে দিতে পারি আপনি অন্য কোথাও আটকা পড়ে গেছেন, আজ আসতে পারবেন না,” তিনি বলেন। “তাতে অসুবিধা হবে না।” “না,” আমি হেসে বলি। “আমি সেখানে যেতে চাই এবং যাবার জন্য আমার হাতে যথেষ্ট সময় আছে।”







