নেয়ামত ইমাম
দ্বিতীয় খণ্ড
৪.
জীবনে কোনো বিশেষ অপরাধীর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। পত্র-পত্রিকা পড়ে বা মানুষের মুখে শুনে আমি যা বলতে পারি তা হচ্ছে অপরাধীদের জীবন থাকে বহুলাংশে সীমিত। তাদেরকে হিসাব করে কথা বলতে হয়। নম্র হতে হয়। ধৈর্য রাখতে হয়, যেমনটি হয়তো অপরাধে লিপ্ত হবার আগে বা আটক হবার আগে তারা করতে পারেনি। তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছে এবং সেজন্য এখন ভীষণভাবে অনুতপ্ত — এমনটি মানুষ তাদের মধ্যে দেখতে চায়। অনুতাপ করতে দেখা না গেলে সবাই তাদেরকে ধিক্কার দেয়। কিন্তু কেউ আমাকে কখনো এমন কোনো তথ্য দিতে পারেনি যেখানে আটক করার পর অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পরিষ্কার করে বলা হয় না কেন তাকে আটক করা হয়ছে, যা এখন আমার ক্ষেত্রে ঘটছে। আমাকে যদি কেউ অনুতপ্ত দেখতে চায় তাহলে তার আগে আমাকে বলতে হবে কি অপরাধ সম্পর্কে আমি অনুতপ্ত হবো। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া যে কোনো মানুষ আমার কথা বুঝতে পারবে। সচরাচর যা শোনা যায় তাতে অপরাধীদের সাক্ষ্য নেওয়া হয়, কাগজপত্রে তাদের সই নেওয়া হয় — কখনো জোর করে, সাক্ষীদের সাক্ষ্য নেওয়া হয়, আইনজীবী বা বিচারকেরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন, দরজায় পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকে, কাউকে আবার পাঠানো হয় সর্বোচ্চ নিরাপত্তামণ্ডিত কারাগারে। কাউকে পরানো হয় পুলিশের হেলমেট ও প্রতিরক্ষামূলক জ্যাকেট। আরো কত কি। যে কোনো বিচারে সত্য-মিথ্যা প্রমাণের একটি বিরাট চাপ থাকে, সেগুলোর সঙ্গে শাস্তি বা স্বাধীনতার সূ² ও ন্যায্য যোগাযোগ নির্ণয়ের চাপ থাকে। কিন্তু সবার আগে থাকে ঠিক কোন দৃষ্টিকোণ থেকে কাউকে অপরাধী বলে সন্দেহ করা হবে তা নির্ণয় করা। তারপর একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দেখা হয় সে সন্দেহটি আইনানুগ কি না, ন্যায়বিচারের চর্চার ধারাবাহিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। কখনো তা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, কখনো তা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। বিশেষ করে বিভিন্ন সময় এমন কানাঘুষা আমি শুনেছি, যেখানে বলা হয় বিচারের কাজটি এত তাড়াতাড়ি সম্পন্ন করা হয়েছে যে তাতে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণাদি হয় সংগ্রহ করা হয়নি বা অবজ্ঞা করা হয়েছে। সে জন্যই কখনো কখনো শোনা যায় হাড়গোড় পুনরায় পরিক্ষা করবার জন্য কারো কবর খোঁড়া হচ্ছে বা যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীকে আবার আদালতে তোলা হচ্ছে এবং যথাযথ ক্ষতিপূরণ সহ মুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে এমনও হয়েছে যে বিশেষ অপরাধের ভিত্তিতে কাউকে আটক করা হয়, কিন্তু বিচারকার্য নিয়ে বছরের পর বছর গড়িমসি করা হয় বা তা একেবারে শুরু করা হয় না। যেমনটি ঘটে পিলখানার বিদ্রোহী জোয়ানদের ক্ষেত্রে বা চট্টগ্রামের লালখানের মজুমদার বাড়ির তের খুনের মামলার আসামিদের ক্ষেত্রে, যাদের মধ্যে ছিলেন জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের কতিপয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিভিন্ন ব্যাংকের কয়েকজন আঞ্চলিক পরিচালক, একটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় কয়েকজন কর্মী ও সমর্থক। কিন্তু কখনো এমন হয় না যে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মোটেই জানানো হয় না কেন তাকে তুলে আনা হলো বা আটকে রাখা হলো।
দুপুর বেলা খাবার পরিবেশন করতে এসে বাহাউদ্দিন মিয়া দরজাটি আবারো খোলা রেখে চলে যায়। বাইরে কথাবার্তা ও পায়ের শব্দ শোনা গেলে আমি দরজায় যাই, কিন্তু বাইরে কারা রয়েছে একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি হিসাবে আমার তা দেখার অনুমতি রয়েছে কি না তা ভেবে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। এই পর্যন্ত এখানকার নিয়মকানুনগুলোর একটিও আমি ভাঙ্গিনি। আমি চাই না আমার নামে কোনো অভিযোগ অফিসে চলে যাক, যা এই পরিস্থিতিতে আমার জীবনকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করতে পারে। কেউ যদি সত্যিই আমার ক্ষতি করতে চায়, তারা বলতে পারে আটকে রাখার পরও আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না, অপরাধ করার প্রবণতা আমার অস্তিত্বের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে, এই হচ্ছে তার প্রমাণ। কিন্তু না চাইলেও এক সময় আমি ইঞ্চি ইঞ্চি করে মাথা বের করে নিজেকে দরজার বাইরে তাকাতে দেখি। করিডোরের এক কোণে, সম্ভবতঃ ২১৯ বা ২২০ নম্বর কক্ষের সামনে, আমি সরদার আমিরুল ইসলামকে দেখতে পাই। তার সঙ্গে রয়েছে আলুথালু পোশাকের এক ক্লান্ত যুবক, যার মুখে বা গলায় গভীর আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট। যুবকটি কক্ষে ঢুকলে তিনি তাতে তালা মেরে চাবিটি পকেটে নেন। আমার বিশ্বাস তিনি আমাকে তার দিকে তাকাতে দেখেছেন। সেজন্য ভদ্রতার খাতিরে আমি বলি, “কেমন আছেন আপনি, আমিরুল সাহেব?” তার চাহনি দেখে বুঝতে পারি তিনি এমনটি আমার কাছ থেকে আশা করেননি। কিছুটা দেরিতে হলেও শুধু “ভালো” বলে তিনি আমার সামনে দিয়ে হেঁটে সিঁড়ির দিকে চলে যান।
বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে আমি সামিয়ানার কথা ভাবতে থাকি। দক্ষিণ পাইকপাড়ায় কোনো বাড়ির সামনে কখনো আমি একত্রে তিনটি গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখিনি। এটি একটি অতি দরিদ্র এলাকা। যারা গাড়ির মালিক বা জীবনে অনেক টাকা-পয়সা বা ধন-সম্পত্তি দেখেছেন, তারা এখানে থাকতে আসেন না। সুতরাং চলে যাওয়া পর্যন্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়িগুলোকে হয়তো আশেপাশের বাড়ি থেকে অনেকেই লক্ষ করেছে গতকাল। তাদের কাছ থেকে সামিয়ানা আমার আটকের কথা জানবে। খুব কৌতুহল হয় তারা আমার সম্পর্কে তার কাছে কি বলেছে তা জানার এবং সে সম্পর্কে সে নিজে এখন কি ভাবছে। তার সামনে আমি কখনো এমন কোনো আচরণ করিনি যার জন্য আমাকে উদ্বিগ্ন হতে হবে। আমার বিশ্বাস কোনো প্রতিবেশি আমার সম্পর্কে অপ্রীতিকর কথা বলে তার কান ভারি করতে চেষ্টা করলেও আমার সম্পর্কে তার ধারণাটি রাতারাতি পরিবর্তিত হয়ে যাবে না। আমরা এখন মাসের শেষের দিকে। আমি এখানে থাকলেও দুই তারিখের মধ্যে তার ভাড়া পরিশোধ করবো, যাতে একজন দায়িত্বশীল ভাড়াটিয়া হিসাবে আমাকে নিয়ে তার চিন্তা করতে না হয়। নিতান্ত আর্থিক দায় না থাকলে কেউ সাবলেট ভাড়া দিতে চায় না। সে জন্যই এমন কোনো মাস নেই যে ভাড়ার টাকাটি আমি তার হাতে সঠিক সময়ে তুলে দেইনি। যদি আর কোনো সুযোগ না থাকে, তাহলে রফিকুল্লাকে ডেকে আমি তার কাছে পাঠাবো এবং এভাবে বিষয়টির সমাধান করবো। হয়তো আজ রাতে রফিকুল্লার সঙ্গে আমার কথা হবে। সে নিশ্চয়ই চব্বিশ ঘন্টা বাইরে কাটাবে না। তখনই তার সঙ্গে আমি বিষয়টি নিয়ে আলাপ করবো।
বিকাল বেলা টয়লেটে যাবার জন্য বাহাউদ্দিন মিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সে জানায় এখনি সেখানে যাওয়া যাবে না, কারণ একজন বড় মাপের অভিযুক্ত ব্যক্তি, একজন লেখক, এই মুহূর্তে সেখানে আছে। সে আমাকে কয়েকটি মিনিট অপেক্ষা করতে বলে। লোকটির জন্য মাত্র কিছুক্ষণ আগে তাকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছে বলে সে জানায়। “কি রকম পরিশ্রম?” আমি জিজ্ঞেস করি। সে নাকি টেলিফোনে কারো সঙ্গে কথা বলেছে আধ ঘন্টা ধরে। সে সময় তার চোখের পানি, নাকের পানি মিলেমিশে টেলিফোনটি একেবারে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যায়। টেবিল এবং চেয়ারের হাতলগুলোও নাকি সে নোংরা করে ফেলে। গরম পানিতে তোয়ালে ভিজিয়ে এগুলোকে আবার ব্যবহারোপোযোগি করে তুলতে হয়। ব্যাপারটি ঘটে দুপুর বেলায়, বাহাউদ্দিন মিয়ার ব্যস্ততার সময়, যার ফলে তাকে কাজ করতে হয় দ্রæত। তবে সে বলে কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে এখানে এমনটি এই প্রথম ঘটেনি। এমনকি গত মাসেও দুই-দুইবার তাকে টেলিফোনের কক্ষটি পরিষ্কার করতে হয়েছে, যার মধ্যে একবার তাকে পুরো দিনের জন্য বন্ধ করে রাখতে হয়েছে কক্ষটি। “একটি টেলিফোনের কক্ষ এত কি নোংরা করতে পারে কেউ যে এটিকে সারাদিন বন্ধ করে রাখতে হবে?” আমি জানতে চাই। “কি ঘটেছিল সেখানে?” “তেমন কিছু না,” সে বলে। “শাহাতলী থেকে একজন স্থানীয় সংবাদাতাকে নিয়ে আসা হয়েছিল সেদিন। হয়তো সে বুঝতে পারেনি তার জীবনে ঠিক কী ঘটে যাচ্ছে। মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে সে প্যান্ট নষ্ট করে ফেলে।”
বিকাল চারটায় আমার জন্য চা নিয়ে আসে বাহাউদ্দিন মিয়া। দিনের শেষে ঘরে ফিরে যাবার আগে আজকের জন্য এই হবে তার সঙ্গে আমার শেষ দেখা। আমাকে রাতের খাবার দেবে সাহাবুদ্দিন। বাহাউদ্দিন মিয়া জানতে চায় যাবার আগে সে আমার জন্য কিছু করতে পারে কি না। আমি বলি একটি দিনে সে আমার জন্য যথেষ্ট করেছে, যদিও আমি নিজে আমার জন্য কিছুই করতে পারিনি। “সে কেমন কথা!” সে বলে। “আপনি নিশ্চয়ই অনেক কিছু করেছেন। আমি আপনাকে কয়েকবার টেলিফোনের কক্ষে নিয়ে গেছি। সেখানে আপনি হয়তো অনেকের সঙ্গে কথা বলে আপনার বিষয়টি সমাধান করতে চেয়েছেন। এখানে কখনো এমন লোক আসে যাদেরকে বারবার করে টেলিফোনটি ব্যবহার করার সুযোগ দিলেও তারা ফোন করবার মতো কাউকে খুঁজে পায় না। এমন নয় যে কাউকে তারা চেনে না বা ঢাকায় বা আশেপাশের কোনো জায়গায় তাদের আত্মীয়স্বজন নেই। কথা হচ্ছে এখানে অভিযুক্ত হিসাবে আসবার পর তাদেরকে গভীরভাবে তাদের সম্পর্কগুলোর দিকে তাকাতে হয়, সত্যিকার অর্থে বুঝতে হয় এই ব্যক্তি বা ওই ব্যক্তি আমার অবস্থাটি অনুভব করবে কি না এবং হৃদয় থেকে আমাকে সাহায্য করতে চাইবে কি না। অনেক লোক তাদের স্বামী, স্ত্রী বা সন্তানদের ফোন না করে ফোন করে এমন সব লোককে, বিশ বছর ধরে হয়তো যাদের সঙ্গে তাদের কথা হয়নি। সেই মুহূর্তে তারা সত্যিই জানে কে খাঁটি, কে খাঁটি নয়। কি ভয়াবহ অবস্থা দেখুন। এসব জানার পর একজন মানুষ হিসাবে আমি ভেতরে ভেতরে খুব কষ্ট পাই। কখনো কখনো মনে হয় আমরা যাদেরকে ভালোবাসি, শরীর কেটে তাদেরকে চোখ, যকৃৎ বা ফুসফুস দিয়ে দিলেও তারা আমাদের ত্যাগটা বুঝতে পারবে না। কিন্তু আপনার ব্যাপারটা আলাদা। সকাল থেকে আপনি যথেষ্ট সচল ছিলেন। আপনার মনোবল ভেঙ্গে পড়েছে এমনটি আমার কখনোই মনে হয়নি। আপনি খাওয়া-দাওয়াও নিয়মিত করেছেন। এটা একটা বিরাট ব্যাপার। হয়তো এখনো আপনি আপনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সমাধান করবার ব্যাপারে অগ্রসর হতে পারেননি। কিন্তু সে ব্যাপারে আপনি যে বিভিন্ন লোকের সঙ্গে যোগাযোগ করা শুরু করেছেন, তাকেও আমি অগ্রসর হওয়াই বলবো। সব একসাথ করলে হয়তো দেখা যাবে আপনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর সবকটি মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে খণ্ডন করবার জন্য আপনি প্রস্তুত।”
দিনের মতো আমি তাকে বিদায় জানাই। বলি কাল সকালে আমাদের আবার দেখা হবে। সে মাথা নোয়ায় এবং দরজাটি বন্ধ না করে চলে যেতে থাকে। আমি সে দিকে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করি। একটু হেসে “ধন্যবাদ” বলে সে দরজাটি বাইরে থেকে আটকে দেয়। আমি দাঁড়াই জানালায়, দেখি আফতাবনগর লেকের পানি অলসভাবে শুয়ে আছে। দূরে, চরম নিরবতায় উড়ে যাচ্ছে কয়েকটি পাখি। বাহাউদ্দিন মিয়া আমার ভেতরটা দেখতে পায়নি। সে জানে না আমি দরকারি কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। উপরন্তু আমি আমার চাকরিটি হারিয়েছি, যে চাকরির ওপর নির্ভর করে আমার বেঁচে থাকা। তাকে বলিনি অন্য অনেকের মতো আমিও ফোন করিনি আমার পরিবারের কাউকে। বিশেষ করে আমি আমার বাবাকে ফোন করতে পারতাম। কিন্তু করিনি।







