প্রচ্ছদপ্রবন্ধশামসুর রাহমানের ছড়া সাহিত্য

লিখেছেন : আরিফ চৌধুরী

শামসুর রাহমানের ছড়া সাহিত্য


আরিফ চৌধুরী 

সাহিত্য ও সংস্কৃতি মানুষের সামাজিক রাজনৈতিক প্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, রাজনৈতিক ধারার মতো সাহিত্য ও পরিবর্তিত রূপ লাভ করে সামাজিক অবস্থার পরিবেশ ও প্রতিবেশের উপর। একটি দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো, প্রাকৃতিক পরিবেশ, লৌকিক ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যবোধ স্বপ্ন ও কল্পনা, সুখ দুঃখের বিচিত্র রূপ ফুটে ওঠে লেখকের সাহিত্য সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। কবিরা সর্বদা অনুভূতি প্রবণ ও আবেগময় বলেই সকল সামাজিক রূপ তাদের চেতনায়, শৈল্পিক ও নান্দনিকতা লাভ করে। তেমনিভাবে কবি শামসুর রাহমানের ছড়ায় উঠে এসেছে স্বদেশ চেতনা,মাটি, মানুষ, ফুল, পাখি, নদী ও মুক্ত আকাশ। রবীন্দ্রনাথের পথ ধরে তিনি নানান ছড়ায়, কবিতায় ছন্দের ব্যবহার করেছেন সহজ সরল ও মৌলিকতায়।
কবি শামসুর রাহমানের ছড়া লেখা শুরু হয় সাহিত্য চর্চার এক যুগ পরে ষাট দশকের শুরুতে।
ষাট দশকের সেই সময়ে শিশুদের নিয়ে লেখালেখির ভাবনা তার মধ্য কাজ করতে থাকে। কবির শিশু কিশোরদের নিয়ে লেখা প্রথম কবিতার বই” এলাটিং বেলাটিং ” (১৯৭৪) প্রকাশের পর পরই শামসুর রাহমানের ছড়া সাহিত্য এক নতুন মাত্রার সূচনা করে।
দেখতে দেখতে খুব কম সময়ের মধ্য তিনি পাঠকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। আরও দুটো ছড়ার বই ” ধান ভানলে কুঁড়ো দেবো” এবং গোলাপ ফোটে খুকির হাতে” প্রকাশিত হলে ছড়া সাহিত্যের অন্যতম একজন রূপকার হিসাবে অনিবার্য হয়ে ওঠেন। ইতিমধ্যে তার কিশোর স্মৃতিচারণমূলক রচনা “স্মৃতির শহর” প্রকাশিত হলে সবার মাঝে শামসুর রাহমান নতুন করে পরিচিতি লাভ করেন।
একে একে অর্ধ ডজন ছড়ার বই শিশু কিশোরদের উপহার দেন শামসুর রাহমান। যেমন: রংধনু সাঁকো, লাল ফুলকির ছড়া, নয়নার জন্য, আমের কুঁড়ি, কামের কুঁড়ি, তারার দোলায় দীপিকা, নয়নার জন্য গোলাপ, চাঁদ জেগেছে নদীর বুকে, শামসুর রাহমানের ছড়া সমগ্র সহ সকল ছড়া ছোটদের কাছে সমাদৃত হয়েছে।
শামসুর রাহমানের ছড়ার বিষয়বস্তু দেশ, মাটি, মানুষ ও প্রকৃতি ও নদী।
পাঠক সমাজের বাস্তবতা শিশু কিশোরদের মনভোলানো স্বপ্নরাজ্য, রাজপুত্রের গল্প, চাঁদমামা, স্বদেশে প্রেম ও সমাজের নানান অসংগতি বিষয়াবলী নিয়ে তার ছড়ার সংখ্যা কম নয়।
আমাদের স্বাধীকার আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম, দেশ মাতৃকার অভাবনীয় কষ্ট তার একাধিক ছড়ায় উঠে এসেছে, স্বদেশ প্রেমের ভাবনার চিত্রাবলীতে। যেমন: 
” আজকে আমি বলবো শুধু 
যুদ্ধ জয়ের কথা,
যার সুবাদে পেয়ে গেছি সাধের স্বাধীনতা।
যাদু বলে নয়কো মোটে
নয়তো সহজ পথে
স্বাধীনতা এলো বুঝি 
রক্তমাখা রথে,
স্বাধীনতার শত্রু যারা
তাদের পায়া ভারি। 
এসো সবাই মিলে ওদের 
তাড়াই তাড়াতাড়ি।
নইলে বাগান উজাড় হবে
ফুটবে নাকো ফুল
একনিমিষে উজাড় হবে
ক্ষীর নদীর কূল।
( যুদ্ধজয়ের কথা– শামসুর রাহমান) 
আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীন দেশ পেয়েছি। পেয়েছি আমাদের গর্বিত জাতীয় পতাকা।
সে স্বাধীনতা অর্জনে বীর বাঙালি মুক্তিসেনার দল যে আত্মত্যাগের মহীমার মধ্য দিয়ে শত্রুদের কাবু করে বিজয় নিয়ে এসেছে। সেই বিজয়ের উল্লাস ও আনন্দকে ধারণ করে শামসুর রাহমান লিখেছেন ” টুকটুকে লাল স্বাধীনতা” নামক অসাধারণ পংক্তিমালার অনবদ্য ছড়া।
” শত্রুসেনা বাংলা জুড়ে 
ক্ষণে ক্ষণে জুলুম করে 
শহর এবং গ্রাম পোড়ালো
লাশ সাজালো থরে থরে,
তাই না দেখে বীর বাঙালি 
বন বাদাড়ে, মাঠে লড়ে।
মুক্তিসেনার দীপ্ত চোখে
প্রতিশোধের আগুন ঝরে।
মুক্তি সেনা অস্ত্র হাতে 
শত্রুর দুর্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে
শত্রু উড়ে ঝড়ের মতো
বুক কাঁপানো তুমুল ঝড়ে।
স্বাধীন ভোরের টাটকা রোদেও
নীল আকাশে পায়রা উড়ে
খোকাখুকির নাচন দেখে
মায়ের হাসি লুটায় দোরে।
(টুকটুকে লাল স্বাধীনতা– শামসুর রাহমান)। 
শিশু কিশোরদের  মনোজগতের মাঝে নিবিষ্ট হয়ে শিশুদের রূপকথার গল্প, দৈত্য, রাজ ও রাজকুমারের গল্প,পরীরদেশের গল্প শোনানোর মনোজগতের ভাব মানবিক চেতনায় ধারণ করে শিশুদের মনোজগতের মাঝে আলোড়ন সৃষ্টির প্রয়াসে শামসুর রাহমানের ছড়ায় সহজ সরল ভাষায় রূপকথার গল্প বলেছেন শিশুদের মনোজগতকে  নতুন ভাবনায় উজ্জীবিত করার লক্ষ্য যেমন: 
জলটুপটুপ দিঘির পাড়ে ডালিম গাছের ডাল
ডালিম গাছে জল ঢেলেছে খুকু মনি কাল
তোতা পাখি লেজ নাচালো, ডালিম গাছে মৌ
হঠাৎ দেখি ডুব দিয়েছে লাল সালুকের বৌ।
লাল শালুকের বৌ এর মাথায় মুক্তো জমে ঐ
মুক্ত নিল হাওয়ার রাজা, আমরা চেয়ে রই।
(জলটুপটুপ– শামসুর রাহমান) 
সমাজের ঘটে যাওয়া নানান অসংগতির চিত্র পরিবেশের বৈচিত্র্যময়তা, শিশুদের রূপকথার মন ভোলানো জগতে কল্পনার রাজ্য, ভূত পরি, দৈত্য দেশের গল্প, সমাজের টানাপোড়েন, সহজ সরল ভাষায় তুলে আনার দক্ষতায় ও নির্মাণে শামসুর রাহমান ছিলেন সদা সচেষ্ট। রূপকথার রাজ্যের এক রাজার জীবনযাপনের নানান অসংগতির চিত্র তিনি বলেছেন এক মিষ্টি ছড়ায়–
” আজব দেশের ধন্য রাজা দেশ জোড়া তার নাম 
বসলে বলে হাঁটরে তোরা 
চললে বলে থাম।
রাজ্য ছিলো সান্ত্রি সিপাই
মন্ত্রী কয়েক জোড়া,
হাতিশালে হাতি ছিলো
ঘোড়াশালে ঘোড়া।
গাছের ডালে শুক সারিদের 
গল্প ছিলো কত
গল্পে তাদের রাজার কথা 
ফুটতো খইয়ের মতো।
(রূপকথা– শামসুর রাহমান)। 
শামসুর রাহমানের ছড়ায় শিশুদের মনোজগতকে নাড়া দিয়ে যায় এমন শব্দ, ছন্দ ও ভাষার কারুকার্যে শিশুদের মনোজগতকে খুব সহজেই দোলা দিয়ে যায়।
তাইতো তার ছড়া পাঠককের কাছে পৌঁছাতে পেরেছেন নানান কারুকার্যে। তার ছড়া সকল শ্রেণির পাঠককে ও পাঠকের মনে দোলা দিয়ে যায় অনায়াসেই। 
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি ও নিজস্ব কাব্যসত্তার অধিকারী কবি শামসুর রাহমান জন্মেছিলেন ঢাকায়, ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর, 
আদি নিবাস নরসিংদির পাড়াতলি গ্রামে।
বাংলা সাহিত্যের সকল শাখায় বিচরণের মতো ছড়া সাহিত্য শামসুর রাহমানের অবদান অসাধারণ মহীমায় অম্লান। তার ছড়া সমাজ চিন্তা,স্বদেশ ভাবনা, শিশুদের মনোজগতকে কথা উঠে এসেছে খুব সহজেই। আমাদের দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন মতো তার ছড়া সকল সময়ে ভাঙা-গড়ার দিনগুলোতে সমকালীন সময়ের সাক্ষাী হয়ে আছে, থাকবে চিরকাল।

………………………………..
 সভাপতি, চট্টগ্রাম কবিতা পরিষদ।

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা