শাহানারা স্বপ্না
প্রখ্যাত কবি, কথাশিল্পী, সংগঠক, সম্পাদক, শিশু সাহিত্যিক ও সাহিত্যান্দোলনের গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিত্ব জাহানারা আরজু সম্প্রতি তিরানব্বই বছর বয়সে চিরবিদায় নিয়েছেন। এক সময়ের তুমুল আলোচিত কবি, নিবেদিতপ্রাণ সাহিত্যিক, শ্রদ্ধেয় কবি জাহানারা আরজু কাটিয়েছেন এক গ্ল্যামারাস পোয়েটিক্যাল লাইফ। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয় একজন আপাদমস্তক সাহিত্য-কর্মী। লিখেছেন, সম্পাদনা করেছেন, সংগঠন তৈরী করেছেন এবং সাহিত্যের উন্নয়নে কাজ করেছেন। তাঁর অর্ন্তধানে আমরা এমন একজনকে হারালাম, যিনি বাংলাদেশের সাহিত্যাঙ্গনে, কাব্যজগতে, নারী জাগরনে, পত্রিকা সম্পাদনায় এবং শিশু সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং স্মরনীয় অবদান রেখেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন, আগের মত সরব থাকতে পারতেন না, সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও আর তৎপর ছিলেন না, তাই অনেকটাই আড়ালে চলে গিয়েছিলেন।
বিশ শতকের মধ্যভাগের আধুনিক কাব্যধারাসিক্ত জাহানারা আরজুর কবিতা। সেই সময়ে যাঁরা বাংলা সাহিত্যে নতুন একটি ধারা সৃষ্টি করেছিলেন, অবদান রেখেছিলেন–কবি জাহানারা আরজু তাঁদের মধ্যে অন্যতম এবং নারী সাহিত্যিকদের মধ্যে তিনি ছিলেন প্রধানতম কবি। নারী সাহিত্যিকের প্রসারমানতায় এবং সাহিত্যবিকাশে তিনি পূর্ববঙ্গের প্রথম মহিলা সাপ্তাহিক ‘সুলতানা’ নামের পত্রিকা প্রকাশ করেন। তিনি এ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। রাইটার্স গিল্ডের প্রত্রিকা ‘পরিক্রম’ এর যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে ১৯৬৫ সালে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ‘সেতুবন্ধন’ নামে আরেকটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনা করেন।
জাহানারা আরজু পঞ্চাশের দশক থেকে লিখছেন। তাঁর কবিতা প্রথম ছাপা হয় ১৯৪৫ সালে আজাদ পত্রিকার ‘মুকুলের মাহফিলে’। লিখেছেন তৎকালীন প্রতিটি বিখ্যাত পত্রিকায়–দৈনিক আজাদ, সওগাত, মোহাম্মদী, ইত্তেহাদ, মিল্লাত, বেগম, ইত্তেফাকসহ সবক’টা দৈনিকে। তাঁর কবিতায় একদিকে বিশ্বাস, আদর্শ, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের রূপায়ন, অন্যদিকে রয়েছে প্রকৃতিপ্রেম, স্বপ্ন কল্পনা ও রোমান্টিকতা।
জাহানারা আরজুর প্রথম কাব্যগ্রন্থ– ‘নীল স্বপ্ন’ ১৯৬২ সালে প্রকাশিত হয়। ‘কালের পাতায়’, পাখিমন,’ স্বাক্ষর’, ‘নতুন চর’, ‘শাশ্বত’ –এমনি অপরূপ শব্দবন্ধের তিপ্পান্নটি কবিতা। প্রতিটি কবিতাই কবির কাব্য-প্রতিভার উজ্জ্বল স্বাক্ষর। প্রকৃতিনিমগ্ন কবি একের পর এক তৈরী করেছেন স্বপ্নময় ধ্রুপদী চিত্রকল্প।
জাহানারা আরজু যেকালে সাহিত্যচর্চা শুরু করেন, সেকালে সমাজে নারী লেখক ছিল খুবই অল্প, হাতে গোনা কয়েকজন। তিনি বিভিন্ন সভা-সংগঠন, কবিতাসর ও পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে অবদান রাখেন। তাঁদের অপরিসীম ত্যাগ ও পরিশ্রমেই তৈরী হতে পেরেছে আজকের সাহিত্য জগতের পাটাতন। তিনি শক্তিশালী আধুনিক নারী কবি হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদা পেয়েছিলেন। কাব্যগ্রন্থ, উপন্যাস, ছোটগল্প, শিশুতোষ–সব ধরনের লেখায় তিনি স্বচ্ছন্দ। লিখেছেন নানা আঙ্গিক ও রূপ-রীতির প্রচুর কবিতা। প্রায় বিশটি কাব্যগ্রন্থ, চারটি শিশু-সাহিত্যগ্রন্থ, চারটি ছোটগল্পের বই ও দু’টি স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে তাঁর।
জাহানারা আরজুর কতিার ল্যান্ডস্কেপ, প্রগাঢ় চিন্তা ও স্বচ্ছতা পাঠকের অন্তর্লোক ছুঁয়ে যায়, সৃষ্টি করে গভীর দর্শনবোধ। মানুষ-মাত্রেই প্রকৃতির সাথে সংলগ্ন, ষড়ঋতুর পরিবর্তনে বিরহ-ব্যথার আনন্দ-বেদনে সক্রিয় সাাড়া দেয়া হৃদয়েরই ধর্ম। কবির কাজ সেই ভাষাতীত ভাষাকে বাঙ্ময় করে তোলা, কুশলী শব্দবন্ধনে কাব্যময় রূপ দেয়া– কবি জাহানারা আরজু সেই দুর্লভ শক্তির স্বাক্ষর রেখেছেন তাঁর কবিতার ছত্রে-ছত্রে। নিবিড় পর্যবেক্ষণে মূর্ত হয়ে উঠেছে তাঁর প্রকৃতিপ্রেম, মানবমনের অন্ত:স্রোতে হাসি-কান্নার ফল্গুধারার উত্থান-পতনের চিত্র। কবির কবিতার ভাষা তাঁর ’নরম মাটির কচি ঘাস’ এর মতই সহজ সরল। প্রকৃতি ও নিসর্গের নানাবিদ চিত্র ফুটে ওঠে তাঁর কবিতায়–অনাবিল সহজবোধ্য ভাব তৈরী করে এক ধরনের মুগ্ধতা—
”আমি আজ কান পেতে শুনি
দূর নক্ষত্রের কথা যত,
আমি আজ চোখ ভরে দেখি
সূর্যের ভাস্বর শিখা শত।
আলো গানে ভরে তুলি আমার এ বুক
আমার মুখর মন প্রাণবন্যা আবেগ উম্মুখ’..।
নীল স্বপ্ন ( পাখিমন)
কবি হিসেবে বাংলাসাহিত্যে বিশেষ করে কাব্য রচনায় তিনি যে অবদান রেখেছেন, তা সংখ্যা বা পরিমান বিচারে নয়, গুনগত উৎকর্ষেই স্মরণীয় ও বৈশিষ্ট্য মন্ডিত। তাঁর বেশ কিছু কবিতা ইংরেজি অনুবাদ হয় এবং দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়। সাহিত্যে অবদানের জন স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন ১৯৮৭ সালে ’একুশে পদক’। তিনি সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে শুধু সক্রিয়ই ছিলেন না, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁর কবিতা অবলম্বনে নির্মিত হয় ‘শবমেহের’ নামের স্বল্পদৈর্ঘ চলচ্চিত্র–যা ব্যাপক নারী আন্দোলনের রূপ পেয়েছিল।
তাঁর লেখায় মানুষের দু:খ-দুর্দশা বিশেষ করে নারীর প্রতি বৈষম্য, অর্ন্তদাহ, অবিচার, অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিচলিত কবিমন। প্রতিবাদে কবির হাতিয়ার হয়ে ওঠে কবিতা—
–”কিছুতেই বিশ্বাস নেই এখন আর–
চারদিকে সহিংস বাতাসের বুনো গোঙ্গানী,
পায়ের তলায় উত্তপ্ত গলিত লাভা–
মাথার ওপরে সাপের ছোবল,
বুকের ভেতরে প্রচন্ড খরা’
. .‘বন্য শ্বাপদে ভরে গেছে জনারন্য”
অন্তহীন সংলাপ : (বিচারের বানী কাঁদে অহর্নিশি’)
আধুনিক বাংলা কবিতায় তিনি উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে সর্ববমহলে সমাদৃত। তাঁর কাব্যধারা ব্যপ্তি ও বিশালতায় ক্রমঅগ্রসরমান হয়ে সাহিত্যের বিস্তীর্ণ দুয়ার খুলে দিয়েছে।
জাহানারা আরজু পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে একবিংশ শতকে এসে পরিণত প্রকরণে, মাটি ও মানুষের চিত্রকল্পে, উপমা-উৎপ্রেক্ষায় মননশীল ও সুগভীর জীবনবোধে আন্দোলিত, অসাধারন কাব্যময়তায় দীপ্ত।
জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান কবি জাহানারা আরজুর মূল্যায়ণে বলেছেন–”এখন মহিলা কবিদের মধ্যে জাহানারা আরজুই একজন প্রধান কবি। তাঁর কবিতায় একটি অন্তরঙ্গ অভিলাষ প্রকাশ পেয়েছে। তিনি দৈনন্দিন জীবন ও পারিবারিক জীবনের গন্ডিকে রক্ষা করে তার মধ্যে একটি বিশিষ্টতা দান করেছেন।”(নির্বাচিত প্রবন্ধ)।
প্রাচীন আরব সমাজে পরিবারে কবিজন্মকে খুব শুভ ও গৌরবের মনে করা হতো। কারণ, কবিরা যাবতীয় শুভ ও শুভ্রতার কথা বলে। কবিরাই সমাজকে সুন্দর করে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করে। ভারতবর্ষের সাতশ’ বছরের গৌরবোজ্জ্বল মুলিম শাসনামলে কবিদের সন্মান ছিল সর্বোচ্চতায়। কবির সৃষ্টির স্মরণ, মূল্যায়ণই একজন কবিকে যুগ-যুগ ধরে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।







