প্রচ্ছদসাম্প্রতিকত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ : জয়-পরাজয় নিয়ে একটি নির্মোহ পর্যালোচনা

লিখেছেন : আবু জাফর সিকদার

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬ : জয়-পরাজয় নিয়ে একটি নির্মোহ পর্যালোচনা

আবু জাফর সিকদার

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এ অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াত বা ১১ দলীয় ঐক্যবদ্ধ জোট কেন হেরেছে বা তাদের প্রত্যাশিত আসন অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে তা রীতিমতো একটি গবেষণার বিষয়।

নানা তথ্য উপাত্ত, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বহুবিধ কার্যকারণ বিচার বিশ্লেষণ করলে এ ব্যাপারে হয়তো অনেক কারণ বের হয়ে আসবে। আমরা সে বিষয়ে বিস্তারিত আলাপে যাবো না।

এখানে কেবল কয়েকটি মৌলিক কারণ ও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কিত দিকটি তুলে আনার চেষ্টা করবো।

আমার ধারণা, জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের হারে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেছে এবার বা বারবার তা হলো– ধর্মীয় ফেতনাবাজি ও ফতোয়াবাজি; এবং মূলধারার মিডিয়াট্রায়ালও এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক। তবে এই ফতোয়াবাজি ও ফেতনাবাজি মূল নেয়ামক, নাকি ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে হারিয়ে দেয়া হয়েছে এই সমীকরণ গাণিতিক সূত্রের মতো এক্ষণে মিলিয়ে দেয়া সম্ভব নয়। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কতটুকু হয়েছে বা হয়নি এ বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য উপাত্ত নেই, এটা সত্যিই ঘটে থাকলে তা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো প্রমাণের চেষ্টা করবেন।

আমরা ফতোয়াবাজি, ফেতনাবাজি এবং এর পূর্বাপর বিরূপ প্রভাব নিয়ে পর্যালোচনা করতে চাই। তবে মিডিয়ার প্রভাব সহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণও আলোচনার শেষে সংক্ষেপে তুলে ধরা হবে।

এ ব্যাপারে ফতোয়াবাজি ও ফেতনাবাজি একটি আলাদা ডিসকোর্স হিসাবে আলোচনার দাবি রাখে। জামায়াতের প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই তাদের রাজনৈতিক দর্শন ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণকে বরাবরই কয়েকটি বৃহত্তর ধর্মীয়গোষ্ঠী বা ঘরানা চরম বিরোধিতা করে আসছে। অনেকটা সাপে নেউলে অবস্থা! সব মিলিয়ে বিরোধিতা এক কথায় চরমে। তবে এটাও ঠিক যে, প্রায় সব ঘরানার আলেমওলামা পীর মাশায়েখ সহ ইসলামপ্রিয় শিক্ষিত ও রাজনৈতিক সচেতন একটি অংশ জামায়াতের রাজনৈতিক তৎপরতায় সক্রিয় অংশিজন।

এসব নিয়ে একটু বিস্তৃত পরিসরে আমরা পর্যালোচনা করতে চাই। জামায়াত এর এবারের পরাজয়ে এই ফতোয়াবাজি এবং গোষ্ঠী স্বার্থ দৃশ্যনীয়ভাবেই প্রভাব বিস্তার ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। ডেমোগ্রাফিক ভোট বিশ্লেষণে এর প্রমাণ স্পষ্ট।
জামায়াত জোট বরিশাল, ফরিদপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট, ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, বি বাড়িয়া, নোয়াখালী এসব অঞ্চল ও বিভাগে সবচেয়ে বেশি খারাপ ফলাফল করে। অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে বৃহত্তর রংপুর, রাজশাহী, খুলনাজুড়ে জামায়াত ও ১১ দলীয় জোট অনেক ভালো রেজাল্ট বের করে আনতে পেরেছে।

প্রথমে আমরা দৃষ্টি দিই খারাপ রেজাল্ট করা বিভাগগুলোর দিকে।

বৃহত্তর বরিশাল– ফরিদপুর অঞ্চল : চরমোনাই, উজানি, আটরশি পীর ও দেওবন্দী আকিদার প্রভাব বলয়ের এলাকা।

বৃহত্তর চট্টগ্রাম বিভাগ — হেফাজত/দেওবন্দী/তাবলিগী হাটহাজারী মাদ্রাসা/পটিয়া বড় মাদ্রাসা ও অন্যান্য খারেজি বা দারুল নাজাত সিলসিলার মাদ্রাসা প্রভাবিত জনগোষ্ঠী ব্যাপক। পাশাপাশি মাজার ও সুফি ঘরানার কথিত আহলে সুন্নী ঘরানার আলেম, পীর ও তাদের কট্টর অনুসারী জনগোষ্ঠীরও এখানে প্রভাব রয়েছে।

সিলেট/ময়মনসিংহ/বি বাড়িয়া : দেওবন্দী, জমিয়ত, ফুলতলী পীর, মাজারপন্থি সুফি দরবেশ ও কথিত আহলে সুন্নীর আলেমওলামা, পীর ও তাদের সমর্থক গোষ্ঠী বেশ শক্তিশালী ও প্রবল।

কুমিল্লা/ফেনী/ নোয়াখালী: এখানেও সুন্নী জনগোষ্ঠীর প্রভাব কম হলেও হেফাজতি দেওবন্দীদের গোষ্ঠীগত ভোট ব্যাংক রয়েছে।

ঢাকা-নারায়নগঞ্জ-গাজীপুর অঞ্চলেও এই দুই ধারার অনুসারীর প্রভাব বিদ্যমান।

মোটকথা কাদিয়ানী থেকে বেরলভি (ড. আব্বাসী, যিনি আবার চরম কাদিয়ানী বিরোধীও বটে!), দেওবন্দী, তাবলিগী, হেফাজতি চরমোনাই, উজানী কিংবা ফুলতলী পীর, হিজবুত তাহরীর থেকে তাহেরী হুজুর, বায়তুল মোকাররমের খতিব থেকে বাবুনগরী কিংবা আব্বাসী হুজুর, জামায়াত বিরোধিতায় কেউ কারও থেকে পিছিয়ে ছিলেন না!

কী এক অভূতপূর্ব ঐক্যে তারা জামায়াত জোটকে চরম বিরোধিতার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছেন। ফতোয়া আর সমালোচনার কামান দাগানোর একমাত্র লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় এই জামায়াত। বিএনপি কিংবা অন্যকোনো সেক্যুলার দলের বিরুদ্ধে তাদের তেমন কোন কথা ছিলো না! বরং তাদের এই নির্দয়তার সুফল পুরোটাই ডিপোজিট হতে থাকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি’র ভোট ব্যাংকে।

একমাত্র উত্তরাঞ্চল ও খুলনা অঞ্চলের আহলে হাদিস ঘরনার আলেমগণকে নিরবতা পালন করতে দেখা গেছে। এবং এসব অঞ্চলে ধর্মীয় বিরূপ প্রচারণা ছিলো না বলে সাধারণ ভোটারগণ জামায়াত জোটকে নির্দ্বিধায় ভোট দিয়েছেন বলে আমার ধারণা। কাজেই ভোটের মাঠে এই জামায়াত বিরোধী ধর্মীয় কার্ড কতটা গভীর ও বিধ্বংসী প্রভাব ফেলেছে তা এই আলোচনা থেকে স্পষ্ট হবে আশা করি।

প্রথমে চট্টগ্রাম অঞ্চল নিয়ে আলোচনা তোলা যাক। এই আলোচনার পর বাকি অঞ্চল ও বিভাগের ফলাফল বিশ্লেষণে প্রায় অভিন্ন চিত্র দেখা যাবে।

কথিত মাজার ও সুফি ঘরানা– ইসলামি ফ্রন্ট, ছাত্রসেনা, মাইজভাণ্ডারীসহ বিভিন্ন মাজার ও খানকা কেন্দ্রিক গোষ্ঠী ও আলেমওলামা, ধর্মীয় বক্তা, বিশেষ করে আহমদিয়া সুন্নিয়া ঘিরে গড়ে ওঠা কট্টর জামায়াতবিদ্বেষী বিশাল অংশ – এরা বংশপরম্পরায় প্রো-আওয়ামী ভোট ব্যাংক হিসাবে পরিচিত। এবার ব্যতিক্রম হিসাবে তাদের বিরাট অংশ বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। এরা মোমবাতি ও চেয়ার প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। তাদের জশনে জুলুসে লক্ষ লক্ষ লোকের সমাগম হলেও তাদের প্রায় ১০০ ভাগকেই জামায়াত বিরোধী হিসাবে গড়ে তোলা হয়েছে। এরা ধর্মীয় বিশ্বাসে কড়া-সুন্নী হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে। এর মধ্যে নিজেদের বাক্সে মোমবাতি/চেয়ার মার্কায় মাত্র কয়েক শতাংশ টেনেটুনে ভোট পড়লেও বাকী ৯০/৯৫ শতাংশই পড়ে আওয়ামী ও বিএনপি বা অন্য কোন সেক্যুলার দলের পক্ষে। কারণ এই ঘরানার আলেম ওলামা পীর খানাকাপন্থি বক্তারা জামায়াতের চরম বিরোধিতা করলেও সেক্যুলার কোনো দলের বিরুদ্ধে একটি টু শব্দও উচ্চারণ করেন না। ফলে তাদের সমর্থকগোষ্ঠী ভোটের সময় জামায়াত বিরোধী বিকল্প যে কোনো একটি দলকে খুঁজে নেয়। আরও ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো এই গ্রুপটির রাজনৈতিক ফ্রন্টটি তৈরি করা হয়েছে ৮০/৯০ এর দশকে কেবল জামায়াত শিবিরের বিরোধিতা করার ধর্মীয় শাখা হিসাবেই। আওয়ামী লীগের মেয়র মরহুম এবিএম মহিউদ্দিন ও বিএনপির মরহুম আবদুল্লাহ আল নোমান সাহেব ছিলেন তাদের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক।জামায়াতের বিপরীতে গিয়ে তাদের জাসদের মাইনউদ্দিন খান বাদলকেও ভোট দিতে সমস্যা হয় না! আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের বিপরীতে জমিয়তুল ফালাহ মসজিদকেন্দ্রিক প্রভাব তৈরি এবং ঈদে মিলাদুন্নবী (স.)কে ঘিরে জশনে জুলুসের ব্যাপক প্রচার প্রসারে তারা সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেছেন এবং এই ধারা এখনও চলমান রয়েছে।গাউছিয়া কমিটি ও আহমদীয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসাকে ঘিরে এই ধর্মীয় উপধারা বিকাশমান।
এছাড়া চট্টগ্রামের প্রসিদ্ধ সব মাজার ঘিরে ওরশ, ফাতেহা, জেয়াফত ইত্যাদি যেসব বিশাল কর্মযজ্ঞ চলে, এর সাথে সংশ্লিষ্ট ভক্তকুল ও মুরিদান ও তাদের বংশ পরম্পরায় বর্ধনশীল সমর্থকগোষ্ঠী সবাই কোনো না কোনোভাবে এই জামায়াত বিরোধী ভোট ব্যাংক হিসাবে ব্যবহার হয়ে আসছে। এই সংখ্যা চট্টগ্রামে নেহায়েত কম নয়। এটা মাথায় রাখুন।
এর পাশাপাশি মাথায় নিন হেফাজত, দেওবন্দী, খারেজি – যে নামেই ডাকুন তাদেরও বিশাল নেটওয়ার্ক রয়েছে চট্টগ্রাম জুড়ে। অসংখ্য ছোট বড় মাদ্রাসা, মসজিদ, পীর মুরিদী ঘিরে তাদেরও বিশাল ভক্তকুল। তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ (আনুমানিক ২০ শতাংশ) জামায়াতের রাজনীতির সাথে একাত্ম বা সহানুভূতিশীল। তারা ভোট দিলেও অধিকাংশ কট্টর জামায়াতবিরোধী অবস্থানে অনড় এবং তাদের বিরোধিতা কতটা চরম মাত্রায় তা বুঝতে হলে হেফাজত আমীর মহিবুল্লাহ বাবুনগরীর জামায়াত বিরোধী ‘হারাম’ ফতোয়াই যথেষ্ট।
একমাত্র চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলায় সাতকানিয়া, লোহাগাড়া এবং বাঁশখালী এবং কক্সবাজার জেলায় বিজয়ী কিংবা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে জামায়াত জোট। কিন্তু চন্দনাইশ,আনোয়ারা, পটিয়া, বোয়ালখালী অঞ্চলে পটিয়া মাদ্রাসা, মোহসেন আওলিয়া সুন্নী মাদ্রাসা সহ হেফাজতি ও মাজারপন্থিদের শক্ত অবস্থানের কারণে জামায়াত কোণঠাসা হয়ে পড়ে। চন্দনাইশ সাতকানিয়া আংশিক (চট্টগ্রাম-১৪), আনোয়ারা (চট্টগ্রাম-১৩), বোয়ালখালী (চট্টগ্রাম-৮), পটিয়া (চট্টগ্রাম -১২) এই সব আসনে ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থীরা এবার মোমবাতি বা চেয়ার মার্কায় ভাল ভোট সংগ্রহ করতে পেরেছেন। আওয়ামী লীগ না থাকার কারণেই মূলত এই ভোট প্রাপ্তি বলেই অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। তবে আনোয়ারা, বোয়ালখালী ছাড়া বাকিরা বোধ হয় জামানত ফেরত পাবেন না। এছাড়া বাকিরা চোখ বুজে বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। ফলে জামায়াত জোট ও বিএনপি’র ভোটের ব্যবধান এখানে বেড়ে গেছে সহজেই।
উত্তর চট্টগ্রামে এই হিসাবটা আরও কার্যকরভাবে প্রভাব ফেলেছে। এখানে হেফাজতী বাবুনগরীর এন্টি ব্যালিস্টিক মিসাইল ফতোয়া, মাইজভাণ্ডারী, সুন্নী জনতার নয়নমণি বয়ানী হুজুরদের সার্বক্ষণিক জামায়াত বিরোধী সার্ভেইল্যান্স জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটকে ১০০ ভাগ নকআউট পর্বে ঠেলে দেয়। কারণ গ্রামের সহজ সরল অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত গরীব, মেহনতী মানুষ ধর্মীয় কোনো না কোনো বিশ্বাসে, ঘরানায় আস্থাশীল এবং মাদ্রাসা, মসজিদ, খানকার হুজুরদের কথায়, বক্তৃতায় তারা প্রভাবিত হয়। চট্টগ্রাম মহানগরেও প্রায় একই অবস্থা। ধর্মীয় আবেগ ও বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে পরস্পর বিরোধী নানা ঘরানার যারা জামায়াত বিরোধী মনোভাব পোষণ করে তারা একচেটিয়া বিএনপিকে এবার ভোট দিয়েছে। দলীয় বা ব্যক্তি বা আঞ্চলিক বিবেচনায় জাতীয় পার্টি বা অন্যরা কেউ ভোট টানতে পারেনি। জামায়াত জোটের এনসিপিসহ অন্য দলগুলোরও তেমন কোনো আশা ব্যঞ্জক কর্মতৎপরতা ছিলো না, প্রায় শূন্যের কোঠায় তাদের অবস্থান। জামায়াতের জন্য মূলত ‘এক দীর্ঘমেয়াদী ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে থেকে গেলো ধর্মীয় এই বিভেদরেখা। ভোটের হিসাব নিকাশে জামায়াত যদি এই বিভেদরেখা মুছে দিতে না পারে, বারবার এই বিপর্যয়ের মুখে পড়তেই হবে। ধর্মীয় আন্তঃগোষ্ঠীর মধ্যে দূরত্ব ঘুচাতে না পারলে পরিস্থিতি উত্তরণের কোন সম্ভাবনা নেই।
জামায়াতবিরোধী আওয়ামী বয়ান এবার তেমন কাজ না করলেও এই ধর্মীয় বিদ্বেষ ও কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি বিএনপির ভোট বাক্সকে ওয়াকওভার দিয়েছে এতে কোন সন্দেহ নেই।

মিডিয়ার বিরামহীন বিরূপ প্রচারণা ও আস্থার অভাবে
এখানে ভোটের পার্থক্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে অমুসলিম ভোটও একচেটিয়া ঐক্যবদ্ধ জোটের বিপক্ষের বাক্সে চলে গেছে। আমাদের ইউনিয়নে এরকম একটি বিশেষ ওয়ার্ডের ভোটের কারণে পুরো ইউনিয়নের ভোটের চিত্রটা পালটে গেছে। এটি শুধু আমাদের ইউনিয়নের গল্প নয়, সারাদেশেই এই চিত্রটি লক্ষনীয়। খুলনায় জামায়াতের এক হিন্দু প্রার্থী কিংবা সুনামগঞ্জের দিরাইশাল্লায় এড. শিশির মনির হেরে যাওয়া বিশ্লেষণ করলেও এই একই চিত্রটি ফুটে ওঠে। জামায়াতকে নানা কারণে তারা ভোট দিতে পারেনি এটাই বাস্তবতা।

বিএনপি’র বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মামলাবাজি, দখলবাজি, দলীয় কোন্দল ও হত্যা, রাহাজানি, জুলাই অভ্যুত্থানের বিপক্ষে নানারকম তৎপরতা সহ অনেক অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ার কারণে বিএনপি বেশ বেকায়দায় ছিলো কিন্তু জামায়াতের বিরুদ্ধে এরকম তেমন অভিযোগ না থাকার কারণে তারা বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে উঠে আসে। তাদের বিরুদ্ধে নারী বিষয়ক যে অভিযোগ তোলা হয় তাও শেষমেশ নারী ভোটাররা আমলে নেয়নি। কিন্তু এই ধর্মীয় কার্ডটি বেশ ভালোভাবেই জামায়াত জোটকে বেকায়দায় ফেলেছে সন্দেহ নেই। তবে নিশ্চয়ই সবাইকে নয়। একটি ভালো অংশ এক্ষেত্রে দিকভ্রষ্ট হয়েছে এতে কোন সন্দেহ নেই। চরমোনাই জোট থেকে বের হয়ে যাওয়াতে অবশ্যই বেশ কিছু নিশ্চিত সিট জোটের হাতছাড়া তো হয়েছেই।

যা হোক, আমরা উপরের আলোচনায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের যে বিশ্লেষণটি দেখলাম এর পর বোধ হয়, উল্লেখিত অন্য বিভাগ বা অঞ্চলেও এর কোন রকম ব্যতিক্রম ঘটেনি।
সিলেট, ময়মনসিংহ, ঢাকা, কুমিল্লা, ফরিদপুর ও বরিশাল বিভাগের ফলাফলের অভিন্ন প্রভাব আমরা লক্ষ্য করেছি। তাই আলাদা করে পর্যালোচনা আশা করি লাগবে না।

৩৬ জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে তারেক জিয়া দেশে ফেরার আগ পর্যন্ত বিএনপি ও তাদের জোট রীতিমতো ব্যাকফুটে চলে গিয়েছিলো। বিশেষ করে প্রচার প্রচারণায় এবং দলীয় নেতাকর্মীদের বেপরোয়া আচরণে মানুষ ব্যাপকহারে জামায়াতের এলাই এর দিকে ঝুঁকে যায়। বিশেষ করে অনলাইন মিডিয়া জামায়াত এনসিপি জোটের পক্ষে একটা হাইপ তুলতে সক্ষম হয়। তারেক জিয়া দেশে প্রত্যাবর্তনের পর মূলধারা মিডিয়া এবং বিএনপি সাইবার টিম সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা ব্যাপক প্রচারণায় ফিরে আসে। ঋণখেলাপী ও দ্বৈত নাগরিকত্ব প্রশ্নে কিছুটা বেকায়দায় পড়ে এবং দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে বিদ্রোহী প্রার্থীকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণেও তাদেরকে যথেষ্ট বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। জোটের শরিকদেরকে নিয়েও চলে নানা টানাপোড়েন। সব কিছু ছাপিয়ে নির্বাচনে শেষ হাসি তারাই হাসলো। ভুমিধস বিজয় যেন তাদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি কিছু এনে দিলো রাতারাতি! তারেক জিয়া নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বহুবার বলেছেন, এবারের ভোটযুদ্ধ কোন সহজ লড়াই হবে না। সবাইকে সংযত ও সংহত থেকে দলীয় শৃঙ্খলা ও সিদ্ধান্তকে মেনে কাজ করার জন্য তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে আহ্বান জানাচ্ছিলেন। অবশেষে বিজয় তাদের ঘরেই উঠলো। শতকের নিচে বেঁধে দিলো জামায়াত জোটকে। জয় পরাজয়ের এই দ্বৈরথে কেউ জিতবে কেউ হারবে, এটাই নিয়তি। তবে এই জয় বা পরাজয় চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়। আগামীর দিনগুলো বলে দিবে খেলায় কে কীভাবে টিকে থাকবে। সাফল্যের পরবর্তী মঞ্জিল অভিমুখে চলার দৃঢ় প্রত্যয়ে সব দল, জোট এগিয়ে যাবে। সুস্থ ধারায় জনগণ ও রাষ্ট্রের কল্যাণ কামনায় দায়িত্বশীল আচরণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। এটাই জাতির হতভাগা নাগরিকের প্রত্যাশা।

@চট্টগ্রাম
২৮.০২ ২০২৬

আরও পড়তে পারেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
spot_imgspot_imgspot_img
- Advertisment -spot_imgspot_imgspot_img

জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য সমূহ

Mohammad Burhan on গুচ্ছ কবিতা
কামরুন নাহার on গুচ্ছ কবিতা
ফরিদ ভূঁইয়া on জুলাইয়ের কবিতা
Mehedi Hasan on তেলাপোকা